একদিনে সীতাকুণ্ডের সুপ্তধারা, সহস্রধারা ও বাঁশবাড়িয়া বীচ ভ্রমণের ইতিবৃত্ত

প্রতিটা ট্যুর শেষে যখন অভিজ্ঞতার ঝুলি নিয়ে লিখতে বসি, অভ্র কীবোর্ডের অক্ষরগুলো তখন বেইমানী শুরু করে। মনে হয় ঠিকঠাক কিছুই বর্ণনা করতে পারছি না। যাই হোক, তাও শুরু করি।

যারা নিরাপদে ট্রেকিং করতে চান এবং অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমী, তাদের জন্য একেবারে আদর্শ জায়গাটির নাম সীতাকুণ্ড। কিছুদিন আগেই এক দিনের সীতাকুণ্ড ট্যুর শেষ করে এলাম। আপনাদের সুবিধার্থে একদম হুবহু ট্যুরের খুঁটিনাটি তুলে ধরার চেষ্টা করব।

ঢাকা-সীতাকুণ্ড:

ঢাকা থেকে রাতের বাসে রওনা দিলে খুব ভোরে আপনাকে সীতাকুণ্ড নামিয়ে দেবে। চেষ্টা করবেন ১২টা বা তার পরে বাসে উঠতে, যাতে আলো ফোঁটার আগেই সীতাকুণ্ড পৌঁছে না যান। ঢাকা থেকে সীতাকুণ্ড ভাড়া ৪৮০ টাকা। সুপারভাইজারকে বলে রাখবেন যেন সীতাকুণ্ডের ইকো পার্কের সামনে নামিয়ে দেয়।

অথবা চট্টগ্রাম মেইল ট্রেনে করে সীতাকুণ্ড স্টেশনে নেমে যেতে পারেন। ভাড়া ১১০ টাকা। তবে এটি লোকাল ট্রেন হওয়ায় বিরক্ত বোধ করতে পারেন। ইকো পার্কের গেটে নেমে হালকা নাস্তা খেয়ে, কিছু শুকনো খাবার কিনে প্রস্তুতি নিন জীবনের অবিস্মরণীয় একটি অভিজ্ঞতার জন্য।

সুপ্তধারার চোখ জুড়ানো দৃশ্য; Source: নাজমুল হাসান

সুপ্তধারা:

ইকো পার্কের গেট থেকে সিএনজি নিয়ে পার্কের মেইন গেটে চলে যান, ভাড়া জন প্রতি ১০ টাকা। সেখানে ইকো পার্কের টিকেট কাটতে হবে। টিকেট ২০ টাকা প্রতিজন। মেইন গেটে সিএনজি পাওয়া যায়, সাধারণত সহস্রধারা পর্যন্ত ৩০০ টাকা ভাড়া।

তবে ভালো হয় যাওয়ার সময় সিএনজি না নিয়ে হেঁটে রওনা দিন। তবে হাঁটা একটু কষ্টদায়ক, যেহেতু পাহাড়ের রাস্তা ধরে উপরে উঠতে হবে। তবে কষ্ট ছাড়া অ্যাডভেঞ্চারের ফিল নেয়া অপরাধের পর্যায়ে পড়ে।

সুপ্তধারায় যাওয়ার সিঁড়িপথ; Source: লেখক

সুপ্তাধারায় যাওয়ার পথে ইকো পার্কের এই রাস্তাটায় কিছুক্ষণ পর পর পাবেন ফুলের বাগান। যদিও বাগানগুলো ফুলবিহীন। কেন জায়গাটি ফুলশূন্য, সেটা না হয় কর্তৃপক্ষের জন্য প্রশ্ন রইলো। ইকো পার্কের এই রাস্তাটির বিশেষত্ব হলো, কিছুক্ষণ বাদে বাদে বিশাল সাইনবোর্ডে লেখা ছোট কবিতা বা কিছু অর্থবহ বিশেষ লাইন অথবা সতর্কবাণী। যেটা একদম আলাদা অন্যান্য পার্ক থেকে।

