বান্দরবানের স্বপ্নকথন: চিংড়ি ঝর্ণার পথে

বান্দরবানের প্রায় ৯০ শতাংশ সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে পাহাড়ের অন্তরালে। গাড়ি দিয়ে যাওয়া যায় না এসব জায়গায় সাধারণত। ওই যে বলে, কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে, ঠিক তেমনি এই অপার সৌন্দর্যের ভাণ্ডার থেকে সুন্দরের জলধারায় সিক্ত হতে চাইলে যেতে হবে গভীরে, পায়ে হেঁটে। যেখানে কোনোদিন বিদ্যুুৎ আসেনি, নেই কোনো যানবাহনের ঝঞ্ঝাট, নেই কোনো শপিং মল বা নাগরিক কোলাহল সেখানেই মিলবে আনন্দমহল। বলছি বান্দরবানের পাহাড়ি সৌন্দর্যের কথা। পাহাড় বেয়ে বহু উঁচু থেকে জল গড়িয়ে ঝর্ণার সৃষ্টি করে যেন মনে হয় স্বর্গ থেকে কেউ অবিরাম জলের বন্যা ভাসিয়েছে। গতরাতে বগালেক এসেছি, আজকের গন্তব্য চিংড়ি ঝর্ণা।

আজকের গন্তব্য চিংড়ি ঝর্ণা, ছবিঃ ওয়াহিদুজ্জামান

খুব সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে গেলাম সবাই। হালকা শীত পড়েছে অক্টোবরের এই সময়টায়। কটেজ থেকে বের হয়ে হালকা পাতলা নাস্তা করে নিলাম। শেষবারের মতো গত রাতের কটেজটিকে দেখে নিলাম। কাপড় শুকাচ্ছিল আমাদের, বলে গেলাম চিংড়ি ঝর্ণা থেকে ফেরার পথে নিয়ে যাবো। এখানকার মানুষজন লোকালয়ের চেয়ে অনেক ভালো, কোনো কিছুতেই না নেই তাদের।
আমাদের কটেজ, ছবিঃ দীপ সেন

বান্দরবানের এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে খাবার মতো বেশ সুস্বাদু আর উপাদেয় খাবার কলা। ট্রেকিংয়ের জন্য বেশ উপযোগী এই কলার সর্বোত্তমটা মনে হয় বান্দরবানেই পাওয়া যায়। তাই চিংড়ি ঝর্ণার পথে পা বাড়ানোর আগে দুই হালি কলা কিনে নিলাম, পথে যেতে যেতে খাওয়া যাবে। বগালেক পাড়া থেকে বের হতে হলেও আর্মি ক্যাম্প থেকে রেজিস্ট্রি করে যেতে হয়। তাই আবার উঁচুতে অবস্থিত ক্যাম্পে উঠে নাম লিখিয়ে রওনা দিলাম ঝর্ণার উদ্দেশ্যে। সকালে বগালেক বেশ সুন্দর দেখাচ্ছিল।
সকালের নাস্তার ব্যবস্থা, ছবিঃ দীপ সেন

বগালেককে পেছনে ফেলে চলতে শুরু করলাম আমরা। বগালেক পাড়া থেকে মাত্র ১ ঘণ্টার পথ বললেন অজিত দা, আমাদের গাইড। বগালেক থেকে মাত্র তিন বা সাড়ে তিন কিলোমিটার পথ চিংড়ি ঝর্ণার। হাঁটতে লাগলাম সবাই মিলে আর দেখতে লাগলাম আশেপাশের সৌন্দর্য। যতই ঝর্ণার কাছে যাচ্ছি একটু একটু করে ঝর্ণাটি দেখার ইচ্ছে বাড়ছে। অজিত দা বললো, “খুবই সঠিক সময়ে এসেছো তোমরা!” গত রাতেই নাকি বৃষ্টি হয়েছে তাই ঝর্ণা এখন ভরা যৌবনা। অজিত দার কথার প্রমাণ আমরা হাঁটতে হাঁটতেই পাচ্ছিলাম। বিভিন্ন জায়গায় পাথরের গা বেয়ে ছোট ছোট জলধারা প্রবল বেগে আছড়ে পড়ছে। পানি ছুঁয়ে দেখলাম ভীষণ রকমের ঠাণ্ডা।
ঝর্ণার পথে, ছবিঃ লেখক

হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ জোঁকের উৎপাত শুরু হলো। বলে রাখা ভালো, বান্দরবানের যেখানেই ঝর্ণা আছে সেখানেই আছে প্রচুর পরিমাণ জোঁক। তাই সব সময় সাথে লবণ রাখা উচিত জোঁক ছাড়ানোর জন্য। আমাদের সাথে লবণ ছিল না, তাই হাত আর কাঠি দিয়ে পায়ের জোঁকগুলো টেনে টেনে খুলছিলাম। বেশ ভালো রক্ত খেয়ে ফুলে-ফেঁপে উঠেছে জোঁকগুলো। অজিত দা বললো, “পানির বেশি কাছে যেও না, জোঁকগুলো আরো ধরে বসবে”। তাই যতটা সম্ভব পানির কাছে না গিয়ে হাঁটতে লাগলাম।
সবুজের সুড়ঙ্গ, ছবিঃ দীপ সেন

