সফেদ সমুদ্রের নীলিমা রিসোর্টে দুটি দিন

কক্সবাজার বেড়াতে গেলে যে কেউই এমন হোটেল খুঁজবে, যেখান থেকে সমুদ্র দেখা যায়। ইতি আপু তাই বেছে নিলেন নীলিমা রিসোর্ট। সারা রাত বাস জার্নি করে সকালে যখন কক্সবাজারে এসে পৌঁছেছি, তখন গুড়িগুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। বাসস্ট্যান্ড থেকে অটোয় চেপে চলে এলাম সুগন্ধা পয়েন্টে। এখানেই নীলিমা রিসোর্ট। রিসোর্টের ঠিক সামনে অটো থেকে নামলাম।
প্রথমেই যেটা চোখে পড়লো, তা হলো লম্বা ঘাড়ওয়ালা দুটো জিরাফের ভাস্কর্য। অবাক হয়ে ভাবছিলাম, কক্সবাজার আর সমুদ্রের সাথে তো জিরাফের কোনো সম্পর্ক নেই। তাহলে ঠিক কোন চিন্তা থেকে জিরাফের ভাস্কর্য করা হলো? পরে একসময় রিসোর্ট কর্তৃপক্ষকে জিজ্ঞেসই করে ফেলেছিলাম, কৌতূহল চাপতে না পেরে।
জবাবে কর্তৃপক্ষ হেসে বলেছিলেন, কক্সবাজারে বাচ্চাদের উপভোগ করার জন্য তেমন কিছু নেই। তাই এটা বাচ্চাদের আনন্দ দেবার জন্য করা হয়েছে। রিসোর্টটি বাইরে থেকে দেখে তেমন আকর্ষণীয় মনে হলো না আমার কাছে। দেখা যাক, ভিতরে কী অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য।

সিঁড়ির ল্যান্ডিং। সোর্স: লেখিকা

নীলিমা বীচ রিসোর্টটি আসলে “ইকো হলিডেইজ লিমিটেড”এর আওতাধীন একটি রিসোর্ট। তিন তলা বিশিষ্ট এই রিসোর্টটিতে দুই ধরনের মোট চৌদ্দটি ঘর রয়েছে। তার মধ্যে আটটি বিল্ডিং রুম এবং কাঠের তৈরি ঘর ৬টি। দোতলার ঘরগুলো সব সাধারণ ইট-সিমেন্টের বানানো ঘর। আর তিনতলায় আছে সম্পূর্ণ কাঠের তৈরী দৃষ্টিনন্দন কিছু কটেজ।
কটেজগুলোরও দুটো ক্যাটাগরি আছে। তার একটি কাপল বেডরুম, অন্যটি ডাবল বেডরুম। কাপল বেডরুম ৩,০০০ আর ডাবল ৪,০০০ টাকা। সবগুলো কটেজই এসি ডিলাক্স। আমরা তিনতলার কটেজগুলোই নিতেই চাইলাম। কিন্তু আমাদের হতাশ করে দিয়ে রিসিপশনিস্ট বললেন, ‘এখন ছয়টি কটেজ ঘরের কোনোটিই খালি নেই। আমাদের বিল্ডিং রুমগুলো দেখাতে পারে। তবে সন্ধ্যায় কটেজ খালি হবে।’
কটেজের বাইরের দেয়াল। সোর্স: লেখিকা

