দেরাদুনের অনিন্দ্য সুন্দর বন গবেষণা কেন্দ্র

রোদ ঝলমলে, বর্ণিল পথ পেরিয়ে সবুজের মাঝ দিয়ে সামনের দিকে এগোতে লাগলাম, বন গবেষণা কেন্দ্রের আঁকাবাঁকা পিচ ঢালা পথ ধরে মূল ভবনের দিকে। বন গবেষণা কেন্দ্রের অপূর্ব ভবনটি এর আগে কয়েকজন বন্ধুর ঘুরে যাওয়ার পরে দেখেছি। ছবি দেখেই দারুণ ভালো লেগেছিল এর নান্দনিক রূপ আর কারুকাজ দেখে। আসলে ঠিক কারুকাজ নয়, দূর থেকে এই ভবনটি দেখতে এতই সুন্দর যে, সেখানে যে আলাদা কোনো কারুকাজ নেই সেটা বোঝার কোনো উপায়ই নেই।

নির্জন পথ পেরিয়ে ১০ মিনিটের মতো হেঁটে ছোট রাস্তা থেকে মূল পথের মোড়ে এলাম। যেখান থেকে চোখে পড়ছিল হালকা লাল ইটের তরী অপরূপ স্থাপনার ঝলমলে রূপ। পুরো ভবনের চারপাশেই বিস্তীর্ণ সবুজ ঘাসের বিশাল বিশাল মাঠ। মাঠের নানা জায়গায় নানা রকম ছোট বড় গাছ আর বর্ণিল ফুলের আয়োজন যা দেখেই চোখের একটা আলাদা আরাম হয়, মনের মধ্যে একটা সুখ সুখ অনুভূতি হয়, আর অপেক্ষা না করে যত দ্রুত সম্ভব ওই ভবনের বারান্দায় বা সিঁড়িতে ছুটে গিয়ে বসতে মন চায়।

চলার পথে দূর থেকে অপূর্ব বন গবেষণা কেন্দ্র। ছবিঃ লেখক 

আমিও আর দেরি না করে গাছের ছায়া দেখে দেখে রোদ বাঁচিয়ে দ্রুত পায়ে হাঁটা শুরু করলাম। মুল ভবনে ঢোকার কয়েকটা পথ আছে। আসলে কয়েকটা না চারদিকের মাঠের সাথে আছে চারটি বেশ চওড়া পথ আর চাইলে মাঠের মাঝ দিয়ে সবুজ ঘাসে ছোঁয়া মেখেও যাওয়া যাবে মূল ভবনের ছায়াতলে। আমি ভাবলাম না হয় লাগুক একটু রোদ তবুও একদম মূল যে গেট সে গেটের পথে না গিয়ে, দুইপাশে দেবদারু গাছের ছায়া ঘেরা যে পথ সেই পথের দিকে এগিয়ে চললাম। কারণ মূল ফটকের রোদেলা পথে পা বাড়াবো আর দেখবো যখন ফেরার পথ ধরবো তখন।

তাই অডিটোরিয়ামের পাশ ঘেঁষে, দেবদারুর ছায়া দিয়ে ঘিরে রাখা পথে ঢুকে পড়লাম মূল ভবনের বারান্দায় যেতে। অনেকক্ষণ রোদে হেঁটে হেঁটে ক্লান্ত ছিলাম, যে কারণেই দেবদারুর ছায়া পেয়ে একটু বসে নিলাম, পাশের বেদীতে। অপরিচিত একজনকে দিয়ে দুখানা ছবি তুলিয়ে সোজা পথে এগিয়ে গেলাম। এই পথ থেকেই একটা অপূর্ব দৃশ্য দেখা যায়, আর সেটা হলো পথের শেষেই শুরু বন গবেষণা কেন্দ্রের মূল ভবনের বারান্দা আর বারান্দার সাথে একদম সোজা, ভবনের অন্যপাশে যাওয়ার পথ। এপাশ থেকে ওপাশ পুরোটাই দেখা যায়। দূর থেকে মনে হয়, কেউ বোধহয় ওপাশ থেকে কোনো আলোক রেখা ফেলেছে।

করিডোরে দুই প্রান্ত। ছবিঃ লেখক 

একটা অন্য রকম সৌন্দর্য সেটা। আর পরে হেঁটে হেঁটে যখন পুরো ভবনের সবগুলো করিডোর, বাগান, লাইব্রেরী, মিউজিয়াম আর নানা রকম কর্মকাণ্ড দেখছিলাম তখন বেশ ভালোভাবে খেয়াল করলাম এই ভবনের যে করিডোরের দরজাতেই দাঁড়াই না কেন একদম সোজা অন্য পাশের দরজার ওপারে চোখ চলে যায়, যাবেই। কারণ একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের করিডোরের মাঝে নেই কোনো বাধা, কোনো দেয়াল বা কোনো ঘর, এমনকি নেই কোনো গাছপালাও।