ঝর্ণার পানির গর্জন খুব ভালোভাবে কানে আসতে শুরু করে। বুঝে গেলাম এসে গেছি চিংড়ি ঝর্ণায়। তবে সেটা অনেক উপরে, তার জন্য কম করে হলেও ৬ তলা সমান উচ্চতায় পিচ্ছিল পাথর বেয়ে উঠে যেতে হবে। পাথরের গা বেয়ে প্রচণ্ড বেগে পানি গড়িয়ে নিচে পড়ছে আর তার মধ্য দিয়েই সাবধানে পা ফেলে এগিয়ে যাচ্ছি আমরা। পাথরের গায়ে জমে থাকা শেওলার আবরণ একদম পিচ্ছিল করে তুলেছিল পাথরগুলোকে। পাথর বেয়ে উঠে গেলাম একটুখানি মাটি আছে এমন এক জায়গায়। এখান থেকে দেখা যাচ্ছে বিশাল এক অপূর্ব ঝর্ণা, চিংড়ি ঝর্ণা। একটা গাছের নিচ দিয়ে পার হয়ে গেলাম আর উঠে গেলাম একদম ঝর্ণা পর্যন্ত।
উপরে উঠার রাস্তা, ছবিঃ লেখক

এত বিশাল ঝর্ণা আমরা আগে দেখিনি কখনো। তাই অবাক হওয়ার এবং খুশির পরিমাণ একটু বেশিই ছিল আমাদের। ক্যামেরার শরীরটা পলিথিন দিয়ে মুড়িয়ে শুধু লেন্সটা বের করে ছবি তুলে নিলাম চটজলদি। টিশার্ট খুলে দৌড় লাগালাম পিচ্ছিলতাকে তোয়াক্কা না করে, আজকে ইচ্ছে মতো ভিজবো। বিশাল এই ঝর্ণার পানির বেগও নেহাত কম ছিল না, ঝর্ণার নিচে বসলে গায়ে এসে বুলেটের মতো লাগে প্রতিটি জলকণা। তবুও বসে রইলাম যতক্ষণ না সবটুকু আত্মতৃপ্তি আসে। সকাল দশটার দিকে চিংড়ি ঝর্ণা পৌঁছাই আমরা। প্রায় দেড়-দুই ঘণ্টা ছিলাম। ঝর্ণার মায়া এমনভাবে বশ করেছিল যে আসতেই ইচ্ছে হচ্ছিল না। অজিত দা’র ডাকে বুঝলাম যেতে হবে।
চিংড়ি ঝর্ণা এবং আমরা, ছবিঃ নাহিদুল ইসলাম

আসলে চিংড়ি ঝর্ণা আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল না, ছিল কেওক্রাডং। কিন্তু আমাদের প্রথম ট্রেক হওয়ায় অনেকেরই শরীর সায় দিচ্ছিল না। কিন্তু এত কাছে এসে ফিরে যেতেও মন চাইছিল না, তবুও রিস্ক না নিয়ে বগালেক পাড়ায় ফেরার পথ ধরলাম। দুপুরের আগে পৌঁছে গেলাম বগালেক পাড়ায়। সেখানে দুপুরের খাবার খেয়ে আবার গেলাম আর্মি ক্যাম্পে, নাম রেজিস্ট্রি করিয়ে রুমায় ফেরার পথ ধরি।
অবিরাম অজস্রধারা, ছবিঃ লেখক

আসার সময় পুরো রাস্তায় এক-দুই বারের বেশি থামিনি, তবে থামতে হয়েছে যেখান থেকে ট্রেক শুরু করেছি তার নিচে যে খাড়া পথ ছিল তার আগে। আসার সময় চিন্তা করিনি এই পথটা এত ভোগাবে, ইটের তৈরী সরু এই রাস্তায় দম বন্ধ হয়ে আসছিল। কতবার যে পানি গিলেছি তার হিসেব নেই, আর একটু হাঁটার পরেই বসে পড়তাম। অনেক কষ্ট হয়েছে সেই খাড়া পথ পাড়ি দিতে, মাথার উপর কড়া রোদ সেই কষ্টকে বাড়িয়ে দিচ্ছিল বহুগুণে। অবশেষে উঠে গেলাম আস্তে ধীরে।
ফেরার পথে নষ্ট হয়ে যায় গাড়ি, ছবিঃ লেখক

গাড়ি ছিল না রুমায় ফিরে যাওয়ার। আধ-ঘণ্টা সেখানেই বসে ছিলাম, রুমা থেকে গাড়ি আসলো শেষে। গাড়ির আবার ব্রেক নেই, গিয়ারের হাতল আমাকে ধরিয়ে দিলো ড্রাইভার। রোমাঞ্চকর সেই ভ্রমণে মাঝপথে গাড়ি নষ্ট হয়ে যায়। সেখান থেকে হেঁটেই রওনা দিলাম শেষে রুমার উদ্দেশ্যে। সন্ধ্যায় রুমায় এসে পৌঁছে যাই আমরা। রাতটা সেখানেই কাটাবো বলে ঠিক করি। ১,০০০ টাকা প্রতি রুম করে ৬ জনের দুটো রুমও পেয়ে যাই রুমায়। সেই রাতে আবার জন্মদিনও ছিল আমার, সবগুলো বন্ধু রুমার আনাচে কানাচে কেক খুঁজে না পেয়ে বেকারীর কেক আর সাদা মোমবাতি দিয়েই ঘটা করে পালন করলো আমার জন্মদিন। সব মিলিয়ে অসাধারণ একটা রাত ছিল রুমার সে রাত, জন্মদিনে সবচেয়ে ভালো গিফটটা নিজেকে দিয়েছিলাম এই বান্দরবানে এসে। আগামীকাল আরও রোমাঞ্চ অপেক্ষা করছে, তবে সে অভিজ্ঞতা নিয়ে আসছি পরের লেখায়।
ফিচার ইমেজলেখক

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

মন মাতানো মুন্নারের চা বাগানের পথে পথে

ফয়'স লেক: যেখানে রয়েছে ত্রিভুজ প্রেমের দৃশ্য