ঘুরে আসুন তিন রাত চার দিনে ঢাকা-কাপ্তাই-সাজেক

কর্ণফুলী নদী; Source: লেখক

বদ্ধ ঢাকার সীসাযুক্ত বাতাসে দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল কদিন ধরেই। তাই হুট করেই বন্ধুদের সাথে ব্যাকপ্যাক নিয়ে বেড়িয়ে পরলাম দেশের দক্ষিণাঞ্চলে। তিন রাত চার দিনের বিশাল ট্যুর শেষ করে এখন নিজের ঘরে বসে আছি আর ভাবছি ‘জীবনে এই চারটা দিন কি আবার আসবে!!?!’ যাইহোক সেই অভিজ্ঞতার আলোকেই লিখব আজ।

দিন নং-১ঃ ঢাকা-কাপ্তাই-রাঙামাটি

ঢাকা থেকে ১১টার বাসে কাপ্তাই এর উদ্দেশ্যে রওনা দিবেন। ভাড়া ৫৫০ টাকা (ননএসি)। পরদিন সকাল ৭ টায় “জুম রেস্তোরাঁ” নামক পিকনিক স্পটে নামবেন (হেল্পারকে বললেই নামায়ি দিবে)। জুম রেস্তোরাঁ ঘুরে দেখতে পারেন। ১০ টাকা করে টিকেট প্রতিজন। তবে আমাদের উদ্দেশ্য ছিল “কায়াকিং”। জুম রেস্তোরাঁ থেকে এক মিনিট হাঁটলেই “কায়াকিং ক্লাব” নামক সাইনবোর্ড দেখতে পাবেন। সেখানে নেমে বোট ভাড়া করবেন। একটি বোট এক ঘন্টার জন্য ৩০০ টাকা। তবে চুয়েট এবং সুইডিস পলিটেকনিকের জন্য ২০০ টাকা। চাইলে আধা ঘন্টা করেও নিতে পারেন। এক বোটে দুইজন উঠা যাবে সর্বোচ্চ। 

কর্ণফুলীর বুকে কায়াকিং; Source: লেখক

কর্ণফুলীর বুকে কায়াকিং করে আপনার মন প্রাণ জুড়ে যাবে নিমিষেই। নির্মল বাতাস আর নদীর সৌন্দর্য অবলোকন করবেন সম্মুখে। সবাইকে লাইফ জ্যাকেট দেয়া হয়। আর নদীর পানি স্থির থাকায় নিরাপদ ভাবেই কায়াকিং করতে পারবেন।

কায়াকিং ক্লাবের ঠিক পাশেই “ফ্লোটিং প্যারাডাইস” নামক রেস্টুরেন্টে দুপুরের খাবার খেতে পারেন। পর্যটন এরিয়া হিসেবে বেশ কম দাম এবং মজাদার। এখানে বলে রাখি ফ্লোটিং প্যারাডাইসে খাওয়ার সময় কর্ণফুলী নদীর যে ভিউ আপনি দেখতে পাবেন তা জীবনে ভুলতে পারবেন না। আমি বাজী রাখতে পারি।

ফ্লোটিং প্যারাডাইস থেকে কর্ণফুলীনদী; Source: লেখক

কায়াকিং করে দুপুরের খাবার খেয়ে জুম রেস্তোরার সামনে থেকে সিএনজি ভাড়া করবেন। নেভি ক্যাম্প, আর্মি ক্যাম্প ঘুরিয়ে সিএনজি নিয়ে চলে যাবেন বড়দাম নামক জায়গায়। সিএনজি ভাড়া নিবে ৫০০-৬০০। প্রায় ২৫ কিলোমিটারের পাহাড়ি পথ। সেখানে “Berannye Lake Shore Cafe” তে গিয়ে অবশ্যই এক কাপ কফি খাবেন। রেস্টুরেন্টটার বিশেষত্ব হলো অনেক গুলো ছোট ছোট কাঠের তৈরি বৈঠক খানার মত বানিয়ে রাখা হয়েছে কাপ্তাই লেকের ঠিক উপরে। সেখানে বসে কফি খেতে খেতে মুগ্ধ চোখে কাপ্তাই লেক দেখতে পাবেন। কি সুন্দর-ই না আমাদের দেশটা!! কত কিছুই না দেখা বাকি এখনো!!

