একদিনেই ঘুরে আসুন মানিকগঞ্জের বালিয়াটি জমিদারবাড়ি থেকে

একদিন থেকে, ঘুরে, পরদিন চলে আসা যায় এরকম একটা ঝটিকা সফরের কথা মাথায় অনেকদিন থেকেই ছিল। কিন্তু কোথায় যাওয়া যায় সেটা নিয়ে খানিকটা দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগছিলাম। এক বন্ধু অতি উৎসাহে প্রস্তাব করলেন মানিকগঞ্জের নাম। দেশের সবচেয়ে বড় জমিদারবাড়িগুলোর একটি, বালিয়াটি প্রাসাদ, আছে সেখানে।

বন্ধুটি একদম গবেষণা করে, ছবি দেখিয়ে আমাদের দিন দিন প্রলুব্ধ করার চেষ্টা অব্যাহত রাখলেন, তার অসীম ধৈর্য আর প্রবল উৎসাহ দেখে তার প্রস্তাবনা সাদরে গৃহীত হলো! উঠে পড়লাম মানিকগঞ্জের বাসে, জমিদারবাড়ির খোঁজে!

সাত প্রাসাদের একটি, ছবিঃ ফারজানা তাসনিম

দুই ঘণ্টার মাঝেই মানিকগঞ্জ পৌঁছে গেলাম। জমিদারবাড়িটা সাটুরিয়া উপজেলায়। অটোতে করে পাঁচ বন্ধু চলে এলাম সেখানে। আরেক বন্ধুর বাবার সরকারি চাকরির সুবাদে সাটুরিয়ার সরকারি ডাক বাংলোতে থাকার সুযোগ হলো। সেটাকেও একটা ছোটখাটো জমিদারবাড়ি বলে চালিয়ে দেয়া যেতে পারে! ব্যাগ রেখে, চট করে গোসল সেরে সবাই বেরিয়ে পড়লাম। এরপর ভ্যানে চড়ে আধা ঘণ্টার মাঝে পৌঁছে গেলাম বালিয়াটি জমিদারবাড়িতে।

পাবেন প্রাচীনত্বের ছাপ! ছবিঃ ফারজানা তাসনিম

কেন এই বাড়িটিকে প্রাসাদ বলা হয়, সেটা ভেতরে ঢুকলেই পরিষ্কার হয়ে যাবে আপনার কাছে। বিশাল এলাকা নিয়ে ভেতরে দেখতে পাবেন সাতটি মনোরম স্থাপনা। জানা গেল, পুরো জায়গার আয়তন প্রায় বিশ একর। প্রাসাদের মূল ব্লক ছিল পাঁচটি, এখন দেখা যায় চারটি, একটি পরিত্যক্ত।

কেন্দ্রীয় ব্লকের রংমহল নামের প্রাসাদটিতে একটি জাদুঘর স্থাপন করা হয়েছে। একে পরিপূর্ণ রূপ দেয়ার জন্য কাজ চলছে এখনো। জাদুঘরের ভেতরে আছে অনেক রকম সিন্দুক আর আয়না। সেই সাথে দেখতে পাবেন বিভিন্ন ধরনের হারিকেন আর হ্যাজাক বাতি।

তাছাড়া জমিদারদের বিশাল আকৃতির বেশ কিছু পালঙ্ক, শিকার করার জন্য দেয়ালে ঝোলানো বন্দুক, তলোয়ার, নানা ধরন এবং নানা গড়নের ছুরি, দামি ঝাড়বাতি, শ্বেত পাথরের টেবিল, চেয়ার আর  তৈলচিত্র তো আছেই।  প্রাসাদের ভেতরে কাঠের শৈল্পিক কারুকাজ করা প্যাঁচানো সিঁড়িগুলো সত্যিই দেখার মতো! সবকিছু দেখে জমিদারদের রুচির প্রশংসা আপনাকে করতেই হবে!

জৌলুস ফুরিয়ে যায়নি এখনো! ছবিঃ ফারজানা তাসনিম

বালিয়াটি জমিদারবাড়ির সবগুলো প্রাসাদ কিন্ত একসাথে তৈরি হয়নি। আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে উনিশ শতকের প্রথমদিক পর্যন্ত একটার পর একটা প্রাসাদ তৈরি করা হয়েছে। সামনের চারটি প্রাসাদ ব্যবহার করা হতো ব্যবসায়িক কাজে। আর পেছনেরগুলোতে জমিদার পরিবারের সদস্যরা থাকতেন। এগুলোকে বলা হতো অন্দরমহল।

প্রাসাদগুলোর একদিকে আছে পুকুর আর বাঁধানো ঘাট। ছবি তোলার জন্য জায়গাটা বেশ মানানসই। পুকুরঘাটের সবুজ গাছগাছালিতে ঘেরা জায়গাটার চারপাশে কাজ করে এক ধরনের আরামদায়ক প্রশান্তি। এখানে বসার জন্য কংক্রিটের কিছু আসন তৈরি করা হয়েছে। আসনে বসে পায়ের উপর পা তুলে তাকিয়ে থাকতে পারেন বিশাল বিস্তৃত আকাশের দিকে।

পুকুরের স্বচ্ছ পানির দিকে তাকালে আশেপাশের গাছপালাগুলোর প্রতিচ্ছবিও দেখতে পাবেন। ক্ষণিকের জন্য হারিয়ে যেতে পারেন দূর অতীতে, যখন কোনো একজন জমিদার হয়তো আপনার মতোই আপনার জায়গাটায় বসে আকাশ দেখতেন!

