ঈদ ভ্রমণ:খেঁড়ু মিয়ার কাচারি ঘর ও ঈশা খাঁর দীঘির গল্প

ঈশ্বরদী বিমান বন্দরের পাশ থেকে কথা হচ্ছিল একজন স্থানীয় বৃদ্ধ লোকের সাথে। তিনি আমাকে একটি কাচারি ঘরের সন্ধান দিলেন, স্থানীয়ভাবে এটি খেঁড়ু মিয়ার কাচারি ঘর নামে পরিচিত। তার কাছ থেকে খেঁড়ু মিয়ার গল্প শুনছিলাম। খেঁড়ু মিয়া নামটা মূলত তার ডাক নাম ছিল, যার আসল নাম মকবুল হোসেন। এই ভদ্রলোকের শরীরটা অনেক হ্যাংলা-পাতলা ছিল বলে লোকে তাকে খেঁড়ু মিয়া বলে ডাকত।

রাস্তা থেকে খেঁড়ু মিয়াঁর কাচারি ঘর; Source: Achinto Asif

এয়ারপোর্ট মোড় থেকে ঈশ্বরদীর দিকে দুই মিনিট হাঁটতেই একটি মোড় পড়ে। বৃদ্ধ সেখান থেকেই একটি মাটির ঘর দেখিয়ে বললেন, ওটাই খেঁড়ু মিয়ার কাচারি ঘর। পাকা রাস্তার বাম পাশের মাটির রাস্তা ধরে এগিয়ে গেলাম সেদিকেই। এটি একটি মাটির তৈরি ঘর। দেয়াল ভেঙে বাঁশের চটা বেরিয়ে গেছে। এগুলো রডের পুরনো ভার্সন।

কাচারি ঘরও মূলত বর্তমান গেস্ট রুমেরই পুরনো ভার্সন। এটি বাংলাদেশের একটি পুরনো ঐতিহ্য। এক সময় কাচারি ঘর ছিল আভিজাত্যের প্রতীক। সেই সময়ের অবস্থাসম্পন্ন গৃহস্থের মূল বাড়ি থেকে একটু দূরে পথচারী বা অতিথিদের জন্য নির্মাণ করা হতো এই কাচারি ঘর। এখন আর তা দেখা যায় না।

কাচারি ঘর সম্পর্কে এমন তথ্য পাওয়া গেলেও এক সময় এটি রাজস্ব আদায়ের কাজেও ব্যবহার করা হতো। খেঁড়ু মিয়ার কাচারি ঘরটিও সম্ভবত রাজস্ব আদায়ের কাজেই ব্যবহৃত হতো।

কাচারি ঘরটির চারপাশ ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম। এর পিছন পাশে একটি উঁচু মিনার চোখে পড়ল। এটি আসলে মিনার নয়, কিন্তু কী সেটা জানি না। এটা বেশি পুরনো মনে হলো না। আমার ধারণা, সম্প্রতি এখানে কোনো মিল বা কারখানা ছিল। যা হোক, তার পাশেই রয়েছে বিশাল আম বাগান। সেখানে মাঝে মাঝে দু’একটা বাড়ি চোখে পড়ে। তবে বাগানটি বেশ বড়।

ঘুরতে ঘুরতে কাচারি ঘরটির অপর প্রান্তে গেলাম, সেখানে কিছু লোক কোরবানির গরু কাটার কাজ করছে। তাদের কাছে গিয়ে নিজের পরিচয় দিয়ে জায়গাটি সম্পর্কে জানতে চাইলাম।

আম বাগান; Source: Achinto Asif

লোকটি আমাকে যা বললেন তা আমি কখনো ভাবতে পারিনি। রীতিমতো একের ভেতর তিন! এই আম বাগানটি নিয়ে এলাকায় একটি গল্প প্রচলিত আছে। বলা হয়, এই বাগানটি এক সময় ঘন বন জঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল এবং এখানে বাস করতেন এক দেবীতুল্য নারী।

এক দিন ঈশা খাঁ এই বাগানে শিকার করতে আসেন। তখন কিছু বাঘ এসে তাকে ঘিরে ফেলে। এমন সময় সেই নারী এসে হিংস্র বাঘেদের চোখ রাঙিয়ে তাড়িয়ে দেন।

ঈশা খাঁ মহিলাটির প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে তাকে পুরস্কৃত করতে চাইলেন। মহিলাটি বললেন, আমি গৃহত্যাগী মানুষ, আমার আর কী চাই! আমাকে শুধু একটি কুঠি আর খাবার জলের জন্য দীঘি খনন করে দিলেই চলবে। তখন ঈশা খাঁ তার কাছ থেকে কিছুদিনের সময় নিয়ে একটি এক গম্বুজওয়ালা কুঠি ও একটি দীঘি খনন করে দিলেন।

