খুলনার দক্ষিণডিহি: ঠাকুরের শ্বশুরবাড়ির পথে

“…কবিগুরু একবার কিছু বন্ধু বান্ধব নিয়ে বাংলা মুলুকের বাইরে পাত্রী দেখতে গেলেন। পাত্রী খুব ধনী, সাত লাখ টাকার উত্তরাধিকারী। সে যুগে সাত লাখ টাকা যৌতুক, ভাবা যায়! তিনি যে ঘরে বসে আছেন, সে ঘরে দুজন অল্প বয়সী মেয়ে এসে বসল। এক জন নেহায়েত চুপচাপ, সাধাসিধে, জড়ভরতের মতো এক কোণায় বসে রইল। অন্য মেয়েটি যেমন সুন্দরী, তেমনি চটপটে, স্মার্ট। একটুও জড়তা নেই, সুন্দর ইংরেজি উচ্চারণ। পিয়ানো বাজাল দারুণ। সংগীত নিয়ে জ্ঞানগর্ভ টুকটাক আলোচনাও করল। রবীন্দ্রনাথের খুব পছন্দ হলো মেয়েটিকে। এমন সময় বাড়ির কর্তা ঘরে ঢুকে শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর মেয়ে দুটির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। সুন্দরী মেয়েটিকে দেখিয়ে বললেন, ‘হিয়ার ইজ মাই ওয়াইফ। ‘ আর জড়ভরতকে দেখিয়ে বললেন, ‘হিয়ার ইজ মাই ডটার।’ পাত্রী দেখার দল বিস্ময়ে হতবাক!…” 

সংস্কারের পূর্বে; ছবি: Bangla Tribune

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিয়ে নিয়ে হুজ্জত কম হয়নি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরে তৎকালীন সমাজের অন্যতম প্রভাবশালী ধনী পরিবার হলেও তারা ছিলেন পিরালী ব্রাহ্মণ অর্থাৎ জাতিচ্যুত। তাদের পূর্বপুরুষদের বসবাস ছিল খুলনার পিঠাভোগে। এখান থেকেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্বপুরুষ পঞ্চানন কুশারী জীবিকার উদ্দেশ্যে কলকাতায় যায়। সেখানে তাদের ভাগ্য ফেরে এবং কালক্রমে তারা হয়ে ওঠে কলকাতার বিখ্যাত ঠাকুর পরিবার। কিন্তু পিরালী হওয়ার কারণে, তাদের সাথে খুব কম অভিজাত পরিবারই বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করত। এজন্য ঠাকুর পরিবারের সাথে যশোর-খুলনার অন্যান্য পিরালী ব্রাহ্মণদেরই বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপিত হতো।
অনেক ঘটনার পরে অবশেষে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিয়ে ঠিক হয় তার মামার বাড়ির দেশ যশোরের দক্ষিণডিহি। তার মা সারদা সুন্দরী দেবী এই গ্রামেরই মেয়ে ছিলেন। তার কাকী ত্রিপুরা সুন্দরী দেবীও এই দক্ষিণডিহির কন্যা ছিলেন। অবশেষে যুবক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিয়ে ঠিক হলো দক্ষিণডিহি গ্রামের বেণী মাধব রায়চৌধুরির কন্যা ভবতারিণী দেবীর সাথে। হ্যাঁ, ঠিকই পড়েছেন। ভবতারিণী দেবীই কবিপত্নী মৃণালিনী দেবীর পূর্ব নাম।
পাশ থেকে যেমন দেখতে; ছবি: লেখক

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অবশ্য এখানে বিয়ে করতে আসেননি। বরং ভবতারিণী দেবীকেই কলকাতা নিয়ে যাওয়া হয়। যদিও ইতিহাস থেকে জানা যায় কবি তার শৈশব এবং কৈশোরে কয়েকবার মায়ের সাথে দক্ষিণডিহি এসেছেন। এখনো দক্ষিণডিহি গ্রামের মাঝখানে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে সেই স্মৃতি-ধন্য বাড়িটি। এখন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে সেটি। সংস্কার করে নাম দেওয়া হয়েছে রবীন্দ্র কমপ্লেক্স। অনেকদিন যাব যাব করেও যাওয়া হচ্ছিল না। অবশেষে একদিন রওনা হয়েই গেলাম। সাথে কে? নাহ! এবার আর কাউকে সাথে পাইনি। তবে হাতে আছে প্রিয় ক্যামেরাটি।
সকালের সূর্য চারপাশে কেবল আলো মেলেছে। পাখিরা ডানা মেলে উড়াল দিয়েছে আকাশ পানে। বাস আমাকে নামিয়ে দিলো ফুলতলা বাজারে। একপাশে দেখি অনেকগুলো ভ্যান দাঁড়িয়ে আছে। আমি তাদের দিকে এগিয়ে গেলাম।
-ভাইসাব কই যাবেন?
কম বয়স্ক একজন এগিয়ে এলো আমার দিকে।
-রবীন্দ্র কমপ্লেক্সে।
-ওহ, কবির শ্বশুরবাড়ি। আসেন আসেন, বসে পড়েন।
আমি তার ভ্যানে উঠে বসতেই উনি তুফান বেগে প্যাডেল মারলেন। তারপর কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাকে পৌঁঁছে দিলেন রবীন্দ্র কমপ্লেক্সের সামনে।
উপর থেকে; ছবি: রাজীব কুণ্ডু