যাই হোক, ২৫-৩০ মিনিট হেঁটে পৌঁছে যাবেন সুপ্তধারা ঝর্ণার প্রবেশপথে। প্রায় ৪২৪টি সিঁড়ি নিচে নেমে যেতে হবে মূল সুপ্তধারা থেকে প্রবাহিত পাহাড়ি ঝিরিপথের মুখে। ধীরে ধীরে সাবধানে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামুন। মাঝে বেশ কয়েকবার বিশ্রাম নিয়ে নিন।

তাড়াহুড়ো করবেন না একদম, বৃষ্টির দিনে কিছুটা পিচ্ছিল থাকতে পারে। তাই ট্রেকিং জুতো বা ফ্রিকশন ভালো এরকম জুতো পরলে ভালো হয়। সিঁড়ি থেকে নেমে বামপাশের ঝিরিপথ ধরে এগোতে শুরু করুন।

সুপ্তধারা থেকে প্রবাহিত পাহাড়ি ঝিরিপথ; Source: লেখক

সুপ্তধারা নামকরণের পেছনে কারণ হলো, এই ঝর্ণা বর্ষাকাল ছাড়া সুপ্ত অবস্থায় থাকে। ঝিরিপথে কিছু জায়গায় কোমর সমান পানি, তাছাড়া বেশিরভাগটায় হাঁটু সমান পানি। লাঠি সাথে রাখবেন অবশ্যই। সাবধানে ধীরেসুস্থে এগুবেন। নীচে পিচ্ছিল পাথর, তাই এংলেট পায়ে দিয়ে হাঁটা ভালো। মাঝে কিছু জায়গায় ছবি তোলার জন্য বিরতি নিতে পারেন। 

এক থেকে দেড় ঘণ্টা কষ্ট করে হেঁটে অনেকটা দূর থেকে যখন সুপ্তধারার পানি পতনের শব্দ কানে বাজবে, তখনি জোরে নিঃশ্বাস নিন, হৃদয়কে শান্ত করুন, কারণ একটু পরের সেই অতিপ্রাকৃত দৃশ্যটা দেখার জন্য হৃৎপিণ্ডটা মোটেই প্রস্তুত থাকবে না। ঝর্ণা টর্ণা কিচ্ছু নেই, সব বানানো গল্প, মন যখন এরকম আভাস দিচ্ছে, ঠিক তখনি সুপ্তাধারার দেখা পাই আমরা, সবাই একসাথে সজোরে আকাশ বাতাস কাঁপানো চিৎকার দিয়ে বলে উঠেছিলাম “পেয়েছি, একে পেয়েছি”। এক কথায় অবিশ্বাস্য সেই দৃশ্য।

সুপ্তধারা ঝর্ণা; Source: লেখক

ছবি এবং স্মৃতি সংরক্ষনের কাজ শেষ করে আমার অনুরোধ থাকবে, ঝর্ণাটার ঠিক নিচে গিয়ে কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকুন, অনুভব করার চেষ্টা করুন প্রকৃতির অপরূপ হিংস্রতাকে। শ্রদ্ধা করুন প্রকৃতির নিষ্ঠুরতাকে।

ঝিরিপথ দিয়ে ঠিক যেই পথে এসেছেন, ঠিক সেই পথ দিয়ে চলে আসুন। সিঁড়িপথ দিয়ে উঠতে বেশ কষ্ট হবে। মাঝে বিশ্রাম নিয়ে নিয়ে উপরে উঠুন। উঠে বেঞ্চে বসে শুকনো খাবারগুলো খেতে পারেন, অবশ্যই প্রচুর পানি নিয়ে নেবেন সাথে।

সহস্রধারা ঝর্ণা; Souce: লেখক

সুপ্তধারা-সহস্রধারা:

সুপ্তধারা থেকে আরও ২৫-৩০ মিনিট হাঁটলে সহস্রধারার সিঁড়িপথ। সেখানে সিঁড়ি প্রায় ৪৮৭টি হলেও সুপ্তধারারর সিঁড়ির মতো এবড়োথেবড়ো নয়। আর কোনো ঝিরিপথ পাড়ি দিতে হবে না। সিঁড়ি থেকে নেমেই দেখতে পাবেন অনেক উঁচু থেকে পতিত হওয়া অবিরাম সহস্রধারা।

