ঈদ ভ্রমণ: ঈশ্বরদীর পথে বিচিত্র এক ভ্রমণ অভিজ্ঞতা

ঘোরাঘুরির নেশাটা অনেক দিনের। যতদূর মনে পড়ে আমি সর্ব প্রথম একা ভ্রমণ করি ক্লাস সেভেনে থাকতে। তারপর থেকে অধিকাংশ সময় একাই ভ্রমণ করেছি। একা একা ঘুরে বেড়িয়েছি দেশের নানা প্রান্তে, দেখেছি অনেক রঙের মানুষ, আবিষ্কার করেছি মনের মাঝে লুকিয়ে থাকা অজানা অনেক পথ।

ভ্রমণ পরিকল্পনার সময় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সাথে সাথে আরেকটি জিনিসকে আমি গুরুত্বের সাথে দেখি, আর তা হলো নানা রঙের মানুষের সংস্পর্শ। এই পৃথিবীতে যে কত ধাঁচের মানুষ আছে, ভ্রমণ না করলে তা অজ্ঞই থেকে যেতে হয়। এই মুহূর্তে লালনের একটা গান মনে পড়ছে, ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’

বাসা থেকে রওনা হওয়ার সময়; Source: রমেন

সেদিন রাতভর ঘাঁটাঘাটি করে পটুয়াখালী ভ্রমণের জন্য একটা ট্যুর প্লান তৈরি করেছি। ভেবেছি এবারের ঈদটা প্রকৃতির সাথেই কাটাব, কিন্তু সকাল বেলা ঘুম থেকে ওঠার পর পাবনার ভুত মাথায় চড়ে বসল। ভাবলাম, পাবনার পাগলা গারদে পাগলদের ঈদ দেখতে গেলেও ব্যাপারটা মন্দ হয় না। তখন আমি পাবনার দর্শনীয় স্থানগুলোর একটা লিস্ট লেখার কাজ করছিলাম। হয়তো এজন্যই পাবনার ভুতটা মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছিল।

পাবনা আর পটুয়াখালী দুইটি জেলা মাথার মধ্যে ঘুর-পাক খাচ্ছে; কোথায় যাওয়া যায়! আগামীকাল ঈদ তাই ভেবে সময় নষ্ট না করে গন্তব্যটা অদৃষ্টের উপর ছেড়ে দিলাম। ব্যাগ গুছিয়ে নওয়াপাড়া বাস স্ট্যান্ডের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। নওয়াপাড়া পৌঁছে সোজা গেলাম ট্রেন স্টেশনে। সেখানে একটা ট্রেন দাঁড়িয়ে আছে। কাউন্টারে গিয়ে জানতে পারলাম সেটা রাজশাহীর ট্রেন। আমি আগে থেকেই জানতাম, রাজশাহীর ট্রেন পাবনার ঈশ্বরদী রেল স্টেশনে থামে। আমি স্পষ্টই বুঝতে পারছিলাম, ভাগ্য আমাকে পাবনা অভিমুখে ঠেলে দিচ্ছে।

স্টেশনে দাঁড়ানো ট্রেন; Source: অচিন্ত্য আসিফ

উঠে পড়লাম ট্রেনে। ইদের আগের দিন, তাই ট্রেনটা প্রায় ফাঁকা ছিল। এসময় খুলনা থেকে ছেড়ে যাওয়া প্রায় সব ট্রেনই এমন থাকে। কারণ তখন সবাই বাড়ি ফেরে। উল্টো দিকে খুব কম মানুষই যায়। আর এই হাতে গোনা সংখ্যার মধ্যে আমিও পড়ে গিয়েছি। আমার পাশের সিটে বসে থাকা ঈশ্বরদীর এক ভদ্রলোক আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কোথায় যাবেন? আমি যখন উত্তরে বললাম ঈশ্বরদী তখন তিনি স্বাভাবিকভাবেই আমাকে তাঁর এলাকার লোক মনে করলেন।

কিন্তু যখন জানতে পারলেন আমি ঘোরার উদ্দেশ্যে ঈশ্বরদী যাচ্ছি, আর জায়গাটি আমার কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত, তখন তিনি যেন খানিকটা কেঁপে উঠলেন। তিনি যেন ভাবতেই পারেন না যে, ইদের সময় কোনো মানুষ বাড়ি ছেড়ে অপরিচিত এলাকায় ঘুরতে যায়!

পুরো ট্রেনের সব থেকে বেশি যাত্রীওয়ালা বগি; Source: অচিন্ত্য আসিফ

ঝক ঝক করে ট্রেন এগিয়ে চলেছে। ইতিমধ্যেই যশোর স্টেশন পেরিয়ে গেছি। ট্রেন ভ্রমণে জানালার বাইরের দৃশ্যটা বেশ আকর্ষণীয় হয়। তাই আমার নজরটাও বাইরের দিকে। রাস্তার পাশ দিয়ে দিগন্ত জোড়া ধান ক্ষেত, মাঝে মাঝে দু’একটি পাকা-কাচা বাড়ি। এর মাঝে কমনভাবেই চোখে পড়ছিল সারি সারি খেজুর গাছ। যশোর জেলার মতো এত খেজুর গাছ দেশের অন্য কোথাও আছে কিনা আমার জানা নেই। আর থাকবে না কেন! যশোর জেলা তো এই খেজুরের গুড়ের জন্যই বিখ্যাত, যাকে স্থানীয়ভাবে পাটালী গুড় বলা হয়। এছাড়া আখের ক্ষেত ও ফুলের ক্ষেতগুলোও বেশ আকর্ষণীয়ভাবে ধরা দিচ্ছিল।

