কুমিল্লার ধর্মসাগর দিঘির পাড়ে একটি বিকেল

ময়নামতিতে শালবন বিহার, জাদুঘর, রূপবান মুড়া, ইটাখোলা মুড়া, লতিকোট মুড়া, ওয়্যার সিমেট্রি, বার্ড ঘুরে কুমিল্লা শহরে ফিরে এলাম। বিশ্বরোড ফিরে এসে শুনি, নিলয় বেচারা দুই ঘণ্টা ধরে শহরে এসে অপেক্ষা করছে। জাকির ভাইয়াকে ফোনে বলেছিল, ও শহরে এসে পড়েছে, গ্যাঞ্জামের কারণে ভাইয়া শুনেছে, ও চরে এসেছে! বেচারার জন্য কষ্টই লাগল। ওর সাথে সবসময়ই এমন কিছু ঘটে। বিকেল হয়ে এসেছে। তাসনু আর থাকতে পারবে না। সন্ধ্যে হবার আগেই ওকে বাড়ি ফিরতে হবে। এখান থেকে তাসনু চলে গেল। আর আমরা আবারো পঞ্চমানব ধর্মসাগর দেখতে গেলাম।

ধর্মসাগর দীঘি। সোর্স: সজিব সাইফুল

কুমিল্লা শহরের প্রাণকেন্দ্রের বাদুরতলা নামক জায়গায় অবস্থিত বিশাল আকারের দীঘিটিই হলো ধর্মসাগর দীঘি। তবে ইতিহাস গত কারণে এর নামকরণ ‘সাগর’ হলেও এটি সাগর নয়, দীঘি। এ দীঘির আয়তন ২৩ দশমিক ১৮ একর। ইতিহাস গ্রন্থ থেকে জানা যায়, কুমিল্লার ‘ধর্মসাগর’ দীঘির রয়েছে কয়েকশ’ বছরের ইতিহাস। ত্রিপুরা রাজ্যের রাজা ধর্মমাণিক্য ১৪৫৮ খ্রিস্টাব্দে এ দীঘিটি খনন করেন। তাঁর নামানুসারে এ দীঘির নামকরণ করা হয় ‘ধর্মসাগর’। আবার কারো কারো মতে, রাজা ধর্মপালের নামানুসারে এই দীঘির নাম হয়েছে ধর্মসাগর দীঘি। প্রায় ২০০-২৫০ বছর আগে আনুমানিক ১৭৫০ অথবা ১৮০৮ খ্রিস্টাব্দে দীঘিটি তৈরি করা হয়েছে। প্রজাহিতৈষী রাজা ছিলেন ধর্মপাল। তিনি ছিলেন পাল বংশের রাজা। বাংলায় তখন ছিল দুর্ভিক্ষ। রাজা দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের সাহায্যের জন্য এই দীঘিটি খনন করেন। এই অঞ্চলের মানুষের জলের কষ্ট নিবারণ করাই ছিল রাজার মূল উদ্দেশ্য।
সাগর নাম দিয়ে দেশে যে কয়টি দীঘি রয়েছে ধর্মসাগর তার মধ্যে অন্যতম। বিকেলের পড়ন্ত সূর্যের আলো যখন তেজহীন হয়ে আসতে থাকে শত শত দর্শনাথীর পদ ভারে ধীরে ধীরে মুখরিত হতে থাকে ধর্মসাগর পাড়। যেন প্রতিদিনই বসে মিলন মেলা। ধর্মসাগরের উত্তর কোণে রয়েছে কুমিল্লার শিশুপার্ক। এই শিশুপার্কে বসে সাগরের দৃশ্য উপভোগ করা যায়, সবুজ শ্যামল ও বিশাল বড় গাছ নিয়ে এই শিশুপার্ক।
সাগর নাম দিয়ে দেশে যে কয়টি দীঘি রয়েছে ধর্মসাগর তার মধ্যে অন্যতম। সোর্স: flickr.com

