লাকসামে নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানীর নওয়াব বাড়ি

অপু নজরুল ভাইয়ার পোস্ট থেকে জানতে পারলাম, কুমিল্লার লাকসামের পশ্চিমগাঁওয়ে নওয়াব ফয়জুন্নেসার নওয়াব বাড়ি। ভাবলাম, চাঁদপুর থেকে যদি ট্রেনে চেপে বসি, দেড় থেকে দুই ঘণ্টার মধ্যেই লাকসাম পৌঁছে যাব। ঈদের ছুটিতে তাই চাঁদপুরের পাশের নতুন কোনো জেলার অন্বেষণে না গিয়ে ঠিক করলাম, লাকসামই যাব।

কিন্তু এই ট্যুরের ক্ষেত্রে ভাগ্যটা খারাপই বলতে হবে, কারণ এবারে বেড়াতে বের হবার প্রতি পদে পদেই ঝামেলা হয়েছে। সকাল সকাল বাড়ি থেকে বেড়িয়ে রেল স্টেশনে গিয়ে শুনি, ডেম্যু ট্রেন চলাচল বন্ধ। কী আর করা? বাসস্টেশনে গিয়ে বাস ধরেই যাত্রা শুরু করলাম।

এই ভবনটিতে আরবিতে কিছু লেখা ছিল। তাই বুঝতে পারিনি এটা কিসের জন্য তৈরি হয়েছিল। সোর্স: লেখিকা

সারা সকাল চান্দিনায় ঘুরে ফিরে গেলাম লাকসামের দিকে। দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম মহিলা নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানীর বাড়িতে।

নওয়াব ফয়জুন্নেসার জন্ম কুমিল্লা জেলার হোমনাবাদ পরগনার (বর্তমানে লাকসামের) অন্তর্গত পশ্চিমগাঁয়ে । তিনি ১৮৩৪ সালে জন্মগ্রহন করেন । তাঁর বাবার নাম আহমেদ আলী চৌধুরী , বাবা জমিদার আর মা-আরাফান্নেসা চৌধুরানী । তিনি তাঁর বাবার প্রথম কন্যাসন্তান। সে সময় জমিদার বংশের সন্তান হিসেবে বেশ আরাম-আয়েশের মধ্য দিয়ে তিনি বেড়ে ওঠেন।

মোগল রাজত্বের উত্তরসূরী এই মহীয়সী নারীর দুই ভাই এয়াকুব আলী চৌধুরী এবং ইউসুফ আলী চৌধুরী। আর দু’বোন লতিফুন্নেসা চৌধুরানী এবং আমিরুন্নেসা চৌধুরানী ছিল । ছোটবেলা থেকে লেখাপড়ায় তাঁর প্রচুর আগ্রহ দেখে তার বাবা তার জন্য একজন গৃহশিক্ষক নিযুক্ত করেন।

তিনি কঠোর নিয়মানুবর্তিতা পালন করে তাঁর জ্ঞানস্পৃহাকে আরো উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর করে তোলেন। গৃহশিক্ষকের সাহায্যে ফয়জুন্নেসা খুব দ্রুতই কয়েকটি ভাষার উপর গভীর জ্ঞান অর্জন করতে সক্ষম হন। বাংলা, আরবি, ফার্সি ও সংস্কৃত – এ চারটি ভাষায় দক্ষ ছিলেন তিনি।

নওয়াব হাউজের উপরের তলা। সোর্স: লেখিকা

সে সময়ের আরেক স্বনামধন্য জমিদার সৈয়দ মোহাম্মদ গাজীর সাথে ১৮৬০ সালে তার বিয়ে হয়। তিনি ছিলেন মোহাম্মদ গাজীর দ্বিতীয় স্ত্রী। তার দাম্পত্য জীবন খুব একটা সুখের হয়নি। কথিত আছে নওয়াব ফয়জুন্নেসা ১৮৭১ সালে বিয়ের সতেরো বছর পর জানতে পারেন তার স্বামীর আরেকটি স্ত্রী আছে । তাই সতীন থেকে পৃথক থাকার জন্য তিনি তার বিয়ের কাবিনের এক লক্ষ এক টাকা দিয়ে পশ্চিমগাঁওয়ে সাড়ে তিন একর জমিতে একটা বাড়ি করেন । এটি নির্মাণ করতে তিন বছরের মতো সময় লেগেছিল। এই বাড়িটি দেখার জন্যই এতদূর এসেছি আমরা।

