দক্ষিণেশ্বর মন্দির ও অলস কলকাতায় বৃষ্টি বিলাস

বৃষ্টির দিন কলকাতার দিনগুলো বেশ আলসেমিতে কাটছিলো। আজ কোথাও ঘুরে না আসলে দুইটা দিনই বৃথা যাবে ভেবে বন্ধু জয়কে বললাম চল বাইরে যাই, কিছু খেয়ে আসি। বাইরে বলতে আমার মতলবটা ওকে বুঝতে দেইনি কারণ জয় আমার থেকে বেশি ঘরকুনো স্বভাবের। বাইরে বেরিয়ে দেখলাম বৃষ্টি বেশ কমে এসেছে। গত কয়েকদিন ধরেই রয়েছি দূর্গানগরে জয়ের বাসায়।

কেন বসে আছি জানি না কিন্তু কলকাতা ঘুরতে ভালোই লাগছে। বললাম চল দমদমের ট্রেন ধরি। দেখালাম অনায়াসেই রাজি হয়ে গেল। বেশ ঘন ঘন ট্রেন যায় এই লাইনে তাই দুপুর বারোটার সময় ডাউনে বেশ ভিড় ছাড়া ট্রেনে চেপে বসলাম। মিনিট দশেকের মধ্যে দমদম নেমে বললাম আজ দক্ষিনেশ্বর গেলে কেমন হয়?

বৃষ্টিন্সাত স্টেশন। ছবিঃ মিহির বিশ্বাস 

আমার মতলব বুঝতে পেরে দেখলাম জয় বেশ করে একটা হাসি দিলো। বলল আচ্ছা চল, বালির ট্রেন ধরতে হবে। যে কথা সেই কাজ ১ মিনিটের মাথায় একটা ট্রেন পেয়ে গেলাম। ভাগ্য বেশ ভালো ছিল বলা চলে। ট্রেনে উঠে সিট পর্যন্ত পেয়ে গেলাম। দমদম স্টেশন থেকে দক্ষিনেশ্বর কালি মন্দির এক বা দুই স্টেশন পরেই। তাই দাঁড়িয়ে থাকলেও চলে।

১৫ মিনিটের মাথায় পৌঁছে গেলাম দক্ষিনেশ্বর স্টেশনে। সামনে বিশাল হুগলী নদী। নদী পার হয়ে চলে গিয়েছে কলকাতার একমাত্র রেল ব্রিজ। যাকে বালি ব্রিজও বলা হয়। স্টেশনে নেমে দেখলাম টোটো চালকেরা ডাকাডাকি করছে মন্দির পর্যন্ত যাবার জন্য। জয়কে বললাম চল, হেঁটেই যাই।

লোকের ভিড়। ছবিঃ মনিস পাল 

২০ মিনিট ইতস্তত হাঁটার পর পৌঁছলাম মন্দিরের গেটে। একটু সামনে থেকেই দেখা যায় বিশাল মন্দিরটি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে বিশাল গঙ্গা নদী। হুগলী জেলার গঙ্গার এই অংশটুকুকে হুগল নদী নামেই ডাকে সকলে। এটি মূলত উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার কামারহাটিতে অবস্থিত। ১৮৮৫ সালের দিকে তৎকালিন রানী রাসমণি এই মন্দিরটি স্থাপনা করেন। মন্দির নিয়ে অজস্র গল্পের প্রচলন আছে এলাকা ভেদে।

একটা গল্পে বলা হয় হুগলি নদীর পূর্ব পাড়ের বরাহনগরে রয়েছে কৃপাময়ী কালী মায়ের মন্দির। ১৮৪৮ সালে এলাকার জমিদার জয়রাম মিত্র নির্মাণ করেন মন্দিরটি। যে কারণে এই মন্দির ‘জয় মিত্তির কালীবাড়ি’ নামেও অনেকে চেনেন। মূল মন্দির ছাড়াও এখানে রয়েছে ভিন্ন বারোটি শিব মন্দির। কথিত, এই কালী মন্দিরের আদলেই পরবর্তীকালে দক্ষিণেশ্বরের মন্দির নির্মাণ করা হয়েছিল।

১৮৬৫ সালের মন্দির। ছবিঃ উইকিপিডিয়া 

জান বাজারের রানী রাসমণি তখন জায়গা খুঁজে বেড়াচ্ছেন ভবতারিণীর মন্দির তৈরি করার জন্য। গঙ্গার পাড়ের বালি, শেওড়াফুলির উত্তরপাড়া জমিদারদের সঙ্গে জায়গা নিয়ে কথাও বলেছিলেন তিনি। জমির খোঁজে এমনই একদিন তিনি নৌকায় করে ভেসে চলেছিলেন। শেওড়াফুলি ঘাটের পাশ দিয়ে যেতে যেতে হঠাৎ ঘাটের দিকে নজর পড়ে রানী রাসমনীর। ঘাটের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটি ছোট্ট মেয়ে। পরনে লাল পাড় সাদা শাড়ি। হাতছানি দিয়ে ডাকছে রানীমাকে।

