বান্দরবানের স্বপ্নকথন: গন্তব্য বগালেক

সময়টা ২০১৬ সাল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ২য় বর্ষে উঠেছি মাত্র। ১ম বর্ষের সেমিস্টার ব্রেকে হামহাম থেকে ঘুরে আসলাম। ঘুরে আসার পর ক্যাম্পাসে এসে কী যেন নেই নেই লাগা শুরু করলো। ২য় বর্ষের প্রথম সেমিস্টার শেষের দিকে, মাসের নাম নভেম্বর। তন-মন আকুপাকু করতে লাগলো ঘুরতে যাওয়ার জন্য। আমার কখনো ঘুরতে যাওয়ার সঙ্গীর অভাব হয়নি, এক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হলো না। নিজের ডিপার্টমেন্টের কাছের কিছু বন্ধুর সাথে প্ল্যান করতে লাগলাম বান্দরবান যাওয়ার। সে সময়কার উৎসাহটাই আলাদা ছিল, পরীক্ষার আগের রাতেও পরিকল্পনার অংক কষেছি বহুবার। পরীক্ষা শেষ হওয়ার দিনক্ষণ গুনছিলাম, ততদিনে গ্রুপে এসে জড়ো হয়েছে সাত জন।

গন্তব্য বগালেক, ছবি: লেখক

আমাদের পরীক্ষা শেষ হলো অক্টোবরের ২ তারিখ। ততদিনে ৭ জনের গ্রুপটা ১২ জনের বিশাল এক দলে পরিণত হয়েছে। পরীক্ষা শেষ হওয়ায় বিরাট ঝামেলা মাথা থেকে নেমে গেল, উঠে গেলাম খুলনা থেকে ঢাকা যাওয়ার বাসে। ঢাকা থেকে ইউনিকে বান্দরবানের বাসের টিকেট কাটা ছিল আমাদের। ঢাকা থেকে বান্দরবানের বাসগুলোর মধ্যে ইউনিক যথেষ্ট ভালো সার্ভিস দেয়, ভাড়া ৬০০ টাকা রেখেছিল যতদূর মনে পড়ে। খুলনা থেকে ঢাকা পৌঁছে যাই রাত আটটায়, বান্দরবানের বাসে উঠে পড়ি রাত ১১টায়। উঠেই ঘুম দিলাম, শরীর প্রচণ্ড ক্লান্ত।
অপরুপা বান্দরবান, ছবি: লেখক

ভোরের দিকে ঘুম ভাঙল। বান্দরবানের আঁকাবাঁকা কংক্রিটে ঢালাই দেয়া রাস্তা দিয়ে বাস ছুটে চলেছে। হালকা শীত শীত লাগছিল। বাস থেকে বান্দরবান বাসস্ট্যান্ডে নেমে গেলাম সকাল সাড়ে ৬টায়। একটু সামনে হেঁটে দুইটা ব্রীজ পার হয়ে হাতের ডান পাশের গলি ধরে ঢুকে গেলাম হোটেল প্যারাডাইসে। আমাদের পরিকল্পনা ছিল এখন শুধু ব্যাগ রাখা এবং ফ্রেশ হওয়ার জন্য একটি রুম নিয়ে ভারী সব জিনিস ব্যাগে রেখে আজকেই বগালেক চলে যাবো। ৬০০ টাকা দিয়ে একটি খুবই সাধারণ রুম নিলাম যাতে ব্যাগগুলো রাখা যায়। বলে গেলাম পরশু এসে ভালো রুম নিচ্ছি।
বান্দরবান সদর থেকে রুমার পথে, ছবি: লেখক

চটজলদি হাত-মুখ ধুয়ে ব্রীজের ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা চান্দের গাড়িগুলোর কাছে গেলাম। গন্তব্য রুমা বাজার। রুমা বাজার পর্যন্ত ভাড়া চাইলো ৫,০০০ টাকা। তবে শেষমেষ ৩,৫০০ টাকায় চলে গিয়েছিলাম। এটা তখনকার কথা, এখন একটু বেশি হওয়াই স্বাভাবিক। বান্দরবান সদর থেকে ৪৫ কিলোমিটার দূরত্বের রুমাতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সকাল এগারোটা বেজে গেল। আমরা পথে অনেক জায়গা নেমে ছবি-টবি তুলছিলাম তাই দেরী হয়েছে।
রুমা থেকে বগালেকের পথে, ছবি: লেখক

রুমায় পৌঁছে প্রথমেই গাইড খুঁজতে লাগলাম এবং পেয়েও গেলাম, অজিত দা। অজিত দা আমাদের আর্মি ক্যাম্পে নিয়ে গেলেন এবং সেখানে নাম এন্ট্রি করিয়ে হালকা নাস্তা করে রওনা দিলাম বগালেকের উদ্দেশ্যে। রুমা থেকে শীতের শুরুতে ল্যান্ডরোভারে করে ১১ কিলোমিটার পর্যন্ত গাড়িতে যাওয়া যায়, একদম শীত পড়ে গেলে নতুন রাস্তা হয় তা দিয়ে সরাসরি বগালেক পর্যন্তও যাওয়া যায়।
রুমা থেকে গাড়ির পথ, ছবি: লেখক

