হরিণ প্রজনন কেন্দ্র ও পশু পাখির অভয়ারণ্য কক্সবাজারের ডুলাহাজরা সাফারি পার্ক

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ স্থান হলো কক্সবাজার। কক্সবাজারের রূপ ও মাধুর্যের কথা কারো অজানা নয়। পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতসহ কক্সবাজারে রয়েছে অনিন্দ্য সুন্দর দর্শনীয় স্থান। কয়েকটি স্থানকে ব্যক্তিগত মালিকানায় বা বেসরকারী উদ্যেগে গড়ে তোলা হয়েছে, আবার কয়েকটি স্থান প্রাকৃতিকভাবে গড়ে উঠেছে।

কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতের দিগন্ত বিস্তৃত জলরাশির আছড়ে পড়া, ঢেউয়ের গর্জন, খালি পায়ে বালির সৈকতে হাঁটা, প্রিয়জনদের সাথে নিয়ে সূর্যাস্ত দেখার প্রতিটি মুহূর্ত অসাধারণ এবং রোমাঞ্চকর। অপরদিকে অন্যান্য দর্শনীয় স্থানগুলোও পর্যটকের মনকে আন্দোলিত করে।

ছবিসূত্রঃ touristplaces.com.bd

কক্সবাজারের অনেকগুলো পর্যটন কেন্দ্র ও দর্শনীয় স্থানের মধ্যে ডুলাহাজরা সাফারি পার্ক অন্যতম। ডুলাহাজরা সাফারি পার্ক তথা বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক কক্সবাজার সদর উপজেলা থেকে ৪৮ কিলোমিটার উত্তরে এবং চকোরিয়া থানা থেকে দশ কিলোমিটার দক্ষিণে বন বিভাগের ফাসিয়াখালি রেঞ্জের ডুলাহাজরা ব্লকে অবস্থিত।

৯০০ হেক্টর জায়গা জুড়ে অবস্থিত ডুলাহাজরা সাফারি পার্কটিকে অনেকে সাফারি পার্ক বলতে নারাজ। কারণ তারা মনে করেন প্রাকৃতিক অবকাঠামোর বদলে কৃত্রিম অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে বেশি।

ছবিসূত্রঃ Places to Visit or Historical Places Bangladesh

সাফারি পার্কের বৈশিষ্ট্য ডুলাহাজরা সাফারি পার্কের মধ্যে অনুপস্থিত বলে আখ্যা দেয় কেউ কেউ। ডুলাহাজরা সাফারি পার্ক বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় কর্তৃক ১৯৯৯ সালে হরিণ প্রজনন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে।

ছবিসূত্রঃ Print News | The Asian Age

বন বিভাগের ফাসিয়াখালি রেঞ্জের ৮টি ব্লক নিয়ে হরিণ প্রজনন কেন্দ্র হিসেবে ডুলাহাজরা সাফারি পার্ক গড়ে উঠলেও এখানে হরিণ ছাড়াও রয়েছে অন্যান্য প্রাণীর আভাস। এখানে সিংহ, বাঘ, ভাল্লুক, স্বাদু ও লোনা পানির কুমির, হাতি, জলহস্তী, বানর, মায়া হরিণ, চিত্রা হরিণ, প্যারা হরিণ, সম্বর হরিণ রয়েছে।

পর্যটকদের সুবিধার জন্য এখানে স্থাপন করা হয়েছে ওয়াচ টাওয়ার। ওয়াচ টাওয়ার তথা পর্যবেক্ষণ টাওয়ারে দাঁড়িয়ে পুরো পার্কে পশুপাখির অবাধ বিচরণ ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। এছাড়া পর্যটকদের বিশ্রামের জন্য এখানে গড়ে তোলা হয়েছে বিশ্রামাগার ও ডরমেটরি।

দেখার আছে নানা কিছু

ছবিসূত্রঃ vromonguide

৯০০ হেক্টর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত এই পার্কে দেখার মতো অনেক কিছু আছে। চিরসবুজের এই বনে রয়েছে উঁচু-নিচু নানা গাছ গাছালি, ভেষজ উদ্ভিদের গাছ, উঁচু-নিচু টিলা, হ্রদ, খাল, নাম না জানা সবুজ বৃক্ষ, লতা পাতা ও ঝোঁপ।

এখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশ পর্যটকদের হৃদয় হরণ করে। হঠাৎ কোনো পশুর গর্জন ভেসে আসে কানে আবার কখনো কখনো পাখির কিচির মিচিরে কেটে যায় সারা বেলা। পায়ে হাঁটার পথ যেন সবুজের সমারোহে ঘেরা এক আচ্ছাদন। চারদিকে সবুজ আর সবুজ।

বৃক্ষের ছায়া পাওয়া যায় পথে পথে। ডরমেটরি, বিশ্রামাগারে পর্যটকরা বিশ্রাম নিতে পারে। সেই সাথে ওয়াচ টাওয়ারে দাঁড়িয়ে পুরো বন ও পার্কের অনিন্দ্য সুন্দর রূপ উপভোগ করতে পারে।

ছবিসূত্রঃ bangladeshtourismguide.com

দূর থেকে দেখা যায় হরিণের অবাধে ছুটে চলা। পার্কের বণ্যপ্রানীরা যেন বাইরে যেতে না পারে সেজন্য গড়ে তোলা হয়েছে উঁচু বেষ্টনী। এই বেষ্টনীর ভেতরে থাকে বাঘ, হরিণ, বানর সহ বহু পশু ও প্রাণী। ওয়াচ টাওয়ারে দাঁড়িয়ে উপভোগ করতে পারবেন এক গাছ থেকে অন্য গাছে বানরের ছুটোছুটি ও বানরের খেলা।

