ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ হয়ে হুমায়ূন স্যারের গৌরীপুর জংশনে

নোংরা রেলস্টেশন। সোর্স: লেখিকা

বন্ধুরা মিলে ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ যেদিন যাচ্ছি, সেদিন থেকে পাঁচদিনের লম্বা সরকারি ছুটি পড়ে গিয়েছে। ফলে বাস-ট্রেন কোনো জায়গার টিকিটই সহজ প্রাপ্য নয়। তার উপরে সড়ক পথে ঢাকা-গাজিপুরের বিখ্যাত জ্যাম তো আছেই। সবকিছু বিবেচনা করে ট্রেনের টিকিট কাটা হলো।
এয়ারপোর্ট স্টেশনে এসে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছি আর মানুষের ভিড় দেখছি। আতঙ্কিত মনে ভাবছি, এতো মানুষ ঠেঙ্গিয়ে কী করে ট্রেনে উঠবো? তেরোজনের সার্কেলে আমরা তিনজন মেয়ে। সার্কেলের তিনজন ট্রেনেই আছে, আমাদের সিটের দখল নিয়ে রেখেছে। তারপরেও ট্রেনে ওঠা থেকে শুরু করে সিট পর্যন্ত যাওয়ার পর্যন্ত প্রচণ্ড রকম হেনস্তার শিকার হয়েছি আমরা তিনজন। খুলেই বলি। ট্রেন এসে প্লাটফর্মে থামার পর ঙ নম্বর বগির সামনে গিয়ে জড়ো হলাম।
ইতোমধ্যেই, বগির সামনে জটলা বেঁধে গেছে। সেই জটলার মধ্য দিয়ে কীভাবে ঢুকবো, ভেবে পাচ্ছিলাম না। বন্ধুদের সাহায্যে কী করে যেন ঠেলে ঠুলে ট্রেনে উঠে পড়লাম। কিন্তু ওটুকুই। এরপর তো আর নড়তেই পারি না! যেন আক্ষরিক অর্থেই ট্রেনে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। পিনি তো বলেই উঠলো, ‘আমার দম আটকে আসছে! আমি শ্বাস নিতে পারছি না!’
একে তো প্রচণ্ড মানুষের চাপ, তার উপরে এক অসভ্য সম্ভবত ট্রেনে উঠেছেই মেয়েদের শরীরে হাত দেবার জন্য। প্রচণ্ড ভিড়ের মুখে তাকে হাতের নাগালে পাইনি। পিঠে ব্যাগ থাকাতে কিছুটা রক্ষা পাওয়া গেছে।

ওভারব্রিজ। সোর্স : লেখিকা

কিন্তু পিঠের এই ব্যাগই আবার সামনে এগোতে দিচ্ছিল না। তারপর সজল এগিয়ে এসে আমার পিঠ থেকে ব্যাগ খুলতে সাহায্য করলো। সেই সাথে উচ্চস্বরে বললো, ‘ভাই, আমাদের সিট আছে সামনে, আমাদেরকে একটু যেতে দেন!’
ঠেলে, ধাক্কিয়ে কীসের মধ্য দিয়ে যে সিট পর্যন্ত পৌঁছালাম, আল্লাহই ভালো জানেন। সিটে বসার পর ওই লোকটাকে আর খুঁজে পাইনি, নইলে অ্যায়সা ধোলাই দেওয়ার ব্যবস্থা করতাম যে ইহজনমে এসব জঘন্য কাজ করা ভুলে যেত।
জংশন গুলোতে অনেকগুলো প্লাটফর্ম থাকে। সোর্স :. লেখিকা

ট্রেনে আগে থেকে সিট দখল রাখা তিন বন্ধুর উপর খুব রাগ হলো। ভিতরে এমন জঘন্য অবস্থা, অথচ ওরা সাহায্য করলে আমরা অনায়াসেই জানালা দিয়ে ঢুকে যেতে পারতাম। খুব একটা সমস্যা হতো না। অন্তত যে দুর্ভোগ পেরিয়ে এসেছি, তার তুলনায় এটুকু সমস্যাকে কোনো সমস্যা বলেই মনে হতো না। এই চিন্তাটা ওদের মাথাতেই আসেনি।
ময়মনসিংহের কেওয়াটখালি পৌঁছাতে সময় লাগলো চার ঘণ্টা। আড্ডা দিতে দিতেই চার ঘণ্টা কেটে গেল। এটি একটি জংশন। ওভারব্রিজের উপরে উঠে চারপাশে তাকিয়ে দেখলাম, বানের পানির মতো মানুষ প্লাটফর্মগুলোতে হাঁটাহাঁটি করছে। উপর থেকে বোঝা গেল, জংশনটি কী পরিমাণ নোংরা। অথচ আমি চট্টগ্রামের পাহাড়তলি রেলস্টেশনে গিয়ে ঘুরে এসেছি কয়েকদিন আগে, সেখানে এত ময়লা-আবর্জনা ছিল না।
পনেরোটার মতো মালগাড়ির পুরানো ওয়াগন পড়ে আছে। সোর্স : লেখিকা

