নবাব ফয়জুন্নেসা জামে মসজিদ ও বিভিন্ন শিক্ষালয়ের ইতিবৃত্ত

লাকসাম যাওয়ার ভাবনাটা ছিল অনেকদিন আগে থেকেই। নবাব ফয়জুন্নেসার জমিদার বাড়ির সাথে সাথে তাঁর নির্মিত মসজিদটিও দেখার স্বাদ ছিল আমার। এই মসজিদের প্রতি বিশেষ আকর্ষণ থাকার কারণ হলো, নান্দনিক এই মসজিদটিতে পুরুষদের সাথে সাথে মেয়েদেরও নামাজ পড়ার ব্যবস্থা আছে।

দশ গম্বুজ মসজিদ। সোর্স: লেখিকা

বেড়াতে গিয়ে কত সুন্দর সুন্দর মসজিদ দেখে আফসোস করেছি, ‘আহা! এখানে যদি আমিও নামাজ পড়তে পারতাম!’

কারণ বেশিরভাগ বিখ্যাত মসজিদগুলোতেই মেয়েদের নামাজের জায়গা নেই। নবাব ফয়জুন্নেসা চমৎকার একটি মসজিদ তৈরি করে এবং তাতে মেয়েদের নামাজের ব্যবস্থা করে, আমার সেই আক্ষেপ কিছুটা হলেও ঘুচিয়েছেন।

এই মসজিদের সামনেই শায়িত আছেন, নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী ও তাঁর পরিবারের সদস্যগণ। মসজিদের দক্ষিণে পারিবারিক কবরস্থান ফয়জুন্নেসা পরিবারের। বলতে গেলে, মসজিদের ঠিক সামনেই রয়েছে, ঢুকলেই প্রথমে চোখে পড়বে। নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী ছোট কন্যা বদরুন্নেছা চৌধুরানীকে নিজ গ্রাম পশ্চিমগাঁওয়ে বিয়ে দেওয়ায় তাঁর কবর মায়ের পাশেই হয়েছে।

অপর মেয়ে সৈয়দা আসাদুন্নেসা চৌধুরানীকে বৃহত্তর সিলেটের হবিগঞ্জ জেলার জমিদার বাড়ীতে বিয়ে দিয়েছিলেন বলে এখানে তাঁর কবর নেই। সৈয়দ শাহ আজহারুল হক, আলহাজ খান বাহাদুর সৈয়দ মুহাম্মদ গাজিউল হক, মোতাওল্লী আলহাজ্ব মৌলভী সৈয়দ সিরাজুল হক, সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল হক, সৈয়দা খাইরুন্নেসা বেগম সহ আরো কয়েকজনের কবর রয়েছে এখানে। প্রত্যেক কবর ফলকে নাম আর জন্ম-মৃত্যু সাল লেখা আছে।

মসজিদের ছাতের আলপনা। সোর্স: লেখিকা

মসজিদের ভেতরের দেয়াল, মিম্বর আর মুয়াজ্জিনের আজান দেওয়ার জায়গায় আছে দুই ধরনের টাইলসের কারুকাজ। সেকালের টাইলসগুলো ছিল খুব দৃষ্টিনন্দন আর আভিজাতিক। দেয়ালের উপরের অংশের টাইলসগুলোতে রয়েছে গোলাপি, সাদা আর নীল রঙের কারুকাজ। আর নিচের দিকের টাইলসে হালকা শ্যাওলা সবুজ রঙের ডিজাইন।

মসজিদের ছাদে দশটি গম্বুজ আছে। ঠিক মাঝে বড় একটা গম্বুজ। এই গম্বুজের চার ধারে মাইকগুলো লাগানো। বড় গম্বুজের চারপাশে আছে মোট নয়টি গম্বুজ। পশ্চিম গাঁয়ে নিজ বাসস্থানের পাশেই রয়েছে এই দশ গম্বুজ মসজিদটি। নামাজীদের সুবিধার্থে একটি পুকুর খনন করেছিলেন। পাশেই রয়েছে অজু করার জন্য খননকৃত পুকুরটি। ওহ, হ্যাঁ! মসজিদটি কিন্তু জমিদার বাড়ির ঠিক পাশেই।

মসজিদের অন্দরে। সোর্স: লেখিকা

নওয়াব বাড়ি আর মসজিদ একই রাস্তার পাশে। রাস্তার ধার ঘেঁষে একটি সরু খালমতোন জলধারা প্রবাহিত হচ্ছে। বাদামওয়ালাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘খালের নাম কী?

