মৃত্যুর জন্য যে শহরে ভিড় জমে মানুষের!

আপনি মৃত্যুকে কতটা কাছ থেকে দেখতে চান? কতখানি অপেক্ষা করেন মরে যাবার জন্য? জীবনের চরম আর বাস্তব এই সত্যকে মেনে নেবার জন্য কতখানি উদগ্রীব আপনি? কথাগুলো এ জন্য জিজ্ঞেস করা যে, মৃত্যু এমন এক বিষয় যার জন্য খুব আগ্রহভরে অপেক্ষা আমরা কখনোই করি না। সুন্দর এই পৃথিবী, পরিবার, বন্ধু ছেড়ে হুট করে চলে যাওয়ার মতো সাহস হয়তো ইচ্ছে করে কেউ করে না। কিন্তু সব সময় এমনটি হয় না। এখনও বিশ্বে এমন এক শহর বেঁচে রয়েছে যেখানে মানুষ যায় এবং অপেক্ষা করে শুধু মৃত্যুর জন্য!

মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করা এ শহরের নাম বানারাস। ভারতের বহুল প্রচলিত একটি শহর। সনাতনধর্মালম্বীদের কাছে বিশ্বের অন্যতম পবিত্র শহর হিসেবে পরিচিত উত্তর প্রদেশের এই শহরটি। এই জায়গাটির আরেক নাম কাশী। ভারতের পৌরাণিক কাহিনী মতে, মহাভারতের পঞ্চপাণ্ডব রাজপুত্ররা তাদের চাচতো ভাইদের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী উত্তরাধিকার যুদ্ধে জয়লাভের পর পাপমুক্ত হতে কাশীতে গমন করে। তাদের সেই গমনের পর থেকে আজ অবধি মানুষ শত শত বছর ধরে দুঃখ বা বেদনা থেকে মুক্তি পেতে দক্ষিণ ভারতের এই শহরে আসছে।

image source: bbc.com

হিন্দু ধর্মগ্রন্থ মতে, এখানে মৃত্যুর পর পবিত্র গঙ্গা নদীর তীরে শবদাহ হলে পুনর্জন্ম চক্র ভেঙে মুক্তি মেলে। একইসঙ্গে মুক্তি মেলে পাপ থেকেও। বানারাসে মনিকর্ণিকা ও হরিশচন্দ্র ঘাটে দিবারাত্রি চিতার আগুন জ্বলে।

বানারাসের ঘাটের সিঁড়িগুলো নদীতে গিয়ে মিশেছে। গঙ্গার পানিতে পাপ ধুয়ে যাবে এমন বিশ্বাস সবার মাঝে থাকলেও এই পানি এখন মানব ও শিল্প বর্জ্যে ধারণ করেছে ধুসর বর্ণ। যখন দর্শনার্থী ও তীর্থযাত্রীরা নৌকায় করে গঙ্গার ঘাট অতিক্রম করেন, তখন তারা এখানে মৃতের আত্মার মুক্তির জন্য পরিবার ও পুরোহিতদের স্তুতি পাঠ শুনতে পান। প্রতিদিন শত শত ভ্রমণকারী এই পবিত্র ভূমি দেখতে এখানে ভিড় জমান। এখানে ধূমপান, যৌনক্রিয়া, যেকোনো ধরনের মাংস, ডিম পেঁয়াজ-রসুনের খাবার খাওয়া নিষিদ্ধ।

image source: bbc.com

মৃত্যুকে স্বেচ্ছায় বরণ করতে চাওয়া এই মানুষগুলো যেখানে থাকেন সেগুলোকে হোটেল না বলে বলা হয় পরিত্রাণের ঘর। আর এখানে বসবাসকারীদের প্রক্রিয়াকে বলা হয় কাশীবাস। এগুলো পরিচালনা করে বিভিন্ন দাতব্য সংস্থা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এই ঘরে যারা একবার আসেন তারা এখান থেকে কেবল তখনই বিদায় নেন যখন তাদের মৃত্যু হয়।

