পৃথিবীর শীতলতম মরুভূমি স্পিতি ভ্যালির গল্প

স্পিতি ভ্যালির স্বপ্নময় রূপ। স্পিতি ভ্যালি, হিমাচল প্রদেশ। ছবিঃ রিফাত রাব্বি

তীব্র অ্যালার্মের শব্দে কম্বলের ভেতর থেকে আড়মোড়া ভেঙে উঠলাম। ভারতের হিমাচল প্রদেশের মানালিতে তখন বর্ষাকাল। অল্প শীতে উঠতে ইচ্ছে হচ্ছিল না। কিন্তু মনে রয়েছে তীব্র শিহরণ। স্পিতি ভ্যালিগামী গাড়িটি হোটেলের নিচে এসে ট্যাঁ ট্যাঁ শব্দে হর্ণ দিতেই তিড়িং করে লাফিয়ে উঠলাম বিছানা ছেড়ে।

কোনোমতে দাঁত ব্রাশ করে মুখে পানি না দিয়েই ৭০ লিটারের গোছানো বিশাল ব্যাকপ্যাকটি ঘাড়ে ঝুলিয়ে বের হলাম হোটেল থেকে। গাড়িতে চড়ে বসতেই শুরু হলো ঝুম ঝুম করে বৃষ্টি। উঠে দেখলাম বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ছাঁচের আর চেহারার বেশ কিছু মানুষ জড়সড় হয়ে বিরক্তিভরা মুখে চেয়ে আছে। দেরীর জন্য সবাইকে দুঃখ প্রকাশ করতে করতে বসে পড়লাম আমার জন্য নির্ধারিত সিটে।

মানালি থেকে সাড়ে পাঁচটায় গাড়ি ছেড়ে, ছুটে চললো উঁচু থেকে উঁচু পাহাড়ের উপর দিয়ে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে। যত উপরে উঠছি বাড়ছে মেঘের আনাগোনা। মেঘ আর বৃষ্টির মধ্যেই পেছনে ঝাপসা হয়ে আসতে লাগল মানালি শহর।

মেঘছায়ার খেলায় রোথাংপাস। রোথাংপাস, মানালি, কুল্লু, হিমাচল প্রদেশ। ছবি: রিফাত রাব্বি

ভারতের হিমাচল প্রদেশের উত্তর প্রান্তে রয়েছে ধূসর হিমালয়ের ধু ধু প্রান্তর। শীতল এই প্রান্তরই স্পিতি ভ্যালি নামে পরিচিত। শত শত কিলোমটার বিস্তৃত ধূসর রঙের শীতল এই মরুভূমির অনেক অংশ এখনো থেকে গেছে লোক চক্ষুর আড়ালে।

নিরেট নীল আকাশ আর আকাশছোঁয়া অগণিত পর্বতের সারি এখনো রয়ে গেছে অস্পর্ষী হয়ে। গাড়িতে বসেই কল্পনা করতে থাকলাম কীরকম হবে দেখতে সেই ধু ধু প্রান্তর।


স্পিতি ভ্যালি, হিমাচল প্রদেশ। ছবি: রিফাত রাব্বি

মানালি থেকে রোথাংপাসের দিকে গাড়ি উঠছে। কখনো মেঘের মধ্যে দিয়ে, কখনো মেঘের থেকে অনেক উপর দিয়ে। অনায়সে ঘণ্টা তিনেকের মাথায় অপরূপ সবুজ রোথাং পাস অতিক্রম করলাম। ৩,৯৭৮ মিটার উঁচু এই রোথাং পাস। উপর থেকে দেখা যায় মানালির বিস্তৃত সবুজ প্রান্তর।

মাঝে মাঝে মেঘ আর মাঝে মাঝে সূর্যের আলো পড়ে পুরো সবুজ ভ্যালি হয়ে উঠেছে স্বর্গের উদ্যান। সেই উদ্যান পেছনে ফেলেই ছুটে চলেছি ভারতের সবচেয়ে দূর্গম অঞ্চলে। যেখানে যেতে পাড়ি দিতে হবে পৃথিবীর অন্যতম বিপজ্জনক ২০০ কিলোমিটার পথ।

হাজার হাজার ফুট খাঁদের পর পৃথিবীর অন্যতম বিপজ্জনক রাস্তাও যেন স্বপ্নের মতো। স্পিতি ভ্যালি, হিমাচল প্রদেশ। ছবি: রিফাত রাব্বি

