বাংলার সর্বপ্রাচীন মাদ্রাসারূপে আখ্যায়ী দারসবাড়ি মাদ্রাসা

rrem

প্রাচীনকালের বাংলার দুই প্রদেশ গৌড় ও লখনৌতি এখন দুটি আলাদা দেশে। এই দুই প্রদেশের সীমান্তে কোতোয়ালি দরওয়াজা। সীমান্তে বললেও ভারতীয় সীমানার একটু ভেতরে। যেহেতু এটা ভারতের সীমানায়, তাই এটাকে বাংলাদেশের কোনো দর্শনীয় স্থান বলা যায় না। কে যে এটাকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের দর্শনীয় স্থানের আওতাভুক্ত করেছে, সেটা ভেবেই অবাক হই। সীমানার কাছ থেকে গাড়ি ঘুরিয়ে চালক এবার আমাদের নিয়ে এলো দারসবাড়ি বা দারাসবাড়ি মাদ্রাসার রাস্তায়।

পিচঢালা প্রধান রাস্তার পাশ দিয়ে একটা মাটির শাখা রাস্তা চলে গেছে। কদিন আগে বৃষ্টি হওয়ায় সে মেঠোপথ কর্দমাক্ত হয়ে আছে। তাই আবারোও হাঁটতে হবে। চাঁপাই বেড়াতে এসে কেউ গরমের জন্য হাঁটতে চাচ্ছে না। দানিয়াচক মসজিদ দেখতে গিয়ে এত কষ্ট করতে হয়েছে বলে ইভা আর রুদ্র গাড়ি থেকে বেরই হলো না। কষ্ট হোক আর যাই হোক, ঘুরতে এসে গাড়িতে বসে থাকার বান্দা আমি নই। একে একে দলের বাকি পাঁচজনও বের হলো।

প্রবেশদ্বার; Source : মাদিহা মৌ

মাথার উপর ছাতা খুলে হাঁটতে শুরু করলাম। মিনিট পাঁচেক হাঁটার পর পাওয়া গেল দারসবাড়ি মাদ্রাসা। এটা দেখে প্রথমেই আমার মনে পড়লো কুমিল্লার লতিকোট মুড়ার কথা। কারণ লতিকোট বিহারের মতোই দারসবাড়ি মাদ্রাসার যেটুকু স্থাপনা টিকে আছে, তা মূল অংশের অর্ধেকটুকু। তবে এটা মাটির নিচ থেকে উদ্ধার হয়েছে, নাকি এরকমভাবেই ছিল তা জানতে পারিনি।

দারাসবাড়ি মাদ্রাসা; Source : মাদিহা মৌ

বিশাল এলাকা নিয়ে তৈরি হয়েছিল মাদ্রাসাটি। ধারণা করা হয়, এটিই বাংলাদেশের প্রথম মাদ্রাসা। বৌদ্ধদের বিহারের সাথে একটা মাদ্রাসার আকৃতিতে কেন মিল থাকবে তা ভাবনায় এলো। অবশ্য বিহার হলো বৌদ্ধ ধর্মের সাথে সম্পৃক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ভিক্ষুদের বাসস্থান, ধর্মীয় আচারাদি সম্পন্ন ও ধ্যান করার স্থান। সেই সাথে অবশ্যই বৌদ্ধ শিক্ষার কেন্দ্র। মাদ্রাসাও ইসলাম ধর্মের সাথে সম্পৃক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

বেশিরভাগ মাদ্রাসাতেই ছাত্রদের আবাসিক ব্যবস্থা থাকে। সেখানে তারা শিক্ষাগ্রহণের সাথে সাথে ধর্মচর্চাও করে। উদ্দেশ্য যেহেতু একই, সেই সাথে দুই ধরনের স্থাপনাই পাঁচশ বছর আগেকার, তাই স্থাপত্যকলায় মিল থাকতেই পারে। বিহারগুলো সাধারণত প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী কুষাণ রীতিতে গড়া হতো। বর্গাকৃতি ব্লক রীতির এবং একটি অভ্যন্তরীণ অঙ্গনের চারদিকে চার সারিতে থাকতো কক্ষসমূহ। মাদ্রাসাটি একই রীতিতে নির্মিত।

