ঈদ ভ্রমণ: গ্রাম্য প্রকৃতির টানে অচেনা পথে হারিয়ে যাওয়ার গল্প

সকালের নাস্তা সেরে রওনা হলাম লালপুরের উদ্দেশ্যে। শুনেছি লালপুরের বিলমাড়িয়াতে একটা কুঠি বাড়ি আছে। তবে সেটা কার কুঠি বাড়ি বা কী বৃত্তান্ত সেটা জানি না। পথিমধ্যে একজন বৃদ্ধ বলেছিলেন তাই যাচ্ছি।

এয়ারপোর্ট মোড় থেকে ইজি বাইকে উঠেছি। বাইক সরাসরি লালপুর যাবে না। সেখানে যেতে গেলে প্রথমে আরামবাড়ি নামতে হবে তারপর সেখান থেকে লালপুর যাওয়া যাবে।

আরামবাড়ি পৌঁছে সেখানে একটু ঘুরে দেখছিলাম। মোড় থেকে ডান দিকের রাস্তায় ঢুকে পড়েছি। এখানে রাস্তার পাশেই একটি মাঠ রয়েছে আর মাঠের ওপাশেই একটা ঈদগাহ দেখা যাচ্ছে। মাঠের অন্য পাশেই রয়েছে আখের ক্ষেত। এখানে আসার সময় রাস্তার পাশে আরো বেশ কয়েকটি আখের ক্ষেত চোখে পড়েছিল। তাই স্বাভাবিকভাবেই বুঝতে পারছিলাম, এই অঞ্চলে বেশ আখের চাষ হয়।

মাঠ, ঈদগাহ, আখের ক্ষেত; Source: Achinto Asif

আরামবাড়িতে বেশিক্ষণ ঘোরাঘুরি করলাম না। মোড়ে এসে লালপুরের গাড়িতে উঠে পড়লাম। অবশ্য ঈদের দিন হওয়ায় সহজে গাড়ি পাচ্ছিলাম না। তাই স্ট্যান্ডে কিছুক্ষণ বসে থাকতে হয়েছিল।

আরামবাড়ি থেকে লালপুর যাওয়ার পথে রাস্তার পাশে বেশ কয়েকটি জায়গায় গরু কোরবানি দেওয়ার দৃশ্য চোখে পড়ছিল। ওগুলো দেখে আশঙ্কা হচ্ছিলো, ওরা রক্ত পরিষ্কার করবে তো! অবশ্য দূষণ গ্রামের মানুষকে বেশি একটা কাবু করতে পারে না। কারণ এখানকার খোলা-মেলা বাতাস সব উড়িয়ে নিয়ে যায়। যত সমস্যা শহরের মানুষের। কোনো দূষণই তাদের এড়িয়ে যায় না।

ইজি বাইকের ভেতর থেকে, এখানকার রাস্তাটা একটু ভালো; Source: Achinto Asif

আমি ইজি বাইকে ড্রাইভারের পাশের সিটে বসেছি। ড্রাইভার আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কোথায় যাবেন ভাই? উত্তরে আমি জানালাম, বিলমাড়িয়া। তখন তিনি আমাকে বললেন, তাহলে তো এখান থেকেই যেতে পারবেন। খামোখা এতদূর ঘুরে যাবেন কেন? এটা বলে সামনের একটি মোড়ে নামিয়ে দিলেন আর বললেন, এখান থেকেই বিলমাড়িয়ার গাড়ি পেয়ে যাবেন।

ইজি বাইকের ড্রাইভার যে মোড়ে নামিয়ে দিয়েছিলেন সেই জায়গাটির নাম মনে নেই। তবে আসলেই সেখান থেকে বিলমাড়িয়ার গাড়ি পেয়ে গিয়েছিলাম। এবারও ইজি বাইক।

এতক্ষণ হাইওয়েতে ছিলাম এবার প্রবেশ করলাম গ্রাম্য সরু রাস্তায়। এখানকার রাস্তাটা বেশ ভাঙাচোরা। গাড়িটা কেমন যেন লাফিয়ে লাফিয়ে চলছে। এমন পরিস্থিতিতে আমার বেশ আশঙ্কা হচ্ছিল, উল্টে যাবে না তো!

বিলমাড়িয়া বাজার; Source: Achinto Asif

আসলে গ্রামের রাস্তাগুলো এমনই। হাইওয়েগুলো ভাঙা হলেও সেগুলোকে একটা জাতে ফেলা যায়, কিন্তু গ্রামের রাস্তাগুলোকে কোন জাতে ফেলব বুঝতে পারি না। এটাকে না বলা যায় পাকা রাস্তা, আর না বলা যায় কাঁচা রাস্তা। দুইয়ের মাঝামাঝি যদি কোনো অবস্থান থেকে থাকে তবে তাই হবে হয়তো।

রাস্তার এক পাশে খালের মতো ছোট নদী। আর অন্য পাশে ঘর বাড়ি। কিছু কিছু বাড়ির উঠানে পাঁজা পাঁজা পাট খড়ি রাখা। আবার কোথাও শুকাতে দেওয়া পাটের আঁশ। মাঝে মাঝে দুই একটি ঘরের চালায়ও চোখ পড়ছে। টিনের এই  চালাগুলো চালকুমড়া সহ নানা ধরনের তরি-তরকারীর গাছে ছেয়ে আছে।