রোথাংপাস শেষ হতে না হতেই দেখতে পেলাম রাস্তার বেহাল দশা। প্রায় চার হাজার ফুট উপর থেকে রাস্তা এই পর্বতকে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে, খুব খাড়া ও বিপজ্জনকভাবে নেমে গেছে নিচের দিকে। রাস্তার পাশে নেই কোনো সেফটি রেলিং, রাস্তায় নেই কোনো পিচ বা পাথর। কাদাময় অতিরিক্ত পিচ্ছিল পথ দিয়ে গাড়ি নামছে প্রায় ৪০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা গতিবেগে।

প্রবল ঝাঁকুনিতে বসে থাকা দুরূহ হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু জানালা দিয়ে বাইরের মেঘ ফুঁড়ে আকাশে ওঠা পর্বতগুলো দেখতে দেখতে এই ঝাকুনি বা পিচ্ছিল রাস্তার ভয়ের অনুভূতি কাজ করছে না। নিচে দিয়ে বয়ে গেছে বিশাল চন্দ্র রিভার। চন্দ্রতাল লেক থেকে উৎপন্ন এই প্রলয়ংকরী নদী আলাদা করেছে স্পিতির ধূসর মরুভূমি থেকে কুল্লুর সবুজ প্রান্তরকে।

হারিয়ে যাওয়া সবুজে যখন ধূসর হয়ে আসছে প্রান্তর। ছাত্রু, লোহার, হিমাচল প্রদেশ। ছবি: রিফাত রাব্বি

চলতে চলতে দেখলাম পাহাড়ের সবুজ হারিয়ে যাচ্ছে পেছনে। সাদা কালো বিভিন্ন রঙের বিশাল পাথুরে পর্বতগুলো ভিড় করতে শুরু করেছে চোখের সীমানা জুড়ে। পাশ দিয়েই বয়ে চলেছে চন্দ্র নদ। যত এগোচ্ছি, ভয়াবহ বিধ্বংসী রূপ ধারণ করছে এই নদী, রাস্তা হতে শুরু করেছে দুর্গম। আকাশ ছোঁয়া পাথুরে এই পর্বতগুলোর গা কেটে একেবেঁকে তৈরি করা পাথুরে রাস্তাগুলো হয়ে উঠছে বিপজ্জনক।

মাঝে মাঝেই রাস্তার উপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে বিশাল বিশাল ঝর্ণার জলরাশি। এর মধ্যে দিয়েই খুব ধীরে হেলেদুলে আমাদের গাড়ী পৌঁছালো ছাত্রু নামক একটি জায়গায়। কয়েকশ মাইল রাস্তার ভেতর এ জায়গাটায় দুই থেকে তিনটি ছোট ছোট ধাবা খাবার জোগায় এই রাস্তায় আসা ভ্রমণকারী ও স্পিতির স্থানীয় লোকেদের। ছাত্রু থেকে ডালভাত খেয়ে আবার গাড়ি চলতে থাকল বড় বড় পাথরের রাস্তা ডিঙিয়ে।

পর্বত ঘেরা শীতল ছাত্রু। ছাত্রু, লোহার, হিমাচল প্রদেশ। ছবি:রিফাত রাব্বি

একটু এগোতেই দেখলাম সামনে বেশ কিছু গাড়ি আটকে আছে। বিশাল পাহাড়ি ঢলে ধুয়ে মুছে গেছে রাস্তার চিহ্ন। বড় বড় পাথরের উপর দিয়ে তীব্র বেগে বয়ে চলেছে অদম্য স্রোতধারা। গাড়িস সকল যাত্রিকে কোনোমত পাথর ডিঙিয়ে হেঁটে পার করতে হলো। এরপর গাড়িগুলো প্রচণ্ড বেগে হেলতে দুলতে ঝুকিপূর্ণভাবে পার হলো বন্যা প্লাবিত রাস্তার অংশটুকু। এই রাস্তার ড্রাইভাররা যে দুনিয়ার সব থেকে অভিজ্ঞ ড্রাইভার তা স্পিতি না গেলে বোঝা যাবে না।

কোনোমতে পার হয়ে ছুটতে শুরু করার ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই পৌঁছালাম অপরূপ কুঞ্জম পাসে। ৪,৫৯০ মিটার উঁচু এই পাসে রয়েছে একটি বৌদ্ধ মন্দির আর বিশাল বিশাল পর্বতের গ্লেসিয়ারে রোদ পড়ে উজ্জ্বল হয়ে আছে পুরো প্রান্তর। এই অপরূপ পাস থেকেই শুরু হয়েছে স্পিতি ভ্যালির সৌন্দর্য। তুলোর মতো অল্প কিছু মেঘ ছাড়া পুরো আকাশ নিরেট নীল হয়ে আছে। আর পর্বতগুলো যেন খুঁটি হয়ে ধরে রেখেছে আকাশকে।