প্রাচীনতম কলেজ; Source : মাদিহা মৌ

সাইনবোর্ড থেকে জানতে পারলাম, দারাসবাড়ি মসজিদের ১৫০ মিটার পূর্ব দিকে দারাসবাড়ি মাদ্রাসা অবস্থিত। এই ঐতিহাসিক স্থাপনা বর্গাকার পরিকল্পনায় নির্মিত। প্রতিটি বর্গের বিস্তার ৫১.৬২ মিটার পর্যন্ত। এই স্থাপনার মাঝামাঝি অংশে ৩৭.৫০ পরিমাপের বর্গাকার চত্বরের পশ্চিম বাহু ব্যতীত অপর তিন বাহুতে এক সারি করে প্রকোষ্ঠ এবং তিন বাহুর মধ্যবর্তী স্থানে একটি করে প্রবেশদ্বার আছে।

পশ্চিম বাহুর মধ্যবর্তী স্থানে পাশাপাশি তিনটি সালাতকোঠা আছে। সালাতকোঠার পশ্চিম দেওয়ালে তিনট অবতল মেহরাব আছে। শোভাবর্ধক পোড়ামাটির ফলক ও নকশা ইট দ্বারা দেয়ালগুলো অলংকৃত। সম্ভবত এটিই বাংলাদেশের প্রাচীনতম মাদ্রাসার নিদর্শন। এখানে প্রাপ্ত একটি শিলালিপির পাঠোদ্ধার থেকে জানা যায় এটি ১৫০৪ খ্রিষ্টাব্দে আলাউদ্দিন হোসেন শাহের শাসন আমলে নির্মিত।

কারুকাজ; Source : মাদিহা মৌ

আলাউদ্দিন হোসেন শাহের সময়কে বাংলার স্বর্ণযুগ বলা হতো। কারণ তাঁর সময়ে বাংলায় ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও সমৃদ্ধি বজায় ছিল। আলাউদ্দিন হোসেন শাহের সময়কালেই কোনো রকম নিগ্রহ ছাড়াই শ্রী চৈতন্য বৈষ্ণব ধর্ম প্রচার করেন। সেকালে হিন্দু পন্ডিতেরা সাহিত্য চর্চা করলেও হোসেন শাহ এই রীতি ভাঙেন। তিনি সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। সব মিলিয়ে যা অনুমান করা যায়, তা হলো আলাউদ্দিন হোসেন শাহের ধর্মীয় সহিষ্ণু মনোভাবের কারণেই হয়তো দারাসবাড়ি মাদ্রাসাটির নির্মাণশৈলী বিহারের সাথে মিলে যায়।

শতাধিক বছর আগে প্রখ্যাত আর্কিওলজিষ্ট কানিংহাম ফিল্ড ভিজিটে এসে এটিকে দারসবাড়ি বা কলেজ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন এবং তার উপর ভিত্তি করেই একে সবচেয়ে প্রাচীন মাদ্রাসা রূপে চিহ্নিত করা হয়েছে।

আলপনা; Source : মাদিহা মৌ

কীভাবে যাবেন

দারাসবাড়ি মাদ্রাসাটি চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার ওমরপুর নামক জায়গায় অবস্থিত। দারাসবাড়ি মাদ্রাসায় যেতে হলে আপনাকে আগে চাঁপাইনবাবগঞ্জ যেতে হবে।