বেণীমাধবের পরিবার দেশভাগের আগেই ১৯৪০ সালে কলকাতায় স্থায়ী আবাস গড়েন। তারা সেখান থেকেই দক্ষিণডিহির বাড়ি দেখাশোনা করতেন। দেশবিভাগের পরে আস্তে আস্তে যাওয়া-আসা কমতে থাকে। সেই সুযোগে তাদের জায়গাও বেদখল হয়ে যেতে থাকে। ১৯৬৫ সালে সমস্তটাই বেদখল হয়ে যায়। দেশবিভাগের পরেও এই জায়গা নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যথা ছিল না।
নব্বই দশকের গোড়ার দিকে এই জায়গার উপরে দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকায় একটি প্রতিবেদন ছাপা হলে তা মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ক্রমে ক্রমে আরো কয়েকটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। আস্তে আস্তে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সচেতন হয়। বেদখল জায়গা পুনরুদ্ধার করে এখানে এখানে একটি আধুনিক সুযোগ সুবিধা সম্পন্ন প্রতিষ্ঠান দক্ষিণডিহি রবীন্দ্র কমপ্লেক্স গঠন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেই উদ্যোগের আওতায় বাড়ির মূল আদল ঠিক রেখে বাড়িটিকে সংস্কার করা হয়। বাড়ির প্রবেশপথে স্থাপন করা হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর মৃণালিনী দেবীর ভাস্কর্য। এছাড়া তৈরি করা হয়েছে মৃণালিনী মঞ্চ। প্রতিবছর এখানে কবির জন্মতিথি এবং মৃত্যু দিবসে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
পুরো রবীন্দ্র কমপ্লেক্সই দেওয়াল দিয়ে ঘেরা। আমি ভেতরে ঢুকলাম। রাস্তার দুপাশে পাতাবাহারের গাছ আমাকে স্বাগতম জানালো। দালানের মধ্যে কবির জীবনের নানা স্মৃতিময় ঘটনার ছবি রয়েছে। মন কেমন করে দেওয়া আবহ। কবির অন্তর্ধান হয়েছে কত যুগ আগে। অথচ কবি আজও আমাদের সমস্ত চেতনায় মিশে আছেন। কবিগুরুর স্মৃতি বিজড়িত এই দক্ষিণডিহি ঘুরতে ঘুরতে কবির কথাই আমার মনে ভেসে উঠল-

যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে,
আমি বাইব না মোর খেয়াতরী এই ঘাটে,
চুকিয়ে দেব বেচা কেনা,
মিটিয়ে দেব গো, মিটিয়ে দেব লেনাদেনা,
বন্ধ হবে আনাগোনা এই হাটে-
তখন আমায় নাইবা মনে রাখলে,
তারার পানে চেয়ে চেয়ে নাইবা আমায় ডাকলে।
…………………………………………………………
তখন কে বলে গো সেই প্রভাতে নেই আমি।
সকল খেলায় করবে খেলা এই আমি– আহা,
নতুন নামে ডাকবে মোরে, বাঁধবে নতুন বাহু-ডোরে,
আসব যাব চিরদিনের সেই আমি।
তখন আমায় নাইবা মনে রাখলে,
তারার পানে চেয়ে চেয়ে নাইবা আমায় ডাকলে॥

ভবতারিণী দেবীর আবক্ষ মুর্তি; ছবি: রাজীব

কীভাবে যাবেন?

ঢাকা থেকে বাসে কিংবা ট্রেনে পৌঁছাতে হবে খুলনা। খুলনা থেকে মহেন্দ্র, ইজি বাইক, টাউন সার্ভিস বাস কিংবা রুটের লোকাল বাসে করে পৌঁছাতে হবে ফুলতলায়। ফুলতলা থেকে যে কোনো ভ্যান চালককে বললেই হবে। তিনিই নিয়ে যাবেন আপনাকে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে। খুলনা শহর থেকে ফুলতলা উপজেলার দূরত্ব ১৯ কিলোমিটার। আর ফুলতলা বাজার থেকে তিন কিলোমিটার উত্তর পশ্চিমে দক্ষিণডিহি অবস্থিত।

কোথায় থাকবেন?

খুলনার অন্যতম আধুনিক হোটেল হলো ‘হোটেল রয়্যাল ইন্টারন্যাশনাল’। এটি কেডিএ এভিনিউতে অবস্থিত। ফোন নাম্বার ০৪১-৭২১৬৩৮। এখানে থাকতে হলে ভালোই টাকা খসবে আপনার। সিঙ্গেল রুমের জন্য পড়বে বারোশো টাকা আর ডাবল টুইন রুমের জন্য দুই হাজার টাকা।
আরেকটি অভিজাত হোটেলের নাম ‘হোটেল ক্যাসল সালাম’। সুইমিং পুলবিশিষ্ট এই হোটেলটি হোটেল রয়্যাল ইন্টারন্যাশনালের সামনেই অবস্থিত। ফোন নাম্বার- ০৪১-৭২০১৬০। এখানে থাকতে হলে আপনাকে গুণতে হবে নন এসি সিঙ্গেল: ১,০০০ টাকা, এসি স্ট্যান্ডার্ড সিঙ্গেল: ১,৫০০ আর স্ট্যান্ডার্ড কাপল: ১,৮০০ টাকা। এছাড়া আছে হোটেল সিটি ইন, হোটেল জেলিকো, হোটেল ইন্টারন্যাশনাল ইন, হোটেল মিলেনিয়াম, হোটেল হলিডে ইন্টারন্যাশনাল প্রভৃতি।
কম খরচে থাকতে চাইলে সোনাডাঙ্গা বাস টার্মিনালের পাশে অনেকগুলো হোটেল আছে। ফেরিঘাট বাস টার্মিনালের সামনেও কিছু হোটেল রয়েছে।
Feature Image: Amitav Aronno

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

জীবিত অবস্থায় নির্মিত হাজী শাহবাজের মসজিদ ও মাজার

এক নজরে একটি জেলা: প্রাচীন জনপদের শহর যশোর