গভীর অরণ্য, দুটি কুকুর ও বন্ধুত্বের গল্প!

শিলিগুড়ি-কালিম্পং হয়ে লাভা পৌঁছাতে পৌঁছাতে দুপুর গড়িয়ে গেছে। বেশ কিছু কাঠখড় পুড়িয়ে। মূল লক্ষ্য রিশপ যাওয়া। কিন্তু আজ আর রিশপ যাওয়া সম্ভব না, কারণ চারদিক মেঘে ঢেকে গেছে, কিছুই দেখা যাবে না। তাই লাভাতেই থাকার জন্য মনস্থির করলাম।

এদিক-ওদিক ঘুরে-ঘুরেও কোনো থাকার জায়গা পাওয়া যাচ্ছে না,কারণ এখন লাভাতে পর্যটক বা পর্যটন মৌসুম নয়, তাই প্রায় সব হোটেল বা লজই বন্ধ। তবুও খুঁজে-খুঁজে একটি লজ পেলাম একেবারে মনের মতো দামে। সেই সাথে বিকেল বেলাই স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে জেনে নিলাম কীভাবে রিশপ যেতে হবে।

মেঘ-কুয়াসার লাভা। ছবিঃ লেখক

লাভা থেকে রিশপ যাবার দুটো উপায়।

১) যদি গাড়িতে যেতে চান, তো ভাঙা-কাঁচা আর বেশ ঝুঁকিপূর্ণ ১২ কিলো আর পাথুরে রাস্তা।

২) পরের উপায় হেঁটে যাওয়া, মাত্র ৪ কিলো! কিন্তু একদম গহীন জঙ্গল, সুনসান নীরবতা, ভাঙা পাহাড়ি রাস্তা, যেখানে আছে পথ হারিয়ে ফেলার সম্ভাবনাও! সময় লাগবে ১:৩০-২ ঘণ্টা।

তাই এখন হেঁটে যাবেন নাকি জীপ রিজার্ভ করে যাবেন, সেই সিদ্ধান্ত আপনাকেই নিতে হবে।

ডানে সেই পথের শুরু।  ছবিঃ লেখক

ঘুম ভেঙে গেল ভোর ৫টায়। এলার্ম বাজার আগেই। মোটা কম্বলের মধ্যে থেকে বের হতে ইচ্ছে হচ্ছিল না কিছুতেই। অথচ ঢাকায় ফ্যানের বাতাসেও কাজ হচ্ছিল না গতকাল! আর এই লাভাতে দুই-দুইটি মোটা কম্বলের নিচ থেকে শরীর উঠতে চাইছে না!

তবুও উঠলাম, যাই। যদি দেখা যায় সাধের কাঞ্চনজঙ্ঘা! তবে এই মেঘে ঢাকা সময়ে রিশপ আসাটা সার্থক হবে। কষ্ট করে হলেও শীতের উষ্ণ আর আরামের বিছানা ছেড়ে উঠে ফ্রেশ হয়ে ছোট ব্যাগে দরকারি খাবার, ব্রেকফাস্টের কেক, চকলেট, চুইংগাম, পানি নিয়ে গরম কাপড় আর টুপি পরে বের হলাম।

বাইরে একেবারে সুনসান নীরবতা। একটি প্রাণীরও দেখা নেই কোথাও! এসব জায়গার মানুষরা এমনিতেও অনেক অনেক দেরীতে ঘুম থেকে জাগে শীতের জন্য। পথে কয়েকটি কুকুর তাদের ঘুম শেষে রোদের জন্য অপেক্ষা করছে গায়ে ওম মাখবে বলে। অদূরে জঙ্গলের ভেতর থেকে ভেসে আসছিল দুই একটি নাম না জানা পাখিদের গান। সূর্য দেব এখনো দেখা দেননি লাভার পাহাড়ি কোনো চূড়ায়। চারদিকে যেদিকেই চোখ ফেরাবেন পাহাড় আর পাহাড় যেন অভিবাদন জানাবে আপনাকে। সেই পাহাড়ের অদ্ভুত আকর্ষণেই পথ ধরেছিলাম আরও উঁচু পাহাড়ের পথে। রিশপের পানে।

লাভার পথের শেষ। পথে

কয়েক মিনিট যেতেই পিছনে অন্য কারো উপস্থিতি অনুভব করছিলাম। তাকিয়ে দেখি, সদ্য ঘুম থেকে উঠে আড়মোড়া ভাঙা দুটি কুকুর আমার পিছে পিছে হেঁটে চলেছে! উহ কী বিরক্তিকর! তাই স্বভাব বশতই বলে বসলাম-

“যাহ, কুকুর, যাহ!”