এটাই সেই পুকুরঘাট! ছবিঃ ফারজানা তাসনিম

পুকুরঘাট পেরিয়ে সামনে এগিয়ে গেলে একদিকে দেখা যাবে পুরোপুরি কাঠের তৈরি একটি দালান। বাড়ির ভৃত্য শ্রেণীর মানুষদের বসবাসের জন্য এটি তৈরি করা হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। এছাড়া প্রাসাদটিতে ঢোকার জন্য আছে অসাধারণ কারুকার্যময় তিনটি বিশাল প্রবেশদ্বার।

দ্বারগুলোর উপর স্থাপন করা হয়েছে ছোট আকৃতির সিংহের প্রতিমূর্তি। প্রাসাদটির জৌলুস যেন এর ফলে বেড়ে গিয়েছে আরো খানিকটা।

আছে প্রকৃতির ছোঁয়া, ছবিঃ ফারজানা তাসনিম

বালিয়াটি জমিদার পরিবারটির গোড়াপত্তন করেন গোবিন্দ রাম সাহা। তিনি ছিলেন উনবিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ের একজন বড় লবণ ব্যবসায়ী। এই পরিবাবের সদ্যস্যদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য দুজন হলেন কিশোরিলাল রায় চৌধুরী এবং রায়বাহাদুর হরেন্দ্র কুমার রায় চৌধুরী।

তৎকালীন সময়ে শিক্ষাখাতে তাদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল। কিশোরিলাল রায় চৌধুরীর পিতাই ঢাকার জগ্ননাথ কলেজটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন যেটি পরবর্তীতে পরিণত হয়েছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে।
দেড় ঘণ্টার মধ্যে আমাদের প্রাসাদ দর্শনের সমাপ্তি ঘটলো। প্রাসাদের বাইরে আরো একটি পুকুর আছে। এর ঘাটে বসে পানিতে পা ভিজিয়ে সবাই চিন্তা করছিলাম জমিদারদের জাঁকজমকপূর্ণ জীবনযাপন নিয়ে!

তুলতে পারবেন মজার সব ছবি! ছবিঃ ফারজানা তাসনিম

সন্ধ্যা হওয়ার আগেই ফিরে এলাম ডাক বাংলোয়। তারপর চলল আড্ডা! বারান্দায়, ছাদে, রুমের ভেতরে! সারা রাত কেউই ঘুমাইনি আমরা। রাতে আরও অনেক মজার মজার ঘটনা ঘটেছিল, এই লেখার সাথে সেগুলো সঙ্গতিপূর্ণ নয় দেখে বিস্তারিত বর্ণনায় যেতে পারছি না! তবে আপনারা বালিয়াটিতে দিনে গিয়ে দিনেই ফিরে আসতে পারেন।

যেভাবে যাবেন

গাবতলি থেকে সাটুরিয়াগামী এস. বি. লিংক বাসে উঠে ৭০ টাকা দিয়ে সাটুরিয়ায় নেমে পড়বেন। সেখান থেকে অটোতে করে বালিয়াটি জমিদারবাড়ি, ভাড়া ১০ টাকা। গুলিস্তান থেকেও মানিকগঞ্জের অনেক বাস পাবেন। সেখান থেকেও যেতে পারেন। তবে সেক্ষেত্রে কালামপুর বাজারে নেমে যেতে হবে। সেখান থেকে অটো নিয়ে নামবেন সাটুরিয়ায়।জমিদারবাড়ি থেকে বেরিয়ে আবার অটোতে করে চলে যাবেন সাটুরিয়া বাসস্ট্যান্ড, দুই থেকে তিন ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে যাবেন ঢাকায়।

খুঁটিনাটি

বালিয়াটিতে প্রবেশমূল্য ২০ টাকা। সকাল সকাল রওনা দেবেন যাতে দুপুরের আগেই পৌঁছাতে পারেন। বিকেল ৫টা পর্যন্ত এটি দর্শনার্থীদের জন্য খোলা রাখা হয়। প্রাসাদ দেখে দুপুরের খাবার খেয়ে বাসে উঠে পড়বেন। সাটুরিয়া বাজারে কিছু খাবারের দোকান আছে, মান ভালোই। একদিনে সব মিলিয়ে ৪০০ টাকারও কম খরচে ঘুরে আসতে পারেন প্রাচীনত্বের মায়ায় মোড়ানো এই স্থাপনাটি থেকে।
ফিচার ইমেজ- ফারজানা তাসনিম 

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

নুসা পেনিডার কেইলিংকিং, ক্রিস্টাল বে, অ্যাঞ্জেলস বে’তে ভ্রমণবিলাস

খাগড়াছড়ির রামগড় চা বাগানে পাহাড়ি সৌন্দর্যের খোঁজে