আমরা ১১ কিলোমিটার পর্যন্ত ল্যান্ডরোভার ভাড়া করলাম ২,৫০০ টাকা দিয়ে, প্রতি গাড়িতে ৫-৬ জন করে বসতে পারে। বান্দরবানের রাস্তা সম্পর্কে আগে থেকে ধারণা না থাকায় বেশ রোমাঞ্চ কাজ করছিল এই ১১ কিলো পথের ভ্রমণটি। খাড়া রাস্তা বেয়ে গাড়ি উঠে যাচ্ছিল টায়ারের অর্ধেক সমান কাদাকে উপেক্ষা করে। ১১ কিলো পথ পার করতে খুব বেশি সময় লাগলো না, দুপুরের দিকে পৌঁছে গেলাম যেখান থেকে ট্রেক শুরু করতে হয় সেখানটায়। এই প্রথম আবিষ্কার করলাম পাহাড়ের বিশালতার মাঝে নিতান্তই ক্ষুদ্র আমাদের। চারদিকের পাহাড়ের সৌন্দর্য আর মেঘের খেলায় মোহিত হয়ে ভুলেই গেলাম ট্রেক এখনো বাকি।
এখান থেকে শুরু করতে হয় ট্রেকিং, ছবি: লেখক

ট্রেক করা শুরু করি কিছুক্ষণের মধ্যে। প্রথমেই একদম খাড়া নিচু একটা ইটের রাস্তা পড়ে। দৌড়ে দৌড়ে মহা আনন্দে নেমে গেলাম নিচে। আসার সময় এই ইটের পথখানি কীভাবে পাড়ি দিবো সেটা মাথায় একবারো আসেনি, পরে অবশ্য এই পথটি ভুগিয়েছিল অনেক। হাঁটতে লাগলাম আমরা। ইটের পথটি শেষ করলেই একটা পাড়ার দেখা পাই, নাম জানা হয়নি তখনো। ক্ষণিক বিশ্রাম নিয়ে আবার হাঁটতে শুরু করি।
প্রচণ্ড খাড়া সেই পথ, ছবি: দীপ সেন

পাহাড়, মেঘ আর উচ্চতাকে সামনে রেখে সবুজ ধানক্ষেত বা বড় বড় ধানগাছের মতো একপ্রকার গাছকে দুইপাশে রেখে হেঁটে যাচ্ছি। হামহামের ট্রেকে আমরা আকাশ দেখতে পারিনি গাছপালার জন্য। কিন্তু এখানে অত বড় গাছই নেই যে আকাশ ঢেকে দেবে। তাই হাঁটছিলাম আর হাঁ করে বান্দরবানের পাহাড়গুলোতে মেঘের আলোছায়ার খেলা দেখছিলাম। যত দেখছিলাম ততই মুগ্ধ হচ্ছিলাম এই ভেবে যে বাংলাদেশের আসল সৌন্দর্য তো এখানে লুকিয়ে আছে। এই বিশালতা, নীল আকাশ আর পাহাড়ের গায়ে হেঁটে যাওয়ার মাঝেই জীবনানন্দ খুঁজে নিচ্ছিলাম প্রতি সেকেন্ডে।
হাটছিলাম জীবনানন্দে, ছবি: লেখক

হাঁটতে হাঁটতে আমরা কমলাপাড়ায় পৌঁছে যাই। খুবই ছোট গোছানো সুন্দর এই কমলাপাড়া। পাড়ার প্রবেশ করার সাথে সাথেই বুঝলাম কেন এই পাড়ার নাম কমলাপাড়া, থোকায় থোকায় কমলা সাজানো এখানকার দু-তিনটি দোকানে। বুঝলাম আশেপাশে বেশ বড়সড় কমলার বাগান রয়েছে। কমলাপাড়ায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে বিকেল হয়ে গিয়েছিল। একটি দোকানে নিয়ে বসালেন অজিত দা। পাঁচ টাকা প্রতি গ্লাস করে ট্যাং খেলাম সেখান থেকে। কমলাও খাওয়া হলো কয়েকটা। অজিত দাকেও খাওয়ালাম জোর করে। খুবই ভালো মনের মানুষ এই অজিত দা। বললেন আর মাত্র ২০ মিনিট হাঁটলেই পৌঁছে যাবো বগালেক। খুশিতে চোখ চকচক করে উঠলো সবার।
কমলাপাড়া, ছবি: লেখক