বিকাল গড়িয়ে গেছে। দুপুরে না খেয়েই বেরিয়েছিলাম। তাই পেটের মধ্যে ছুঁচো নাচছে। খাবারের উদ্দেশ্যে এ বগি ও বগি করছি কিন্তু খাবার বগি পাচ্ছি না। এসময় একজন সাদা ইউনিফর্ম পরা লোকের দেখা। ভাবলাম, তিনি নিশ্চয় খাবার বগির লোক। তার কাছে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম এই ট্রেনে আলাদা করে কোনো খাবার বগি নেই। তবে খাওয়ার ব্যবস্থা আছে।

দুইটি বগির মাঝখানে একটা ফাঁকা জায়গায় তাদের ছোট্ট দোকান। সেখানে একটি ওভেনে কিছু খাবার রাখা। খাবার বলতে কিছু নাস্তা; চিকেন আর জ্যাম-পাউরুটি। কী আর করার! এক প্লেট নিয়ে বসে গেলাম, কিন্তু খেতে পারলাম না। কারণ খাবারগুলো ওভেনে ছিল ঠিকই কিন্তু ঠাণ্ডা আর শক্ত। টেনে ছিঁড়তে পারছিলাম না। হতাশা নিয়ে সিটে ফিরে এলাম, আর পেটের মধ্যে ছুঁচো নাচতেই থাকল।

প্লাটফর্মে যাত্রী ওঠা-নামার দৃশ্য; Source: অচিন্ত্য আসিফ

একের পর এক স্টেশন পার হচ্ছি। ট্রেনটা সব স্টেশন থেকেই যাত্রী নিচ্ছিল; কোথাও এক জন আবার কোথাও দুই-পাঁচ জন যাত্রী ওঠা-নামা করছিলো। বিকাল সাড়ে চারটায় ট্রেনে উঠেছি, এখন নয়টা বাজতে ১৫ মিনিট বাকি। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দূরে কিছু নিয়ন বাতির আলো চোখে পড়ছিল। ওগুলো কীসের আলো জানি না। হয়তো কোনো ফ্যাক্টরি এলাকার হবে। তবে এই রাস্তা আর এই আলোগুলো আমার বেশ পরিচিত। কারণ খুলনা থেকে ঢাকার ট্রেনও এই রাস্তা দিয়েই যায়। আর এই আলোগুলো দেখেই আমি বুঝতে পারি, সামনে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ।

এখনও ঠিক তাই হলো, কিছুক্ষণের মধ্যেই ট্রেনটা হার্ডিঞ্জ ব্রিজের উপরে পৌঁছে গেলো। এখান থেকে জানালা দিয়ে আরেকটি ব্রিজ দেখতে পাচ্ছিলাম। এটা লালন শাহ ব্রিজ। ঐ ব্রিজের উপর দিয়ে তখন ধোঁয়া উড়িয়ে কী একটা গাড়ি যাচ্ছে। গাড়িটির সাথে আমি পরিচিত নই, তবে সেই দৃশ্য এত মনোরম লাগছিল যে তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব না।

লালন শাহ ব্রিজ; Source: অচিন্ত্য আসিফ

কিছুক্ষণের মধ্যেই গাড়িটি আঁধারে হারিয়ে গেলো। সাথে ব্রিজের আলো-ঝলমলে রুপটিও। কারণ ইতোমধ্যেই আমাদের ট্রেন হার্ডিঞ্জ ব্রিজ অতিক্রম করে ফেলেছে। ট্রেনটি এবার একটি প্লাটফর্মে এসে থামল। এই প্লাটফর্মটিও আমার বেশ পরিচিত, কিন্তু আমি যতবারই এই স্টেশনের উপর দিয়ে গিয়েছি ততবারই আমার কেমন যেন লোম খাড়া করা অনুভূতি হয়েছে।

কারণ এখানে আমি কোনো স্টেশন দেখতে পাইনি, শুধুমাত্র চারদিকে অন্ধকারে ছেয়ে থাকা প্লাটফর্মটাই দেখেছি। তাই এখানে নেমে হার্ডিঞ্জ ব্রিজের পাশে ঘোরাঘুরির সাহস পেলাম না। ভাবলাম একবারে ঈশ্বরদী নেমে এদিকে উল্টো আসব সেও ভালো, তবুও এখানে নামব না।

লালন শাহ ব্রিজ ও পাকশি রেল স্টেশন:

লালন শাহ সেতুটি ঈশ্বরদীর পাকশিতে হার্ডিঞ্জ ব্রিজের অদূরে অবস্থিত একটি সড়ক সেতু। এটি ১.৮ মিটার লম্বা। সেতুটির পশ্চিম পাশে (ভেড়ামারা, কুষ্টিয়া) এবং পূর্ব পাশে (পাকশি, ঈশ্বরদী)। এছাড়া হার্ডিঞ্জ ব্রিজের পূর্ব পাশেই রয়েছে পাকশি রেল স্টেশন, যা আপনাকে ভৌতিক রেল স্টেশন ভ্রমণের স্বাদ দিতে পারে।

পরবর্তি পর্ব: মায়াবী রাতে পাকশির পথে

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ঈদ ভ্রমণ: মায়াবী রাতে পাকশির পথে

ক্রিকেটার মাশরাফি বিন মর্তুজার বাড়ির পাশে কয়েক বছর