ঈদ ভ্রমণ: সাধুর আখড়ায় এক অলৌকিক দুপুর

ইজি বাইকে এসে অচেনা একটি তিন রাস্তার মোড়ে নেমেছিলাম। তারপর তৃতীয় রাস্তায় এগিয়ে যেতেই একজন লোকের দেখা পেলাম। লোকটির কাছে যখন জিজ্ঞেস করলাম, কাকা সাধুর আশ্রমটা কোন দিকে? তিনি একেবারে সহজেভাবেই বললেন, এই তো এই রাস্তা ধরে এগিয়ে গেলেই পাবেন কিন্তু বেশ খানিকটা দূরে। ভ্যানে গেলে ভালো হয়। এই কথা বলেই আমার কাছে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কোথা থেকে এসেছেন, বাবা?

বাইকের উপর থেকে; Source: Achinto Asif

আমি যখন বললাম নড়াইল থেকে আসছি, তখন লোকটির মুখভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছিল তিনি আমাকে আরেকটু সাহায্য করতে চান। আসলে গ্রামের মানুষেরা এমনই হয়। দূর থেকে কেউ তাদের গ্রামে ঘুরতে এসেছে জানলে তারা বেশ উৎসুক হয়েই সাহায্য করতে চান।

আমাদের পাশ দিয়ে একটা বাইক যাচ্ছিল। লোকটি বাইকের ড্রাইভারের নাম ধরে ডেকে বললেন, এই লোকটিকে সাধুর আশ্রমে নামিয়ে দিস তো। এসময় আমি যে কী বলে তাকে ধন্যবাদ জানাব বুঝতে পারছিলাম না। তাই গাড়িতে উঠেও বার বার পিছন ফিরে দেখছিলাম। আশ্চর্য! লোকটি আমাকে গাড়িতে উঠিয়ে দেওয়ার পরও অনেক্ষণ ধরে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছেন।

মূল ফটক; Source: Achinto Asif

গ্রামের সরু রাস্তা ধরে কিছু দূর এগিয়ে যেতেই পৌঁছে গেলাম সাধুর আখড়ায়। গাড়ি চালক আমাকে সাধুর আখড়ার গেটেই নামিয়ে দিলেন। আখড়ার গেটে যাওয়ার আগে রাস্তার ডান পাশে একটি বড় পুকুর আছে। পুকুরে একটি বিশাল সান বাঁধানো ঘাট রয়েছে। ঘাটটির বেশ ভাঙাচোরা অবস্থা। দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, এটা বেশ পুরনো একটা ঘাট। এই বড় পুকুর বা দীঘিটির নাম শ্যাম সাগর দিঘী, যা আমি পরে জেনেছিলাম।

আশ্রমের মুল ফটকের ঠিক পাশেই আরেকটি ঘাট রয়েছে। এটি আরেকটি দীঘির ঘাট। দীঘিটির নাম গঙ্গা সাগর দীঘি। ঘাটে বসে কিছু লোক বেশ গল্পে মেতেছে। কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছিল, তারা শহরে থাকে। ঈদের ছুটিতে হয়তো বাড়িতে এসেছে।

দিঘীর ঘাট; Source: Achinto Asif

মুল ফটক পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতে গেলে জুতা খুলে রাখতে হয়। আমি জুতা খুলে ভেতরে প্রবেশ করতেই এক রাস স্নিগ্ধতা এসে মনটাকে ভরিয়ে দিলো। ছায়া সুনিবিড় পরিবেশ, গাছে গাছে পাখি ডাকছে আর মাটিতে থাকা মসগুলো পায়ের নিচে সুড়সুড়ি দিচ্ছে। সব মিলিয়ে এক অন্য রকম ভালোলাগা কাজ করছে।

ডান পাশে রয়েছে বর্তমান সাধুদের থাকার ঘর। বারান্দায় কয়েকজন লোককে বসে থাকতে দেখলাম। তাদের মধ্যে একজন বহিরাগত ও একজন সাদা কাপড় পরা বৃদ্ধ মহিলা ছিলেন।

বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে বৃদ্ধ মহিলাটি; Source: Achinto Asif

আমি সামনের দিকে এগোতে লাগলাম। বাম পাশেই রয়েছে মূল মন্দির। এর অভ্যন্তরে শ্রী শ্রী ফকির চাঁদ গোঁসাইজীর সমাধি রয়েছে। ধারণা করা হয়, ফকির চাঁদ স্বয়ং বিষ্ণুর অবতার ছিলেন। বিষ্ণুই বৈষ্ণব ধর্ম প্রতিষ্ঠার লক্ষে অবতার রূপ ধারণ করেছিলেন।