আমার জীবনের ২য় ট্রেক ছিল এই বগালেক ট্রেক। হামহামের ওই ৬ কিলো ট্রেক করতেই অবস্থা খারাপ হয়ে গিয়েছিল, যেখান থেকে শুরু করেছিলাম সেখান থেকে বগালেকের দূরত্ব ৯ কিলোর মতো। সবাই মোটামুটি ক্লান্ত। এর মধ্যে চোখের সামনে উদয় হলো খাড়া এক পথের। একদম চিকন কিন্তু একেবারেই খাড়া পথ দেখে আমার, টিম মেম্বার আসিফ এবং আসিফুলের অবস্থা খারাপ।
বন-বাদাড়ে হেঁটে চলা, ছবি: লেখক

আমরা এক কদম হাঁটি তো দুই কদম নিচে নেমে যাই। বুঝলাম স্বাস্থ্যই আজকের প্রধান শত্রু। আমার চাকমা বন্ধুর তরতর করে উঠে যাওয়া দেখে আরো হতাশ হয়ে গেলাম। প্রতি তিন কদমে বসে পড়ছিলাম মাটিতে। তবুও পারতেই হবে এমন কিছু ভেবে আবার উঠে দাঁড়াচ্ছিলাম। আসিফুলের বুকে ব্যথা শুরু হলো, তবুও হাটছিল ছেলেটা। অবশেষে গুটি গুটি পায়ে উপরে এসে পৌঁছালাম যেখানে চোখের দৃষ্টিতে ধরা পড়ছিল বগালেকের সৌন্দর্য।
উপর থেকে বগালেক

আনন্দ আর ক্লান্তিতে আমি সেখানেই বসে পড়ি। অনেকক্ষণ বসে বসে দেখছিলাম চারপাশটা। বেশ বিশাল এই বগালেক সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১,২০০ ফুট উপরে অবস্থিত। বগালেকে পৌঁছাতে পেরে আমাদের আনন্দের সীমা এমনভাবে ছাড়িয়ে গিয়েছিল যে লেকের সামনেই সবাই টিশার্ট খুলে ফেললাম আর তেমনিভাবে জয়ের তারুণ্যে একখানা স্থিরচিত্রও ক্যামেরায় ধারণ করা হয়ে গেল।
বগালেক পাড়া, ছবি: লেখক

বগালেকের আর্মি ক্যাম্পে আবারো নাম রেজিস্ট্রি করাতে হলো। সেখান থেকে চলে আসলাম বগালেক পাড়ায়। হ্রদের একদম তীর ঘেঁষে একটি কটেজ দেয়া হলো আমাদের যার প্রতি রাতের ভাড়া ১০০ টাকা প্রতিজন মাত্র। বাঁশের তৈরী এমন দুটো ঘর নিলাম যার প্রতিটিতে ৬ জন করে থাকবে।
বগালেক পাড়ায় থাকার কটেজ, ছবি: লেখক

কটেজগুলো যার তার কাছেই খাবার-দাবারের ব্যবস্থা করলেন অজিত দা। ঘুটঘুটে অন্ধকার রাতে আমরা সবাই একে একে পাড়ার একটু উপরে থাকা গোসলখানায় চৌবাচ্চা থেকে পানি নিয়ে গোসল সারলাম। পেটে তখন বিরাট ক্ষিদে, গোসল করে চটজলদি চলে এলাম খাবার টেবিলে। আইটেম হিসেবে আছে ভাত, ডাল, আলু-চালকুমড়ার তরকারী আর ডিম ভাজি। ক্ষিদের মাত্রা এত বেশি ছিল একসাথে দুটো ডিম সাবাড় করে ফেললাম। আহা! পাহাড়ের সেই খাবারের তুলনা হয় না। সেই স্বাদ আজো জিভে লেগে আছে। খাবারের খরচ মাত্র ১০০ টাকা।
রাতের বগালেক, ছবি: ওয়াহিদুজ্জান

কটেজে ফিরে অন্ধকারে সবাই কটেজের বারান্দায় বসে ছিলাম যেখান থেকে হ্রদের বিশালতা আর রাতের নিস্তব্ধতা উপভোগ করা যাচ্ছিল প্রাণ ভরে। হালকা এক পশলা বৃষ্টিও হয়ে গেল মাঝখানে, মায়ায় ভরা সে রাতের কথা আজো ভুলতে পারিনি। হয়তো পারবোও না। ক্লান্ত শরীরে ঘুমের আহাজারি নেমে আসতে লাগলো ধীরে ধীরে। একে একে ঘরে চলে গেল সবাই, রয়ে গেলাম আমি। এই রাত আমাকে ছাড়তে চায় না, আমিও চাই না এই রাতকে ছেড়ে দিতে। কখন যে বারান্দায়ই ঘুমিয়ে গেলাম টের পাইনি, কে যেন ডেকে তুললো “ঘরে শুবি চল”। আধো ঘুম চোখে রাতের বগালেককে শেষ বারের মতো বিদায় জানালাম, কথা দিলাম আবার আসবো।
ফিচার ইমেজ- লেখক

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বাংলাদেশের বর্ষার রানী সিলেট ভ্রমণের বিস্তারিত

মন মাতানো মুন্নারের চা বাগানের পথে পথে