দিল্লি: এক অপূর্ব এয়ারপোর্টের গল্প

রাত ঠিক ১১:৪০ মিনিটে দিল্লী এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করলো আমাদের প্লেন। ভেবেছিলাম আমাদের এই প্লেন থেকে নেমে, একই জায়গা থেকে শ্রীনগর গামী বিমান ধরতে হবে বুঝি। তো সেই ফাঁকে একটু কিছু খাবার ব্যবস্থা করতে হবে সবার জন্য, তাছাড়া আমাদের বাঙালির পেট কি আর বার্গারে ভরে?
ভেবে রেখেছিলাম এখান থেকে তো ভেতরে ঢোকার ব্যাপার নেই, বাইরে যেতেই পারে যে কেউ, তাই বাইরে গিয়ে সবাই মিলে পেট পুরে দিল্লীর কাবাব-বিরানি খেয়ে তারপর ফের এয়ারপোর্টে ঢুকবো। কিন্তু নেমে বেল্ট থেকে লাগেজ নিতেই নতুন জটিলতায় জড়াতে হলো। আমরা নেমেছি আভ্যন্তরীণ বিমান বন্দরে আর আমাদের পরের ফ্লাইট আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর টার্মিনাল-৩ থেকে। সেটা আবার কোথায়? ভেবেছিলাম হবে হয়তো এটারই পাশে বা ডানে-বামে কোনো লাগোয়া এয়ারপোর্ট বা এক্সটেনশন থেকে।
কিন্তু না, খোঁজ নিয়ে জানা গেল টার্মিনাল-৩ প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত! আর যেতে হবে বাসে করে বা ট্যাক্সিতে। ইনফরমেশনে খোঁজ নিয়ে জানা গেল শুধু টার্মিনাল-৩ এ যেতে এয়ারপোর্টের ব্যবস্থাপনায় আলাদা বাস আছে। সেই জায়গার খোঁজ করতে আমি একটু বাইরে বের হলাম, আর বাইরে বের হয়েই প্রায় বজরাঙ্গি ভাইজানের মতো অবস্থায় পড়লাম।

দিল্লী এয়ারপোর্ট, ছবি লেখক

বাইরে বের হয়েছি কোন জায়গা থেকে বাসে উঠবো খোঁজ নিতে কিন্তু এখানেও আর ভেতরে ঢোকা যাবে না। ঢুকতে হলে বেশ অনেকটা পথ হেঁটে বা ট্যাক্সিতে করে টার্মিনাল-৪ থেকে ঢুকতে হবে। এবার কী হবে? সবার পাসপোর্ট, টিকেট তো আমার কাছে! ভাগ্যিস তখনও সব মোবাইল কাজ করছিল, ওদেরকে ফোন করে বাইরে বের হতে বলে আমি গেটে দাড়িয়ে থাকলাম ঠাঁই। বেশ কয়েক মিনিট কাটল নিদারুণ টেনশন আর অস্থিরতায়। যদি খুঁজে না পাই, যদি ওদের বের হতে না দেয়? যদি পুলিশ কোনো ঝামেলা করে? এসব নিয়ে।
কিন্তু না ওরা ব্যাগ আর ট্রলি নিয়ে বেশ নির্বিঘ্নেই বেরিয়ে আসতে লাগলো দেখে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। কাঁচের দেয়ালের এপাশ থেকে আমি হাত নেড়ে-নেড়ে ওদের দৃষ্টি আকর্ষণ করাতে ওরাও বেশ সহজেই খুঁজে পেল আমাকে, তবে ওদের চোখে-মুখেও ছিল দারুণ উৎকণ্ঠা আর ভয়ের একটা কনকনে শীতল রেখা, দেখেই বোঝা যাচ্ছিল।
তবে ওরা কাছে আসতেই, শুরু হলো আবারো ছুট, কাঁধে ব্যাগ, ট্রলিতে বড় লাগেজ আর দুই হাতে বউ-বাচ্চা নিয়ে টার্মিনাল-৩ এর বাসের দিকে। গিয়ে খোঁজ নিতেই যে জায়গায় দাঁড়াতে বলল, সেটাও বিশাল একটা জায়গা, তবে বাস থামার জন্য শুধু রাস্তা করা, আর যাত্রীদের দাঁড়ানো বা বসার জন্য বেঞ্চ। টিকেট কাটা লাগবে ২৫ রুপি করে, কিন্তু আমরা একটি বিমান থেকে আর একটি বিমান ধরবো বলাতে আর টিকেট দেখাতে টাকা ছাড়াই টিকেট দিল পাঁচ জনের। প্রায় ১০ মিনিট অপেক্ষার পর বিশাল জানালার বাস এসে থামল, সেটায় উঠে পড়তেই কিছুটা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।
তবে প্রায় ২০ মিনিটের সেই বাস জার্নিটা অসাধারণ ছিল। মধ্যরাত, একদম ফাঁকা দিল্লীর ঝকঝকে রাস্তা, হয়তো বৃষ্টি হয়েছিল, তাই দুই পাশের আলোতে রাস্তা চিকচিক করে হাসছিল যেন! নীরব রাতের, ভেজা রাস্তায় খুব দ্রুত গতিতে আমাদের বাস পৌঁছে গেল দিল্লীর টার্মিনাল-৩ বিমান বন্দরে। সেখানে নেমে আগেই সিদ্ধান্ত নিলাম এখানে আর আগে থেকে ভেতরে না ঢুকে, বাইরে থেকে খাবার খেয়ে, কিছু খাবার কিনে নিয়ে তারপর ভেতরে ঢুকতে হবে।
অপূর্ব দিল্লী এয়ারপোর্ট, ছবি লেখক

