কায়াকে করে বাংলা চ্যানেল পাড়ি দুই অভিযাত্রীর

অভিযান সফল, সেন্ট মার্টিনের জেটিতে পৌছানোর সময়; ছবি তূর্য্য

কায়াকিং বাংলাদেশে চালু হয়েছে খুব বেশিদিন আগের কথা নয়। বিগত কয়েক বছরে ব্যক্তিগত ও গ্রুপ পর্যায়ে কায়াকিং করা শুরু হয়েছিল নতুন অ্যাডভেঞ্চার একটিভিটি হিসেবে। এরপর কাপ্তাইয়ে “কাপ্তাই কায়াক ক্লাব” শুরু হলে মোটামুটি সবার নজরে আসে চমৎকার এই অ্যাডভেঞ্চারটি। শান্ত পানিতে নির্বিঘ্নে কায়াক চালানো যায় বলে সব বয়সের সবার মধ্যেই কায়াকিংয়ের প্রতি আগ্রহ দেখা যায়।

যারা এখনো জানেন না কায়াক কী তাদের জন্য বলি, কায়াক হচ্ছে এক ধরনের নৌকা যেটি বিশেষ ধরনের বৈঠা দিয়ে আরোহীকেই চালাতে হয়। কায়াক সাধারণত একজন, দু’জন বা তিন জনের হয়। বাংলাদেশে অনেকগুলো জায়গায় এখন কায়াকিং করা যায়, তার মধ্যে কাপ্তাই ও মহামায়া লেক চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি, রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট সিলেট, কলাতলী সৈকত ও প্যাঁচার দ্বীপ, কক্সবাজার অন্যতম।

যেতে হবে বহুদূর; মুজিবুর রহমান

এর মধ্যে কলাতলী সৈকত ও প্যাঁচার দ্বীপে সমুদ্রে কায়াকিং করা যায়, বাকি সব জায়গায় বদ্ধ পানিতে কায়াকিং করা হয়। আসলে দুটো দু’রকমের মজা। শান্ত পানিতে খুব আরাম করে কায়াকিং করা যায় আর সমুদ্রের পানিতে কায়াকিং করাটা বেশ ভালো অ্যাডভেঞ্চার। এর কারণ হচ্ছে সমুদ্রের ঢেউ। বড় বড় ঢেউয়ের মধ্যে কায়াক চালাতে হলে আপনার ভালো সাহস থাকতে হবে। বিভিন্ন দেশে শুধু সমুদ্র নয়, কায়াকিং করা হয় প্রচণ্ড খরস্রোতা নদীতেও। আমাদের প্রতিবেশি দেশ নেপালেই ভোটেকোশি ও ত্রিশুলি নদীতে কায়াকিং করা হয়। এছাড়া রাফটিংয়ের গাইড হিসেবেও কায়াক থাকে।

সম্প্রতি কায়াকে করে বাংলা চ্যানেল পার হলেন দুজন অভিযাত্রী। এরা হচ্ছেন হানিয়াম মারিয়া রাকা ও সায়মন হোসেন। গত ১৫ই জানুয়ারী ২০১৯ সকাল পৌনে ৯টায় টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ থেকে চালানো শুরু করে ২ ঘণ্টা ৫২ মিনিটে সেন্টমার্টিনের জেটিতে এসে পৌঁছান তারা। সমুদ্রে ব্যবহারের উপযোগী ইনফ্লেটেবল একুয়া মেরিনা সি কায়াক ব্যবহার করেন তারা।

প্রচণ্ড রোদে কায়াকিং চলছে; ছবি- মুজিবুর রহমান

টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ থেকে সেন্টমার্টিনের জেটি পর্যন্ত দূরত্ব প্রায় ১৪.৭৫ কিমি। ঘণ্টায় পাঁচ কি.মি. বেগে চালিয়ে তারা পার করেন এ দূরত্ব। বঙ্গোপসাগরের অংশ বাংলা চ্যানেল কায়াকিং করে পাড়ি দেয়া চাট্টিখানি কথা নয়। শাহপরীর দ্বীপ থেকেই বড় বড় ঢেউ শুরু হয়ে যায়। এরপর যত সামনে যাবে ততই ঢেউ বাড়তে থাকে। সমুদ্রে চালানোর জন্য বিশেষভাবে তৈরী এ কায়াকগুলো ভালোভাবেই এই ঢেউ মোকাবেলা করতে পারে।

বেশি বড় ঢেউ আসলে সেটা কায়াকের উপর দিয়েই চলে যায়। এ অভিযানের জন্য দুইটি কায়াক প্রস্তুত করে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় করে বয়ে আনা হয়েছিলো শাহপরীর দ্বীপে। এ কাজের জন্য ভোর ৪টায় ঘুম থেকে উঠে কায়াকগুলো বাতাস দিয়ে ফুলিয়ে প্রস্তুত করা হয়। দুটি কায়াক নেবার কারণ হচ্ছে যে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে যাতে একটি কায়াক উঠিয়ে নিয়ে আরেকটি দিয়ে অভিযান অব্যাহত রাখা যায়।