ঢাকা থেকে রাজশাহী হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের দূরত্ব ৩১৯.৪ কিলোমিটার। চাঁপাইনবাবগঞ্জ যাওয়ার দুটো পথ আছে। সড়কপথ আর রেলপথ। সড়কপথে যেতে হলে ঢাকার যেকোনো স্থান থেকে আপনাকে প্রথমে যেতে হবে- সায়েদাবাদ, গাবতলি কিংবা উত্তরা। এসব জায়গা থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ যেতে পারবেন এসি বা ননএসি বাসে। নন এসি বাসগুলো হলো- হানিফ, শ্যামলী, দেশ ট্রাভেলস, একতা, গ্রামীণ ট্রাভেলস, সৌদিয়া, ন্যাশনাল, তুহিন, আকিব ইত্যাদি। ভাড়া পড়বে ৫৮০ টাকা। বাসে অন্তত সাড়ে সাত ঘণ্টা লাগবে। জ্যামে পড়লে, আরো বেশি।

অপেক্ষা; Source : জাকির হোসেন

ট্রেনে যেতে হলে আগে থেকেই টিকিট কেটে রাখতে হবে। কমলাপুর কিংবা এয়ারপোর্ট থেকে ট্রেনে উঠতে পারবেন। ভাড়া ৩৮০ টাকা। ট্রেনের নাম পদ্মা। বেশ ভালো ট্রেন। কমবেশি সাত ঘণ্টায় পৌঁছে যাবেন।

তারপর চাঁপাইনবাবগঞ্জ টার্মিনাল থেকে চলে যেতে পারবেন লোকাল বাসে চলে যেতে পারবেন শিবগঞ্জের দারাসবাড়ি মাদ্রাসা। আবার আমাদের মতো গৌড় নগরীর সবগুলো পুরাকীর্তি দেখার জন্য গাড়িও রিজার্ভ করে নিতে পারেন। ৭-৮ জনের জন্য সারা দিনের এসি হায়েসের ভাড়া পড়বে ২,৫০০ টাকা।

কোথায় থাকবেন

যদি একদিনের ট্যুর প্ল্যান করেন, তাহলে রাতের ট্রেন বাসে গিয়ে সারাদিন ঘুরে রাতেই ফিরতে পারবেন। তখন ওখানে থাকার চিন্তা না করলেও হবে। এরপরও যদি আপনি চাঁপাইনবাবগঞ্জে রাত্রিযাপন করতে চান সেক্ষেত্রে আপনার জন্য রয়েছে খুব ভালো একটা অপশন। বড় ইন্দারা মোড়ে পাবেন একটা তিন তারা আবাসিক হোটেল। নাম, স্কাই ভিউ ইন। এছাড়াও আছে আল নাহিদ হোটেল, আল হেরা হোটেল, সোনা মসজিদ হোটেল, থ্রি স্টার হোটেল, লাল বোর্ডিং।

তাছাড়া সরকারি ডাক বাংলো আর রেস্ট হাউস রয়েছে থাকার জন্য। সরকারি ডাকবাংলো শহরের সদর হাসপাতালের কাছেই। অন্যান্য হোটেলগুলো সব শহরের মধ্যেই। কেবল সোনামসজিদ হোটেলটি সোনামসজিদের কাছে। এসব হোটেলের ভাড়ার রেঞ্জ এসি ১,০০০ থেকে শুরু এবং নন এসি ৬০০ টাকা থেকে শুরু।

একটু ছুঁয়ে দেখার আকুতি; Source : মাদিহা মৌ

সতর্কতা

পুরাকীর্তি আমাদের সম্পদ। সেসব দেখতে গিয়ে আশেপাশে ময়লা ফেলে আসবেন না। দালানে নিজের নাম লিখে আসবেন না। নিজের দেশকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখুন। নিজে না শুধরালে, অন্যজনের কাছে তা আশা করা বোকামি। আপনি নিজেই যদি দর্শনীয় জায়গাগুলো পরিষ্কার না রাখেন, অন্যজন রাখবে তা কী করে প্রত্যাশা করেন?

Feature image – মাদিহা মৌ

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ইতালিতে যাওয়ার জন্য বছরের সেরা সময়

বেহুলার বাসর ঘরের গল্পগাঁথা