নারী-পুরুষ যারা কাশীতে জীবনের শেষ সময় কাটাতে আসেন (কাশীবাসী) তাদের জন্য বিভিন্ন দাতব্য সংস্থা ও ব্যবসায়ীদল এখানে আশ্রমগুলো স্থাপন করেছে। ‘ভবন’ এই স্থাপনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পুরনো। এর ১১৬টি কক্ষের মধ্যে ৪০টি কাশীবাসীদের জন্য বরাদ্দ করা হয়ে থাকে।

image source: bbc.com

আশ্রমটির অপারেশন ম্যানেজার ভিকে আগারওয়াল বলছিলেন, কাশীবাসের জন্য আমাদের এখানে বলতে গেলে কয়েক টন আবেদন জমা পড়ে। কিন্তু তার বিপরীতে আমরা খুব স্বল্প সংখ্যকের জন্য কক্ষের যোগান দিতে পারি। তবে যার জন্য খুব জরুরি, নিজের খরচ নিজে যুগিয়ে নিতে পারবেন, আত্মীয়স্বজন রয়েছে খবর নেয়ার মতো এবং শেষ মুহূর্তে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় থাকতে পারবেন এমন মানুষকেই এখানে থাকার জন্য প্রাধান্য দেওয়া হয়। ৬০ বছরের নিচে এখানে থাকার জন্য কাউকে নির্বাচন করা হয় না।

image source: news source

তিনি আরও জানান, কাশীবাসীদের প্রত্যেককে তাদের ব্যক্তিগত সামর্থ অনুযায়ী প্রায় ১ লক্ষ রুপি দিতে হয়। তাদের একটি কক্ষ প্রদান করা হয় যেখানে তারা মৃত্যু পর্যন্ত অবস্থান করেন। তাদেরকে আশ্রম থেকে খাবার দেয়া হয় না, তাদের প্রত্যেককে নিজেদের খাবার নিজেদেরই ব্যবস্থা করতে হয়।

কাশীতে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করা এক নারীর নাম স্বরস্বতী আগারওয়াল। সন্তান-সন্ততিহীন এক বিধবা নারী। চার বছর আগে স্বামীর মৃত্যুর পর বানারসের কাছাকাছি কোনো জায়গা থেকে এখানে এসেছিলেন। কথা হয়েছিল সেখানে থাকা আরও দুই নারী গায়ত্রী দেবী এবং সতী দেবীর সাথে।

আশ্রমে পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে অবস্থান করা ষাটোর্ধ্ব গায়ত্রী দেবী বলছিলেন, এক ছেলে ও দুই মেয়ের জননী তিনি। সন্তানেরা ভারতের অন্য রাজ্যে বাস করে। তারা তাকে দেখতে তেমন একটা আসে না। সন্তান বিয়ে করলে যে সব কিছু বদলে যায় এমন এক আক্ষেপ নিয়েই কথাগুলো বলছিলেন তিনি। তার সাথে এখানে প্রায় একই সময় ধরে থাকা সতী দেবীও বলছিলেন এ কথা।

image source: bbc.com

বানারসের আশ্রমে থাকা শত নারীর মতো এই তিন নারীও কয়েক বছর ধরে এখানে মৃত্যুদিন গুনছেন। তারা জানেন কোনো এক সময় তাদের আয়ু ফুরিয়ে আসবে। তারা আর থাকবেন না এই আলো ঝলমলে পৃথিবীতে। মৃত্যু খুব কঠিন একটা বিষয় হলেও বছরের পর বছর ধরে তাদের এরই অপেক্ষায় এই শহরে দিন কাটাতে হয় জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত।

ফিচার ইমেজ: পিন্টারেস্ট

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

টেকেরঘাটে স্বর্গবিলাসের ইতিবৃত্ত

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার যে ৫টি শহরে এখনো পড়েনি পর্যটকদের পা