কার্জন হলে শেষ বিকেলে…

সেদিন সন্ধ্যায় অফিস শেষে বাসায় গিয়ে, চা শেষ করেই এশার নামাজের প্রস্তুতি নিলাম। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সাধারণত এমনটাই করে থাকি আয়েশ করে আর নিরবিচ্ছিন্নভাবে টিভি দেখার জন্য! নামাজ, খাওয়া বা অন্যান্য কোনো কাজ যদি থাকে, সেটা আগেই করতে হবে।

নামাজ শেষ হতে না হতেই ফোন বেজে উঠলো। সাথে সাথেই মেজাজ খারাপ হয়ে গেল! কারণ অফিস শেষে কোনো রকম ফোন পছন্দ নয়, আর ছুটির দিন শুরু হলে তো নয়ই। যে কোনো রকম ফোনই আমার আনন্দ আর উপভোগের মানসিকতা মাটি করে দেয় অনেকখানি। তবুও ফোন তো ধরতেই হবে, তাই ধরলামও ভীষণ অনিচ্ছা সত্ত্বেও। ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে-

বৃষ্টি বিকেলে… ছবিঃ সংগ্রহ

কী রে ক্যামন আছিস?

এই তো ভালো, কে আপনি?

আমি লর্ড কার্জন!

বলে কী! স্বপ্ন দেখছি না তো আবার?

জ্বী, বলুন?

আরে বেটা তুই যে দেশের আনাচে-কানাচে এত এত ঘুরে বেড়াস, এই ঢাকা শহরটা কি ঠিকমতো ঘুরেছিস কখনো?

হ্যাঁ, ঘুরেছি তো মোটামুটি। কেন?

নাহ, তুই ঠিক মতো ঘুরিসনি!

কী রকম?

তুই-ই বল ঘুরেছিস কিনা?

হ্যাঁ ,আমার তো মনে হয় ঘুরেছি… এই চিড়িয়াখানা, বোটানিক্যাল গার্ডেন, সংসদ ভবন, চন্দ্রিমা উদ্যান, হাতিরঝিল, রমনা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, লালবাগের কেল্লা, আহসান মঞ্জিল আর কী আছে প্রকৃতি দেখার মতো? আমি আবার ইট-কাঠ-পাথরের কিছু তেমন একটা পছন্দ করি না।

সবুজের আচ্ছাদন। ছবিঃ সংগ্রহ

তুই কার্জন হল দেখেছিস কখনো?

অ্যা, বলে কী! এত এত ঢাবিতে গেলাম আর কার্জন হল দেখিনি! কী বলছেন আপনি?

নাহ, তুই দেখিসনি!

নাহ দেখেছি আমি, অনেক পুরনো কারুকার্যখচিত লাল বিল্ডিং! অনেক অনেক দেখেছি।

এই দেখা সেই দেখা নয় রে পাগলা, তুই যেভাবে প্রকৃতি দেখিস সেভাবে কখনো দেখিসনি আমি জানি!

তুই শুধু বাইরে থেকে দেখেছিস, কার্জন হলের ভেতরে গিয়ে কখনো দেখেছিস? বৃষ্টির পরে? বোধহয় না! যা গিয়ে দেখে আয়! চলে আয় কাল কার্জন হলে, দেখিস কত কী দেখাই তোকে!

উহ ঘুম ভেঙে গেল আচমকা, লর্ড কার্জনের খোঁচায়! কার্জন হলকে ভেতর থেকে না দেখার খোঁচায়!

নান্দনিক কার্জন হল। ছবিঃ সংগ্রহ

ঘুম ভাঙার পর থেকে একটা অস্থিরতা ঘিরে ধরেছে। কিসব আজগুবি স্বপ্ন যে দেখি না আজকাল। কোনোভাবেই স্বপ্নটাকে মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারছি না তাই ভাবলাম একবেলা নষ্টই না হয় হবে, হোক না। জীবনের কত সময়ই তো কতভাবে হেলায় হারিয়ে গেছে। তাই যাক না একটা বেলা কার্জন হলের ভেতরে ঘুরে এসে! যেই ভাবনা সেই কাজ। পরদিন শনিবার বিকেলেটা রেখে দিলাম কার্জন হলের জন্য।

শনিবার বেশ দেরি করে ঘুম থেকে উঠেই খুশি আর অবসন্নতার মিশ্রণে দোদুল্যমান একটা অবস্থায় পড়লাম। কারণ বৃষ্টি যদিও আজকাল অনেক পছন্দের, সেই বৃষ্টি ঝরছে আকাশ ভেঙে। ওদিকে কার্জন হলে যেতে পারবো কিনা সেই দুশ্চিন্তা কিছুটা। আগের দিনের স্বপ্নটা কিছুতেই পিছু ছাড়ছে না! তাই ওখানে গিয়ে ঘুরে না আসা পর্যন্ত ঠিক স্বস্তি পাওয়া যাবে না।

কার্জন হলের পুকুর। ছবিঃ সংগ্রহ

দুপুরে খেয়ে হালকা গড়িয়ে বিকেলের বেশ আগেই বেরিয়ে পড়লাম কার্জন হলের উদ্দেশ্যে। কোনোমতে ছুটির দিনের জ্যাম ঠেলে কার্জন হলের গেটে পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় শেষ বিকেল। সামনের নয় কেন যেন রিক্সাওয়ালা আমাকে পিছনের গেটে নিয়ে গেল! হয়তো রিক্সা ভাড়া বেশী নেবে বলে, একটু ঘুরিয়ে পিছনের শিক্ষকদের বাস ভবনের গেটে নামিয়ে দিল। যেটা আসলে একটু বিড়ম্বনার মাঝে ফেললেও, শেষে অনেক সুফল বয়ে এনেছিল আমার জন্য!