 
এই জংশনটির বয়স একশ পেরিয়ে গেছে। ১৮৯৮–১৮৯৯ সালে ময়মনসিংহ হতে জগন্নাথগঞ্জ পর্যন্ত প্রায় ৮৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্যক্তি মালিকানাধীন মিটারগেজ রেলপথ সেকশনটি চালু হয়। রেলওয়ে ব্যবস্থাপনা আরও উন্নত করার লক্ষ্যে ১৯২০ সালে ময়মনসিংহ থেকে জগন্নাথগঞ্জ ঘাট পর্যন্ত ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে দ্বারা পরিচালিত ৮৮ কিলোমিটার বেসরকারি রেললাইন রাষ্ট্রীয়করণ করা হয়।
এখান থেকে আমাদের আবার গৌরীপুর যেতে হবে। গৌরীপুর বলতে গেলে ময়মনসিংহের শেষ সীমানায়। আরোও অনেকদূর যেতে হবে।
ময়মনসিংহ থেকে গৌরীপুর যাবার ট্রেনও আছে। আমরা যখন ময়মনসিংহ স্টেশনে এসে পৌঁছেছি, তখন বাজে বেলা দুইটা। টিকিট কাউন্টার খুঁজে নিয়ে কাউন্টারের কাছেই দেয়ালে টাঙানো চার্টে দেখলাম, এখান থেকে গৌরীপুরের দূরত্ব ৩২ কিলোমিটার। আমাদের ভাগ্যটা ভালোই বলতে হবে কারণ, গৌরীপুর যাওয়ার ট্রেনটি প্লাটফর্মেই দাঁড়িয়ে আছে। আড়াইটায় ছাড়বে। টিকিটের দাম শুনে শিহানের চক্ষু ছানাবড়া। মাত্র ১২ টাকা। তবে টিকিটের গায়ে লেখা ১১ টাকা। আমরা সানন্দেই ১২ টাকা দিয়ে টিকিট কিনে মোটামুটি ফাঁকা দেখে একটা বগিতে উঠে বসলাম।
ইতস্তত ওয়াগন। সোর্স: লেখিকা

ঠিক আড়াইটায় ট্রেন ছেড়ে দিলো। এটাতে তেমন ভিড় নেই। বসার জন্য খালি সিট আছে। তবে আমরা সবাই এক জায়গায় সিট পেলাম না। তাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসলাম। আমার পাশে একজন মাঝবয়সী মহিলা বসেছিল। তাকে বাদাম সাধলাম, নিলেন না। তবে আলাপ জমতে দেরি হলো না। কথায় কথায় জানতে চাইলেন, আমরা কে কার কী হই, কোত্থেকে এসেছি, কোথায় যাচ্ছি ইত্যাদি ইত্যাদি। গৌরীপুর জমিদার বাড়ি দেখতে যাচ্ছি শুনে বললেন, এখন তো আর জমিদার বাড়ির কিছুই অবশিষ্ট নেই। উনাদের ছোটবেলায় জমিদারদের ফাঁসিকাষ্ঠ, নির্যাতনশালাসহ আরোও কত কিছু ছিল!
নির্যাতনশালার নাম শুনেই আমি নড়েচড়ে বসলাম। এই ব্যাপারে জিজ্ঞেস করাতেই বললো, জমিদারদের কেউ অসম্মান করলেই শাস্তি দেওয়া হতো। এই অসম্মান মানে হলো- বাড়ির সামনে দিয়ে প্রজাগণ জুতা পায়ে দিয়ে হেঁটে যাওয়া, ছাতা মাথায় হেঁটে যাওয়া। একটা বিশেষ আসন ছিল রাজার জন্য, যেখানে বসে তিনি প্রজাদের উপর আরোপিত শাস্তি আয়েশ করে দেখতে পেতেন। এখন আর ওসবের কিছুই অবশিষ্ট নেই।
গল্পগুজব করে সময় কেটে যাচ্ছিল। আমার বাদাম খাওয়া শেষ। খাওয়ার সময় বাদামের খোসা সব একটা ঠোঙায় জমিয়ে রেখেছিলাম। খাওয়া শেষে ঠোঙা হ্যান্ড ব্যাগে রেখে দিলাম এই ভেবে যে, ডাস্টবিন পেলে ফেলে দেব। আমার পাশের মহিলাটি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে সেদিকে। তারপর বলেই ফেললো, ‘এখানে ফালায় দাও। ছোকলা মোকলা ব্যাগে পুরছো কেনো?’ আমি হেসে বললাম, ‘যেখানে সেখানে ময়লা ফেলি না আমি। ডাস্টবিনে ফেলব।’
উনি পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য দেখতে পেয়েছেন, এমন ভাব করলেন। আমি আর বসলাম না। ঘেমে নেয়ে গিয়েছি। উঠে দরজার কাছে এসে দাঁড়ালাম। দরজা দিয়ে হু হু করে বাতাস আসছে।
গৌরীপুর। সোর্স: Flickr