কফি ছাড়াও বিভিন্ন আদবাসীদের খাবার পাবেন রেস্টুরেন্টিতে। কাপ্তাই থেকে যাওয়ার রাস্তাটা রীতিমত আপনার বুক কাপিয়ে দিবে। উঁচুনিচু পাহাড়ি রাস্তা, মাঝে হঠাৎ এসে পরা ভয়ানক বাঁক। একপাশে বিশাল কাপ্তাই লেক। লেকের মাঝে মাঝে দ্বীপের মত ছোট ছোট টিলা। এক কথায় অসাধারণ সেই অভিজ্ঞতা।

Berannye Lake Shore Cafe; Source: www.foodyas.com

সেখান থেকে সিএনজি নিয়ে চলে যাবেন আসামবস্তি বীজে। ভাড়া নিবে ১৫০-১৮০। যাওয়ার পথে শ্রদ্ধেয় বনভান্তের জন্মস্থান এবং মন্দির দেখতে পাবেন। ব্রীজে কিছুক্ষণ আড্ডা দিতে পারেন। ব্রীজ থেকে কিছুক্ষণ হাঁটলেই একটি হোটেল চোখে পরবে যেখানে মাছ ভাজা দেখতে পাবেন। সেটা অবশ্যই মিস করবেন না। কাপ্তাই লেকের টাটকা মাছ ভাজা যে এত সুস্বাদু হতে পারে জানা ছিল না। ফলি মাছ ভাজা প্রতি পিস ১৫ টাকা। চিংড়ী (মাঝারি সাইজ) ৩৫ টাকা পিস। তাছাড়া এখানে নুডুলস, চিকেন বড়া, চটপটিও পাওয়া যায়। দোকানের চেহারা অনুযায়ী খাবারের মান বেশ ভালো।

ততক্ষণে বিকেল হয়ে যাবে। চাইলে সেখান থেকে সিএনজি নিয়ে ঝুলন্ত ব্রীজ এবং রাজবন বিহার ঘুরে আসতে পারেন। বিহারে রাখা রয়েছে শ্রদ্ধেয় বনভান্তের মৃত দেহের মমি। সেখান থেকে সিএনজি নিয়ে চলে যাবেন সোজা রাঙামাটি বাসস্ট্যান্ড। সেখানে হোটেল নিয়ে বিশ্রাম নিন। মাঝারি মানের হোটেলের ভাড়া ৫০০-১০০০। একরুমে ৪ জন থাকা যাবে।
রাতে বাসস্ট্যান্ডের পাশেই হোটেল থেকে ভাত অথবা রুটি সবজি খেতে পারেন।

কাপ্তাই কায়াক ক্লাব; Source: লেখক

দিন নং-২ঃ রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি

ভোরে উঠে ফ্রেশ হয়ে বাসস্ট্যান্ড থেকে ৭ টার বাসে করে খাগড়াছড়ি রওনা দিবেন। বাস ভাড়া ১৬০ টাকা। বাসে উঠার আগে নাস্তা খেয়ে নিবেন বাসস্ট্যান্ডের কোন হোটেল থেকে। ৩ থেকে সাড়ে ৩ ঘন্টা লাগবে। রাস্তাটা পাহাড়ি, এবং বেশ সুন্দর ও গোছানো। তবে লোকাল বাস ছাড়া আর বাস নেই। তাই একটু বিরক্ত বোধ করতে পারেন।

খাগড়াছড়ি সদরে নেমে অটো নিয়ে চলে যাবেন শাপলাচত্বরে। সেখানে গিয়ে হোটেল নিবেন। আমরা ৮০০ টাকা দিয়ে বেশ ভালো হোটেলে ছিলাম। ‘হোটেল নিলয়’, শাপলাচত্বরের পাশেই। আরেকটু ভালো হোটেলও নিতে পারেন। হাজার টাকার মধ্যে। প্রতি রুমে চার জন থাকা যাবে।

হোটেলে উঠে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফ্রেশ হয়ে “মনটানা” হোটেলে দুপুরের খাবার খেয়ে সিএনজি বা অটো নিয়ে চলে যাবেন “পেড়াছড়া” বাজারে। ১০০ টাকা ভাড়া নিবে। সেখান থেকে দুইঘন্টার ট্রেকিং পথ। প্রায় ৬০০ সিঁড়ি পার হয়ে যেতে হবে “হাতির মাথা” নামক স্থানে। যারা ট্রেকিং করতে চান তাদের জন্য আদর্শ। বর্তামানে এটিকে “হাতিমমূড়া” নামে অনেকে চেনে। এটি একটি স্থানীয় ভাষা যার অর্থ হাতিরমাথা।