কিন্তু সেই কুকুর দুটি আর কোথাও যায় না, ঠিক আমার পিছু-পিছু হেঁটে চলেছে!

একবার ভাবুন তো, পথে যেতে যেতে যদি আপনাকে কোনো কুকুর অনবরত অনুসরণ করে সেটা কতটা বিরক্তির উদ্রেক করবে?

বারবার করে পিছন ফিরে তাকাই আর সেই কুকুর দুটিকে বলি, “যাহ কুত্তা, যাহ!”

এভাবে প্রায় ১৫ মিনিট হাঁটার পরে যেখানে রাস্তা শেষ হয়েছে, ঠিক শেষ নয়, রাস্তার এক জায়গায় গেট করে তালা লাগানো আছে, ওপাশে আর যাওয়া যাবে না, যে কোনো কারণেই হোক। তবুও যেতে উদ্যত হতেই কুকুর দুটি ঘেউ-ঘেউ করে উঠলো! এবারই প্রথম আমার মনে কেন যেন একটু খটকা লাগলো, ওদের ডাক শোনার পর থেকেই। কেন যেন ওই রাস্তা দিতে আর যেতে মন সায় দিচ্ছিল না! তবুও আর একটু এগোলাম। আর এগোতেই একজন স্থানীয় মানুষের দেখা পেলাম, যিনি পাহাড়ি ঝর্ণার প্রাকৃতিকভাবে আর আপন মনে বয়ে চলা পানির ধারাকে পাইপ দিয়ে অন্যদিকে নেবার ব্যবস্থা করছেন।

লাভা। ছবিঃ লেখক

তাকে আমার গন্ত্যব্য আর উদ্দেশ্য বলাতে, তিনি আবার উল্টো পথে যেতে বললেন। কারণ বনের যে জায়গা থেকে রিশপ যাবার পথ রয়েছে, সেটা ফেলে এসেছি! তিনি দিক নির্দেশনা দিলেন আর সাথে বারবার করে একটি পরামর্শ দিলেন, যে বনের ভেতর দিয়ে হেঁটে যেতে-যেতে কোনোভাবেই যেন ডানে বা বামে বাঁক না নেই! কারণ বামে বাঁক নিলে আবার নিচেই নেমে যেতে হবে। যেখান থেকে শুরু করেছি হাটা, আর ডানে বাঁক নিলে বনের ভেতরে পথ হারিয়ে যাবার প্রবল সম্ভাবনা! যেখানে একবার পথ হারালে পথ খুঁজে পাওয়া খুবই কঠিন! এমনকি বন্য জানোয়ারের শিকার হওয়াটাও অসম্ভব হবে না!

তাই জঙ্গল ধরে হেঁটে হেঁটে যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো রকমে একটা গাড়ি চলাচলের উপযোগী মাটির এবং পাথুরে রাস্তা না পাবো ততক্ষণ যেন জঙ্গলে সোজা এগোতে থাকি। আর সাথের কুকুর দুটিকে উদ্দেশ্য করে তিনি বললেন,

“যা, রাস্তা দেখিয়ে নিয়ে যা, রিশপ পর্যন্ত!” (হিন্দিতে)

আর আমাকে বললেন…

“কুকুর দুটিকে সঙ্গে নিয়ে যান!” (হিন্দিতেই)

মানে কী? কুকুর সঙ্গে নিয়ে কোথায় যাবো! মনে-মনে বললাম, মুখে আর প্রকাশ না করে। সেই স্থানীয় বাসিন্দার দেয়া পথের পরামর্শ অনুযায়ী সেভাবেই আবার পেছনে গিয়ে সঠিক জঙ্গলের পথে পাহাড়ে ওঠা শুরু করলাম! আর সেই গভীর কালো অন্ধকার জঙ্গলের পাহাড়ি পথের একটু যেতে না যেতেই বুঝলাম, কেন কুকুর দুটিকে সাথে নিয়ে যেতে বলেছে!

