ডাকাতিয়ার তীরে চাঁদপুরের সুন্দর গ্রাম ইসলামপুর

বছর পাঁচেক আগে, যখন বাংলাদেশের কোনো অভাবনীয় সৌন্দর্য আমার দেখা হয়নি, তখন একদিন ইটালি প্রবাসী ছোট ভাই সানি জিজ্ঞেস করেছিল, ‘তোর চোখে দেখা সবচেয়ে সুন্দর জায়গা কোনটি?’

উত্তরে আমি বলেছিলাম, ‘আমার এলাকা আমার খুব প্রিয়।’

উত্তর শুনে সানি খুব হেসেছিল। বলেছিল, ‘যারা নিজের গণ্ডির বাইরে কখনো যায়নি, তাদের কাছে নিজের এলাকাটাই সুন্দর।’

ওর কথা শুনে মনে হয়েছিল, ঠিকই বলেছে। আমের ভিতরের পোকা কি কখনো জানে, বাইরের দুনিয়াটা কেমন? কিন্তু আমি এখন জানি, সারা বাংলাদেশ ঘুরে এলেও নিজের এই গ্রামটা অন্যরকম প্রশান্তি দেয় চোখে। এখানে ফিরে এলে কতটা ভালো লাগে।

বাড়ির পাশেই হাইওয়ে। সোর্স: মাদিহা মৌ

ছোটবেলায় স্কুলে যেতাম নদী পেরিয়ে। নদীর নাম ডাকাতিয়া। এই নামের পিছনেও কিছু লোককথা আছে। বলা হয়, আগে নাকি ডাকাতরা মানুষজনকে মেরে এই নদীতে এনে ফেলতো। তাই এর নাম হয়েছে ডাকাতিয়া। ডাকাতিয়ার পাশেই আমাদের বাড়ি। ঠিক গা ঘেঁষে নয়, বিস্তৃত জমিজমা আছে বাড়ির পাশের মেঠোপথ আর নদীর মাঝের জায়গাটুকুতে। আর আছে নদীর সাথে সংযুক্ত একটা খাল। খালটা মেঠোপথের ঠিক পাশেই।

একেবেঁকে মেঠো পথটা এগিয়ে গেছে অনেক দূর। খেয়াঘাটের সাথে গিয়ে মিশেছে। এই রাস্তা জুড়ে কত স্মৃতি! সাধারণ একটা মাটির রাস্তাও খুব সুন্দর দেখায় দুপাশে দাঁড়ানো বড় বড় গাছগুলোর জন্য। গাছগুলো ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। তারমধ্যে একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ আছে। অদ্ভুত গাছটা দাঁড়িয়ে আছে না বলে শুয়ে আছে বা হেলান দিয়ে বসে আছে বললে বেশি মানাবে। কারণ গাছটা কিছুটা হেলে তারপর বেড়ে উঠেছে।

হেলানো অংশটুকুতে যে কেউ অনায়াসে পা ঝুলিয়ে বসতে পারবে। তবে সেই যে কেউটাকে অবশ্যই গাছে ওঠার ক্ষেত্রে পটু হতে হবে। কারণ গাছটার ঠিক নিচেই রয়েছে গভীর খাদ। একবার পা ফসকে পড়লে হাড়গোড় তো ভাঙবেই, সেই সাথে রাস্তায় উঠে আসার জন্য কাঠখড় পোড়াতে হবে অনেক।

ডাকাতিয়া ব্রিজ থেকে নদী। সোর্স: মাদিহা মৌ

বিকেলবেলায় বহুদিন অলস ভঙ্গিতে হেঁটে বেড়িয়েছি সেই মেঠোপথে। উদাস দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে থাকতাম দূর দিগন্তে। গোধূলির অস্তগামী সূর্যের রক্তিম আভা প্রতিফলিত হতো। চমৎকার মায়াময় একটা দৃশ্য হিসেবে ধরা পড়তো আমার চোখে। হাঁটতে হাঁটতে হেলানো সেই কৃষ্ণচূড়া গাছটার কাছে এসে তরতর করে উঠে যেতাম গাছটার হেলানো অংশে। পা ঝুলিয়ে বসে পড়তাম সেখানে।

ডাকাতিয়া ব্রিজ। সোর্স: মাদিহা মৌ

ছায়াঢাকা সুনিবিড় এই গ্রামটায় শৈশব কেটেছে আমার। প্রতিদিন স্কুল থেকে এসে কোনোরকমে নাকে মুখে খাবারটা গুজেই আম্মুর কাছ থেকে ছাড়া পেলেই ছুট লাগাতাম। বর্ষায় প্রকৃতির পরিবর্তন চোখে পড়তো দারুণভাবে। খালটা পানিতে টইটম্বুর হয়ে উঠতো। ফসলি জমিগুলো হয়ে উঠতো ভরা যৌবনা বিল। তখন ডাকাতিয়া হয়ে উঠতো বিশাল।

