চন্দ্রদ্বীপ রাজ্যের দুর্গাসাগর দীঘির গল্পগাথা

গুঠিয়া মসজিদ ঘুরে এসে দুর্গাসাগর দীঘির দিকে পা বাড়ালাম। বরিশাল নথুল্লাবাদ বাসস্ট্যান্ড থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে বাবুগঞ্জ উপজেলার মাধবপাশা গ্রাম। মাধবপাশা গ্রামের দুর্গাসাগর দীঘির নামে যে জায়গায় সিএনজি নামিয়ে দিলো, সেখানটায় বিশাল এক প্রবেশদ্বার। দীঘি দেখতেও নাকি টিকেট কেটে নিতে হবে। টিকেটের দাম ২০ টাকা।

টিকেট কেটে ভেতরে ঢুকে বুঝতে পারলাম, এটা কেবল দীঘি নয়। পার্কের মতো করা হয়েছে দীঘির চারধারে। প্রথমেই চোখে পড়লো রকমারি পণ্যের কিছু দোকান, প্রকাণ্ড বট গাছ আর একটু দূরে আধাবন্দী কিছু হরিণ। আমরা আগেই হরিণের খাঁচার কাছে গেলাম। বেশ কয়েকটাই খাঁচার ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। কিছু সংখ্যক আছে দূরে। আমরা হরিণের পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে চাইলাম। হরিণগুলো একদমই ভয় পায় না। সরে গেলো না।

মণিহারী জিনিসপাতির দোকান; Source : মাদিহা মৌ

হরিণের খাঁচার সামনেই বিশাল সাইনবোর্ডে দুর্গাসাগর দীঘির প্রায় আড়াইশ বছরের ইতিহাস লেখা আছে। চতুর্দশ শতকে রাজা দনুজমর্দন চন্দ্রদ্বীপ রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। এ বংশের পঞ্চম রাজা জয়দেব। তার কোনো পুত্রসন্তান ছিল না। একমাত্র কন্যা রাজকুমারী কমলা দেবী। কমলা দেবীকে বিয়ে করেন বরিশাল জেলার বাবুগঞ্জ উপজেলার দেহেরগতি গ্রামের উষাপতীর পুত্র বলভদ্র বসু। রাজা জয়দেবের কোনো পুত্রসন্তান না থাকায় জামাতা বলভদ্র বসু ‘চন্দ্রদ্বীপ’ নামে এ রাজ্য লাভ করেন। তখন চন্দ্রদ্বীপের রাজধানী ছিল বাকলা।

বলভদ্র বসুর প্রপৌত্র রাজা কন্দর্প নারায়ণ, যিনি বারো ভুঁইয়াদের অন্যতম ছিলেন, তিনি ১৫৮৪ সালে বর্তমান বাবুগঞ্জ উপজেলা সদরের অদূরে ক্ষুদ্রকাঠিতে রাজধানী স্থাপন করেন। ক্ষুদ্রকাঠির সিকদারবাড়ি সংলগ্ন রাজার ভিটাতেই ছিল কন্দর্প নারায়ণের নির্মিত চন্দ্রদ্বীপের দ্বিতীয় রাজধানী। সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে প্রতিবছর রাজধানীর ব্যাপক ক্ষতিসাধন হওয়ার কারণে এবং জলদস্যুদের কবল থেকে মুক্তি পেতে সমুদ্র উপকূলবর্তী বাকলা থেকে রাজধানী বাবুগঞ্জের ক্ষুদ্রকাঠিতে স্থানান্তর করেন রাজা কন্দর্প নারায়ণ।

১৫৮৪ সালে বাবুগঞ্জে রাজধানী স্থাপনের মাত্র ১৫ বছর পরই এই রাজা মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। তিনি বিদ্রোহ দমনের জন্য চন্দ্রদ্বীপ আক্রমণ করেন এবং কন্দর্প নারায়ণের বাহিনীর সঙ্গে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে রাজা কন্দর্প নারায়ণ পরাজিত হন এবং প্রাণ হারান। তখন রাজ্যের শাসনভার চলে যায় কেন্দ্রীয় সরকার, তথা সম্রাট জাহাঙ্গীরের হাতে।