অবশ্য সংরক্ষিত কায়াকটি পানিতে নামানোর প্রয়োজন পড়েনি এবার। অথচ মাত্র দু’মাস আগের প্রচেষ্টায় অনুশীলনের সময় কায়াকের প্যাডেল ভেঙে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। সংরক্ষিত আর কোনো কায়াক না থাকার কারণে সেবারের মতো অভিযান পরিত্যক্ত করে ঢাকায় ফিরে যেতে হয় তাদের।

হানিয়াম মারিয়া রাকা; ছবি- লেখক

এবার তাই আর ভুল না করে দুটো প্যাডেল আরেকটি কায়াক নৌকায় করে নিয়ে আসা হয়েছে। সহযোগি নৌকায় ছিলেন দেশের স্কুবা ডাইভিংয়ের পথিকৃত ডুবুরি মুজিবুর রহমান, ট্রাভেলার্স অফ বাংলাদেশের অ্যাডমিন ফজলে রাব্বি, একজন ফটোগ্রাফার তূর্য্য। যতটা সহজ হবে তারা ভেবেছিলেন ততটা কিন্তু হয়নি।

সায়মন হোসেন; ছবি- স্বরূপ সাহা

অভিযান শুরু হবার কিছুক্ষণের মধ্যেই কায়াককে হারিয়ে ফেলে সহযোগি নৌকা। প্রায় এক ঘণ্টা খোঁজাখুজি করার পর দেখা মেলে কায়াকের। তারপর অবশ্য আর ঝামেলা হয়নি। তবে বিশাল বড় বড় ঢেউ পাড়ি দিয়ে চালাতে দুই অভিযাত্রীর অনেক কষ্ট হয়েছে। এছাড়া শীতকাল সত্ত্বেও রোদ অনেক কষ্ট দিয়েছে তাদের।

শেষ পর্যন্ত সব প্রতিবন্ধকতা পার হয়ে সেন্টমার্টিন জেটিতে এসে পৌঁছান তারা। বলাই হয়নি তাদের পুরো পরিচয়। হানিয়াম মারিয়া রাকা পিক সিক্সটি নাইন আউটডোর ও অ্যাডভেঞ্চার নামে একটি অ্যাডভেঞ্চার শপের স্বত্বাধিকারি। ঢাকার এলিফেন্ট রোডের বাটা সিগন্যালে ও বসুন্ধরা সিটির দ্বিতীয় তলায় দুটো শোরুম আছে এ শপের।

রাকা ও সায়মন অনুশীলনের সময়; ছবি- রাকা

নানা রকম অ্যাডভেঞ্চার সংক্রান্ত জিনিসপত্র বিক্রি করে তার দোকানে। যেমন- তাঁবু, স্লিপিং ব্যাগ, ব্যাকপ্যাক, ক্লাইম্বিং গিয়ার্স, সারভাইবাল গিয়ার্স ইত্যাদি। বাংলা চ্যানেল কায়াকিংয়ের জন্য ব্যবহৃত কায়াক দুটিও এই দোকান থেকেই নেয়া। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি বাংলাদেশের যুবসমাজে অ্যাডভেঞ্চারকে উৎসাহ দেবার জন্যেও কাজ করেন।

বাংলা চ্যানেল কায়াকিংয়ের আগেও তিনি নেপাল থেকে কায়াকিংয়ের উপর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এছাড়া দেশে ও দেশের বাইরে পর্বতারোহণ, স্কুবা ডাইভিং, বাঞ্জি জাম্পিং, ক্যানিয়ন সুইং, রাফটিং সহ বিভিন্ন অ্যাডভেঞ্চারে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এখনও বিভিন্ন ধরনের অ্যাডভেঞ্চার ভ্রমণের আয়োজন করে চলেছেন। এছাড়া তিনি সফলভাবে স্কুবা ডাইভিংয়ের কোর্স সম্পন্ন করে সার্টিফিকেটও লাভ করেছেন।

তীরের কাছে; ছবি- তূর্য্য

সায়মন হোসেন একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের ছাত্র। তিনি একাধারে সাইক্লিস্ট, ট্রাভেলার ও দৌড়বিড় হিসেবে পরিচিত। ইতোমধ্যে তিনি ৭টি দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে সফলভাবে তা সম্পন্ন করেছেন। এর মধ্যে তিনটি ছিল হাফ ম্যারাথন। এগুলোও তিনি সফলভাবে সম্পন্ন করতে পেরেছেন।

তাদের বাংলা চ্যানেল কায়াকিং করে পার হওয়া তরুণদের জন্য একটি সাহসী দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে এবং এদেশে কায়াকিংয়ের জনপ্রিতা বাড়াতে সাহায্য করবে। নদীমাতৃক বাংলাদেশে এখনও নদী ভিত্তিক পর্যটন খুব একটা জনপ্রিয় করা সম্ভব হয়নি, অথচ আমাদের সামনে এই খাতে অমিত সম্ভাবনা রয়েছে।

ফিচার ছবি: তূর্য্য

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কালিয়াকৈরের শ্রীফলতলী জমিদার বাড়ির মেটেরঙা আভিজাত্য

নৈনিতালের অভিজাত নানক হোটেল