স্বামী বিচ্ছেদের পর তিনি সমাজ সংস্কার ও গঠনমূলক কাজে আত্মনিয়োগ করেন। তিনি জমিদারি পরিচালনার প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন । ১৮৭৩ সালে তার বাবা মারা যাওয়ার পর তিনি পশ্চিমগাঁওয়ের জমিদারি লাভ করেন এবং ১৮৮৫ সালে মায়ের মৃত্যুর পর তিনি মাতুল সম্পত্তিরও উত্তরাধিকারী হন। একজন নারী হয়েও সে সময়ে জমিদারির কঠোর দায়িত্ব তিনি সফলভাবে পালন করতে পেরেছেন।

রবীন্দ্রযুগে যে কয়জন নারী বাংলা সাহিত্য সাধনা করে যশ ও খ্যাতি অর্জন করেন, নবাব ফয়জুন্নেসা তাদের মধ্যে অন্যতম। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সাহিত্যিক হিসেবে নবাব ফয়জুন্নেসার নাম চিরস্মরণীয়। তার সাহিত্য সাধনার খুব অল্প সময়ে তিনি বঙ্কিমচন্দ্রের সমসাময়িক লেখক। শুধু তাই নয় প্রথম মুসলিম গদ্য-পদ্যে লেখিকা ছিলেন। ১৮৭৬ খ্রীস্টাব্দের ১০ ফেব্রুয়ারি ঢাকা গিরিশচন্দ্র মুদ্রণ যন্ত্র থেকে শ্রীমতি নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী রচিত সাহিত্য গ্রন্থ ‘রূপজালাল’ প্রকাশিত হয়।

পাশ থেকে নওয়াব বাড়ির দোতলার ছাদ।  সোর্স: লেখিকা

বৃটিশ অপশাসনের ফলে মুসলিম সমাজে কুসংস্কারের বেড়াজালে অবরোধবাসিনী হয়েও ফয়জুন্নেসা সাহিত্য সাধনার মাধ্যমে একটি গৌরবময় স্থান অধিকার করে আছেন। ‘রূপজালাল’ ব্যতীত ফয়জুন্নেসা কর্তৃক দু’খানি গ্রন্থের নাম পাওয়া যায়-‘সঙ্গীত লহরী’ ও ‘সঙ্গীত সার’ প্রকাশিত হলেও তা এখন দুষ্প্রাপ্য।

একথা বললে অত্যুক্তি হবে না সাহিত্য সাধনায় ফয়জুন্নেসার পথ ধরে বেগম রোকেয়ার আবির্ভাব হয়েছে । বাংলার নারীদের সাহিত্যে অবদানে নওয়াব ফয়জুন্নেসা সর্বাগ্রে।

নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানীর নওয়াব বাড়ি। সোর্স: লেখিকা

ইতিহাস অনুসন্ধানে জানা যায়, নবাব ফয়জুন্নেসা বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সৌদি আরবে পবিত্র হজ্বে গিয়ে বাঙালি হাজিদের যেন সমস্যা না হয়, সেজন্য মক্কা শরিফে মুসাফিরখানা ও মক্তব প্রতিষ্ঠা করেন।

এ ছাড়া নিজের প্রজাস্বত্ব এলাকায় ফয়জুন্নেসা রাস্তাঘাট, পুল-কালভার্ট, মসজিদ-মাদ্রাসা, দুটি বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি এলাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অবদান রাখেন তিনি। সে সময় পুরুষ জমিদারদের বেশিরভাগই রঙ্গশালা নিয়ে পড়ে থাকতেন আমোদ-ফুর্তিতে; আর প্রজা-শোষণের দৃষ্টান্ত দেখাতেন। অথচ নবাব ফয়জুন্নেসা নিজেকে উৎসর্গ করেন প্রজাহিতকর কাজে।

পাশের বাড়ির ছাদ থেকে এই ছবিটি তুলেছি। সোর্স: লেখিকা

ভারতের নিভৃত পল্লীর এ বিদূষী রমণী বেঁচে থাকতে তার কাজের স্বীকৃতি সেভাবে পাননি । তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের রানী নবাব ফয়জুন্নেসাকে বেগম উপাধিতে ভূষিত করেন। মুসলিম নারী হিসেবে এমনিতেই বেগম উপাধি থাকায় তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন।

পরে প্রজাবান্ধব জমিদারির কারণে রানী তাকে নবাব উপাধি দেন। ১৮৮৯ সালে তার নির্দেশক্রমে ফয়জুন্নেসাকে এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ‘নওয়াব’ উপাধি দেয়া হয়। তৎকালীন সময়ে তিনিই ছিলেন এশিয়া তথা উপমহাদেশের একমাত্র মহিলা নবাব।