আমরা ভাবলাম, আপাতত নরমাল দুটো রুম নিয়েই ফ্রেশ হয়ে বীচে চলে যাই। ফিরে এসে কটেজে উঠলেই চলবে। যেই ভাবনা, সেই কাজ। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে গিয়ে দেখি, রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ ভিতরটাকে সাজিয়েছে একদম বাঙালিয়ানা ঢঙে। সিঁড়ির পাশের দেয়াল, ল্যান্ডিংয়ের দেয়াল সাজানো হয়েছে বাঁশ দিয়ে। বাঁশ কেটে চৌকো ডিজাইন করে লাগানো হয়েছে দেয়ালে।
নীলিমার এই ঘরগুলো নিতান্তই সাধারণ। তবে বিছানা বেশ আরামদায়ক। রুমের পাশে বড়সড় বারান্দাও আছে। বারান্দার ডেকোরেশনেও বাঁশের আধিক্য রয়েছে। আসার সময় সারারাত ধরেই বর্ষণ অব্যাহত ছিল, কখনো মুষলধারে, কখনো গুড়িগুড়ি। আমাদের প্রায় সবারই ব্যাগের কাপড়চোপড় ভিজে একাকার। ভেজা কাপড় সব বারান্দায় মেলে দিয়ে আমরা ঘুরতে বেরিয়ে গেলাম।
কটেজের ভিতরকার দেয়াল। সোর্স: লেখিকা

সন্ধ্যায় রিসোর্টে ফিরে পেয়ে গেলাম কাঙ্ক্ষিত কটেজ-রুমের চাবি। খেয়ে দেয়ে চাবি নিয়ে পা বাড়ালাম সেদিকে। উদ্দেশ্য, ঘুম। প্রায় দশ ঘণ্টার টানা জার্নি করে, সারাদিন ঘোরাঘুরি, সমুদ্রে দাপাদাপি করে প্রচণ্ড ক্লান্তি জেঁকে ধরেছে। বিছানায় যাওয়া খুব জরুরী।
কটেজ রুমগুলো সব তিন তলায়। তিন তলায় উঠতে গিয়ে মুগ্ধতা আরো বাড়লো। তিন তলার রুমগুলো যেহেতু কাঠের, বাইরে থেকে দেখতে খুব সুন্দর দেখাচ্ছিল। এখানকার করিডোরে চমৎকার কিছু চিত্রকর্ম ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।
বারান্দা। সোর্স: লেখিকা

তালা খুলে কটেজের ভিতরে ঢুকলাম। হলুদাভ আলোয় একটা ছিমছাম গোছানো রুম চোখে পড়লো। রুমের ঠিক মাঝে ডাবল বেড। বিছানায় ধবধবে সাদা চাদর বিছানো। মাথার দিকে দুটো বালিশ আর পায়ের কাছে কম্বল রাখা। মাথার দিকে দেয়ালে চমৎকার একটি চিত্রশিল্প ঝুলছে।
বিছানার বাম পাশে কাঠের সরু কাবার্ড, তার পাশেই দেয়ালে আয়না ঝোলানো। সামনে ড্রেসিং টেবিল। বিছানার ডান পাশের দেয়ালটি স্বচ্ছ কাঁচের। পর্দা দেওয়া। কাঁচের দেয়ালের সামনে দুটো টুল ও একটি ছোট টি টেবিল আছে। বাথরুমের দেয়ালের পাশে টিভি আর এসি লাগানো। এখানটায় একটা সিঙ্গেল সোফা রাখা আছে। এর পাশেই বারান্দা।
তিন তলার করিডোর। সোর্স: লেখিকা

বারান্দার দরজা খুলে এক পা বাড়িয়ে সামনে দাঁড়াতেই এক ঝাপটা নোনতা হাওয়া ছুঁয়ে গেল আমাকে। সেই সাথে সমুদ্রের ঢেউয়ের শব্দ শুনে চমকে উঠলাম। সারাদিন সমুদ্রের ধারেই ছিলাম, কিন্তু তখন চারপাশের কোলাহলে বুঝতেই পারিনি সাগরের গর্জন এতটা গুরুগম্ভীর হয়।
বাইরে ঘোর অন্ধকার, কিন্তু উত্তাল সমুদ্রের ফেনিল সাদাটে ঢেউয়ের রেখা দেখা যাচ্ছে কালো অন্ধকারকে ভেদ করে। এখানে দাঁড়িয়ে অনুভব করলাম, রাতের সমুদ্র আমাকে অমোঘভাবে টানছে।
চিত্রকল্প। সোর্স: লেখিকা