চলন্ত ইজি বাইক থেকে তোলা প্রাকৃতিক দৃশ্য; Source: Achinto Asif

এখন আমি কোথায় আছি জানি না। গ্রামের নামই বা কী! বেশ খানিকক্ষণ আগেই বিলমাড়িয়া বাজার পার করে এসেছি। ইচ্ছা করেই সেখানে নামিনি। গ্রাম্য রাস্তা বেয়ে অজানার উদ্দেশ্য যাত্রা করার ইচ্ছে আমাকে নামতে দেয়নি। আমি গ্রামেরই ছেলে। গ্রাম আমাকে টানে। সেই সাথে গ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও আমাকে মুগ্ধ করে কিন্তু সেটা যখন হয় নাটোরের কোনো গ্রাম, তখন তো কবি জীবনানন্দ দাশ হতে ইচ্ছে করে।

হাজার বছর ধ’রে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে,

সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে

অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে

সেখানে ছিলাম আমি; আরো দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে;

আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,

আমারে দু-দণ্ড শান্তি দিয়েছিলো নাটোরের বনলতা সেন।

চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,

মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য; অতিদূর সমুদ্রের ’পর

হাল ভেঙে যে-নাবিক হারায়েছে দিশা

সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি-দ্বীপের ভিতর,

তেমনি দেখেছি তারে অন্ধকারে; বলেছে সে, ‘এতদিন কোথায় ছিলেন?’

পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।

সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন

সন্ধ্যা আসে; ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল;

পৃথিবীর সব রং নিভে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন

তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল;

সব পাখি ঘরে আসে— সব নদী— ফুরায় এ-জীবনের সব লেনদেন;

থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।

আপনি যদি আমার এই ঈদ ভ্রমণের পূর্ব প্রকাশিত সব কটি লেখা পড়ে থাকেন আর লালপুর উপজেলা না চিনে থাকেন তবে হয়তো একটু চিন্তায় পড়ে গেছেন। কারণ আমি এর আগেই বলেছিলাম, আমি পাবনা ভ্রমণে যাচ্ছি। পাবনা ভ্রমণের এই গল্পে নাটোর এলো কোথা থেকে? আপনার মনে নিশ্চয়ই এই প্রশ্নটি উদয় হয়েছে।

চলন্ত ইজিবাইক থেকে তোলা প্রাকৃতিক দৃশ্য; Source: Achinto Asif

একটু ক্লিয়ার করে বলি। আমি নিজেও এতক্ষণ জানতাম না যে আমি নাটোরে আছি। ইজি বাইকে বসে স্থানীয় একটি লোকের সাথে কথা বলতে গিয়ে জানতে পারলাম, লালপুর উপজেলাটি নাটোরের অন্তর্গত। আর বিলমাড়িয়া লালপুরের একটি ইউনিয়ন।

ইজি বাইকে আমার পাশের সিটে বসে থাকা লোকটি আমার ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনি নিশ্চয় সাধু বাবার আশ্রমে যাবেন? তার এই প্রশ্ন শুনে আমি কী বলব বুঝতে পারছিলাম না। ভাবছিলাম, যদি বলি আমি গ্রাম্য প্রকৃতি দেখতে যাচ্ছি, তবে তিনি আমাকে হাফ পাগল মনে করতে পারেন। কারণ প্রকৃতির সাথেই যাদের বসবাস, তারা আলাদা করে প্রকৃতি উপভোগ করতে পারে না। এমনকি প্রকৃতি যে উপভোগ্য কিছু হতে পারে সেটা তাঁরা মেনে নিতে পারেন না। তাই তো গ্রামের মানুষ বিনোদনের জন্য ছুটে যান কৃত্রিম সৌন্দর্যে সাজানো পার্কগুলোর দিকে। আর শহুরে মানুষ ছুটে যান প্রকৃতির কাছে।

আমি তার প্রশ্নের উত্তরে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লাম। তিনি বললেন, তাহলে তো আপনাকে এখানেই নামতে হবে। বলেই ড্রাইভারকে গাড়ি থামাতে বললেন। আমি কী বলব বুঝতে পারছিলাম না। তাই নেমেই পড়লাম।

এই তিন রাস্তার মোড়ে নেমেছিলাম; Source: Achinto Asif

একটি তিন রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে আছি। আশেপাশে কোনো লোকজনও দেখতে পাচ্ছিলাম না। তাই তৃতীয় রাস্তা বেয়ে হাঁটতে শুরু করলাম। মনে মনে ভাবলাম এখানে যেহেতু নামতে বলল তাহলে নিশ্চয় এই তৃতীয় রাস্তা দিয়েই সাধু বাবার আশ্রমে যেতে হয়। কৌতূহলী মন উৎসুক হয়ে উঠলো, একবার গিয়েই দেখি কী আছে সেখানে!

হাঁটতে হাঁটতে একটু সামনে যেতেই একজন লোকের দেখা। তাঁর কাছে জিজ্ঞেস করলাম, ভাই সাধু বাবার আশ্রমটি কোন দিকে?

পরবর্তী পর্বে থাকবে:

সাধুর আশ্রম ও ভেল্লা বাড়ি মাজার দর্শনের গল্প।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভারতে নেপালি ও কলকাতার মানুষের জীবন

ভার‍তের দক্ষিণরাজ্য তামিলনাড়ুর শীর্ষ ভ্রমণ স্থানের গল্প