প্রেয়সীর ঘ্রাণ…

মাঝে মাঝে মনে মনে ভাবি, কোন রূপে তুমি বেশী সুন্দর, কোন রূপে তোমায় আরও আকর্ষণীয় লাগে, কোন সাজে তুমি বেশী মায়াবী, কোন শাড়িতে তুমি বেশী মোহময়ী?

শরতের নীল-সাদা সাজে? হেমেন্তর মাতাল করা বাতাসে? শীতের কুয়াশা ঢাকা অভিমানী মুখে? বসন্তের বর্ণীল সাজে? নাকি বর্ষার ভেজা ভেজা লাজে?

মনে আছে আজও, তোমাকে প্রথম দেখার দিনটি ছিল কুয়াশা ঢাকা, মাঝে মাঝে ঝরে পড়া বৃষ্টিতে ভিজে চেয়ে থাকা, হুটহাট মেঘের ঘোমটায় মুখ লুকিয়ে থাকা। এভাবে একটু আধটু দেখা পেয়েছিলাম সেবার। প্রথম দেখার দিনে। তবে তাতেই আমি বিভোর হয়ে গিয়েছিলাম তোমাতে। তোমাকে প্রথম দেখার সেই রূপ আমি আজও ভুলতে পারি না। অবশ্য কেইবা আছে এমন যে তার প্রেয়সীকে প্রথমবার দেখার কথা ভুলে যেতে পারে? কেউ নেই আমি জানি। আর তাই তো তোমার সেই রূপ আজও অমলিন হয়ে আছে আমার সুখ স্মৃতির পাতায়।

সবুজ সাজে প্রেয়সী! ছবিঃ সংগ্রহ

পরদিন অবশ্য তুমি একেবারেই নতুন সাজে সেজেছিলে, হেসেছিলে ঝলমলে হাসিতে, নিজেকে রাঙিয়ে ছিলে নানা রঙে। একেবারে বর্ণীল করে তুলেছিলে সব রকমের রঙে রেঙে। খুব খুব ভোরে সোনালী আলোয় সেজেছিলে, হেসেছিলে উচ্ছ্বসিত হয়ে। আমি মুগ্ধ হয়ে, অপলক নয়নে শুধু তাকিয়েই ছিলাম, তাকিয়েই ছিলাম। পুরোটা সকাল আমি শুধু তোমাকে দেখে দেখেই কাটিয়ে দিয়েছিলাম।

এরপর বন্ধুদের নানা রকম জোর জবরদস্তিতে ওদের সাথে বেড়িয়ে পরেছিলাম ঠিক-ই, কিন্তু জানো তো, আমার মন বাঁধা পড়েছিল তোমার কাছে, তোমার হাসিতে, তোমার উচ্ছ্বাসে আর তোমার ঝলমলে সাজে সেজে থাকা অপরূপ রূপের মাঝে। কতভাবে যে পালাই পালাই করেছিলাম ওদের কাছ থেকে সে বলে বোঝানো যাবে না। কিন্তু বিধাতা ঠিক-ই আমার চাওয়া বুঝে গিয়েছিলেন। আর তাই তিনি আমাকে আমার অবাধ্য, অশান্ত বন্ধুদের হাত থেকে উদ্ধার করে, তোমার হাতে সঁপে দিয়েছিলেন।

ওদের হাত থেকে ছাড়া পেয়ে, আমি এক ছুটে চলে গিয়েছিলাম তোমার কাছে। কখনো চুপ করে বসে থেকেছি তোমার পাশে, কখনো অপলক চেয়ে থেকেছি তোমার অপরূপ রূপের পানে, কখনো তোমার রঙের বদল দেখেছি ক্ষণে ক্ষণে, কখনো তোমার গন্ধ নিয়েছিলাম প্রাণভরে। ওহ, আচ্ছা তুমি জানো তো, তোমার তুমির সবকিছু মধ্যে আমার কোনটা সবচেয়ে বেশী ভালোলাগে, খুব করে টানে, চুম্বকের মতো আমাকে তোমার কাছে আটকে রাখে, তোমাকে কেন আমার সব সময় আঁকড়ে ধরতে ভালোবাসি? জানো কী?

আকাশে, পাহাড়ে, নদীতে অপরূপ সাজে সে… ছবিঃ লেখক

আচ্ছা বলি, তোমার রঙ, রূপ, গন্ধ, হাসি, আনন্দ, উচ্ছ্বাস, লাজ, মান-অভিমান, কান্না এসব কিছুর মাঝে আমার সবথেকে সবথেকে প্রিয় তোমার গন্ধ! হ্যাঁ সত্যি তাই, কেন যেন তোমার তুমির একটা কেমন যেন আলাদা গন্ধ আছে, তোমার নিজের সেই গন্ধই বারবার আমাকে তোমার কাছে টেনে নিয়ে যায়। আমি কিছুতেই তখন নিজেকে আটকে রাখতে পারি না। তোমার শরীর জুড়ে ছড়িয়ে থাকা একটা কেমন যেন ঘ্রাণ! প্রাণ ভরে উপভোগ করার আকুলতা আমাকে পাগল করে তোলে, ব্যাকুল করে দেয়, উন্মাদ হয়ে উঠে আমি তোমার কাছে ছুটে ছুটে যাই।

অথচ এমন নয় যে তোমার চেয়ে অপরূপ, তোমার চেয়ে স্নিগ্ধ, তোমার চেয়ে কমনীয়, কোমল, তোমার চেয়ে আকর্ষণীয় কাউকে আমি দেখিনি। নাহ, একদমই তাই নয়, তোমার চেয়ে সুন্দর হাসির, উচ্ছ্বসিত, মন কাড়া সাজের, অনেককেই আমি দেখেছি। কিন্তু ওদের মাঝে যেটা আমি পাইনি, ওদের যে বিশেষ কিছু আমাকে চুম্বকের মতো ওদের কাছে টেনে নিয়ে যেতে পারেনি সেটা হল, ওদের কারো নিজের গন্ধ আমাকে আকুল করে তুলতে পারিনি, তোমার মতো গন্ধ পেতে আঁকড়ে ধরে থাকার জন্য!

