ঈদ স্মৃতিতে ঈশ্বরদী বিমান বন্দর

আজ ঈদ। হোটেলের কেয়ারটেকার সকাল ছয়টায় ঘুম থেকে তুলে দিয়ে ‘ঈদ মোবারক’ জানালো। আমি ঝটপট রেডি হয়ে নিলাম। দশ কেজি ওজনের ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়লাম অজানা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে।

আজকে আমি কোথায় যাব তার কোনো পূর্ব পরিকল্পনা নেই। পুরো পরিকল্পনা তৈরি করার কাজটা ছেড়ে দিলাম স্থানীয়দের উপর, দেখি তাঁরা কোথায় নিয়ে যায়!

হোটেল থেকে সেই মায়াবী ঈশ্বরদী জংশন দুই মিনিটের পথ। আমি সেদিকেই হাঁটছি। রাতে যে পাশে অন্ধকারাচ্ছন্ন দেখেছিলাম সেই পাশে যাওয়ার জন্য ওভার ব্রিজের উপর উঠলাম। সেখান থেকে পুরো জংশনটা দেখা যায়, যা আমি গত রাতে আলো-ঝলমলে রূপে দেখেছিলাম। এখন দেখছি দিনের উজ্জ্বল আলোয়।

ঈদের সকালে ঈশ্বরদী জংশন; Source: Achinto Asif

আজ ঈদের দিন তাই এখানে তেমন কোলাহল নেই। অনেকগুলো ট্রেন প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছে। মাঝে মাঝে দুই একজন মুসল্লিকে দেখছিলাম। তারা ওভার ব্রিজের উপর দিয়ে অপর প্রান্তের দিকে যাচ্ছে। সম্ভবত ঐ দিকটায় কোথাও ঈদের জামাত হবে।

ওভার ব্রিজ থেকে নেমেই একটা ইজি বাইক স্ট্যান্ড। সেখানে মাত্র একটি গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। আর চালক এয়ারপোর্ট… এয়ারপোর্ট… বলে ডাকছে। আমাকে দেখেই বলল, ভাই গেলে তাড়াতাড়ি আসেন। ঈদের নামাজ পড়তে যাব, সময় নেই। তাই এখনই টান দেব।

উঠে পড়লাম ইজি বাইকে। কিন্তু মনের মধ্যে একটা খটকা কাজ করছিল। পাবনাতে আবার এয়ারপোর্ট এলো কোথা থেকে! রাতে মোবাইলটা ডেড হয়ে গেছে। তাই গুগল করেও দেখতে পারছি না যে, আমি কোথায় আছি বা কোথায় যাচ্ছি। গাড়ি চলছে তো চলছেই।

রাস্তাটা বেশ সুন্দর। দুই পাশে সারি সারি গাছ, আর উপরে সেই গাছের ঝুলে থাকা ডাল-পালা। মনে হয় যেন, গাছের বেড়ায় সবুজ ছাউনি। মাঝে মাঝে দুই একটি মোড় আর সেখানে দু’একটি দোকান। অধিকাংশ দোকানই বন্ধ। কিছু কিছু যা খোলা আছে তা নিশ্চয় সেমাই-চিনি বা মসলা বিক্রির উদ্দেশ্যে খোলা রেখেছে।

ইজি বাইক থেকে রাস্তার দৃশ্য; Source: Achinto Asif

আনুমানিক ১৫-২০ মিনিট চলার পরে গাড়ি থামল একটি ছোট মাঠের সামনে। আমি ইতি-উতি করে এয়ারপোর্ট খোঁজার চেষ্টা করছিলাম। এদিকে ড্রাইভার আমার দিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, এয়ারপোর্ট কোথায়! তিনি আমাকে একটা গেটের দিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বললেন, ঐ দিকে।

গেটের সামনে গিয়ে দেখি সেখানে লেখা আছে, ঈশ্বরদী সেনানিবাস। আমি মনে মনে বেশ সংশয়ে পড়ে গেলাম। এটা কী করে এয়ারপোর্ট হয়, তাহলে কি এখানকার মানুষ সেনানিবাসকেই এয়ারপোর্ট বলে! এটা তো দেখছি রীতিমতো একটা কৌতুক। যা হোক, এত হাস্যরস না বানিয়ে জিজ্ঞেস করে দেখি। গেটেই রয়েছে গার্ড রুম। গার্ডকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম, এয়ারপোর্ট ভেতরে আছে কিন্তু তা এখন বন্ধ।