হাতির মাথা; Source: Farid Sohail

খাগড়াছড়ি শহরের অদ্ভুত সুন্দর একটা ভিউ পাবেন আপনি। নিমিষেই দুই ঘন্টা ট্রেকিং এর কষ্ট ভুলে যাবেন।
(এখানে বলে রাখি, আদিবাসীদের পাড়া দিয়ে হাতির মাথা যেতে হয়। তাদের বিরক্ত করবেন না, অযথা উচ্চ স্বরে কথা বলবেন না)

হাতির মাথা থেকে ফিরে এসে সন্ধ্যায় শহর ঘুরে দেখতে পারেন। শাপলাচত্বরের ঠিক পাশেই “বরিশালের হালিম ও চটপটি” দোকানের হালিম খেতে পারেন। ৪০ টাকা এক বাটি। খুব ভালো খেতে। 
পাশেই বিখ্যাত চায়ের দোকান। সেখানে গরুর দুধের চা খাবেন অবশ্যই। এই চায়ের দোকানের বিশেষত্ব হলো, এই দোকানে সিগারেট পাওয়া যায় না এবং ধুমপান সম্পূর্ণ নিষেধ।

রাতে হাল্কা পাতলা খেয়ে হোটেলে রেস্ট নিন। রাতেই শাপলাচত্বর থেকে চাঁদের গাড়ি ঠিক করে রাখবেন। ভালো করে কথা বলে নিবেন। সাজেক গিয়ে এক রাত থাকবে, পরের দিন খাগড়াছড়ি এসে আলুটিলা গুহা, রিসাং ঝর্ণা, ঝুলন্ত ব্রীজ ঘুরাবে। ৭০০০-৮০০০ ভাড়া নিবে। ড্রাইভার এবং হেল্পারের খাওয়া দাওয়ার ব্যাপার ক্লিয়ার করে নিবেন। দুই ধরনের গাড়ি পাওয়া যায়। একটা সবুজ রঙের (এটাই আসল চাঁদের গাড়ি বলা যায়) আরেকটা সাদা রঙের পিকাপ। সাদা রঙের পিকাপে যাওয়া আরামদায়ক। ভাড়া ৫০০-১০০০ বেশি নিবে।

দিন নং-৩ঃ খাগড়াছড়ি-সাজেক

যদিও সাজেক রাঙামাটি জেলার অন্তর্ভুক্ত, তবে খাগড়াছড়ি দিয়েই যাওয়াই সহজতর। সকালে উঠে নাস্তা করে ৮ টার মধ্যে চাঁদের গাড়ি দিয়ে রওনা দিবেন সাজেক। 
দিঘিনালা হয়ে বাঘাইছড়া বাজারে গিয়ে আর্মি ক্যাম্পের চেক পোস্টে অপেক্ষা করতে হবে। সাড়ে ১০ টার দিকে সব চাঁদের গাড়ি একবারে রওনা দিবে সাজেকে উদ্দেশ্যে।

বলে রাখা ভালো খাগড়াছড়ি থেকে সাজেক যাওয়ার পুরো রাস্তাটা আপনার বুকে কাঁপুনি সৃষ্টি করবে। আঁকাবাঁকা, উঁচুনিচু পাহাড়ি রাস্তা। পাশেই বিশাল খাদ। হঠাৎ হঠাৎ এতটাই খাড়া রাস্তা যে মনে হবে উপরে যাওয়া আর সম্ভব না। তবে চাঁদের গাড়ির শক্তিশালী ইঞ্জিনে সব বাধাই পেড়িয়ে যাবেন নিমিষেই। ছাদে উঠা থেকে বিরত থাকুন।

ভয়কে জয় করে ফেলার পর বেশ মনোরম দৃশ্য উপভোগ করতে পারবেন। ১২টার মধ্যে সাজেক চলে যাবেন। সেখানে আদিবাসীদের কটেজ ভাড়া করতে পারেন। কটেজগুলোর বিশেষত্ব হলো কটেজের বারান্দায় বসে আপনি ঘন্টার পর ঘন্টা পাড় করে দিতে পারবে  নিমিষেই। এতটাই সুন্দর চারদিকের দৃশ্য।