চারদিকে বৃক্ষশোভিত একটি মনোরম স্থান ধর্মসাগর। দীঘিপাড়ের সবুজ বনানী ধর্মসাগরকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা। থরে থরে সাজানো বড় বড় গাছের সারি। চারপাশে বিপুল সবুজ বৃক্ষের সমাহারে নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর পাখ-পাখালীর কলকাকলীতে মুখর থাকে ধর্মসাগর দীঘি। তার মাঝে সিমেন্টে বাধানো বেঞ্চি। তাই সারা বছর ধরেই দূর-দূরান্ত থেকে এ দীঘি দেখার জন্য আসেন পর্যটক, প্রকৃতি ও বিনোদনপ্রেমীরা। এক কথায় অপূর্ব। বিকেল বেলাটা যারা ঘুরতে চান তাদের জন্য এটি একটি আদর্শ স্থান। ইচ্ছে করলে নৌকা ভাড়া করে দীঘির চারপাশ ঘুরে আসতে পারেন। সব কিছু মিলিয়ে এটি একটি অসাধারণ ও নান্দনিক দর্শনীয় স্থান।
ধর্মীয় উৎসব-বর্ষবরণ ছাড়াও বছরের প্রায় সবসময় এখানে দেখা যায় প্রকৃতি ও বিনোদনপ্রেমীসহ দূর-দূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীর ঢল। এদিকে ধর্মসাগর ছাড়াও জেলার বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে আছে প্রাচীনতম অনেক দীঘি। এগুলো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় এনে, এর চারপাশে রিটার্নিং ওয়াল নির্মাণ, রেস্টহাউস নির্মাণ, ভ্রমণের জন্য কয়েকটি স্পিডবোটের ব্যবস্থাকরণ করে বিনোদনমুখী করা গেলে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় হতো বলে মনে করেন জেলার বিশিষ্টজনেরা।
বিকেলের পড়ন্ত সূর্যের আলো যখন তেজহীন হয়ে আসতে থাকে শত শত দর্শনাথীর পদভারে ধীরে ধীরে মুখরিত হতে থাকে ধর্মসাগর পাড়। সোর্স; ইভা

দীঘির উত্তরপাড় এলাকায় রয়েছে ৫ একরের ‘নগর পার্ক’। দীঘির উত্তর-পূর্বকোণে রয়েছে ‘রাণী কুটির’ এবং একটি ‘শিশু পার্ক’ ও ‘কুমিল্লা নজরুল ইন্সটিটিউট’। কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে দীঘির পশ্চিম পাড়ে বিভিন্ন জাতের ফুল ও বাহারী গাছ লাগিয়ে দর্শনার্থীদের জন্য আকর্ষণীয় করে তোলা হয়েছে।
ধর্মসাগর পাড়ে ধর্মীয় উৎসব (ঈদ-পূজা), বর্ষবরণ, বসন্তবরণ ঘিরে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার হাজারো দর্শনার্থীর ঢল নামে। বিশুদ্ধ পরিবেশে প্রতিদিন প্রেমিক-প্রেমিকা, দম্পত্তি ও রসিকজনেরা প্রাণ খুলে মায়াময় স্থান এই দীঘি পাড়ে সময় কাটান। বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ, যুবক-যুবতী, তরুণ-তরুণীসহ শিশুরা রাজহংস ও নৌকায় চড়ে নাচ-গানে, আনন্দ-উৎসবে মেতে ওঠেন। এছাড়া এখানে প্রতিদিন সকালে ও সন্ধ্যায় নগরীর বিভিন্ন এলাকার বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষকে নির্মল পরিবেশে শারীরিক কসরৎ করতে দেখা যায়।
মেঘলা আবহাওয়ায় আরোও মোহনিয়া হয়ে ওঠে ধর্মসাগর পাড়। সোর্স: ইভা