কীসের ঘুম আর কীসের কী? কটেজের বারান্দায় দাঁড়িয়ে সমুদ্রের উত্তাল গর্জন আর নিস্তব্ধ সৈকত আমাকে ঘরে থাকতে দিলো না। সবাই মিলে ছুটে গেলাম সৈকতে। কিছুক্ষণ রাতের সমুদ্রের সাথে গল্প করে ফিরে এলাম রুমে। এবারে সত্যিই আর কোনো শক্তি অবশিষ্ট নেই, ঘুমিয়ে পড়লাম।
রাতে মনে হয় কাঁচের দেয়ালের সামনের পর্দা সরিয়ে রেখেছিলাম। সকালে ওখান দিয়ে আলো এসে আমার চোখে পড়ায় ঘুম ভেঙে গেল। বিরক্তি নিয়ে চোখ খুললেও বাইরের দিকে তাকিয়ে আমার বিরক্তি উবে গেল। ঘুম ভেঙেই আরামদায়ক বিছানায় শুয়ে এরকম একটা দৃশ্য দেখতে পেলে কেউই বিরক্ত হবে না। স্বচ্ছ কাঁচ ভেদ করে আমার দৃষ্টি চলে গেল মাত্র সাড়ে নয় ইয়ার্ডস দূরে আছড়ে পড়া সমুদ্রের ঢেউয়ের উপর। দৃষ্টিসীমার মধ্যে কয়েকটা ঝাউগাছের পাতা নড়ছে। বিছানায় শুয়ে আমার মনে হচ্ছে, আমি নাটকের কোনো প্রাকৃতিক দৃশ্যের কাস্টিং দেখছি!
কাঁচের দেয়ালের ওপাশে সমুদ্র। সোর্স: লেখিকা

কাল সারাদিন, এমনকি রাতেও সৈকতে ছিলাম। কিন্তু বিছানায় শুয়ে, শরীরে আরামদায়ক আলস্য মেখে সমুদ্রের ঢেউ গুনে সময় পার করার অনুভূতি অন্যরকম। ব্যাপারটা ঠিক ব্যাখ্যা করার মতো নয়। অন্যরকম এক ভালো লাগা। রিসোর্ট এর রুমগুলো যেন প্রকৃতির মাঝে আরেক প্রকৃতি।
নিজের বিছানার এত কাছ থেকে একসাথে সমুদ্র দেখা আর এর উত্তাল গর্জন শোনা, সত্যিই অদ্ভুত এক উপলব্ধি। রাতে পর্দা খুলে শুয়েছি বলে নিজেই নিজের পিঠ চাপড়ে দিলাম। নইলে ঘুম ভেঙেই এমন একটা স্বর্গীয় অনুভূতি হতো না।
নান্দনিক দেয়ালঘড়ি। সোর্স: লেখিকা

আমার দলের অন্যেরা পাশের ডাবল বিছানার রুমে রয়েছে। রাতে আর সেদিকে যাওয়া হয়নি। সকালে বিছানা ছেড়ে, হাতমুখ ধুয়ে পাশের রুমে গেলাম। এই ঘরটা ডাবল বলা হলেও, এখানে বিছানা আছে তিনটা। এগুলোর দুইটা ডাবল বিছানা, একটা সিঙ্গেল। এটার সবকিছুই বড় বড়। রুমটা বড়, বারান্দা বড়, বাথরুম বড়। এই ঘরটি থেকেও সমুদ্র দেখা যায়। এটার কাঠের দেয়ালগুলোতে হাতে আঁকা ছবির সাথে সাথে নান্দনিক একটা দেয়ালঘড়ি সময় দেখিয়ে চলছে।
কটেজ রুমে থাকলে সকালের নাস্তা ফ্রি সার্ভ করে নীলিমা রেস্টুরেন্ট। রেস্টুরেন্টে বাংলা খাবারের সাথে সাথে বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক মাছের আইটেম পাওয়া যায়। একজন ওয়েটার এসে জেনে গেল, আমরা নাস্তায় কে কী খেতে চাই। তারপর সবার জন্য খাবার এনে সাজিয়ে দিয়ে গেল। যতদিন এখানে ছিলাম, এই ছেলেটিই আমাদের খাবার দিয়ে গেছে। ছেলেটি বেশ বিনয়ী।
হলদে আলোয় কটেজ। সোর্স: সাইমুন ইসলাম