রুইলুই পাড়া; Source: লেখক

কটেজে উঠেই দুপুরের খাবারের অর্ডার দিয়ে দিবেন। নইলে খাবার পাবেন না। খাবারের দাম একটু বেশি। “হালাল রেস্টুরেন্ট” নামে সাজেক রিসোর্টের সামনের হোটেলটায় দাম কিছুটা কম এবং মজাদার। ভাত, মুরগী, ডিম, সবজি, আলু ভর্তা/শুটকি ভর্তা ১৭০ টাকা, প্রতিপ্লেট। (দামাদামি করে নিবেন)
বিকেলে হ্যালিপ্যাড ১,২ এলাকা এবং রুইলুই পাড়া ঘুরে দেখবেন। হ্যালিপ্যাডে উঠে নিজেকে এক মুহূর্ত আকাশের রাজা বলে মনে হবে। নিমিষেই জীবনের জটিলতাগুলো হারিয়ে যাবে আপনার মস্তিষ্ক থেকে। দুপুরে খাবার পর রাতের খাবারের অর্ডার দিয়ে যাবেন। তারা রেডি করে রাখবে। রাতে কটেজে বসে আড্ডা দিতে পারেন, কিংবা রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করে সময় পার করতে পারেন।

খুব ভোরে উঠে কংলাক পাড়ায় যাবেন। ড্রাইভারকে বললেই নিয়ে যাবে। সেখান থেকে ৩০ মিনিট পাহাড়ে ট্রেকিং করে পৌঁছে যাবেন কংলাক পাড়ায়।
দৃশ্যগুলো এতটাই সুন্দর যে শুধু অবাক হতে থাকবেন। দু হাত মেলে প্রকৃতিটাকে কিছুক্ষণ অনুভব করুন। আমি কথা দিতে পারি, মুক্ত বিহঙ্গের চেয়ে কোন অংশে কম মনে হবে না নিজেকে। কংলাক পাড়া থেকে এসে নাস্তা করে ১০ টার মধ্যে রওনা দিতে হবে। আর্মি চেক পোস্ট থেকে সব গাড়ি একবারে রওনা দিবে।

কংলাক পাড়া; Source: লেখক

১টার মধ্যে খাগড়াছড়ি শহরে চলে আসবেন। এসেই সন্ধ্যার বাসের টিকেট কেটে ফেলুন। শান্তি পরিবহন ভালো এই রুটে। খাগড়াছড়ি থেকে ঢাকার ভাড়া ৫২০ টাকা।
দুপুরের খাবার খেয়ে সরাসরি চলে যাবেন আলুটিলা গুহায়। অদ্ভূত এই গুহাটি বেশ মুগ্ধ করবে আপনাকে। গুহার মেঝে পিচ্ছিল এবং উঁচুনিচু। মশাল নিতে পারেন ছবি তোলার জন্য। তবে ফোনের ফ্ল্যাশ লাইট ব্যবহার করাই ভালো।

আলুটিলা গুহা; Source: লেখক

আলুটিলা থেকে রিসাং ঝর্ণা। ৩০-৪০ মিনিটের ট্রেকিং পথ। বর্ষাকালে ঝর্ণা ভরপুর থাকলেও অন্য ঋতুতে শুকিয়ে যায়। তবে আশ পাশ টা বেশ সুন্দর।
রিসাং থেকে গাড়ি নিয়ে চলে যাবেন হর্টিকালচার পার্কে। সেখানে রয়েছে ঝুলন্ত ব্রীজ।সন্ধ্যার মধ্যে শহরে চলে আসুন। বাসস্ট্যান্ডে অপেক্ষা করুন, আর ভাবতে থাকুন জীবনে আর কি কি দেখা বাকি। দেশটাকে কতটুকু চেনা বাকি।

বিঃদ্রঃ জরুরী ওষুধপত্র, স্যালাইন, ইনো সাথে রাখুন। ব্যাগ নিয়ে ঘুরাঘুরি করতে হবে তাই যত কম সম্ভব জামাকাপড় নিন। ভারী জামাকাপড় পরিহার করে টিশার্ট ও শর্টপ্যান্ট ব্যবহার করুন। আর অবশ্যই যেখানে সেখানে ময়লা আবর্জনা ফেলা থেকে বিরত থাকুন।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

E T B এর ইভেন্ট: বোয়ালিয়া ঝর্ণা ভ্রমণ এবং মহামায়ায় কায়াকিং

হাজারো পদ্মের ভুতিয়ার বিল