যেটা একদম আলাদা কোনো সাজ, কোনো কারুকাজ, কোনো গাছ-গাছালি বা কোনো রকম ভিন্ন আয়োজন ছাড়াই দিয়েছে অন্য রকম একটা সাজ, একটা আকর্ষণ আর একদমই ভিন্ন রকম একটা নান্দনিক ব্যাপার। যা ভালো লাগবে, মুগ্ধ করবে আর অভিভূত করবে যে কাউকেই।

এই ভবনের নানা রকম দারুণ অভিজ্ঞতার মধ্যে দুইটা আমার কাছে একদমই অন্য রকম লেগেছে। একটা হলো বাইরে প্রচুর গরম, কিন্তু এই ভবনের ভেতরে ঢোকার পরে আর একটুও গরম লাগে না! প্রথমবার একটু অবাক হয়েছি আর ভুল ভেবেছি যে এটা বোধহয় আমার ভ্রম, কিন্তু না বেশ কয়েকবার পরখ করে দেখেছি এটা একই রকম। দারুণ একটা ব্যাপার। এটাই এই ভবনের বিশেষ কোনো ব্যাপার কিনা জানা হয়নি। তবে বিষয়টা খুব খুব উপভোগ করেছি। আর দ্বিতীয় যেটা সেটা হলো এই ভবনের একদম সোজা করিডোরগুলো। যার এক পাশ থেকে অন্যপাশ একদম দেখা যায়। প্রতিটা অংশেই ঠিকএকই রকম ব্যাপারটা দারুণ লেগেছে।

ভবনের ভিতরের সবুজ গালিচা। ছবিঃ লেখক 

আর প্রতিটা অংশে দারুণ দারুণ সবুজ ছোট মাঠের মাঝে নানা রকম বর্ণিল আয়োজন তো আছেই। ভবনের প্রতিটা অংশেই আছে আলাদা আলাদা কোনো না কোনো মিউজিয়াম। এখানে সেখানে চলছে নানা রকম নাটক বা সিনেমার শুটিং, কোথাও শুটিং চলছে কোনো ডকুমেন্টারির। ঝলমলে সব আয়োজন সবুজ মাঠ আর লাল ভবনের মাঝে। যার তৈরি করেছিল এক অন্য রকম আকর্ষণ আর উপভোগ করার ক্ষণ।

এভাবে এই নান্দনিক ভবনের সবটুকু ধীরে ধীরে হেঁটে হেঁটে দেখে, বসে, বিশ্রাম নিয়ে, ক্যাফেতে খেয়ে কখন যে দুপুর গড়িয়ে গেছে বুঝতেই পারিনি। অথচ ঢুকেছিলাম সেই সকালে। আর শুনেছিলাম এখানে নাকি এক ঘণ্টাই যথেষ্ট ঘুরে দেখার জন্য! কিন্তু কই? আমার তো সারাদিন চলে গেছে, তবুও তো মন ভরলো না, দেখার, বসার, ঝিরঝিরে বাতাসে সবুজ ঘাসে গড়াবার, ইচ্ছামতো হেঁটে হেঁটে স্বাদ মিটিয়ে ছবি তুলবার! অবশেষে দারুণ ক্ষুধা লাগায় আর বাইরে ভীষণ কড়া রোদ থাকার কারণে আর দূরের অরণ্যে ঘুরতে যাওয়ার ইচ্ছা বিসর্জন দিলাম সেদিনের মতো।

মুল ভবন, প্রধান সড়ক থেকে। ছবিঃ লেখক 

ফেরার সময় চোখে পড়লো ভবনের একটা একটা বিভাগের বারান্দায়, এক এক রকম সাজে সাজিয়ে রেখেছে সেইসব বিভাগের কেউ কেউ। পুরনো আর বনেদী লাইব্রেরী, লাইব্রেরীর ভেতরে ব্রিটিশ আমলের নানা রকম আসবাব আর দারুণ একটা প্রাচীন ফ্যান বা পাখা। বৃদ্ধ লাইব্রেরিয়ান আর তার আন্তরিক অভ্যর্থনা পেয়ে সেদিনের মতো শেষ করেছিলাম মুগ্ধতায় মুড়ে থাকা একটি বর্ণীল সকাল, ঝিরঝিরে বাতাসের সাথে সবুজের মাঝে এক অপূর্ব ভবনের অলস দুপুর আর কিছু সুখের স্মৃতি।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

অধরা-অরণ্যের ভালোবাসায় পাসপোর্ট ভিসা

নো ম্যান্স ল্যান্ড স্বপ্নের ভাঙা গড়া