মাওয়া, লোভনীয় ইলিশ ও ইলিশের ডিম ভাজির গল্প

আচ্ছা ইলিশ পছন্দ করেন আপনি? যদি করে থাকেন তবে বলুন তো দেখি, আপনার সামনে একদম তাজা ইলিশের বেশ বড় বড় কয়েক টুকরো ডিম বেশ একটু হলুদ-লবণ আর সামান্য গুড়ো মরিচ ছিটিয়ে গরম তেলে হালকা বাদামী করে ভেজে নামিয়েছে।

জিভে জল আনা ইলিশের ডিম ভাজি! ছবিঃ lh3.googleusercontent.com

তাহলে ঠিক কতক্ষণ আপনি চুপচাপ বসে থাকতে পারবেন? বা জিভে টলমলে জল চলে আসবে কিনা একটু চেখে দেখতে? আরও যদি হয় সাধ আর সাধ্যের মধ্যে, তবে ঠিক কতক্ষণ আপনি এই ভীষণ প্রিয়, আর আজকালকার দিনে প্রায় দুর্লভ খাদ্য না খেয়ে থাকতে পারবেন?
আর যদি চান ইচ্ছে মতো বড় সাইজের কয়েকটা ইলিশ কিনবেন নিজ হাতে, ফিরে পেতে সেই ফেলে আসা পুরনো দিনের মধুময় স্মৃতি, পরিবারের সবার জন্য অন্তত একবেলা প্লেটে তুলে দিতে চান বিশাল সাইজের, মৌ মৌ গন্ধের আর মন পাগল করা ইলিশের ডিম ভাজার অমৃত স্বাদ তবে তো আর কথাই নেই, এই ঢাকার দুর্মূল্যের আর বড় লোকের বাজার আপনার জন্য নয়।
ইলিশের ভাজি। ছবিঃ লেখক

ঠিক এমনি সাধ আর সাধ্য মেলাতে, ইলিশ মাছের ডিম ভাজা আর তাজা ইলিশ মাছ প্রাণ ভরে খেতে, চোখ ভরে দেখতে আর সাধ্যের মধ্যে বা একদিনের জন্য হলেও বড় সাইজের ইলিশ কিনে নিজেকে নিজের কাছে তৃপ্তি দিতে, যেতে হবে ঢাকার অদূরেই, খুব ভোরে।

কখন যাবেন?

চলুন ঘুরে আসি। কখন? কোথায়? কীভাবে? কত দামে? আর কতটা স্বাদ চেখে দেখা যায় মনের মতো ইলিশের? আর এই দুর্মূল্যের বাজারে কীভাবে একদিন নয়, এক বেলার জন্যও পাওয়া যায় সেই ফেলে আসা পুরনো স্বাদ, ঘ্রাণ আর অনবরত মুখে হাত শুকে বেড়ানো সেই দিনগুলোর মতো একটি দিন।

লোভ লাগানো ইলিশ। ছবিঃ লেখক

তবে যেতে হবে মাওয়া ঘাটে এবং এই আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে, মানে বর্ষাকালে। কারণ আমরা সবাই জানি যে বর্ষা হলো ইলিশের মৌসুম। হোক সেটা ইলিশ কিনতে, খেতে বা দুচোখ ভরে দেখতে আর সেই সাথে ঘোলা জলের পদ্মা নদীর বালুচর উপভোগ করতে। তাই যে কোনো কারণেই হোক, এখন বর্ষা কাল, তাই বেরিয়ে পড়তে পারেন কোনো এক সকালে। সকালে বলতে, বাসায় ছুটির দিনে আয়েশ করে ঘুমিয়ে, উঠে ফ্রেশ হয়ে, নাস্তা করে হেলে দুলে গেলে চলবে না। এভাবে গেলে শেষে মাওয়া গিয়ে ধুলো-বালি-গরম-জ্যাম আর ধুধু বালুচর ছাড়া কিছুই চোখে পড়বে না। শেষে হতাশ হয়ে ফিরে আসতে হবে, নিশ্চিতভাবেই।
ইলিশ কিনবেন নাকি দেখবেন?
ইলিশের পসরা। ছবিঃ লেখক

