দারাসবাড়ি মসজিদের অপূর্ব কারুকাজের প্রাচীনতম দেয়ালগুলো

দারাসবাড়ী মাদ্রাসা ঘুরে ফিরে যাব, এমন একটা পদক্ষেপ নিচ্ছিলাম। ভাইয়ার সাথে মাদ্রাসার সীমানা পেরিয়ে মেঠোপথে নেমেছি, তখন দেখলাম, হাতের ডানপাশে কিছু হৈচৈ শোনা যাচ্ছে। ভাইয়াকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ওখানে কী?’

ভাইয়া বললো, ‘এরা সম্ভবত দারাসবাড়ি মসজিদ দেখে ফিরছে।’

আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘মসজিদও আছে?’

ভাইয়া মাথা ঝাঁকালেন।

হেঁটে মসজিদ পর্যন্ত গেলাম। একটা উঁচুভূমির উপর মসজিদটি দাঁড়িয়ে আছে। এই এলাকার সব মসজিদের দেয়ালই সম্ভবত পোড়ামাটির ফলক তথা টেরাকোটা দিয়ে তৈরি। এই মসজিদটিও তার থেকে আলাদা নয়। তবে এর বাইরের দেয়ালের টেরাকোটাগুলো তেমন নান্দনিক নয়। বাইরের দেয়াল কেন বলছি? কারণ খুবই বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, এই মসজিদের ভেতরের দেয়ালেও টেরাকোটা আছে! শুধু তাই নয়, ভেতরের টেরাকোটাগুলো আরো অনেক বেশি কারুকার্যময় আর নিখুঁত।

দারাসবাড়ি মসজিদের বাইরের দিক; Source : মাদিহা মৌ

সাধারণত কারুকার্যময় পোড়ামাটির ফলকগুলো বসানো হতো মসজিদের বাইরের দেয়ালেই। আমার দেখা টেরাকোটা সমৃদ্ধ মসজিদগুলোর মধ্যে কেবল এই মসজিদেই ভেতরের দেয়ালেও টেরাকোটা দেখতে পেয়েছি। এছাড়াও এই মসজিদের বিশেষত্ব হলো, এটায় আজান দেওয়ার জায়গা কিংবা খিলান কেবল মাত্র একটা নয়। পশ্চিম দিকের দেয়ালে নিয়মিত বিরতিতে আটটার মতো খিলান আছে। খিলানগুলোকে ঘিরে চারপাশেই রয়েছে টেরাকোটা।

আয়তাকার মসজিদটির মাথার উপর ছাদ নেই। কালের পরিক্রমায় ধ্বসে পড়েছে। ধ্বসে গেছে অনেক পিলারও। মেঝেতে জন্মেছে সবুজ ঘাস। আসলে দীর্ঘদিন মাটির নিচে চাপা পড়ে ছিল এ মসজিদ। সত্তর দশকের প্রথমভাগে খনন করে এটিকে মাটির নিচ থেকে উদ্ধার করা হয়। তাই এখন আর দারাসবাড়ি মসজিদে সালাত আদায় করা যায় না। মসজিদের ভেতরে তিনটি কক্ষ মতোন অবয়ব। এক কক্ষ থেকে অন্য কক্ষে যাওয়ার জন্য মাঝের দেয়ালগুলোতে চমৎকার মিনারাকৃতির প্রবেশদ্বার। মসজিদটি চারপাশে গাছগাছালির সারি। একপাশে একটা দীঘি আছে। দীঘিটির এক পারে মসজিদ, আর অন্য পারে মাদ্রাসা। আকারে এটি ছোট সোনা মসজিদের চেয়েও বড়।

এক কক্ষ থেকে অন্য কক্ষে যাওয়ার জন্য মাঝের দেয়ালগুলোতে চমৎকার মিনারাকৃতির প্রবেশদ্বার; Source : মাদিহা মৌ

মসজিদটির আয়তন ৯৯ ফুট ৫ ইঞ্চি ও ৩৪ ফুট ৯ ইঞ্চি। ইট নির্মিত এই মসজিদের অভ্যন্তরের আয়তক্ষেত্র দুই অংশে বিভক্ত। পূর্ব পার্শ্বে একটি বারান্দা, যা ১০ ফুট ৭ ইঞ্চি। বারান্দার খিলানে ৭টি প্রস্তর স্তম্ভের উপরের ৬টি ক্ষুদ্রাকৃতি গম্বুজ ছিল। ঠিক মাঝখানের গম্বুজটি অপেক্ষাকৃত বড় ছিল। উত্তর দক্ষিণে ৩টি করে জানালা ছিল। উত্তর পশ্চিম কোণে ছিল মহিলাদের নামাজ আদায়ের জন্য প্রস্তরস্তম্ভের উপরে একটি ছাদ। এর প্রমাণ পাওয়া যায় সেখানে অবস্থিত একটি মেহরাবের মাধ্যমে। এটি ছাড়াও পশ্চিম দেয়ালে পাশাপাশি ৩টি করে ৯টি কারুকার্য খচিত মেহরাব রয়েছে।