আমাদের হাতে অনেক সময় আছে। তখন রাত ১টা, আর আমাদের পরের বিমান সেই সকাল ৬:৩০ এ। তাই মনের মতো খাবারের দোকান খুঁজতে লাগলাম। ফার্স্ট ফুডের দোকানে নুডলসের অর্ডার দিতেই একজনের চোখে পড়লো সামনে কেএফসি। এবার আর যাই কোথায়, অর্ডার ক্যান্সেল করেই ছুটলাম কেএফসিতে। লাগেজ কোথায় রেখে ভেতরে ঢুকবো সেই ভাবনা ভাবতেই গেটের দারোয়ান জানালো ভেতরে নিয়েই যাওয়া যাবে। ব্যস, দারুণ নিশ্চিন্তে কেএফসির ভেতরেই সব লাগেজ রেখে মেন্যু নিয়ে, চিকেন আর রাইস বোল অর্ডার করলাম সবার জন্য।
আহ কী যে দারুণ ছিল সেই খাবারের স্বাদ, এখনো যেন মুখে লেগে আছে! বাসমতী চালের বিরিয়ানির মতো, সাথে আচার, সস আর দারুণ একটা মাসালা চিকেন, সাথে বিশাল বড় একটা পেপসি সব মিলে দাম মাত্র ১৭০ রুপী! একদম পেট পুরে খেয়ে, অনেক সময় রেস্ট নিয়ে সাথে কিছু ফার্স্ট ফুড নিয়ে ঢুকে পড়লাম মূল এয়ারপোর্টের ভেতরে।
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় চরকা! ছবি লেখক

ঢোকার মুখেই পড়লো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কাঠের চরকা, সেটার ছবি তুলে ভেতরে ঢুকেই তো হাঁ হয়ে গেলাম। এত ঝকঝকে, তকতকে, ঝলমলে আর সুবিশাল এয়ারপোর্ট দেখে। যদিও অন্য এয়ারপোর্টের কথা জানি না, এই দ্বিতীয়বারের মতো আমার এয়ারপোর্ট দেখা, প্রথমবার দেখেছি আগের দিন সন্ধ্যায়, কলকাতা থেকে দিল্লী আসতে।
তখন রাত প্রায় ৪টা। মাঝের দুই ঘণ্টা পুরো এয়ারপোর্টের এ মাথা থেকে ও মাথা করেছি বাপ-বেটা মিলে, ছবি তুলেছি আর হেঁটে বেড়িয়েছি। এরপর নতুন বোর্ডিং পাস নিয়ে আবারো ভেতরে ঢোকা, মূল এয়ারপোর্ট যাকে বলে। এবার তো ভেতরে ঢুকে একেবারে তাজ্জব বনে গেলাম! এ কী দেখছি, এটা যদি এয়ারপোর্ট হয় তো এতক্ষণ যেখানে ছিলাম সেটা তো বারান্দা মাত্র! চলন্ত সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আবার উপরে উঠে টিকেটে দেখলাম আমাদের বিমান ৫৪ নাম্বার গেট থেকে ছাড়বে।
মন জুড়ানো দিল্লী এয়ারপোর্ট, ছবি লেখক