অর্ধবন্দী হরিণ; Source : মাদিহা মৌ

চার বছর পর রাজা কন্দর্প নারায়ণের পুত্র রাজা রামচন্দ্র কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে সন্ধি করে পুনরায় রাজ্য লাভ করেন। রাজা রামচন্দ্র ১৬০২ সালে মাধবপাশায় রাজধানী স্থাপন করেন, যা ছিল চন্দ্রদ্বীপের তৃতীয় রাজধানী। রাজা রামচন্দ্র যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্যের কন্যা বিমলা সুন্দরীকে বিয়ে করেন। এভাবে রাজতান্ত্রিক ধারায় চন্দ্রদ্বীপ রাজ্যের শাসনকার্য পরিচালিত হতে থাকে। ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটে এবং ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী এ রাজ্যের শাসনভার নিয়ে নেয়।

ব্রিটিশ সরকারের অধীনে চন্দ্রদ্বীপের রাজা শিবনারায়ণ ১৭৮০ সালে এলাকাবাসীর পানির সংকট নিরসনে মাধবপাশায় ঐতিহাসিক দুর্গাসাগর দীঘি খনন করেন। তার স্ত্রী দুর্গা রানীর নামানুসারে দীঘির নামকরণ করা হয় দুর্গাসাগর। দীঘি খননে এক হাজার ৮০০ শ্রমিক একাধারে ছয় মাস কাজ করেন বলেও জনশ্রুতি রয়েছে। তৎকালীন দীঘি খননে ব্যয় হয়েছিল তিন লাখ টাকা। ১৭৯৯ সালে চন্দ্রদ্বীপ রাজ্যের বিলুপ্তি ঘটে।

হরিণটি একটুও ভয় পায়নি; Source : মাদিহা মৌ

প্রথম খননের ১৯৪ বছর পর ১৯৭৪ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতির বিশেষ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় দীঘিটি পুনঃখনন করা হয়। আমরা দীঘির মাঝখানে যে দ্বীপটি দেখতে পাচ্ছি, তা তৈরি করা হয় সে সময়ই। ১৯৯৬ সালে দুর্গাসাগর দীঘিকে পর্যটন কেন্দ্রে রূপান্তরের জন্য ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘দুর্গাসাগর দীঘি উন্নয়ন ও পাখির অভয়ারণ্য’ প্রকল্পের আওতায় নেওয়া হয়। সে সময়ই দুর্গাসাগর দীঘির চারপাশে নিরাপত্তা দেয়াল ও প্রবেশদ্বার নির্মাণ করা হয়।

দীঘিটির মোট আয়তন ৪৫ দশমিক ৫৫ একর। চারপাশে চারটি ৫০ ফুটবিশিষ্ট পাকা ঘাট রয়েছে। লম্বায় এটি এক হাজার ৯৫০ ফুট ও প্রস্থে এক হাজার ৭৫০ ফুট। শীতে এই দুর্গাসাগরে ঝাঁকে ঝাঁকে অতিথি পাখির সমাগম হয়। বিভিন্ন প্রজাতির কয়েক হাজার পাখির কলকাকলীতে দীঘিটি শীতকালে মুখরিত থাকে। সরাইল ও বালিহাঁস সহ নানান প্রজাতির পাখি দীঘির মাঝখানকার দ্বীপটিতে আশ্রয় নেয়। দীঘির অদূরেই মাধবপাশা বাজারের একটু দূরে অবস্থিত লাকুটিয়া জমিদার বাড়ির ধ্বংসাবশেষ দেখতেও অনেকেই যায়। লাকুটিয়া জমিদার বাড়িটি তিন’শ বছরের পুরনো।

অরণ্যচর; Source : মাদিহা মৌ

দীঘির ধারে কিছুক্ষণ বসে রইলাম। শীত মৌসুমে বনভোজন এবং দর্শনার্থীদের ঢল নামে দুর্গাসাগর দীঘির চারপাশে। গত কয়েক বছরে দর্শনার্থী আয় বেড়েছে পাঁচ গুণ। দুই-তিন বছর আগেও মাসে যেখানে দুর্গাসাগর দীঘি থেকে দর্শনার্থী-আয় ছিল ২৫-৩০ হাজার টাকা, এখন তা এক লাখে উন্নীত হয়েছে।

