রোথাং পাসের দিনগুলো

গাড়িতে উঠেই বেশ ভালো লাগছিল। চকচকে আবহাওয়া আর আকাশে এদিক ওদিক ইতস্তত মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে। কিছু কিছু মেঘ দেখতে তুলোর মতো যা আবার পাশ দিয়েই উড়ে যাচ্ছে। মানালি থেকে সবে যাত্রা শুরু করেছি। ঘণ্টাতিনেক লাগবে রোথাংপাস পৌঁছতে। ভাবছিলাম বোরিং লাগবে কিনা! আমাকে অবাক করে দিয়ে পাহাড়গুলো আস্তে আস্তে অপরূপ হয়ে উঠতে শুরু করল।

বেশ ফুরফুরে মেজাজে এগোচ্ছিলাম। সময় যত যাচ্ছে রাস্তার পাধে গাছপালা ভারী হয়ে উঠছে। অদ্ভুত রকম শান্তি শান্তি পরিবেশ। ততক্ষণে ছোট ছোট বেশ কিছু শহর ছাড়িয়ে এসেছি। রাস্তার পাশ দিয়ে আপেলের সারি সারি বাগান উঠে গেছে পাহাড়ের উপরের দিকে। আর পাহাড়ের গা বেয়ে আমাদের গাড়ি উঠে যাচ্ছে রোথাং পাসের উপরের দিকে।

রোথাং পাস, কুল্লু, মানালি। ছবিঃ লেখক 

ভূপৃষ্ঠ থেকে ১৩,৫০০ ফিট অর্থাৎ প্রায় ৩,৯০০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত এই পাসটি কুল্লু, লোহাল ও স্পিতি ভ্যালিকে আলাদা করেছে। তাছাড়া এই পাসের পর থেকেই লেহ এবং স্পিতি ভ্যালির রাস্তা দুই দিকে চলে গিয়েছে। রোথাং পাস সম্ভবত ভারতের সব থেকে জনপ্রিয় পাস এবং সব ধরনের ট্রাভালাররা এখানে উচ্চতা, বরফ ও উচ্চতম পর্বতের স্বাদ নিতে আসেন। 

মানালি থেকে অল্প কয়েক ঘণ্টার রাস্তা। মাত্র ৫১ কিলোমিটার পাড়ি দিলেই পাওয়া যায় পৃথিবীর সুন্দরতম ল্যান্ডস্কেপগুলোর মতো একটা জায়গা। আবার মানালিতে ঘুরতে আসা অধিকাংশ ট্রাভেলারদের প্রধান আগ্রহ থাকে রোথাং পাসে ঘুরতে আসা। তাই এসব কারণে রোথাং পাস বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

রাস্তার পাশেই আপেল বাগান। রোথাং পাস, কুল্লু, মানালি। ছবিঃ লেখক   

আপেলের বিশাল বাগিচাগুলো চোখ থেকে সরে যেতেই চোখে পড়তে শুরু করল হাজার হাজার ফিট উঁচু ঝর্ণা। এত বিশাল সাইজের ঝর্ণা আমার চোখে পড়েনি কখনো। মনে হচ্ছে আকাশের উপরে উঠে যাওয়া পাহাড়ের মেঘের ভেতর থেকে গড়িয়ে পড়ছে এই ঝর্ণাগুলো। গাড়ি ততক্ষণে অর্ধেক পথ চলে এসেছে। একটু বাদেই চোখে পড়ল এক সাথে ৩-৪টা আকাশ ছোঁয়া ঝর্ণা।

এত উপর থেকে ঝর্ণাগুলো পাহাড়ের গা বেয়ে বেয়ে নিচের নদীতে চলে আসছে যা নিজের চোখে না দেখে বোঝানো অসম্ভব, কী তার রূপ, কী তার বিশালতার মহীমা। যত উপরে উঠছি রাস্তার বাঁক বাড়ছে। পাহাড়ি রাস্তাগুলো কখনো সোজা রাখা হয় না। জিগজ্যাগ করে পাহাড়ের গা বেয়ে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে বানানো হয়। এতে করে রাস্তা টেকসই হয় ও যানবাহনের চলাচলে সুবিধা হয়।

রোথাং পাস, কুল্লু, মানালি। ছবিঃ লেখক 

যাত্রা শুরুর ঘণ্টা আড়াই এর মাথায় আমাদের গাড়ি পৌঁছালো মারহিতে। রোথাং পাসের নিচে সব থেকে কাছের ছোট্ট একটা বাজারের মতো জায়গা। অল্প কিছু দোকান, কিছু পোর্টেবল টয়লেট চোখে পড়ল আর খাবার জন্য কিছু রেস্তোরাঁ দিয়েই এই মারহি জায়গাটা তৈরি। বুঝতে পারলাম না এখানে কোনো কটেজ বা থাকার মতো কিছু আছে কি না।

মারহি থেকে সকালের নাস্তা সারলাম ডাল, রুটি আর মুরগির মাংস দিয়ে। তবে দামটা একটু চড়া। যেহেতু পর্যটন এলাকা ও সভ্যতা থেকে বেশ খানিকটা দূরে তাই এখানে দাম বেশী হওয়া স্বাভাবিক। খাওয়া শেষে রোথাং পাসের উপরের দিকে ওঠার পালা। দেখলে মনে হয় এই তো অল্প একটু রাস্তা, আসলে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে পাহাড় বেয়ে গাড়িতে করেই এই পথটুকু পার হতে প্রায় ঘণ্টা লেগে যাবে।