মাঝে মাঝে ভাবি, কি আছে তোমার শরীরের গন্ধে? কি আছে ওই গন্ধের জাদুতে, কি এমন সম্মোহন আছে তোমার ঘ্রাণে? যে ঘ্রাণ আমাকে আমার আমির কাছ থেকে কেড়ে নেয় বারবার। আমাকে অস্থির আর আকুল করে তোলে পালিয়ে গিয়ে তোমার শরীর জুড়ে জড়িয়ে থাকা ঘ্রাণে ডুবে যেতে? তুমি নিজেই হয়তো জানো না তোমার এই সম্মোহনী ক্ষমতা।

বর্ণিল সাজে প্রেয়সী। ছবিঃ সংগ্রহ

এটা নিয়ে আমি অনেক অনেক ভেবেছি, যে কেন কারো রঙ, রূপ, সাজ, পোশাক, হাসি, কান্না, অভিমান, উচ্ছাস এসব বাদ দিয়ে বা এগুলো উপেক্ষিত থেকে যায় কারো শরীরের গন্ধে, ঘ্রাণে, নেশায়, মাদকতায়? কি আছে ওই ঘ্রাণে, গন্ধে যা এমন নেশাতুর করে তোলে? এতটা মোহাচ্ছন্ন করতে পারে কাউকে?

তখন একদিন উপলব্ধ হলো এই রঙ, রূপ, সাজ, পোশাক, উচ্ছ্বাস, হাসি, কান্না, মান-অভিমান এসবই সময় আর পরিস্থিতির সাথে পরিবর্তনশীল। এক এক সময়ে, এক এক পরিস্থিতিতে এসবের অদল বদল বা রূপের পরিবর্তন ঘটে থাকে। শুধু যেটার পরিবর্তন হয় না, সেটা হলো প্রতিটি জিনিসের নিজস্ব ঘ্রাণের, গন্ধের। পার্থিব সকল কিছুর নিজের একটা নিজস্ব ঘ্রাণ বা গন্ধ থাকেই। যেটা ঘ্রাণ বা গন্ধ তাকে আলাদা করে উপস্থাপন করে অন্যদের কাছে। হয়তো সবাই সবকিছুর এই ঘ্রাণটা পায় না, অনুভব বা উপলব্ধি করতে পারে না। ওই ঘ্রাণের সুখ সাগরে ডুবে যেতে পারে না, সাঁতার কাটতে জানে না।

কিন্তু একবার যদি কোনো কিছুর গন্ধ কাউকে পেয়ে বসে, কারো শরীরের ঘ্রাণকে কেউ ভালোবেসে ফেলে, তখন সেখানে, সেই ঘ্রাণে, সেই গন্ধে, সেই মানুষ বা পার্থিব কিছুর প্রতি যে আকর্ষণ, যে আবেগ, যে সম্মোহন, যে মাদকতা আর নেশার তৈরি হয়, তা থেকে আর মুক্তি মেলে না, পাওয়া যায় না। তখন ওই গন্ধ, ওই ঘ্রাণ আর ওই নেশাতুর পার্থিবতা অপার্থিব আকর্ষণে কাছে টেনে নেয়, আঁকড়ে ধরে, আবেগে আপ্লুত করে দেয়।

পাহাড়ের সাথে নদীর কথোপকথন। ছবিঃ লেখক

আমি পেয়েছি সেই গন্ধ, সেই ঘ্রাণ, সম্মোহিত হয়েছি, নেশায় পাতাল হয়ে বারে বারে ছুটে আসতে বাধ্য হই, হয়েছি, তোমার সবটুকু জুড়ে জড়িয়ে, ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ওই অমোঘ ঘ্রাণের প্রতি। তোমার সবকিছু জুড়ে, পাহাড়, সবুজ অরণ্য, অভিমানী মেঘ, মন খারাপের কুয়াশা, বয়ে চলা পাহাড়ি নদী, ঝর্ণা ঝিরি, আকাশে-বাতাসে, পথে-প্রান্তরে যেখানই যাই না কেন আমি এই গন্ধটা পাই। কোথা থেকে যে এই গন্ধ আসে, কোথায় যে সে থাকে, আর কেউ এমন করে পায় কিনা আমি জানি না।

তোমার সবকিছু জুড়ে থাকা এই গন্ধের প্রতি, এ আমার এক অদ্ভুত ভালোলাগা, অবাধ্য আবেগ, অশান্ত আবদার, অসহ্য সুখ, অবাক বিস্ময়, অসুস্থ সম্মোহন, অনন্ত সম্ভোগ, তুমি জানো কী?

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

পেহেলগাম: মন যেখানে মাতাল হয়ে যায়

রাজা নীলকণ্ঠ রায়ের স্মৃতি বিজরিত অভয়নগরের এগারো শিব মন্দির