তুলনামূলকভাবে সুপ্তধারা থেকে অনেক সহজগম্য বিধায় এখানে অনেকেরই দেখা পাবেন। সহস্রধারার মূল আকর্ষণটা হলো এখানে আপনি মূল ঝর্ণার ঠিক নিচে চলে যেতে পারবেন একদম সহজে।

সহস্রধারায় যাবার সিঁড়িপথ; Source: লেখক

ফেরার সময় ঝর্ণাটার সামনের পাথরটায় একা কিংবা প্রিয়জনকে সাথে নিয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকুন, চোখ রাখবেন ঠিক সহস্রধারার চূড়ার দিকে। কথা দিলাম, সময়টা সেখানে থেমে যাবে আপনার।

উঠতে ইচ্ছে না করলেও এবার উঠতেই হবে, কারণ আবার ৪৮৭ সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে হবে। এই ট্যুরের সবচেয়ে কষ্টদায়ক মুহূর্ত মনে হয় এটাই। মনে হবে, অনন্তকাল যুগ ধরে সিঁড়ি ভাঙছেন, তাও শেষ হচ্ছে না।

সহস্রধারার অবিরাম ধারা; Source: লেখক

সহস্রধারা-বাঁশবাড়িয়া বীচ:

সহস্রধারা থেকে বেরোতে বেরোতে তখন দুপুর গড়িয়ে বিকাল। সিএনজি নিয়ে সোজা চলে আসুন ইকো পার্কের গেটে। ভাড়া ২৫০-৩০০ টাকা। সেখান থেকে বাসে বা টেম্পুতে করে বাঁশবাড়িয়া যাবেন। ভাড়া জনপ্রতি ১০ টাকা। হেল্পারকে বললেই নামিয়ে দিবে। বাঁশবাড়িয়া নেমে সাধারণ মানের কোনো হোটেলে ভাত খেয়ে নিন। সেখান থেকে সিএনজি নিয়ে চলে যাবেন বাঁশবাড়িয়া বীচে। ভাড়া জন প্রতি ২০ টাকা।

বাঁশবাড়িয়া বীচে পানির উপর বানানো ব্রীজ; Source: adarbepari.com

বাঁশবাড়িয়া বীচের সম্পর্কে বলতে গেলে যে শব্দগুলো মাথায় আসে, তা হলো “স্নিগ্ধতা”, “প্রশান্তি”। বীচটি ফুটবল খেলার জন্য আদর্শ। তবে আমার পরামর্শ হলো, সবুজ ঘাসের গালিচায় বসে বিকালটা স্নিগ্ধতায় কাটিয়ে দিন। সারাদিনের ক্লান্তি কাটানোর এরচেয়ে ভালো উপায় আর হতে পারে না।

বাঁশবাড়িয়া বীচে সূর্যাস্ত; Source: লেখক

কিছুদিন আগেই এখানে বীচ ঘেঁষে পানির উপর বানানো হয়েছে ব্রীজ। ভাটার সময় ব্রীজটি পানির উপরে থাকলে জোয়ারের সময় তা পানির নিচে চলে যায়। সূর্যাস্তটা দেখেই রওনা দিন। সন্ধ্যার বাসে করে ঢাকা ব্যাক করুন।

বিঃদ্রঃ যথাসম্ভব কম জামাকাপড় নিন এবং সম্ভব হলে ওয়াটারপ্রুফ ব্যাগ ব্যবহার করুন। ঝিরিপথে হাঁটার জন্য থ্রি কোয়াটার বা হাফপ্যান্ট ব্যবহার করুন। এবং সর্বোপরি খেয়াল রাখবেন, আপনার দ্বারা প্রকৃতির যেন কোনো ক্ষতি না হয়। বোতল, চিপ্সের প্যাকেট বা প্লাস্টিক জাতীয় পদার্থ ইত্যাদি ব্যাগে রাখুন, পরে ডাস্টবিন দেখে ফেলে দেবেন।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

মিনি সুইজারল্যান্ডের সবুজ কার্পেটে!

গ্রীষ্মের দিনে শান্তির সন্ধানে: ভারতের ৭টি হিল স্টেশনে ট্রেন ভ্রমণ