যেতে হবে অন্যান্য অফিস ডের চেয়েও অনেক অনেক আগে আর দ্রুত। মোট কথা ফজরের আযানের পরপর বেরিয়ে পড়তে হবে মাওয়ার উদ্দেশ্যে। যেন ৭টার মধ্যে পৌঁছে যেতে পারেন, মাওয়া ঘাটের ইলিশের মূল আড়তে। যদি দেখতে চান রাশি রাশি সত্যিকারের রুপালী ইলিশের চকচকে হাসির ঝিলিক। সদ্য ধরে আনা তাজা তাজা রুপালী ইলিশগুলো আপনার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসবে দেখবেন। বিনিময়ে আপনিও ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হবেন এক টুকরো হাসি। সে আপনি যতই গোমড়া মুখো হন না কেন!
এখানে ঠিক সকাল ৭টার মধ্যে মূল পাইকারি আড়তদাররা বসেন তাদের ইলিশের বিশাল সমারোহ নিয়ে। সারারাত ধরে উত্তাল আর খরস্রোতা পদ্মায় জীবন বাজি রেখে ইলিশ ধরেন যে জেলেরা, সূর্যের আলো ফুটতে না ফুটতেই তারা চলে আসেন মাওয়া ঘাটে। সেখানেই হয় প্রথম কেনাবেচা। এখানে কোনো মাপ নেই, আকার নেই, ওজন নেই বলতে গেলে। এখানে আছে শুধু সংখ্যা আর ঠিক দরদাম।
আমরা বাজার থেকে যে দামে কিনি সেই তুলনায় নাম মাত্র দামই বলতে গেলে। তবে এখান থেকে আপনি নিজে মাছ কিনতে পারবেন না কিছুতেই। সেই সুযোগ নেই, ওরা আপনাকে দেবে না। আপনাকে মাছ কিনতে হলে ওই বাজারের আড়তদার বা খুচরো দোকান থেকেই কিনতে হবে। তবে এখানে আপনি উপভোগ করতে পারবেন, চোখের তৃষ্ণা মেটাতে পারবেন ইলিশের নৌকা, ট্রলার আর এলোমেলো ইলিশের ঝাঁক দেখে।
ভজির জন্য তৈরি ইলিশ। ছবিঃ লেখক

ইলিশ খাবেন?
যদি প্রাণ ভরে ইলিশ খেতে চান, তবে মাওয়া ঘাটের মাছের পাইকারি বাজার বা এর আশেপাশে ঘুরে কোনো লাভ হবে না। ওতে করে শুধু সময় নষ্ট হবে আর হয়রানি। ইলিশ ভাজা, ইলিশের ডিম ভাজা, সাথে বেগুন ভাজা ও নানা রকম ভর্তা দিয়ে গরম গরম ভাত উপভোগ করে উদরপূর্তি করতে চাইলে যেতে হবে প্রায় ৩ কিলোমিটার দূরের ফেরি বা লঞ্চ ঘাটের কাছে। সেখানে অনেক অনেক দোকান রয়েছে এসব পসরা সাজিয়ে, গেলেই নানা প্রলোভনে ডেকে নিতে চাইবে আপনাকে। ঢুকে পড়তে পারেন নিজের রুচি আর ইচ্ছা অনুযায়ী যে কোনো দোকানে।

পরামর্শ: যদি ইলিশ কিনতে চান

তবে যে কোনো জায়গা থেকে বাসে বা গাড়িতে গেলে নামতে হবে চৌরাস্তার মোড়ে। নেমে ডানে যেতে হবে পুরনো ফেরি ঘাটের দিকে। দুই বা তিন মিনিট হাঁটলেই পেয়ে যাবেন মাছের মূল আড়তের গলির কাঁচা রাস্তা। পায়ে, গায়ে আর কাপড়ে মাছের পানি, রাস্তার কাদা আর নানা রকম গন্ধ নেবার মানসিকতা থাকতে হবে কিন্তু।