উল্লেখ্য, কুমিল্লায় ছড়িয়ে আছে ছোট-বড় অনেক ঐতিহ্যবাহী দীঘি। প্রাচীন কালের রাজা-রাণী ও তাঁদের আপনজনের স্মৃতি জিইয়ে রাখার জন্য ও মানবতার কল্যাণে দীঘি খনন করে গেছেন। জেলা শহরে ‘নানুয়ার দীঘি’, ‘উজির দীঘি’, ‘লাউয়ার দীঘি’, ‘রাণীর দীঘি’, সেনানিবাস এলাকায় ‘আনন্দ রাজার দীঘি’, ‘ভোজ রাজার দীঘি’, বরুড়ায় ‘কৃষ্ণসাগর দীঘি’, ‘কাজির দীঘি’, সদর দক্ষিণে ‘দুতিয়ার দীঘি’, চৌদ্দগ্রামে ‘জগন্নাথ দীঘি’, ‘শিবের দীঘি’ ও মনোহরগঞ্জে বিশাল আয়তনের ‘নাটেশ্বর দীঘি’ উল্লেখ করার মতো।
আমরা এখানকার মুক্ত বাতাসে কিছুক্ষণ ঘোরাফেরা করে, ভেলপুরি খেয়ে বেরিয়ে গেলাম। কুমিল্লায় এসেছি, মাতৃভান্ডারের রসমালাই না খেলে কি চলে? আদী মাতৃভান্ডারের রসমালাই খুঁজতে গিয়ে অবাক হয়ে লক্ষ করলাম, যেসব দোকানে রসমালাই আছে, সেসবের কোনোটায় বসে খাবার ব্যবস্থা নেই। আশ্চর্য তো! আমরা কি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খাব নাকি?
কুমিল্লার রসমালাই। সোর্স: মেঘমালা

তারপর অনেক খুঁজে পেতে একটা দোকান পাওয়া গেল, যেটায় একটা টেবিল আছে। রসমালাই খেয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলে ফিরে চললাম গন্তব্যে।
মাত্র পাঁচজনেও বেশ চমৎকার ভ্রমণ হয়েছে। আড্ডা আর ঘুরে দেখা, দুটোই খুব জমেছে।

কীভাবে যাবেন:

সায়েদাবাদ থেকে তিশা (০১৭৩১২১৭৩২২), উপকূল (০১৯৮১০০২৯৩২, ০১৯৮১০০২৯৪২), কমলাপুর থেকে বিআরটিসি (০১৭৭০৪৯৩৭৭৫) অথবা এশিয়া লাইন পরিবহনে কুমিল্লার শাসনগাছা আসতে হবে। ভাড়া ২০০ টাকা থেকে ২৭০ টাকা। তার পর রিকশাঅটোতে ভাদুরতলা/ধর্মসাগর। ভাড়া পড়বে ১৫ থেকে ২০ টাকা।

কোথায় থাকবেন:

কুমিল্লা ক্লাব, কুমিল্লা সিটি ক্লাবসহ বেশ কিছু হোটেল ও গেস্ট হাউজ রয়েছে এখানে। এসি কিংবা ননএসি সব ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে। দুজনের কক্ষে প্রতি রাত্রিযাপন খরচ হবে ১ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা। এছাড়া থাকার জন্য আছে হোটেল চন্দ্রিমা, হোটেল সোনালী, হোটেল শালবন, হোটেল নিদ্রাবাগ, আশীক রেস্ট হাউস ইত্যাদি। ভাড়া ২০০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে।

চারদিকে বৃক্ষশোভিত একটি মনোরম স্থান ধর্মসাগর। সোর্স: ইভা

আশিক রেসিডেনসিয়াল রেস্ট হাউজ – ঠিকানাঃ ১৮৬, নজরুল এভিনিউ কুমিল্লা, যোগাযোগঃ ৬৮৭৮১
হোটেল আবেদিন – ঠিকানাঃ স্টেশন রোড কুমিল্লা, যোগাযোগঃ ৭৬০১৪
হোটেল নুরজাহান – ঠিকানাঃ ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়ক, কুমিল্লা, যোগাযোগঃ৬৮৭৩৭
হোটেল সোনালি – ঠিকানাঃ কান্দিরপাড়চত্বর, কুমিল্লা, যোগাযোগঃ ৬৩১৮৮
এছাড়া শালবন বৌদ্ধ বিহারের কাছে বার্ড আছে। বার্ডে যোগাযোগ করলে সেখানেও থাকতে পারেন। বার্ডের চমৎকার পরিবেশ আর খাবার আপনার রাত্রীযাপনকে করবে মোহনিয়া।

সতর্কতা:

আমাদের টুরিস্ট স্পটগুলো পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব আমাদের নিজেদের। আসুন, ঘোরাঘুরির সাথে সাথে সুরুচির পরিচয় দিই।
কারণ, মন সুন্দর যার, সেই তো দেশ পরিষ্কার রাখে।

Loading...

One Comment

Leave a Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

মারায়ন তংয়ের চূড়ায় ক্যাম্পিং এবং গ্যালাক্সি দর্শন

প্রাচীনত্ব, বাগেরহাট ও কোদলা মঠের উপাখ্যান