প্রবেশ মূল্য

১. সাধারণ দর্শনার্থী – ২০ টাকা।
২. ৫-১২ বছরের শিশু ও ছাত্র ছাত্রী – ১০ টাকা।
৩. মৎস্য শিকার ফি (এক সিটে ৪টি ছিপ) – ৪০০ টাকা।
৪. মোটর সাইকেল পার্কিং – ২০ টাকা
৫. বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান – ১০০ টাকা
৬. কার, জীপ, মাইক্রোবাস – ৫০ টাকা
৭. মাসিক ভিত্তিতে দোকান ভাড়া – ৫০০ টাকা
৮. পিকনিকের জন্য দুর্গাসাগর মঞ্চ ও শেডের ভাড়া – ৫,০০০ টাকা। স্পট ভাড়া জনসংখ্যার ভিত্তিতে ১,০০০-২,৫০০ টাকা।

দীঘির ঘাট ও দূরের ওই দ্বীপ; Source : মাদিহা মৌ

কীভাবে যাবেন

বরিশাল যাওয়ার দুটি পথ আছে। নৌপথে বা লঞ্চে এবং বাসে বা সড়ক পথে।

ঢাকা থেকে বরিশালের লঞ্চগুলো রাত ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে সদর ঘাট থেকে ছাড়ে। এর মধ্যে সুন্দর বন ৭/৮, সুরভী ৮, পারাবত ১১, কীর্তনখোলা ১/২ লঞ্চগুলো খুবই ভালো। একেকটি লঞ্চ যেন চার তারকা আবাসিক হোটেল। লঞ্চে ডেক ভাড়া ১৫০ টাকা, সিঙ্গেল কেবিন ৯০০-১,০০০, ডাবল কেবিন ১,৬০০, ভিআইপি ৪,৫০০ টাকা। লঞ্চগুলো বরিশাল পৌঁছায় ভোর ৫টার দিকে।

সড়কপথে ঢাকা থেকে বরিশাল যেতে সময় লাগবে ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা। প্রতিদিন ভোর ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত গাবতলি বাস টার্মিনাল থেকে বেশ কিছু বাস বরিশালের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। বেশিরভাগ বাস পাটুরিয়া ঘাট অতিক্রম করে বরিশালে যায়, আবার কিছু কিছু বাস মাওয়া ঘাট অতিক্রম করে বরিশালে যায়। ঢাকা থেকে আগত বাসগুলো বরিশালের ফতুল্লাবাদ বাস স্ট্যান্ডে থেমে থাকে।

বাসগুলো হচ্ছে শাকুরা পরিবহন, ঈগল পরিবহন, হানিফ পরিবহন। এগুলোর মধ্যে এসি বাসের ভাড়া ৭০০ টাকা, নন এসি বাসের ভাড়া ৫০০ টাকা, লোকাল বাসের ভাড়া ২৫০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা। তবে বাসের চেয়ে লঞ্চে বরিশাল গেলেই ভ্রমণ আনন্দদায়ক হবে।

মাছ ধরার মাচান; Source : মাদিহা মৌ

বরিশাল জেলা শহর থেকে মাত্র ১২ কিলোমিটার দূরে মাধবপাশা। বরিশাল থেকে চাখার যাওয়ার পথেই পড়বে দূর্গাসাগর দীঘি। লঞ্চঘাট থেকে ব্যাটারী চালিত লেগুনা করে চলে যেতে পারেন দীঘির গেট পর্যন্ত। অথবা চাখার যাওয়ার বাসে করে গেলে একদম দীঘির গেটে নামিয়ে দেবে।

টিকিট; Source : মাদিহা মৌ

কোথায় থাকবেন

দুর্গাসাগর দীঘির পশ্চিমপাড়ে ঘাট সংলগ্ন স্থানে রয়েছে জেলা পরিষদের ডাকবাংলো। চাঁদনী রাতে দীঘির পাড়ে রাত কাটাতে ইচ্ছা করলে ভ্রমণকারীরা এখানে থাকতে পারেন। এছাড়া আপনি চাইলে বরিশাল ফিরে আসতে পারেন। বরিশালের কাঠপট্টিতে থাকার জন্য বেশ কিছু আবাসিক হোটেল রয়েছে। এসব হোটেলের রুম ভাড়া ৮০০-২,০০০ টাকার মধ্যে।

Feature Image : মাদিহা মৌ

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

তিস্তা পাড়ের লালমনিরহাট

ফারাও

ফারো আইল্যান্ড: ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখতে ৫০০ বছর ধরে সংগ্রাম করছে যে দ্বীপের মানুষ