পিছনের গেট দিয়ে ঢুকে একটু সামনে এগোতেই জাস্ট থ হয়ে গেলাম। চোখ হয়ে গেল ছানাবড়া! বোধ বুদ্ধি হারিয়ে গেল যেন! সবুজের সমারোহ দেখে, ঢাকা শহরের মাঝে যে এত এত চোখ ধাঁধানো সবুজ আছে বা থাকতে পারে সেটা কল্পনাতেও ছিল না। আর সারাদিন ধরে ঝরে পড়া টিপটিপ বৃষ্টি সামান্য ধুলো বা বিবর্ণ পাতাগুলোকেও করেছিল একেবারে তরতাজা। যেন সদ্য গজানো কচি পাতা গাছে গাছে, ডালে ডালে, কাছে দূরে, আশে-পাশে যতদূর চোখ যায় শুধু সবুজ আর সবুজ। চোখ যেন স্বর্গের কোনো আঙিনায় তার দৃষ্টি ফেলেছে! ফেরাতে মন চায় না, পলক ফেলার ইচ্ছা জাগে না, অন্য সব কিছু তখন সবুজের কাছে পরাজিত।

অপূর্ব কার্জন হল। ছবিঃ সংগ্রহ

তার উপর সদ্য শেষ হওয়া বৃষ্টির পরে পশ্চিম আকাশে রোদের ঝিলিক, গাছে গাছে, লতায় পাতায় যেন মুক্তো দানার চোখ ধাঁধানো বিচ্ছুরণ! সদ্য ভেজা সবুজ পাতায় সূর্যের আলো আর সোনালি আভায় একটা সোনালি মুহূর্তের মায়াময় পরিবেশ চারদিকে। এখানে সেখানে গাছে গাছে ফুটে থাকা কাঠ গোলাপের মাতাল করা রঙ-রূপ আর গন্ধের অবিরাম আকর্ষণ ছেঁকে ধরেছিল মন-প্রাণ সব সব সবকিছুই। ঘাসগুলোর ধুলোহীন সবুজ ভেজা মখমলের মতো নরম আর আদুরে আহ্বান! কাছে যাবার, পাশে বসার আর ছুঁয়ে ছুঁয়ে অনন্য সুখ উপভোগের! ইশ কী নির্মল, কী নির্মল!

সবচেয়ে প্রিয় কাঠ গোলাপ। ছবিঃ সংগ্রহ

পাশেই ইটের ঘাট বাঁধানো পুকুর, পুকুরের চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা নারিকেল-আম-কাঁঠালের গাছ, স্বচ্ছ পানিতে গাছের ছায়া, ছেলে-মেয়েদের পুকুর ঘাটে, গাছের ডালে আর ভেজা ঘাসে বসে স্বপ্নের ঢেউ খেলানো! চায়ের কাপে টুংটাং, টিনের প্লেটে ভাজিভুজি, টুপটাপ করে ঝরে পড়া বৃষ্টির ফোঁটা, গাছে গাছে ফুটে থাকা রঙ-বেরঙের ফুল, বিভিন্ন আকারের সবুজ গালিচায় নানা ঢঙের অভিনয়, অবারিত সবুজের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা প্রায় শত বছরের লাল ইটের নান্দনিক কারুকার্য মণ্ডিত বনেদি দালান। আরও যে কত কী?

বলে, দেখে, লিখে আর বর্ণনা করে শেষ করার মতো নয় আদৌ!

ওখানে গিয়ে, দেখে, বুঝে আর অনুভব করার মতো শুধুমাত্র।

পরে ফিরে আসার সময় সার্থক মনে হয়েছিল সেই স্বপ্ন আর লর্ড কার্জনের স্বপ্নময় ফোন।

অপূর্ব পুকুরের অসাধারণ ছবি। ছবিঃ সংগ্রহ

তাই অবশেষে এবং অতি অবশ্যই আন্তরিক ধন্যবাদ –

লর্ড কার্জন, লর্ড কার্জনের স্বপ্নময় ফোন আর কার্জন হল আর এর সমগ্র সবুজ-ঘাস-লতাপাতা-পুকুর-সান বাঁধানো ঘাট-বর্ণিল ফুল প্রিয় কাঠ গোলাপ! আর সামগ্রিকভাবে কার্জন হলের সমস্ত নান্দনিকতাকে।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কাশ্মীরের অনন্ত কষ্ট!

রাজধানী এক্সপ্রেসে আমাদের দুঃসহ রাত!