কিছুক্ষণ পর ট্রেন এসে শম্ভুগঞ্জ স্টেশনে দাঁড়ালো। এই স্টেশনে এসে ট্রেন যে দাঁড়িয়েছে, আর নড়ার নাম নেই। ক্রসিংয়ের কবলে পড়েছি। প্রায় আধাঘণ্টা লাগবে এখান থেকে রওনা করতে। সড়কপথে জ্যাম থাকে আর রেলপথে থাকে ক্রসিং।
শিহান আর রনি ভাই নেমে গেছে স্টেশনে। ঘোরাফেরা করছে। ওখানে একটা মাজার আছে, ওটা দেখে এসে জানালা দিয়ে বললো, দেখতে যাব কিনা। আমি মাথা নেড়ে বললাম, ‘মাজার দেখে কি হবে!’ ও আবার কোথায় যেন চলে গেল।
ওদিকে শিহানের পাশে যে দুজন ভদ্রলোক বসে ছিল, তাদের সাথে তুমুল গল্প জুড়ে দিয়েছে কেয়া। আমিও ওদের সাথে যোগ দিলাম। এদের মধ্যে একজন মাঝবয়সী, একজন প্রায়-বৃদ্ধ। তাঁদের সাথে গল্প করতে করতে আমাদের কেনা অড়বড়ই সাধলাম। আগ্রহ নিয়েই খেলেন ওঁরা। গল্পে গল্পে এই দুজনের কাছ থেকেও জানা হলো অনেক কিছু। আমাদের গন্তব্য, অভিপ্রায় সম্পর্কে জানতে পেরে নিজ থেকেই দুজন জানালেন, কী করতে হবে।
গৌরীপুরের পরিচিতিনামা। সোর্স: India Rail Info

স্টেশন থেকে অটোয় করেই গৌরীপুর জমিদার বাড়ি যেতে পারব। আবার অটোতেই রামগোপালপুর জমিদার বাড়ি যাওয়া যাবে। ভাড়া নেবে ১০-১৫ টাকা করে। স্টেশনেই খাবার জন্য মোটামুটি মানের হোটেল পাবো। এরচেয়ে ভালো মানের হোটেল আশেপাশে পাওয়া যাবে না। সেই সাথে এও জানালেন, গৌরীপুরে লটকন খুবই সস্তা। ৩০-৪০ টাকা কেজি। আমি থ হয়ে গেলাম। বলে কী! এই সেদিনও লটকন কিনেছি ১০০ টাকা করে। ঠিক করলাম, লটকন পেলে কিনে ফেলব। অপর পাশ ক্রসিংয়ের ট্রেনটি চলে এসেছে শম্ভুগঞ্জ স্টেশনে। আমাদের ট্রেন চলতে শুরু করেছে।
কী যেন মনে আসি আসি করেও আসছে না। তার পর হুট করে মনে পড়লো, হুমায়ূন আহমেদের একটা উপন্যাস আছে গৌরীপুর জংশন নামে। এই উপন্যাসের একটা লাইন এরকম যে, ‘ওভারব্রিজের উপর থেকে অনেক দূরে চলে যাওয়া রেললাইন চোখে পড়ে। মন আপন থেকে উদাস হয়।’
স্যার সত্যিই আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছেন। রেললাইনের ওভার ব্রিজ থেকে দূরে চলে যাওয়া লাইন দেখতে সত্যিই খুব দারুণ লাগে। স্টেশনে নেমে চারপাশটা দেখলাম ঘুরে ঘুরে। দেখে মনটাই খারাপ হয়ে গেল। এত খারাপ অবস্থা স্টেশনটার!
গৌরীপুর জংশন। সোর্স: PlacesMap.net