ছবিসূত্রঃ bdxplorer.blogspot.com

দলবেধে হরিণের চলা, ডোরাকাটা বাঘ, সাপ, কুমির, ছোট ও বড় হাতি, জলহস্তী, শেয়াল দেখলে আপনি পাবেন চিড়িয়াখানা দেখার আমেজ। এছাড়া নাম না জানা হাজারো পাখি তো আছেই। বিভিন্ন পশু পাখির ভাষ্কর্যও রয়েছে এখানে।

ছবিসূত্রঃ bbarta24

বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক তথা ডুলাহাজরা সাফারি পার্কে মোট সংরক্ষিত বণ্যপ্রাণীর সংখ্যা ৩৬২। এর মধ্যে ১৪৯টি স্তণ্যপায়ী প্রাণী রয়েছে, ১৫২ সরীসৃপ, ৬১ প্রজাতির পাখি আছে।

ছবিসূত্রঃ Bdnews24

বাঘ, সিংহ, মায়া হরিণ, চিত্রা হরিণ, ভালুক, বানর, সাপ, বনবিড়াল, চিতা বিড়াল, মার্বেল বিড়াল, মেছোবাঘ, শেয়াল, সজারু, খরগোশ, হনুমান ইত্যাদি সরীসৃপ প্রাণী দেখা যায় এই পার্কে। পার্কের ভেতর হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়বে সুন্দর একটি আর্কিড হাউজ।

সেখানে নানা জাতের আর্কিড সাজানো থাকে সবসময়। পার্কের ভেতরে রয়েছে ন্যাচারাল হিস্টোরি জাদুঘর। এই জাদুঘরে বিভিন্ন প্রাণীর কৃত্রিম মূর্তি সংরক্ষিত রয়েছে। একদিকে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য উপভোগ করা, অপরদিকে কৃত্রিম পশুপাখির মূর্তি অন্যরকম অনুভূতি জাগায় পর্যটকদের মনে।

ছবিসূত্রঃ Travelers Diary Bangladesh

ডুলাহাজরা সাফারি পার্কে প্রবেশ করলে প্রধান ফটকের বাম পাশে দেখতে পাবেন ডিসপ্লে ম্যাপ। এই ম্যাপ দেখে অল্প সময়ে বুঝে নিতে পারবেন কোন দিকে গেলে কী দেখতে পাবেন। পার্কে ঢুকতেই হাতের বাম ও ডান পাশে দুটো রাস্তা দেখতে পাবেন। হাতের বাম পাশ দিয়ে হাঁটা শুরু করলে সবকিছু দেখে ডান পাশ দিয়ে বের হয়ে আসতে পারবেন।

পার্কে ঘোরার জন্য নিজস্ব পরিবহণ ব্যবস্থা রয়েছে। কেউ চাইলে পরিবহনে ঘুরে ঘুরে পার্ক দেখতে পারে। তবে হেঁটে হেঁটে দেখলে ভালোভাবে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পশুপাখি উপভোগ করা যায়।

যাওয়ার ব্যবস্থা

বাস

ঢাকা থেকে ডুলাহাজরা সাফারি পার্কে যেতে চাইলে ঢাকা থেকে কক্সবাজারগামী শ্যামলি পরিবহন, এস আলম, গ্রীণলাইন, সোহাগ পরিবহন, হানিফ এন্টারপ্রাইজ, সৌদিয়া দিয়ে যেতে পারবেন। এসব পরিবহনে গেলে পার্কের সামনে নামতে পারবেন। বাসের মান অনুযায়ী ভাড়ার তারতম্য দেখা যায়। ঢাকা থেকে পার্কে গেলে ভাড়া গুণতে হবে ৬০০-২,০০০ টাকা।

ট্রেন

ঢাকার কমলাপুর কিংবা এয়ারপোর্ট রেলস্টেশন থেকে সুবর্ণ এক্সপ্রেস, সোনার বাংলা, মহানগর, চট্রগ্রাম মেইলে চট্রগ্রাম যেতে পারবেন। চট্রগ্রামের নতুন ব্রিজ এলাকা অথবা আধমরা বাসস্ট্যান্ড থেকে কক্সবাজারের ডুলাহাজরা সাফারি পার্কগামী যেকোনো বাসে উঠে পার্কে যেতে পারবেন। মানভেদে ভাড়া নেবে ২৮০-৫৫০ টাকা।

এছাড়া নিজস্ব পরিবহন কিংবা বিমানে পার্কে যেতে পারবেন। বিমানে গেলে বিমানবন্দর থেকে উপরে উল্লেখিত উপায়ে পার্কে প্রবেশ করতে পারবেন।

থাকার ব্যবস্থা

কক্সবাজার পর্যটন এলাকা বলে এখানে অনেক আবাসিক হোটেল রয়েছে। হোটেলের মানভেদে দামের তারতম্য হয়। অফসিজনে গেলে কক্সবাজার গিয়ে হোটেল নির্ধারণ করা যায়। কিন্তু অনসিজনে গেলে আগে থেকে হোটেল বুক করা উত্তম।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

যে ৮টি কারণে বাতিল হয়ে যেতে পারে আপনার আমেরিকান ভিসা

শুভরাড়া খাঞ্জালী মসজিদ: ইতিহাস আর রূপকথা মিলেমিশে যেখানে একাকার