আকাশটা মেঘে ঢেকে থাকলেই এই রাস্তায় নেমে পড়তাম। বৃষ্টি হলে তো কথাই নেই। আকাশের দিকে মুখ ফিরিয়ে বৃষ্টিতে ভিজে একাকার হতাম। তারপরই খালের পানিতে দাপাদাপি। আমাদের এলাকায় এই খালকে ডাকা হতো “খুম্ভা”। এই খুম্ভাই ছিল আমার সাঁতার শেখার জায়গা।

পায়ে চলার পথ। সোর্স: মাদিহা মৌ

আমাদের ডাকাতিয়া নদীতে মাছ ধরার জন্য এক ধরনের বিশাল ফাঁদ পাতা হয়, স্থানীয়রা একে ডাকে “জাগ” নামে। জাগ পাতার কিছু নিয়ম আছে। অনেক ডালপালা হয় এমন বড় গাছের ডাল, কচুরিপানা আর বাঁশ জড়ো করে নদীর কিনারার দিকে এক জায়গায় গোল করে ফেলা হয়। ডাল কচুরীর আশ্রয়ে মাছেরা এখানটায় ছুটে আসে।

মাঝেমধ্যে মাছেদের প্রলুব্ধ করতে শুঁটকি, খইল, কুড়া দিয়ে সুগন্ধি মাছের খাবার দেওয়া হয়। এই খাবার আর আশ্রয়ের টানে মাছেরা ছুটে আছে জাগের ভেতর। তারপর “জাগ-বাট” করার সময় জেলেরা চারপাশে জাল দিয়ে ঘিরে ফেলে। আস্তে আস্তে বড় ডালগুলো ডাঙায় তুলে ফেলা হয়। সেই সাথে জাল গুটিয়ে আনে জেলেরা। গোটানো জালে ধরা পড়ে বিভিন্ন ধরনের নদীর সুস্বাদু মাছ। “জাগ-বাট” দেওয়া হয় মাসে কিংবা দুই মাসে একবার।

ডাকাতিয়া নদীতে গোধুলী। সোর্স: মাদিহা মৌ

আমাদের নিজেদের জাগ আছে বেশ কয়েকটাই। ছোটবেলা থেকেই নদীর তাজা মাছ খেয়েই বড় হয়েছি। জাগ-বাট দিতে অর্থাৎ জাগ তুলতে ২-৩ দিন দিন সময় লাগে। এই সময়টায় জেলেরা নৌকাতেই থাকে, রাঁধে, খায়। আমি একবার জেলেদের রান্না করা তরকারী দিয়ে ভাত খেয়েছিলাম। খুব ঝাল হলেও ওদের রান্না বেশ ভালো। জাগের চারপাশের জাল গুটিয়ে যখন মাছ তোলা হয়, তখন তা দেখার মতো দৃশ্য হয়।

হাজার হাজার বিভিন্ন ধরনের মাছ লাফাচ্ছে। অনেক সময় বিলুপ্ত প্রায় দামী মাছেরও দেখা মেলে। আব্বু সবসময়ই জাগের সবচেয়ে বড় মাছটা ঘরের জন্য রেখে দেয়। আর বড় চিংড়ি পেলে তো কথাই নেই! জানে, মেয়েটার খুব পছন্দ। তাই আগেই আলাদা করে রাখে। নদীর জ্যান্ত মাছ মেরে যখন রান্না করে খাওয়া হয়, তখন তার তুলনা কোনো খাবারের সাথে হবে না। এমনি এমনি তো আর বলা হয় না, “মাছে-ভাতে বাঙালি!”