উপরে এখন ছাদ বা অন্য কিছু না থাকলেও একসময় ওখানে ৯টি গম্বুজ ছিল বলে ধারণা করা হয়। গম্বুজের চিহ্ন এখনো রয়েছে। দারাসবাড়ি মসজিদটির সম্পর্কে তথ্যাদি খোঁজাখুঁজি করার সময় ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে এ স্থানে একটি জঞ্জাল স্তুপের নিচে মুন্সী এলাহী বখশ একটি আরবী শিলালিপি পেয়েছিলেন। লিপিটির দৈর্ঘ্য ১১ ফুট ৩ ইঞ্চি এবং প্রস্থ ২ ফুট ১ ইঞ্চি। তোগরা অক্ষরে লেখা ইউসুফি শাহী লিপিটি এখন কলকাতা জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। কিন্তু এদেশের মসজিদের শিলালিপি কলকাতায় কেন, সেই প্রশ্নের জবাব নেই। এর নম্বর-৩১৩৯। লিপিটি লম্বায় অনেক বড়। তাই একে দু’ভাগ করতে হয়েছে।

ভিতরের টেরাকোটাগুলো অনেক বেশি কারুকার্যময় আর নিখুঁত; Source : মাদিহা মৌ

লিপির অর্থ হচ্ছে, ‘‘সর্বশক্তিমান আল্লাহ বলেন- নিশ্চয়ই সব মসজিদ আল্লাহর, সুতরাং আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করো না।’ নবীও বলেছেন, আল্লাহর জন্য যে একটি মসজিদ নির্মাণ করে, আল্লাহ তার জন্য বেহেস্তে অনুরূপ একটি প্রাসাদ তৈরি করবেন।

এই জামে মসজিদটি ন্যায়পরায়ণ ও মহান সুলতান, জনগণ ও জাতি সমূহের প্রভু, সুলতানের পুত্র সুলতান, তাঁর পুত্র সুলতানের পুত্র শামসুদ্দুনীয়া ওয়াদ্দীন আবুল মুজাফ্ফর ইউসুফ শাহ সুলতান, পিতা বরবক শাহ সুলতান, পিতা মাহমুদ শাহ সুলতান কর্তৃক নির্মিত। আল্লাহ তার শাসন ও সার্বভৌমত্ব চিরস্থায়ী করুন এবং তার উদারতা ও উপচিকীর্ষা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ুক। তারিখ ৮৮৪ হিজরী।’’

ভিতরের দিক; Source : মাদিহা মৌ

শিলালিপি থেকে বোঝা গেল, ১৪৭৯ খ্রিস্টাব্দে সুলতান শামস উদ্দীন ইউসুফ শাহের রাজত্বকালে তাঁরই আদেশক্রমে এই মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন এই মসজিদের নাম ছিল ফিরোজপুর জামে মসজিদ। বছর বিশেক পরে ১৫০২ খ্রিষ্টাব্দে যখন সুলতান হোসেন শাহ্ দারাসবাড়ি বিশ্ববিদ্যালয় তথা বাংলার প্রথম মাদ্রাসা হিসেবে খ্যাত দারাসবাড়ি মাদ্রাসা নির্মাণ করেন, তখন এই অঞ্চলের নাম দারাসবাড়ি নামে প্রসিদ্ধ হয়। তাই ফিরোজপুর মসজিদটির নাম হয়ে যায় দারাসবাড়ি মসজিদ। এ মসজিদটিও বাংলার প্রথম যুগের মুসলিম স্থাপত্যের কীর্তির একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন।

মেহরাব; Source : মাদিহা মৌ

ভারতের সীমান্তঘেঁষা হওয়ায় স্থানটিতে কোনো জনবসতি নেই। চাঁপাইনবাবগঞ্জকে বলা যায় মসজিদের নগরী। এই মসজিদের নগরীতে যত মসজিদ দেখেছি, তার মধ্যে এটিই সবচেয়ে সুন্দর।

কীভাবে যাবেন

চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার শাহবাজপুর ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী গ্রাম ওমরপুরে দারাসবাড়ি মসজিদ অবস্থিত। জায়গাটি জেলা সদর থেকে থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরের ছোট সোনা মসজিদ ও ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের মাঝামাঝি জায়গায় রয়েছে।