আমি সেখানে যাওয়ার অনুমতি চাইলাম, কিন্তু তিনি আমাকে অনুমতি দিলেন না। উল্টো জানতে চাইলেন, ওখানে গিয়ে কী করবেন? ঈদের নামাজ পড়বেন না? আমি উত্তরে কী বলব বুঝতে পারছিলাম না। আকস্মিকভাবেই মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো, আমি মুসলিম না। আর ওখানে একটু ঘুরতে যাব। তিনি আমার কথা শুনে অবাক ভঙ্গিতে বললেন, ওখানে ঘুরতে যাওয়ার অনুমতি নেই, দাদা।

দোকানের সামনে থেকে সেনানিবাসের গেট; Source: Achinto Asif

সকাল থেকেই আকাশে বেশ মেঘ করেছিল। আমি বুঝতে পারছিলাম এমন কিছু একটা হবে। গার্ডের সাথে কথা বলা শেষ হতে না হতেই বৃষ্টি নেমে গেল। আমি দৌড়ে গেটের সামনে থাকা একটা দোকানের ছাউনির নিচে দাঁড়ালাম। এখানে সারি সারি বেশ কয়েকটি দোকান আছে, কিন্তু সবগুলো বন্ধ।

একটি দোকানের সামনে বসে জুতা সেলাই করতে দেখলাম একজন মুচিকে। আমি তাঁর দিকে এগিয়ে গেলাম এবং কথা বলার চেষ্টা করলাম। তাঁর নাম মদন, বাড়ি ঈশ্বরদীতে। তাদের এলাকা নিয়ে নানা কথা বলতে বলতে এক পর্যায়ে কথা হলো তাঁর ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কেও। কী বিচিত্র তাঁর জীবন! পাবনা ভ্রমণ নিয়ে সামনে একটা বই লেখার ইচ্ছা আছে, সেখানে তাঁর জীবন সম্পর্কে দুটি কথা নিশ্চয়ই লিখব।

মদন ভাইয়ের কাছে ঈশ্বরদীর ঘোরার জায়গা সম্পর্কে জানতে চাইলাম। তিনি শুধু একটি জায়গাই চেনেন, আর তা হলো হার্ডিঞ্জ ব্রিজ। অবশ্য পাবনাতে আমি এমন অনেক মানুষই দেখেছি, যারা ঘোরার জায়গা হিসেবে শুধুমাত্র হার্ডিঞ্জ ব্রিজের নামই জানেন। তবে মদন ভাইয়ের কথা একটু আলাদা। জীবিকার তাগিদে যিনি জুতা সেলাই করে দিন কাটান। ঘুরে বেড়ানোর শখ বা সাধ্য কি তাঁর থাকে!

মদন মুচির সাথে গল্প করার ফাঁকে; Source: Achinto Asif

বৃষ্টি হচ্ছে তো হচ্ছেই, থামার কোনো নাম-গন্ধ নেই। অলস বসে থাকার বিস্বাদ থেকে মুক্ত হওয়ার লক্ষ্যে কথা হলো আরো কিছু স্থানীয় মানুষের সাথে। মনে মনে প্রকৃতিকে ধন্যবাদ জানাচ্ছিলাম। কারণ এখন বৃষ্টি না নামলে নিশ্চয়ই এক জায়গায় এতক্ষণ বসে এতগুলো মানুষের সাথে কথা বলার সুযোগ হতো না। আর জীবনের কিছু রূপ অদেখাই থেকে যেত।

এক সময় নামাজ শেষ হলো। এয়ারপোর্ট মসজিদ থেকে নামাজ সেরে ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা বের হচ্ছেন। আমি নামাজ পড়তে পারলাম না। বৃষ্টির ভেতরে কখন যে নামাজ হয়ে গেলো বুঝতেই পারলাম না। যা হোক, তাতে আমি তেমন একটা দুঃখ করলাম না। ইতোমধ্যেই নামাজ সেরে একজন দোকানদারের আগমন ঘটেছে। তিনি যথারীতি দোকানটা খুলে দিলেন। আর আমি বেঞ্চিটা টেনে দোকানের সামনে গিয়ে বসে পড়লাম।

ঈশ্বরদী এয়ারপোর্ট:

ঈশ্বরদী শহরে ৪৩৬ দশমিক ৬৫ একর জায়গা নিয়ে ১৯৬৫ সালে যাত্রা শুরু করে ঈশ্বরদী বিমান বন্দর। নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে অনেকবার এটি বন্ধ ঘোষণা করা হয়। সর্বশেষ ২০১৪ সালে এটি তৎকালীন সরকার কর্তৃক বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এখনো এটি বন্ধই পড়ে আছে।

Feature Image: Ishwardinews24

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ঈদ ভ্রমণ:খেঁড়ু মিয়ার কাচারি ঘর ও ঈশা খাঁর দীঘির গল্প

আমাদের ঈদ? সে এক অন্য রকম অভিজ্ঞতা