বলছি বরিশালের দুর্গাসাগর দীঘির কথা

নামের সাথে সাগরের মিশেল থাকলেও দুর্গাসাগর মূলত দীঘি; সাগর নয়। বাংলার ভেনিসখ্যাত জেলা বরিশাল। বরিশাল জেলার বানারীপাড়া নেছারাবাদ সড়কের পাশে বাবুগঞ্জে দুর্গাসাগর দীঘি অবস্থিত। এটি বরিশাল শহর থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। জনশ্রুতি আছে, ১৭৮০ সালে চন্দ্রদ্বীপ পরগণার তৎকালীন রাজা শিব নারায়ণ উক্ত এলাকার পানির সংকট নিরসনের লক্ষ্যে এই দীঘিটি খনন করেন। এই দীঘিটি খনন করতে ব্যয় হয়েছিল তিন লাখ টাকা। আরো জানা যায়, স্ত্রী রানী দুর্গাবতী একবারে যতদূর পর্যন্ত হেঁটে গিয়েছিলেন ততদূর পর্যন্ত এই দীঘিটি খনন করা হয়। রানী দুর্গাবতী দীঘি খননের উদ্দেশ্যে ৬১ কানি জমি পর্যন্ত হেঁটেছিলেন। তাই রানী দুর্গাবতীর নামানুসারে দীঘিটির নাম দুর্গাসাগর রাখা হয়েছে।

ছবিসূত্রঃ Flickr

দুর্গাসাগর দীঘির তিন দিকে তিনটি ঘাটলা রয়েছে এবং মাঝখানে ছোট্ট দ্বীপ রয়েছে। দুর্গাসাগর দীঘির চারপাশ বেশ সুন্দর ও পরিপাটি। দুর্গাসাগর দীঘি স্থানীয় জনগণের কাছে দুর্গাসাগর মাধবপাশা দীঘি নামেও সুপরিচিত। দীঘির প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ না হয়ে পারে না আগত দর্শনার্থীরা। মানুষের তৈরি দীঘিও চমৎকার ও নয়নাভিরাম হতে পারে তা শুধুমাত্র এই দীঘি দেখলেই বোঝা যায়। গাছগাছালিতে ঘেরা দুর্গাসাগর দীঘির চারপাশ। ঘাটলার পাশেও রয়েছে সবুজ বৃক্ষের সারি। অপূর্ব ও মনমাতানো রূপ যেকোনো মানুষকেই আকৃষ্ট করে প্রবলভাবে।
ছবিসূত্রঃ Dhaka times news

এক হিসেব অনুযায়ী, ৪৫ একর ৪২ শতাংশ জমি নিয়ে দীঘির অবস্থান। ২৭ একর ৩৮ শতাংশ আয়তন নিয়ে জলাশয় এবং ১৮ একর ৪ শতাংশ জমি নিয়ে পাড় তৈরি করা হয়েছে। চারপাশে হাঁটার রাস্তা রয়েছে ১.৬ কিলোমিটার। ১৯৯৭-১৯৯৯ সালে দীঘিটির সর্বশেষ সংস্কার করা হয়েছে। তবুও দীঘিটি খুব সুন্দর।
ছবিসূত্রঃ সাইফুল ইসলাম

দীঘির চারপাশটা গাছের ছায়ায় ঘেরা। হাঁটার পথ বেশ মনোরম ও সুন্দর। এখানে হাঁটতে গেলে আপনার বেশ প্রশান্তি অনুভব হবে। ৬১ কানির বিস্তৃতি নিয়ে তৈরি এই দীঘিটি ঘুরে আসতে আপনার যথেষ্ট সময় ব্যয় হবে। তাছাড়া দীঘির প্রতিটি বাঁক আপনাকে মোহিত করবে। বারো ভূঁইয়াদের মধ্যে একজন অন্যতম রাজা ছিলেন পঞ্চদশ শিব নারায়ণ। তিনি স্ত্রীকে ভালবেসে স্ত্রীর নামেই এই দীঘিটির নামকরণ করেছেন। এবং স্ত্রীর নামে এই দীঘির নামকরণকে সার্থক বলে মনে করতেন তিনি।
ছবিসূত্রঃ সাইফুল ইসলাম

দীঘি নির্মাণের পর ৩০০ বছর কেটে গেছে। অথচ এখনো দীঘির প্রতিটি ঘাট অনেক আধুনিক ও শিল্পসম্মত। দীঘির পানি বেশ স্বচ্ছ ও পরিষ্কার। স্বচ্ছ জলে মাছেরা জলকেলি খেলে। হাঁসেরা দিনভর সাঁতার কাটে। এছাড়া বক, কাক, চিল, দোয়েল, শ্যামা পাখিরাও এখানকার গাছে বসে প্রাণ জুড়ায়। হাঁটার পথ বসন্তকালে কোকিলের কুহু ডাকে মুখরিত থাকে। আগত ভ্রমণ পিপাসুরা পাখির কলকাকলিতে মুগ্ধ হন যেকোনো সময়। তবে সব থেকে বেশি পাখির ডাক শোনা যায় বিকেল থেকে সন্ধ্যা অবধি। দুর্গাসাগর দীঘির বিভিন্ন স্থানে মাচা পাতা আছে। মাচায় বসে মাছ ধরা যায়, জলে পা ডুবিয়ে বসেও থাকা যায়। বাসের মাচায় বসে জলে পা এলিয়ে দিয়ে গান ধরতে পারবেন আপনিও। যদি বন্ধুদের নিয়ে বেড়াতে যান সেখানে তবে তো কথা-ই নেই। দিনভর ছুটোছুটি, হৈ-হুল্লোড়, পাগলামি, মাছ ধরা ইত্যাদির মাধ্যমে সুখময় সময় কাটাতে পারবেন।
ছবিসূত্রঃ ভ্রমণ গাইড