মেয়েটির ডাকে সাড়া দিয়ে ঘাটে পৌঁছলে, মেয়েটি তাঁকে নিয়ে যায় নিস্তারিণী মন্দিরে। রানীমা অবাক হয়ে দেখেন যে, মেয়েটির মুখ অবিকল মাতৃমূর্তির মতো এবং কিছু বোঝার আগেই মেয়েটি অদৃশ্য হয়ে যায়। এর পরেই দক্ষিণেশ্বর মন্দির নির্মাণের কাজ শুরু করে দেন নদীর পাড়েই। 

মন্দিরের সামনে । ছবিঃ উইকিপিডিয়া 

মন্দিরের এলাকায় প্রবেশ করে অদ্ভুত একটা মিশ্র অনুভূতি কাজ করছিল। গঙ্গার নির্মল বাতাসের সাথে পুজো আর্চনার এক অনবদ্য শব্দ কানে বেজে চলছিলো। জয় দেখলাম প্রণাম করার জন্য সামনে এগিয়ে গেল। আমি চারদিকের মানুষ দেখছিলাম। মানুষের ঢল বেশ ভালো রকমের ছিল। আর যত সময় যাচ্ছিল তত মানুষের ঢল বেড়ে চলছিল।

মন্দিরের গায়ে সুন্দর টেরাকোটার কাজ দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলাম আমি। আমি কম বেশী কিছু প্রাচীন স্থাপনায় ঘুরেছি কিন্তু এই মন্দিরের মতো সুন্দর আর বিশাল কাজের সম্ভার আমি খুব কম জায়গাতেই দেখেছি।

শিব মন্দির। ছবিঃ মিহির বিশ্বাস 

এর পাশেই আছে শিব মন্দির। একসাথে ১২টা শিব মন্দির দেখে অবাক হয়েছিলাম। একই ধরনের কাঠামোতে বানানো পাশাপাশি এই মন্দিরগুলো তৈরি করা হয়েছে। দেখতে দেখতে লোকের ভিড় বাড়ছিল। তাই মন্দির এলাকায় না থেকে ঘাটের দিকে চলে আসলাম। বেশ বড় করে মন্দিরের পাশে একটা ঘাট বানানো। এখানেই অনেকে গঙ্গা পুজো করেন,  এই বিশুদ্ধ জলে স্নান সেরে পবিত্র হবার কাজেও ব্যবহার করা হয়। এখানেও বেশ ভিড় ছিল কিন্তু অপেক্ষাকৃত কম।

এত ভিড়ের মধ্যে ভালো লাগছিল না তাই জয়কে নিয়ে বেরিয়ে যাবার জন্য সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। হাঁটতে হাঁটতে গল্পগুলো পড়ছিলাম এই মন্দির সম্পর্কে। এই গল্পগুলোর মাঝে বেঁচে থাকে এই রকম পুরনো স্থাপত্যের ইতিহাসগুলো। আমরাও তার সাক্ষী হয়ে ফেরার পথে পা বাড়ালাম।

নদী থেকে মন্দির।  ছবিঃ অঘ্রাণ 

মন্দির খোলা ও পুজোর সময়সূচী

মন্দিরটি মূলত অক্টোবর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত ভোর ৬টা থেকে দুপুর ১২.৩০টা এবং বিকাল ৩টে থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত খোলা থাকে। আবার এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর অবধি আবার সকালে ভোর ৬টা থেকে দুপুর ১২.৩০টা পর্যন্ত এবং বিকেলে ৩টে থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মন্দির খোলা থাকে। ভোগ খেতে চাইলে ভোরে এসে কুপন কেটে খাওয়া যায়। জনপ্রতি ৫০ রুপি করে খরচ হয়।

একটু ভিড় কম চাইলে আসতে হবে সকাল ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে। ওইসময় মন্দিরে কিছুটা ভিড় কম থাকে। এর পরে দুপুর ১২.৩০টা পর্যন্ত মন্দির খোলা থাকে। প্রতিদিন মঙ্গল আরতি হয় সূর্য ওঠার আগে। গ্রীষ্মকালে ভোর ৪টা ও শীতকালে ভোর ৫টায়। আর সন্ধ্যা আরতি হয় শীতকালে সন্ধ্যা ৬.৩০টায় আর গ্রীষ্মকালে সন্ধ্যা ৭টায়।

রুট ও খরচের খসড়া

শিয়ালদহ বা দমদম থেকে সরাসরি ট্রেন আছে দক্ষিনেশ্বর স্টেশন পর্যন্ত। ভাড়া পড়বে ১০ রুপি। সেখান থেকে টোটোতে ভাড়া নেবে ১০ রুপি রিকশায় ২০ রুপি অথবা হেঁটে গেলে ১৫-২০ মিনিটের মধ্যে পৌঁছানো যাবে। আর হাওড়া থেকে হলে, ট্রেনে করে চলে আসতে হবে বালিঘাট। ভাড়া পড়বে ১০ রুপির মতো। বালিঘাট থেকে সরাসরি নদী পার হয়ে নৌকাতেও দক্ষিনেশ্বর ঘাটে নেমে যাওয়া যাবে অথবা কোনো লোকাল ট্রেন ধরে দক্ষিণেশ্বর স্টেশনে নেমে উপরের পদ্ধতিতে যেতে হবে।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা সেরা ১৩টি ক্যাম্পিং সাইট

উচ্চতার স্বপ্ন ও চন্দ্রখনি পাসের ইতিবৃত্ত