ইলিশের বিকিকিনি। ছবিঃ daily-sun.com

দাম বড় ইলিশের ক্ষেত্রে প্রায় দেড় কেজি ওজনের এক হালি মাছ কিনতে গুনতে হবে অন্তত ৪,০০০-৫,০০০ টাকা। আর হ্যাঁ, এক হালির কমে ইলিশ মাছ সাধারণত বিক্রি করে না কেউ।
মাঝারি বা এক কেজির নিচের এক হালি ইলিশ কিনতে চাইলে খরচ পড়বে ২,০০০-২,৫০০ টাকা, তবে দরদাম করে কিনলে ২,০০০ এর নিচেই কিনতে পারবেন।
আর ছোট ইলিশ এর দাম নির্ধারণ করা মুশকিল, যতটুকু দেখেছি, ওগুলোর কেনাবেচা অনেকটা নির্ভর করবে কে কতটা বেশী দামে বিক্রি করতে পারে আর কে কতটা কম দামে কিনতে পারে, দরদাম করে।
যদি ইলিশ খেতে চান?
খাবার জন্য তৈরি ইলিশ! ছবিঃ i.ytimg.com

দল বেঁধে, বন্ধু বা পরিবার নিয়ে যদি যান তবে সবচেয়ে ভালো হয় হোটেলে মাছ রাখাই থাকে, আপনি দেখে-শুনে দরদাম করে একটি বা দুটি মাছ কিনে ওদেরকে দিয়েই ভাজিয়ে নিতে পারেন। এরপর নিজেদের মতো করে উপভোগ করতে পারেন।
আর যদি হন, একা বা দুই-তিনজন, তবে কয়েকটি দোকান দেখে মাছের পিসের দরদাম করে নিয়ে খেতে পারেন। কারণ এখানে আপনার কাছে মাছের একটি মাঝারী পিস চাইবে ১০০ টাকা! কিন্তু আপনি যদি দরদাম করে খেতে পারেন তবে ৫০-৬০ টাকাতেই পেয়ে যাবেন আপনার পছন্দ মত মাছের পিস বা ইলিশের ডিমের একাংশ। যাই খান না কেন, ভাত-ভাজি-ভর্তা বা ডাল, আগে দাম জেনে তারপর খেতে বা দিতে বলবেন। নইলে কিন্তু মাছ ১০০ টাকা, ভাত ৩০ টাকা, ভাজি ৩০ টাকা আর ডাল রাখবে ৫০ টাকা।
আহ, ইলিশ! ছবিঃ jugantor.com

অথচ সবকিছু মিলেই খেতে পারবেন মাত্র ১০০-১২০ টাকায়। যদি লজ্জা ভেঙে, দরদাম করে কিনে খেতে পারেন। ওরা এমনই, কোন দয়া-মায়া বা ভালোমানুষী দেখাবে না আপনাকে। তাই সাবধান।

যাওয়া-আসা:

ঢাকার যে কোনো জায়গা থেকে যেতে পারবেন মোটামুটি ১০০ টাকাতেই, বাসে গেলে। তবে দল বেধে গেলে নিজেদের গাড়ি বা মাইক্রো নিয়ে যাওয়াই ভালো। ফিরে আসাতেও খরচ একই রকম।

উপলব্ধি:

প্রিয় খাবার, প্রিয়জনদের নিয়েই খাওয়া উচিৎ সাধ্যের মধ্যে হলে। হোক সেটা অল্প পরিমাবণ আর বেশী দামের, নইলে অনেক স্বাদের খাবারও বিস্বাদ লাগে! কারণ শুধু খাবার কেন, যে কোনো মজার জিনিসই অল্প পরিমাণে আর সবাই মিলে উপভোগ করাতেই আসল আনন্দ আর সঠিক তৃপ্তি।
ফিচার ইমেজ- লেখক

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

স্বপ্নের শহর প্যারিস (ভিডিও)

ঈদের ছুটিতে ঝর্ণাদের টানে!