দীঘির মাঝে খানিক জায়গাজুড়ে রয়েছে একটি ছোট্ট দ্বীপ। বড় বড় গাছের ফাঁকে ফাঁকে রয়েছে মাটির তৈরি হরিণ, বাঘ ইত্যাদি। চারপাশে নারকেল, মেহগনি, সুপারিসহ অন্যান্য গাছ রয়েছে। বছরের যেকোনো সময় দুর্গাসাগর দীঘি ভ্রমণে যেতে পারবেন তবে শীতকালে গেলে অন্যরকম রোমাঞ্চকর অনুভূতি অর্জন করতে পারবেন। শীতকালে অসংখ্য অতিথি পাখির আগমন ঘটে এখানে। বিভিন্ন প্রজাতির শত শত পাখির আগমনে পুরো দীঘি কলকাকলিতে মুখরিত হয়। এই দীঘিতে আশেপাশের অসংখ্য স্কুল পড়ুয়া, কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা বেড়াতে আসে।
ছবিসূত্রঃ About Bangladesh

এছাড়া এই দীঘির পাড়ে বনভোজন করে দারুণ উপভোগ করা যাবে। বরিশাল শহর থেকে অনেকেই বনভোজনের জন্য এখানে বেড়াতে আসে। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য অর্থাৎ গাছপালা দেখার পাশাপাশি বনভোজন করা বেশ আনন্দের। বন্ধু- বান্ধবদের নিয়ে আড্ডা ও গানে মধুময় সময় কাটানোর জন্য উপযুক্ত স্থান এটি। দীঘির পানিতে নেমে গোসল করার অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবেন। চাইলে বড়শি দিয়ে মাছও ধরতে পারবেন। তবে এই দীঘিতে নৌকা দিয়ে ঘোরা যায় না। যদি নৌকা দিয়ে ঘোরা যেত তাহলে চমৎকার অভিজ্ঞতা অর্জন করা যেত।

দুর্গাসাগর দীঘিতে যাওয়ার উপায়

ছবিসূত্রঃ Your place abroad

দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে দুর্গাসাগর দীঘি পরিদর্শনে যেতে হলে প্রথমে বরিশাল শহরে যেতে হবে। বরিশাল থেকে যেতে হবে বানাড়িপাড়া নেছারাবাদে। বরিশাল দুই ভাবে যাওয়া যায়। জলপথে ও স্থলপথে।

সড়কপথে বরিশাল

সড়কপথে বরিশাল যেতে হলে গাবতলী থেকে বরিশালের উদ্দেশ্যে যেসকল বাস ছাড়ে সেসব বাসে যেতে হবে। হানিফ পরিবহন, ঈগল পরিবহন, শাকুরা পরিবহন ঢাকা থেকে বরিশালে যায়। ভোর ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত গাবতলী থেকে বাস ছেড়ে যায়। বরিশালের নতুল্লাবাদ বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছাতে সময় লাগে ৬-৮ ঘণ্টা। এসি ও ননএসি বাসে ভাড়া বাবদ ব্যয় হয় ৫০০-৭০০ টাকা। তবে লোকাল বাসে বরিশাল যেতে খরচ হবে মাত্র ২৫০-৩০০ টাকা। লোকাল বাসে গেলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাসে কাটাতে হবে।

নৌপথে বরিশাল

বরিশাল যাওয়ার জন্য নৌপথ সবচেয়ে উত্তম। ঢাকার সদরঘাট থেকে সুন্দরবন ৭/৮, সুরভী, কীর্তনখোলা ইত্যাদি লঞ্চ রাত ৮-৯ টায় বরিশালের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। ভোর ৫/৬ টায় পৌঁছায়। ডেকের ভাড়া ১৫০ হলেও ডাবল কেবিনের ভাড়া ১,৫০০ এবং ভিআইপি কেবিনের ভাড়া ৪,৫০০ টাকা।

বরিশাল থেকে দুর্গাসাগর

বরিশাল থেকে সিএনজি, অটোরিকশা ভাড়া করে দীঘির সামনে পর্যন্ত যাওয়া যায়। এছাড়া বরিশাল থেকে বাসে চড়েও দুর্গাসাগর দীঘি পর্যন্ত যাওয়া যায়।

থাকার ব্যবস্থা

বরিশালে থাকার জন্য বেশ কিছু আবাসিক হোটেল আছে। হক ইন্টারন্যাশনাল, হোটেল গ্রান্ড প্লাজা, এথেনা ইন্টারন্যাশনাল ইত্যাদি হোটেলে থাকতে পারবেন।
ফিচার ইমেজ- Dhaka times news

Loading...

2 Comments

Leave a Reply
  1. লিখাটা খুব ভাল লাগল। ধন্যবাদ আপনাকে বৈচিত্রময় লিখার জন্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সম্রাট অশোকের পুণ্ড্রনগর তথা বগুড়ার বরেন্দ্রভূমি মহাস্থানগড়

পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং থেকে বলছি