৪০-৪৫ বছর বয়সী স্থানীয় লোকটি আঙুল দিয়ে বাগানের এক প্রান্তে দেখিয়ে বললেন, ঐ যে ঐ জায়গায় কুঠিটি ছিল। আমরা ছোটবেলায়ও সেটাকে দেখেছি। এখন তা ভেঙে গেছে। তিনি আরো জানালেন, ঈশ্বরদীর নামকরণের পেছনেও ঈশা খাঁ নামটি জড়িত। বলা হয়, ঈশ্বরদীতে ঈশা খাঁর কর্মচারীদের খাজনা আদায়ের জন্য অনেকগুলো কাচারি/ডিহি ছিল। ঈশা এবং ডিহি থেকে কালক্রমে এর নাম হয় ঈশ্বরদী।

লোকটি এদিকেই দেখাচ্ছিলেন; Source: Achinto Asif

আমি হাঁটতে শুরু করলাম। মাটির রাস্তা থেকে আবার সেই পাকা রাস্তায় উঠলাম। সেখান থেকে মোড়ে এসে বাম দিকে একটি ইটের রাস্তা চোখে পড়ে। এক লোকের কাছ থেকে জানতে পারলাম, এটিই দীঘির রাস্তা।

রাস্তাটি বেশ চিকন। আর দুই পাশে ঘন ঘন বাড়ি। একটি বাড়ির কিছু ছেলে-মেয়েরা ঈদের সাজে সেজে রাস্তায় দাঁড়িয়ে গল্প করছে। দেখে মনে হচ্ছে, রাস্তাটা তারা বাড়ির উঠানের মতোই ব্যবহার করে। সে যা হোক, আমি এক পাশ দিয়ে মাথা নিচু করে হাঁটতে লাগলাম। তারা আমাকে দেখল নাকি দেখল না সেটা আর দেখা হয়নি।

রাস্তার পাশের দৃশ্য; Source: Achinto Asif

একটু সামনে এগিয়ে যেতেই বিশাল এক ডোবা পুকুর চোখে পড়ল। একজন পথচারীর কাছ থেকে জানতে পারলাম, এটিই সেই দীঘি।

দীঘিটি কচুরিপানায় ভর্তি। আর পাতা পচা গন্ধে পানিতে হাত দেওয়ার পরিস্থিতি নেই। ক্যামেরা হাতে নিয়ে দুই তিনটা ছবি তুলতেই আকাশে মেঘেরা গর্জন করে উঠল। মনে হয় আবার বৃষ্টি হবে। তাই বেশিক্ষণ না দাঁড়িয়ে মূল রাস্তার দিকে হাঁটতে শুরু করলাম।

ঈশা খাঁর খননকৃত দিঘী; Source: Achinto Asif

রাস্তার মুখেই একটি দোকান রয়েছে। সেখানে বসে বেশ কয়েকজন লোক গল্প জমিয়েছে। কার গরু কত বড়, তা নিয়ে তুমুল বিতর্ক চলছে।

সকাল থেকে এখনো আমার পেটে কিছু পড়েনি। ক্ষুধায় পেট জ্বালা করছে। তাই ওদিকে কান না দিয়ে সোজা গিয়ে একটা পাউরুটি ও কলা কিনে নিলাম। কতক্ষণ যে এভাবে কাটাতে হবে, কে জানে! ঈদের দিন গ্রাম অঞ্চলে কোনো রেস্তোরাঁ খোলা পাওয়া মুশকিল। শহরেও যে তার ব্যতিক্রম হয় সেটা ঠিক নয়। ঈশ্বরদী থেকেও খাবার হোটেল খুঁজে ব্যর্থ হয়েছিলাম। তাই এতক্ষণ পর্যন্ত অভুক্ত থাকতে হলো।

কীভাবে যাবেন:

ঢাকা এয়ারপোর্ট রেলস্টেশন থেকে খুলনাগামী ট্রেনে করে ঈশ্বরদী পৌঁছাতে পারবেন। অথবা আপনি যদি বাসে আসতে চান তবে ঢাকার যে কোনো জায়গা থেকে এসে আপনাকে দাশুড়িয়া বাস স্ট্যান্ডে নামতে হবে। সেখান থেকে ইজি বাইক বা সিএনজি করে ঈশ্বরদী আসতে পারবেন।

আর ঈশ্বরদী রেলস্টেশন থেকে এয়ারপোর্ট মোড়ে যাওয়ার জন্য ইজি বাইক পাওয়া যায়। এয়ারপোর্ট মোড়ে নেমে যে কারো কাছে জিজ্ঞেস করলেই পেয়ে যাবেন খেঁড়ু মিয়ার কাচারি ঘর ও ঈশা খাঁর খনন করা দীঘি।

Feature Image: Achinto Asif

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

৫০ ডলারে দার্জিলিং ভ্রমণ! (রিশপ-লাভা)

ঈদ স্মৃতিতে ঈশ্বরদী বিমান বন্দর