বাস অথবা সিএনজিতে যাওয়া যায়। যেতে প্রায় ১ ঘণ্টা ১০ মিনিট সময় লাগে। তাই দারাসবাড়ি মসজিদে যেতে হলে আপনাকে আগে চাঁপাইনবাবগঞ্জ যেতে হবে।

কারুকার্যের মায়ায়; Source : মাদিহা মৌ

ঢাকা থেকে রাজশাহী হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের দূরত্ব ৩১৯.৪ কিলোমিটার। চাঁপাইনবাবগঞ্জ যাওয়ার দুটো পথ আছে। সড়কপথ আর রেলপথ। সড়কপথে যেতে হলে ঢাকার যেকোনো স্থান থেকে আপনাকে প্রথমে যেতে হবে- সায়েদাবাদ, গাবতলি কিংবা উত্তরা। এসব জায়গা থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ যেতে পারবেন এসি বা ননএসি বাসে। নন এসি বাসগুলো হলো- হানিফ, শ্যামলী, দেশ ট্রাভেলস, একতা, গ্রামীণ ট্রাভেলস, সৌদিয়া, ন্যাশনাল, তুহিন, আকিব ইত্যাদি। ভাড়া পড়বে ৫৮০ টাকা। বাসে অন্তত সাড়ে সাত ঘণ্টা লাগবে। জ্যামে পড়লে, আরো বেশি।

ট্রেনে যেতে হলে আগে থেকেই টিকিট কেটে রাখতে হবে। কমলাপুর কিংবা এয়ারপোর্ট থেকে ট্রেনে উঠতে পারবেন। ভাড়া ৩৮০ টাকা। ট্রেনের নাম পদ্মা। বেশ ভালো ট্রেন। কমবেশি সাত ঘণ্টায় পৌঁছে যাবেন।

তারপর চাঁপাইনবাবগঞ্জ টার্মিনাল থেকে চলে যেতে পারবেন লোকাল বাসে চলে যেতে পারবেন শিবগঞ্জের দারাসবাড়ি মাদ্রাসা। আবার আমাদের মতো গৌড় নগরীর সবগুলো পুরাকীর্তি দেখার জন্য গাড়িও রিজার্ভ করে নিতে পারেন। ৭-৮ জনের জন্য সারা দিনের এসি হায়েসের ভাড়া পড়বে ২,৫০০ টাকা।

এগুলো কী, বুঝতে পারিনি; Source : মাদিহা মৌ

কোথায় থাকবেন

যদি একদিনের ট্যুর প্ল্যান করেন, তাহলে রাতের ট্রেন বা বাসে গিয়ে সারাদিন ঘুরে রাতেই ফিরতে পারবেন। তখন ওখানে থাকার চিন্তা না করলেও হবে। এরপরও যদি আপনি চাঁপাইনবাবগঞ্জে রাত্রিযাপন করতে চান সেক্ষেত্রে আপনার জন্য রয়েছে খুব ভালো একটা অপশন। বড় ইন্দারা মোড়ে পাবেন একটা তিন তারা আবাসিক হোটেল। নাম, স্কাই ভিউ ইন। এছাড়াও আছে আল নাহিদ হোটেল, আল হেরা হোটেল, সোনা মসজিদ হোটেল, থ্রি স্টার হোটেল, লাল বোর্ডিং।

তাছাড়া সরকারি ডাকবাংলো আর রেস্ট হাউস রয়েছে থাকার জন্য। সরকারি ডাকবাংলো শহরের সদর হাসপাতালের কাছেই। অন্যান্য হোটেলগুলো সব শহরের মধ্যেই। কেবল সোনামসজিদ হোটেলটি সোনামসজিদের কাছে। এসব হোটেলের ভাড়ার রেঞ্জ এসি ১,০০০ থেকে শুরু এবং নন এসি ৬০০ টাকা থেকে শুরু।

কারুকার্যখচিত; Source : মাদিহা মৌ

সতর্কতা

পুরাকীর্তি আমাদের সম্পদ। সেসব দেখতে গিয়ে আশেপাশে ময়লা ফেলে আসবেন না। দালানে নিজের নাম লিখে আসবেন না। নিজের দেশকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখুন। নিজে না শুধরালে, অন্যজনের কাছে তা আশা করা বোকামি। আপনি নিজেই যদি দর্শনীয় জায়গাগুলো পরিষ্কার না রাখেন, অন্যজন রাখবে তা কী করে প্রত্যাশা করেন?

Feature image – মাদিহা মৌ

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

মিষ্টি সকালে রোমান্টিক ধাবায়

গোমুখ অভিযান: শরতের পাহাড় ও হাতের মুঠোয় কল্পনা