রোথাং পাস, কুল্লু, মানালি। ছবিঃ budgettours

মারহি ছেড়ে যখন উপরে উঠতে শুরু করলাম রাস্তার পাশ দিয়ে তখন বেগুনী আর হলুদ ঘাসফুলের মেলা বসেছে। সবুজ পাহাড়ের গায়ে জায়গায় জায়গায় লেগে আছে মেঘ, সেই সাথে রোদের আলো পড়ে দূরের সবুজ পাহাড়গুলো উজ্জ্বল হয়ে আছে। চোখ জুড়িয়ে যাবে এমন দৃশ্য দেখার পর। নিজেকে গাড়ির মধ্যে দেখতেই ইচ্ছে করছিলো না। ছুটে গিয়ে যদি জায়গাগুলোকে দেখে আসতে পারতাম।

অনেক ধৈর্য্য নিয়ে ঘণ্টাখানেক বসে থাকার পর পৌঁছলাম রোথাং পাসের টপে। এখানে সব ধরনের অভিযাত্রিদের সব সময় নামার পার্মিট থাকে না। কিন্তু সামারে নামলে কেউ কিছু বলে না, তাই সুযোগটা হাতছাড়া করার ইচ্ছে ছিল না।

রোথাং পাস ছাড়িয়ে। ছবিঃ লেখক 

গাড়ি থেকে নেমে মুখ দিয়ে প্রথমেই যে শব্দটা বের হলো তা অবশ্যই ওয়াও। চারদিকের সবুজের কার্পেটে ঢাকা পাহাড়গুলো আর সেই সাথে দূরে বিশাল উঁচু পর্বতের মাথায় প্রথমবার বরফ দেখে আত্মহারা লাগছিল। ১৩,৫০০ ফিট উপরে দাঁড়িয়ে চারপাশের পৃথিবী দেখছি। প্রচুর গাছপালা থাকাতে এত উচ্চতাতেও অক্সিজেনের অভাব নেই বললেই চলে। প্রতি মুহূর্তে হারিয়ে ফেলছিলাম নিজেকে।

রোথাং পাসে মেঘের নদী আর বরফের পাহাড়। ছবিঃ লেখক 

যেখানে দাঁড়িয়ে আছি তার অনেক নিচে দিয়ে বয়ে চলেছে সেই হাজার হাজার মিটার উঁচু ঝর্ণাগুলো, সেই সাথে বয়ে চলেছে মেঘের নদী। এক দিকে রাস্তা নেমে গেছে মানালির দিকে, অন্যদিকে রাস্তা চলে গেছে লেহ ও স্পিতি ভ্যালির দিকে। দেখতে দেখতে মনে হয় এখানে ছোট্ট একটা ঘর বানিয়ে যদি সারাজীবন থেকে যেতে পারতাম!

কীভাবে যাবেন ও খরচের খসড়া:

রোথাং পাস যেতে হলে আপনার দরকার হবে একটি ভারতীয় ভিসা। যে কোনো পোর্ট দিয়ে প্রবেশ করে কলকাতা থেকে ট্রেন, বাস বা বিমানে যেতে হবে দিল্লি, অথবা চণ্ডীগড়।ট্রেনে শ্রেণীভেদে দিল্লি বা চণ্ডীগড়ের ভাড়া পড়বে ৬৭৫ থেকে ৩,৫০০ রুপি। বিমানে পড়বে ২,৪০০ থেকে ১২,০০০ রুপি। এই জায়গাগুলো থেকে বাস পাওয়া যাবে মানালির। বাস ভাড়া পড়বে ৪৯০ রুপি থেকে ১,৪০০ রুপি। মানালি থেকে রোথাংপাসের একটা পার্মিট সংগ্রহ করতে হবে। গাড়ির জন্য পার্মিট লাগবে ৫০০ রুপি ও জন প্রতি ৫০ রুপি।

মানালি থেকে রোথাং পাস গামি একটি HRTC এর লোকাল বাস চলাচল করে বছরে আট মাস ভোর পাঁচটায়, এপ্রিল থেকে নভেম্বর পর্যন্ত। বাস ভাড়া ১৩০ রুপি। অথবা ট্যাক্সি ভাড়া করে সরাসরি চলে যেতে পারেন রোথাং পাসে। ভাড়া পড়বে ৩০০ রুপি শেয়ারে গেলে, আর পুরো ট্যক্সি ভাড়া করলে পড়বে ট্যক্সির ধরন অনুয়ায়ী ২,৫০০ – ৫,০০০ রুপি। HRTC এর বাসের টিকেট যাবার ন্যূনতম দুই দিন আগে ও ট্যক্সি ভাড়া করতে হবে যাত্রার আগের দিন।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

নির্মল হাওয়ায় চন্দ্রনাথের চূড়ায়

কর্ণফুলীর বুকে প্রশান্তি রিসোর্টে কায়াকিং!