সুগন্ধা পয়েন্টে অবস্থিত নীলিমা রিসোর্টের আরোও কিছু ভালো দিক হলো, রিসোর্টের গা ঘেঁষেই আছে একটি মসজিদ, বার্মিজ মার্কেট এবং শুঁটকি বিতান। ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের নামাজে যেতে বা যেকোনো টুরিস্টেরই কেনাকাটা করার জন্য দূরে যেতে হবে না।
কক্সবাজারে এসে নীলিমা রিসোর্টে থেকে বেশ আরাম পেয়েছি। রিসোর্টের, রেস্টুরেন্টের স্টাফদের ব্যবহার প্রশংসা করার মতো। তবে কিছু বিষয় আছে, যা না বললেই নয়। এত চমৎকার একটি রিসোর্ট, অথচ এর সামনে এবং পিছনে দুইপাশেই সিটি কর্পোরেশন এসে ময়লা ফেলে যায়। এত সৌন্দর্যের মধ্যে এই ব্যাপারটা বড় বেশি চোখে লাগে। জানিয়েছিলাম তাদেরটা এটা।
জবাবে খুব আক্ষেপ করে বললেন, এটার জন্য কাজ করছেন তারা। হয়তো খুব শীঘ্রই সমস্যাটির সমাধান হবে। আরেকটি ব্যাপার হলো, রিসোর্টের বাথরুম। বাথরুমে পানি নিষ্কাশনের নলটি ঠিক দরজার সামনে। কোন আর্কিটেক্ট এই ব্যাপারটা নির্ধারণ করেছে, জানার খুব ইচ্ছে। আর কোথায় কোনো বাথরুমের ক্ষেত্রে তো এমনটা দেখিনি!
নভেম্বর থেকে মার্চ হলো কক্সবাজারে ভ্রমণপিয়াসুদের জন্য সিজন। আর এপ্রিল থেকে অক্টোবর অফ সিজন। অফ সিজনে নীলিমা রিসোর্ট ৩০-৫০% ছাড়ের অফার দিয়ে থাকে। বর্ষায় অল্প খরচেই সমুদ্র পাড়ে শুয়ে বৃষ্টিতে সমুদ্রের উন্মাদনা উপভোগ করার জন্য নীলিমা রিসোর্ট খুব ভালো একটা অপশন হতে পারে।
ঝাউবনের পাতার ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে সৈকত। সোর্স: সায়েম শামস

সমুদ্রের নীল রঙের সাথে মিলিয়ে রিসোর্টের নাম রাখা হয়েছে নীলিমা। শ্রাবণ মাস হওয়ায় সমুদ্রের পানি ঘোলা হয়ে গেছে। ফলে নীলিমায় বসে সমুদ্রের নীল দেখা হলো না। এই আক্ষেপ ঘোচাতে কোনো এক মাঘ-ফাল্গুন মাসে আরেকবার আসবো অবশ্যই এই দীর্ঘ সৈকতে। আর সেবারোও আমি নিশ্চয়ই এই রিসোর্টেই উঠবো।

হেল্পলাইন:

রিসোর্টে রুম বুকিং কিংবা অন্য যেকোনো তথ্যের প্রয়োজনে কল করতে পারেন এই নাম্বারে- 01831878833

কীভাবে যাবেন:

কক্সবাজার বাসস্ট্যান্ড থেকে পাঁচ টাকা অটোভাড়ায় যাওয়া যাবে সুগন্ধা পয়েন্ট। মোড় থেকে কয়েক পা সামনে এগোলেই নীলিমা রিসোর্ট পাওয়া যাবে।
ফিচার ইমেজ: সাইমুন ইসলাম

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

গোয়া ভ্রমণ: স্টার বীচ রিসোর্ট ও সুইমিং পুলের নীল জলে

প্রেয়সীর কাছে একটি খোলা চিঠি