পনেরোটার মতো মালগাড়ির পুরানো ওয়াগন বিভিন্ন জায়গায় পড়ে আছে। এইসব ওয়াগনে নাকি সংসার ধর্ম চলে। একেকটা ওয়াগন একেকটা বাড়ি। গৌরীপুর জংশন একটি প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী স্টেশন। সারাদেশের সাথে গৌরীপুর তথা বৃহত্তর ময়মনসিংহ, ঢাকা, সিলেট, চট্রগ্রাম, সুনামগঞ্জসহ বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের যোগাযোগের ক্ষেত্রে এই স্টেশনটির গুরুত্ব অপরিসীম। ট্রেনের টিকেট বিক্রি ও মালামাল বুকিংয়ের মাধ্যমে এ স্টেশনে প্রতিবছর সরকারের আয় হচ্ছে প্রায় দেড় কোটি টাকা।
কিন্তু দুঃখের বিষয়, পার্শ্ববর্তী অন্যান্য রেল স্টেশনগুলোর আধুনিকায়ন করা হলেও অজ্ঞাত কারণে গৌরীপুর স্টেশনটিতে কোনো উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। গৌরীপুর স্টেশন মাস্টার অফিস সূত্রে জানা গেছে, এ স্টেশন দিয়ে ঢাকা, চট্রগ্রাম, ভৈরব, জারিয়া ও মোহনগঞ্জ রেলপথে প্রতিদিন মোট ২৮টি আপ ও ডাউন ট্রেন চলাচল করে। তার মধ্যে তিনটি আন্তঃনগর এক্সপ্রেস, দু’টি মেইল, দু’টি কমিউটার ও ২১টি লোকাল ট্রেন রয়েছে। প্রতিদিন প্রায় এক হাজার ট্রেন যাত্রী এ স্টেশনের মাধ্যমে বিভিন্ন গন্তব্যে চলাচল করে থাকে। ট্রেনের টিকিট বিক্রি ও বিভিন্ন মালামাল বুকিং করে সরকারের প্রতি মাসে আয় হয় ১৫ থেকে ২০ লক্ষ টাকা।
নোংরা রেলস্টেশন। সোর্স: লেখিকা

প্ল্যাটফরম ও রেললাইনের অবস্থা বেহাল। স্টেশনটিতে পর্যাপ্ত যাত্রী ছাউনি, বিশ্রামাগার, টয়লেট ও নিরাপত্তার অভাবে প্রতিদিন শত শত ট্রেনযাত্রী মারাত্মক ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। স্টেশনে যেসব টয়লেট ও বিশ্রামাগার রয়েছে তা ব্যবহারের অনুপোযোগী। ফলে যাত্রীরা যত্রতত্র মলমূত্র ত্যাগ করে স্টেশনের পরিবেশ নষ্ট করছেন। সুইপার ও ঝাড়ুদার না থাকায় স্টেশনে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ জমে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। পর্যাপ্ত যাত্রী ছাউনি না থাকায় বর্ষাকালে যাত্রীদের বৃষ্টির পানিতে ভিজে ট্রেনে উঠতে হয়।
জরাজীর্ণ ভবনে চলছে স্টেশনে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কার্যক্রম। জনবল সঙ্কটে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক রাখতে রেলের স্টাফদের হিমশিম খেতে হয়। এ ছাড়া রেলের স্টাফ কোয়ার্টারগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন হিসেবে অনেক আগেই পরিত্যক্ত ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। তবুও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এসব কোয়ার্টারে বসবাস করছেন রেলের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
ভাবছি, এখনকার এই গৌরীপুর জংশন দেখলে হুমায়ূন স্যারের মনের অবস্থা কী হতো!
তথ্যসূত্র :
http://m.dailynayadiganta.com/detail/news/253731

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শান্ত, শীতল মেজাজের গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের মোহমায়া রূপ ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য

নজরুলের চুরুলিয়া: প্রিয় যাই যাই বলো না