মাছ ধরার জাগ। সোর্স: মাদিহা মৌ

২০০৪ সালে, যখন আমি ক্লাস সিক্সে পড়ি, তখন বাড়ির ঠিক কাছেই “ডাকাতিয়া ব্রিজ” উদ্বোধন হলো। তার আগে থেকেই একটু একটু করে বানাতে দেখেছি এই ব্রিজ। ব্রিজের থামের উপর চড়ে কত ঝাঁপিয়ে পড়েছি নদীতে! ব্রিজ আর এর সাথে হাইওয়ে হওয়াতে আমাদের এলাকায় শহুরে বাতাস লাগতে শুরু করলো। যদিও তাতে এখানকার সৌন্দর্য কমেনি এতটুকুও। বরং ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে আমাদের গ্রামের আশেপাশের প্রকৃতিকে দেখায় আরো বেশি মোহনিয়া।

চাঁদপুরের শহরবাসীর ঘোরার জন্য খুব বেশি জায়গা না থাকায় বিভিন্ন উৎসবের দিনগুলোতে লোকারণ্য হয়ে যায় আমাদের ডাকাতিয়া ব্রিজ। সেই সাথে নদীতে নৌকা ভাড়া করে ঘুরে বেড়ানোর ধুম পড়ে যায়। ব্রিজকে কেন্দ্র করে তখন বিভিন্ন ধরনের স্ট্রিট ফুডের পসরা সাজিয়ে বসে বিক্রেতারা। ফুচকা, চটপটির চলই বেশি। এখানকার চটপটি খেতেও বেশ ভালো। চটপটি বিক্রেতা সুমন ভাইয়ের বেচাবিক্রি এতো ভাল যে, তিনি এই চটপটি ফুচকা বিক্রি করেই পাঁচতলা বাড়ি করে ফেলেছেন!

দূরে ওই পাওয়ার প্ল্যান্ট দেখা যায়।  সোর্স: মাদিহা মৌ

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ছাড়াও আমাদের গ্রাম আরোও একটি কারণে বিখ্যাত। তা হলো ওরশ শরীফ। খুব ছোট থেকেই দেখে আসছি, গ্রামের একটা বাড়িকে পীর সাহেব বাড়ি ডাকা হয়। আমি মাজার প্রথা পছন্দ করি না, সেই দৃষ্টিভঙ্গী থেকেই জানি, ইনি কোনো ভণ্ড পীর ছিলেন না। আল্লাহর ওলী ছিলেন। আল্লাহর ধ্যান করার জন্য মাটির নিচে খুপরি মতোন ঘর বানিয়েছিলেন। সেখানে দিনের পর দিন ইবাদত করতেন। একবার ঢুকলে সহজে বেরুতেন না।

তাঁর উসিলায় প্রত্যেক শীতে ওরশ হয়। ওরশ মানে হলো ওয়াজ-মাহফিল। সারারাত ধরে ওয়াজ চলে। ফজরের আজান হলে তবারক বিতরণ করা হয়। তবারক বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিরিয়ানি কিংবা লাবড়া। লাবড়া হলো- ডাল, চাল, তেল, পেঁয়াজ, মাংস, যত রকমের সবজি দেওয়া যায় সব সহ এক ধরনের ঢ্যালাঢেলা খিচুড়ি। বহুদূর থেকে লঞ্চ, বাস ভর্তি করে মানুষজন আসে এই ওরশে যোগ দেবার জন্য। ছোটবেলায় মনে হতো, ওরশ মানেই উৎসব।

জাগ বাট দিচ্ছে জেলেরা। সোর্স: মাদিহা মৌ

এখন অনেক কিছুই বদলে যাচ্ছে। আমাদের বাড়ি ব্রিজের একদম কাছে হওয়ায়, এখানটায় খুব আধুনিকায়ন চলছে। বিশেষ করে বাড়ির সামনের জায়গায় মেরিন ইনস্টিটিউট হবার পর থেকে রাস্তাঘাট পিচঢালা হয়ে যাচ্ছে। আবার ডাকাতিয়ার পাড়েই নির্মাণ করা হয়েছে পাওয়ার হাউজ। সব মিলিয়ে আগের সেই আমেজ আর নেই। তবুও নদীর পাড়ের গ্রাম বলে কথা! ভোর সকালে আর বিকেলে এখনো এটি মুগ্ধতা ছড়ায়।

কীভাবে যাবেন:

আমার গ্রামে আপনাদের স্বাগতম। ঢাকা থেকে লঞ্চে চাঁদপুর। লঞ্চঘাট থেকে সিএনজি বা অটোয় চড়ে সরাসরি গাছতলা ব্রিজ। পাব্লিক ট্রান্সপোর্ট সরাসরি নাও পেতে পারেন। সেক্ষেত্রে ঘাট থেকে অটোযোগে কালিবাড়ি এসে সেখান থেকে ওয়ারলেস হয়ে গাছতলা ব্রিজ।

ফিচার ইমেজ: মাদিহা মৌ

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

E T B এর ইভেন্ট: মেঘের রাজ্য সাজেকে ভ্রমণ

ভ্রমণ আজ জনাকীর্ণ! সচেতন হন