শুরু হল গেট ৩০ থেকে ৬০ এর দিকে হাঁটা, বাম পাশ ধরে, আর ডান দিকে ১ থেকে ৩০ পর্যন্ত গেট। হাঁটা শুরু করতেই অদ্ভুত অদ্ভুত বিস্ময় সামনে আসতে লাগলো এক এক করে। এটা বিমান বন্দর নাকি কোনো সুবিশাল সুপার মার্কেট বুঝতে পারছিলাম না কিছুতেই। কী নেই সেখানে, সব ব্র্যান্ডের কাপড় থেকে শুরু করে জুতা, পারফিউম, ব্যাগ, খাবারের দোকান, নানা রকম রঙিন পানীয়, বইয়ের দোকান, সিডি থেকে শুরু করে নানা রকম নিত্য প্রয়োজনীয় সবকিছুই।
এসব থেকেও আমার কাছে যে জিনিসটা বড় বিস্ময় হয়ে দেখা দিয়েছে সেটা হলো প্রায় ৫/৭ কিলোমিটার হাঁটার পুরোটা পথ কার্পেটে মোড়ান, সেটাও একই রকম কার্পেট, নিখুঁত, পরিচ্ছন্ন। আর আছে প্রতিটি গেটের কাছে বসার চেয়ারের পাশাপাশি ভীষণ আরামদায়ক ঘুমানোর ব্যবস্থা। অনেকেই দেখলাম সেখানে দিব্ব্যি ঘুমোচ্ছে, ব্যাগ-পত্র কাছে রেখেই। নিশ্চয়ই এখানে হারানোর বা চুরির ভয় নেই। আর আছে সমতলেই হাঁটার কষ্ট দূর করতে চলমান রাস্তা, প্রতিটি গেটের কাছে, মাঝে বা পাশেই।
সকল পন্যের সমাহারের দিল্লী এয়ারপোর্ট, ছবি লেখক

আপনার হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে? ওখানে গিয়ে দাড়িয়ে পড়লেই চলে যাবনে পরের গেটের কাছে! আরও আছে বিমান বন্দরের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাবার জন্য ছোট ছোট গাড়িও! তবে সেটা সবার জন্য কিনা বা পেইড কিনা সেটা জানা হয়নি। যাই হোক না কেন, সুবিধাটা তো আছে অন্তত।
এভাবে কিছুটা হেঁটে, কিছুটা চলমান রাস্তায় দাড়িয়ে থেকে আমরা পৌঁছে গেলাম আমাদের নির্ধারিত বিমান ছাড়ার গেট ৫৪ তে। সেখানে গিয়েই ঘুমানোর চেয়ার খুঁজে পেতে দুটো পাওয়া গেল, সাথে সাথে ঘুমের আয়োজন সেরে নিতে লাগলো দুই-একজন।
ততক্ষণে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। পূবের আকাশে লালের রোশনাই, সাথে গোলাপি-বেগুনী আভা, সূর্যদেব ঘুম থেকে উঠি-উঠি করছে। আমাদেরও প্লেনে ওঠার ঘোষণা চলে এলো। উঠতেই হলো ভীষণ আরামের ঘুমের চেয়ার থেকে।
ফিচার ইমেজ- লেখক

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শিমলা-মানালির স্বপ্নিল পথে পথে

শঙ্কা সাধনার কাশ্মীরের শ্রীনগর ভ্রমণ