কুয়াশা জড়ানো পাইন। ছবিঃ লেখক

বেশী নয়, মাত্র এক বা দুই মিনিট জঙ্গলের ভেতরে যেতেই, ছোট-ছোট দুই তিনটি পথের রেখা দেখা গেল, মাথার সিঁথির মতো ক্ষীণ! আর সেখানে গিয়েই প্রথম ভুলটা করলাম! সেটা হলো, আমি মূল পথ রেখে অন্য পথে চলে যেতে চাইলাম! আর সাথে-সাথে কুকুর দুটি ঘেউ-ঘেউ করে উঠলো! ওদের এই আচরণ দেখে ভীষণ অবাক হলাম! একটি ঘেউ-ঘেউ করছে, আর একটি যে পথটি সঠিক, সেখানে দাঁড়িয়ে আছে!

ওদের এই অবস্থা দেখে আমি পুরনো পথে ফিরে এলাম! আর সাথে সাথে ওদের ডাকও বন্ধ হয়ে গেল! কী অদ্ভুত একটা ভালো লাগা আর মায়া জন্মে গেল যেন কুকুর দুটির প্রতি! নিমেষেই! আর এরপর থেকে একটি কুকুর আমার সামনে আর একটি আমার পিছনে চলছে! যেন আমাকে “গার্ড অফ অনার” দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সেই “পাহাড়ের স্বর্গ উদ্যান” রিশপের পথে।

এভাবে আরও প্রায় ১৫ মিনিট জঙ্গলের লতা-পাতা-গাছের ডাল-পাহাড়ি গুল্ম, ঘাস, ঝুরো পাথর, পিচ্ছিল রাস্তা, পেরিয়ে গাড়ি চলাচলের উপযোগী সেই রাস্তাটা খুঁজে পেলাম, যেটা একটা প্রাচীন আর জরাজীর্ণ মন্দিরের বেদি ধরে উঠে গেছে! যেন একটা স্বস্তি পেলাম, জঙ্গল শেষ হয়ে যাবার।

ঘন অরণ্য। ছবিঃ লেখক

কিন্তু হায়, কোথায় শেষ হলো সেই জঙ্গল? এ তো আরও ঘন, কালো আর অন্ধকার এবং আগের চেয়ে অনেক অনেক বেশী ভয়ংকর একটা পথ! আগের জঙ্গলে পা পিছলে গেলে, তবু কোনো না কোনো গাছের সাথে আটকে থাকা যেত, কিন্তু এ যে ভয়াবহ রাস্তা। এক পাশে খাড়া পাথুরে পাহাড়, যার গায়ে গায়ে শত বছরের শ্যাওলা ধরা পাইনের সারি, অন্যান্য বুনো গাছ-গাছালি, বুড়ো বট, শত বছরের পুরনো ঝুলে থাকা বটের লতা! আর অন্য পাশে পাহাড়ের খাঁদ! একবার পা পিছলে গেলে, কোনোদিন কেউ খুঁজেও পাবে না, জানবেই না যে এখানে কেউ পড়ে বা হারিয়ে গেছে! আর এই লতা-পাতার সাথে যদি থাকে কোনো সাপ ওর সাথে পেঁচিয়ে ছোবল দেয়! তবে কী করবো? বা যদি দেখা যায় লতার সাথে ঝুলে আছে কোনো সবুজ আর বিষাক্ত সাপ!

উহ আর ভাবতে পারছি না! এই ভাবতে ভাবতেই ডান হাত চলে গেল, বাম হাতের বাহুতে, সাথে সাথে শরীরের সমস্ত রোমকুপগুলো জেগে উঠলো একসাথে! পেয়ে বাম হাতে শীতল কিছুর ছোঁয়া! ভয়ে মুষড়ে পড়ছি, তবুও একবার তাকিয়ে দেখার সাহস করে, ফিরে তাকালাম, বাম হাতের দিকে, দেখি কখন যেন আঁকড়ে ধরেছে একটা বিশাল জোঁক! উহু, কি যে কষ্টে পাথর দিয়ে ঘষে-ঘষে ওটাকে সরাতে হয়েছে, যে হাতের চামড়া পর্যন্ত ছিলে গেছে, পাথরের ঘষায়-ঘষায়!

ডানে-বামে দুটি পথ। ছবিঃ লেখক

আবারো পথ চলা, এতদূর যেহেতু এসেছি, বাকিটুকু যাবই, যা হয় হোক। কিছুদূর যেতেই থেমে যেতে হলো, পাহাড়ি রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে এক বিশাল গাছ উপড়ে যাওয়ায়। এবার তবে কীভাবে যাই?