পাশের বাড়ির ছাদ থেকে। সোর্স: লেখিকা

২০০৪ সালে ফয়জুন্নেসা চৌধুরানীকে মরণোত্তর একুশে পদক প্রদান করা হয়। তিনি জীবনের শেষ প্রান্তে ওয়ারিশদের প্রাপ্য অংশ বুঝিয়ে দেন। ১৯০৩ সালের অক্টোবর মাসে ও ১৩১০ বঙ্গাব্দের ২০ আশ্বিন নবাব ফয়জুন্নেসা ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর আগে বাড়িটি তিনি সরকারের কাছে ওয়াক্ফ করে যান।

নবাব ফয়েজুন্নেসার স্মৃতিগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে লাকসামের আনাচে কানাচে। এসব স্মৃতি দেখতে এখনো বিভিন্ন স্থান থেকে আসেন প্রচুর দর্শনাথী। ঈদের পরদিন বিকেল হওয়ায় নবাব বাড়ির সামনে প্রচুর মানুষজনকে দেখতে পাই আমরা। প্রবেশদ্বার দিয়ে সামনে ঢুকেই বাড়িটি দেখতে পেলাম।

আধুনিক নির্মাণশৈলীতে গড়া বাড়িটিতে রয়েছে স্থাপত্যকলার সব অপূর্ব নিদর্শন। সিমেন্ট, রড, চুন ও সুরকির সমন্বয়ে নির্মিত দৃষ্টিনন্দন বাড়িটি। নবাববাড়ির নবাব ভবন রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের অভাবে শীর্ণকায় দেখাচ্ছিল। খুব স্বাভাবিকভাবেই বাড়ির বিভিন্ন জায়গায় আস্তর উঠে ইটের গাঁথুনি বেরিয়ে পড়েছে।

প্রবেশদ্বার। সোর্স: লেখিকা

এখনো নবাব ফয়জুন্নেসার প্রচুর সম্পত্তি রয়েছে। নবাব বাড়ি ও সম্পত্তি দেখাশোনার জন্য বংশানুসারে খাদেমের দায়িত্বে রয়েছেন সৈয়দ মাসুদুল হক চৌধুরী এবং সৈয়দ কামরুল হক চৌধুরী।

নওয়াব বাড়ির রাস্তার ধার ঘেঁষে একটি সরু খালমতোন জলধারা প্রবাহিত হচ্ছে। বাদামওয়ালাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘খালের নাম কী?’
সে আমাকে চমকে দিয়ে বললো, ‘এটা ডাকাতিয়া নদী’
জন্মের পর থেকে চাঁদপুরের নিজের গ্রামে যে ডাকাতিয়া দেখে এসেছি, ওটার এই হাল দেখে চমকে ওঠারই কথা। নদী কতই না বৈচিত্র্যময়!

আঙ্গিনা।  সোর্স: লেখিকা

যাই হোক, নদীর তীরে মনোরম পরিবেশে নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানীর বাড়িটি। এখানে তাই রাস্তার পাশে দর্শনার্থীদের বিশ্রামের জন্য কিছু বেঞ্চি বানানো হয়েছে। কিন্তু এতটুকুই যথেষ্ট নয়। চাইলেই নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানীর এই নবাব বাড়িটিকে ঘিরে পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলা যায়। কালের সাক্ষী এই বাড়িটি সংস্কার করা হলে এটি হয়ে উঠবে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে অন্যতম দর্শনীয় স্থান। এ বাড়িটিকে নবাব ফয়জুন্নেসা জাদুঘরে রূপ দিলে নতুন প্রজন্ম জানার সুযোগ পাবে এক প্রজাবান্ধব জমিদারের জনহিত কর্মযজ্ঞ।

বর্তমানে বাড়িটিতে বসবাস করেন তার কয়েকজন উত্তরাধিকারী। কিন্তু দীর্ঘদিন থেকে রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের অভাবে বাড়িটির সৌন্দর্যহানির উপক্রম হচ্ছে। বিশাল এ বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয়ভার বহনও তার উত্তরাধিকারীদের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব সরকার নিলে বাড়িটির সুরক্ষা হবে। একজন প্রত্নস্থানপ্রেমী হিসেবে আমি মনে প্রাণে চাই, বাড়িটির প্রতি যেন সরকারের সুদৃষ্টি পড়ে।

তথ্যসূত্র:
http://newcomilla.blogspot.com/2017/04/comilla-jomidar-bari.html?m=1

ফিচার ইমেজ: মাদিহা

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এক নজরে একটি জেলা: অতীতের পাতা থেকে রাজশাহী জেলা

চাঁদপুরের রূপসা জমিদার বাড়ির কথকতা