কুঞ্জম পাস। স্পিতি ভ্যালি, হিমাচল প্রদেশ। ছবিঃ মহিউদ্দিন মাহি

কুঞ্জমপাস ছেড়ে যখন বিশাল আকৃতির স্পিতি রিভারের পাশ দিয়ে এগোচ্ছি, মনে হলো স্বপ্নের কোনো দেশে এসে ঢুকেছি। হিমালয়ের বরফ গলা হিমশীতল নদীর পাশ দিয়ে আকাশে উঠে গেছে ধূসর রঙের পর্বতগুলো।

কোনো কোনো পর্বতের মাথায় জমে আছে বিশাল গ্লেসিয়ার। আবার কোনো কোনো পর্বতরাজী সারি দিয়ে চলে গেছে দূর দিগন্তের শেষে স্পিতি রিভারের কুল ঘেঁষে।

মায়াময় লোসার। স্পিতি ভ্যালি, হিমাচল প্রদেশ। ছবি:রিফাত রাব্বি


মেঘের ভেতর দিয়ে ঢুকে আসা আলোয় তৈরি হচ্ছে নাটকীয় দৃশ্য। মানালি থেকে গাড়ি ছাড়ার আট ঘণ্টা পর আমরা এসে পৌঁছলাম স্পিতি ভ্যালির প্রথম গ্রাম, লোসারে। এখান থেকে বিদেশীদের পাসপোর্ট চেক করা হয়।

এই ফাঁকে দেখতে গেলাম টিউলিপ, ঘাস্ফুল, শর্ষেফুলের গ্রামটিকে। চারপাশে তাকালে ধূসর পাহাড় আর গাড় নীল আকাশের মাঝে ছোট্ট ছবির মতো সাজানো এই গ্রাম দেখলে মুগ্ধ হয়ে যাবে দুনিয়ার যে কেউ।

বিশাল স্পিতি নদীর পাশ দিয়ে স্পিতি ভ্যালি। স্পিতি ভ্যালি, হিমাচল প্রদেশ। ছবি:রিফাত রাব্বি

পাসপোর্ট চেকিং শেষ হলে আমরা আবার চলতে শুরু করলাম একদম নিচে দিয়ে, মানে স্পিতি রিভারের সমতলেই বলা চলে। যাত্রা শুরু করার ১১ ঘণ্টা পরে আমরা পৌঁছালাম অপরূপ সুন্দর স্পিতি ভ্যালির রাজধানী কাজাতে। দুই কিলোমিটার চওড়া স্পিতি রিভারের পাশে পাহাড়ের গায়ে লেপ্টে থাকা তিব্বতীয় সংস্কৃতিময় কাজা যেন স্বর্গের একটা ছোট্ট শহর।

কীভাবে যাবেন ও খরচের খসড়া:

স্পিতি ভ্যালি যেতে হলে আপনার দরকার হবে একটি ভারতীয় ভিসা। যে কোনো পোর্ট দিয়ে প্রবেশ করে কলকাতা থেকে ট্রেন, বাস বা বিমানে যেতে হবে দিল্লি, অথবা চণ্ডীগড়।ট্রেনে শ্রেণীভেদে দিল্লি বা চণ্ডীগড়ের ভাড়া পড়বে ৬৭৫ থেকে ৩,৫০০ রুপি। বিমানে পড়বে ২,৪০০ থেকে ১২,০০০ রুপি।  এই জায়গাগুলো থেকে বাস পাওয়া যাবে মানালির। বাস ভাড়া পড়বে ৪৯০ রুপি থেকে ১,৪০০ রুপি।

মানালি থেকে কাজা গামি একটি HRTC এর লোকাল বাস চলাচল করে বছরে ছয় মাস ভোর পাঁচটায়, এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। বাস ভাড়া ৩০০ রুপি। অথবা ট্যাক্সি ভাড়া করে সরাসরি চলে যেতে পারেন কাজায়। ভাড়া পড়বে ৮০০ রুপি শেয়ারে গেলে, আর পুরো ট্যক্সি ভাড়া করলে পড়বে ট্যক্সির ধরন অনুয়ায়ী ৬,০০০-১০,০০০ রুপি। HRTC এর বাসের টিকেট যাবার ন্যূনতম দুই দিন আগে ও ট্যক্সি ভাড়া করতে হবে যাত্রার আগের দিন।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চন্দ্রনাথ মন্দির ও তার পাতালপুরীর অজানা রহস্য

দিগন্তের সাথে বিছনাকান্দি ও রাতারগুল ভ্রমণ