কুকুর দুটোই পথ দেখাল আবার, কোনো রকম গাছের গুড়ির ভেতর থেকে একটি ওপাশে গিয়ে দাঁড়ালো, ওর দেখা দেখি আমিও সাহস করে গাছের গুড়ির ফাঁক দিয়ে চলে গেলাম অন্যপাশে। আবার তিনজনা একসাথে হয়ে পথ চলতে লাগলাম।

একবার কুকুর দুটোকে পরীক্ষা করার জন্য, এক কাজ করলাম। যেখানে আবার দুটি রাস্তা দুই দিকে চলে গেছে, আর দুই পাশের রাস্তাতেই দিক নির্দেশনা দেয়া আছে গাছের সাথে, রিশপ এদিকে, অ্যারো মার্ক করে। তো আমি রিশপের দিকে না গিয়ে অন্য রাস্তায় পথ ধরতেই আবার সেই দুই বন্ধু একই সাথে ডেকে উঠলো! ঠিক আগের মতো করেই! এবার পুরোপুরি নিশ্চিত হলাম যে ওরা আমাকে পথ দেখিয়েই নিয়ে যাচ্ছে রিশপের দিকে!

রিশপবের প্রবেশ দ্বার। ছবিঃ লেখক

কিছুদূর যেতেই আবার একটা আতঙ্ক ছুঁয়ে গেল, সবটুকু সত্ত্বা জুড়ে! শুনে কিছু একটা পড়ার শব্দ ঠিক আমার পিছনে! আসলে তেমন কিছুই না। গতকালের বৃষ্টিতে, গাছের পাতায় জমে থাকা বৃষ্টির ফোঁটা, বাতাসের ঝাপটায় এসে পড়েছে, নিচের শুকনো কোনো পাতায়! তাতেই এমন বিকট শব্দ হলো, যে ভয়ে প্রায় গা শিরশির করে উঠেছিল! এতই নীরব, নিস্তব্ধ আর সুনসান সেই জঙ্গল, নেওরাভ্যালী ন্যাশনাল ফরেস্ট!

এরপর একটু হাঁটি আর পিছন ফিরে সেই কুকুর দুটিকে নিজেই ডাকি “কাম বয়েস!”

আর হাসলাম নিজের সাথে নিজেই! প্রবোধ দিলাম নিজেই নিজেকে, মাথা চাপড়ে, যাদের একটু আগেই বলেছি- “যাহ কুত্তা, যা!” আর সেই ওদেরকেই কিনা বলছি “কাম বয়েস!”

ঘন অরণ্যর সেই দুই বন্ধু! ছবিঃ নিরুপায়ফি! 

এরপর আর ১০ মিনিট সেই পাহাড়ি জংলী পথ পেরোবার পরেই সামনে দেখতে পেলাম স্থানীয় দুই বাসিন্দা। যারা জংগলে যাচ্ছে তাদের জীবিকার সন্ধানে! তাদের কাছে জিজ্ঞাসা করতেই জানালো যে চলে এসেছি! সামনের বাঁকটি পেরোলেই, রিশপ।

আসলেই তাই, ৫ বা ১০ মিনিট হাঁটার পরেই চলে এলাম ছবির মতো সাজানো, সুন্দর আর অদ্ভুত আকর্ষণের, অনেক অনেক স্বপ্ন, কল্পনায় রাঙানো, ভাবনায় হারানো রিশপে!

যা দেখে মন থেকে বেরিয়ে এলো, এ যেন-

“পাহাড়ের স্বর্গ-উদ্যান”

তাই এই রোমাঞ্চকর, অ্যাডভেঞ্চারের সাথি হয়ে পাশে থেকে আর বন্ধু হয়ে পথ দেখানোর এই গল্পটির ও সেই বন্ধুদের জন্য গল্পটির নাম দিয়েছি….

“যাহ, কুত্তা! কাম বয়েস..! বা ঘন অরণ্যে, দুই কুকুরের গল্প”

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ঘুরে আসুন কাপ্তাইয়ের বেরাইন্যা লেক থেকে

সাইপ্রাসের যত অনিন্দ্যসুন্দর ভ্রমণস্থানের আদ্যোপান্ত