ভবনটি প্রায় ৩০০ বছরের পুরনো। ভাবতেই অবাক লাগে দৃষ্টিনন্দন কারুকার্যময় এই ভবনটি এত পুরনো! আমি বেশ মনোযোগ সহকারেই বিল্ডিংটিকে দেখছিলাম। সাদা রঙের এই বিল্ডিংটির চারপাশে আরো অনেকগুলো ছোট ছোট বিল্ডিং আছে। এগুলো সবই ফকির চাঁদের অনুসারীদের সমাধি। তার মধ্যে সর্বাপেক্ষা বড় ভবনের অভ্যন্তরে ফকির চাঁদের প্রিয় দুই শিষ্যর সমাধি রয়েছে। সেটাও বেশ কারুকার্যময়।

ফকির চাঁদ সাধুর এক অনুসারীর সমাধি; Source: Achinto Asif

পরনে ধুতি আর চুলে ঝুটি বাঁধা একজন লোক এসে মূল মন্দিরের দরজা খুলে দিলেন। আমি ক্যামেরা নিয়ে ছুটে গেলাম ভেতরের ছবি তুলব বলে, কিন্তু তিনি ছবি তুলতে দিলেন না। লোকটি বললেন, এখানে ফকির চাঁদ গোসাই স্বরূপে অন্তর্হিত হয়েছিলেন। তিনি আঙুল দিয়ে ভেতরে দেখিয়ে বললেন, ওখানে তাঁর চটি রাখা আছে আর পাশেই রয়েছে ক্ষেপী মাতার সমাধি। ফকির চাঁদের অন্তর্হিত হওয়ার খবর শুনে ক্ষেপী মাতাও তৎক্ষণাৎ এখানে অন্তর্হিত হন।

ভবনটির ভেতরে প্রবেশ করা যাবে কিনা জানতে চাইলে লোকটি জানালেন, আমিষভোজীরা এখানে প্রবেশ করতে পারবে না।

মূল মন্দির বা ফকির চাঁদ সাধুর সমাধি; Source: Achinto Asif

এবার তিনি হাঁটতে থাকলেন। আর আমিও তাঁর পিছু নিলাম আর এটা কী, ওটা কী বলে প্রশ্ন করতে থাকলাম। সুউচ্চ এই মন্দিরটির পেছনের দিকেই দুইটি কুয়া রয়েছে আর তার পাশেই রয়েছে একটি বড় ভবন। লোকটির কাছ থেকে জানতে পারলাম, এখানে ফকির চাঁদ গোসল করতেন।

গোসলখানার সাথে লাগোয়া ভবনটি ফকির চাঁদের থাকার ঘর ছিল, যেটা এখন বাৎসরিক অনুষ্ঠানের সময় ছাড়া খোলা হয় না।

গোসলখানা সংলগ্ন কুয়া; Source: Achinto Asif

ফকির চাঁদের দুই শিষ্যর সমাধি ভবনের পাশেই রয়েছে আরেকটি ভবন। সংসার ত্যাগী নতুন সাধুদেরকে দলে নেওয়ার আগে এখান থেকেই শিষ্যত্ব প্রদান করা হয়।

চারদিকে ঘোরাফেরা শেষে এবার গেলাম আশ্রমের অন্য পাশে। সেখানে একটি অক্ষয় বৃক্ষ আছে। এই বৃক্ষের পদমূলে বসে ফকির চাঁদ ও তাঁর শিষ্যরা সাধনা করতেন। বর্তমানে প্রচলিত আছে, কোনো বন্ধ্যা রমণী যদি গঙ্গা সাগর থেকে স্নান করে এসে এই গাছের নিচে আঁচল বিছিয়ে এক মনে গোসাইজীর চরণে কান্নাকাটি করে আর গোসাইজী যদি তুষ্ট হন তাহলে ঐ বৃক্ষ থেকে তাঁর আঁচলের উপর পাতা বা ফল পড়বে। আর এরূপ হলে সেই রমণী সন্তান লাভ করবে।

আমার পেছনে অক্ষয় গাছ; Source: Achinto Asif

সব দিকে ঘোরাফেরা শেষ। এবার আমার বের হবার পালা। কোথায় যাব জানি না। গুরু যে দিকে নিয়ে যায় সেই দিকেই যাবো। আশ্রম থেকে বের হওয়ার সময় কোনো একটি সমাধির গায়ে লেখা দেখেছিলাম,

জীবের নিস্তার লাগি

সেই বংশীধারী

ভুবন প্রকাশ হন গুরু রূপ ধরি। 

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভার‍তের দক্ষিণরাজ্য তামিলনাড়ুর শীর্ষ ভ্রমণ স্থানের গল্প

সাজেকে সূর্য নাকি ৩:৩০টায় ওঠে!