সে আমাকে চমকে দিয়ে বললো, ‘এটা ডাকাতিয়া নদী’

জন্মের পর থেকে চাঁদপুরের নিজের গ্রামে যে ডাকাতিয়া দেখে এসেছি, ওটার এই হাল দেখে চমকে ওঠারই কথা। নদী কতই না বৈচিত্র্যময়! তবে নওয়াব ফয়জুন্নেসা যখন জন্মগ্রহণ করেছিলেন, তখন এই নদী খুবই স্রোতস্বিনী ছিল।

যাই হোক, নদীর তীরে মনোরম পরিবেশে নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানীর বাড়ি এবং মসজিদ। এখানে তাই রাস্তার পাশে দর্শনার্থীদের বিশ্রামের জন্য কিছু বেঞ্চি বানানো হয়েছে। বিকেল হয়ে আসায় সেখানে সার ধরে নারী-পুরুষ বসে আছে।

মসজিদ থেকে একটু সামনে এগোলেই চোখে পড়বে, নবাব ফয়জুন্নেসা সরকারী কলেজ। কলেজের ভেতরে ঢুকে দেখলাম। বিশাল এলাকা নিয়ে গঠিত কলেজটির দালানগুলো বেশ নান্দনিক। তখনকার নির্মাণশৈলী মতে বানানো ভবনগুলোর গাঠনিক রূপ যে চোখ জুড়াবে, তা তো বলাই বাহুল্য।

মুয়াজ্জিনের আজান দেওয়ার জায়গা। সোর্স: লেখিকা

এখানে এসে একটা ব্যাপার উপলব্ধি করলাম। নারী শিক্ষা প্রসারের কথা ভাবলে প্রথমেই যে নামটি আসে, তা হলো বেগম রোকেয়া। হ্যাঁ, বেগম রোকেয়া নারীদের জন্য অনেক কাজ করেছিলেন। কিন্তু এই কাজে পিছিয়ে ছিলেন না মহিলাদের মধ্যে প্রথম নবাব খেতাবপ্রাপ্ত ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী। বেগম রোকেয়া’র জন্মের সাত বছর পূর্বে তিনি লাকসাম এলাকার নবাব ছিলেন। শুধু কলেজ নয়, ১৮৭৩ সালে তিনি মেয়েদের জন্য কুমিল্লায় একটি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।

উপমহাদেশের বেসরকারিভাবে প্রতিষ্ঠিত মেয়েদের প্রাচীন স্কুলগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। কুমিল্লা শহরের নানুয়া দীঘির পশ্চিম পাড়ে ছিল প্রাথমিক বিদ্যালয়টি। এখন এটি শৈলরাণী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের প্রাথমিক বিদ্যালয় হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। একই বছর কুমিল্লার বাদুর তলায় ফয়জুন্নেসা উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। যা বর্তমানে নবাব ফয়জুন্নেসা সরকারি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় নামে পরিচিত। তার জমিদারীর আওতায় ১৪টি কাচারী সংলগ্ন এলাকায় ১৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

অজু করার জন্য খননকৃত পুকুরটি। সোর্স: লেখিকা

আমাদের দেশে শিক্ষার প্রচারে নওয়াব ফয়জুন্নেসার অবদান সত্যিই অনস্বীকার্য। যে কলেজটি আমি দেখতে পেলাম, এটি প্রথমেই কলেজ আকারে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। প্রথমে তিনি এখানে একটি অবৈতনিক মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। সেই সাথে মাদ্রাসার ছাত্রদের জন্য থাকার সুবিধার জন্য একটি ছাত্রাবাসও নির্মাণ করেন। মাদ্রাসার ভালো ফলাফলে উৎসাহিত হয়ে পরবর্তিকালে ফয়জুন্নেসার বংশধরগণ ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দে এটিকে উচ্চ মাধ্যমিক ইসলামিক কলেজে রূপান্তরিত করেন।

১৯৬৫ খ্রীঃ কলেজটি একটি ডিগ্রী কলেজে রূপান্তরিত হয়ে নওয়াব ফয়জুন্নেসা ডিগ্রী কলেজ নামে আখ্যায়িত হয়। ১৯৮২ খ্রীঃ এ কলেজটির সরকারিকরণ হয় এবং নাম হয় “নওয়াব ফয়জুন্নেসা সরকারি কলেজ”। বর্তমানে এই নামেই চলছে কলেজটি।

এখানেই শায়িত আছেন, নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী ও তাঁর পরিবারের সদস্যগন।সোর্স: লেখিকা

তাছাড়া তিনি আর তার কন্যা বদরুন্নেসা পশ্চিমগাঁওয়ে “নওয়াব ফয়জুন্নেসা ও বদরুন্নেসা উচ্চবিদ্যালয়” প্রতিষ্ঠা করেন। মেয়েদের থাকার জন্যও হোস্টেলের ব্যবস্থা করেছিলেন। তার জমিদারির আয় থেকে মেয়েদের জন্য নির্মিত এ হোস্টেলের সব খরচ বহন করা হতো। মেয়েদের জন্য মাসিক বৃত্তির ব্যবস্থাও তিনি করেছিলেন ।

শুধু পড়াশোনার উন্নতিই নয়, এর সঙ্গে সঙ্গে তিনি মেয়েদের স্বাস্থ্য রক্ষা ও সুচিকিৎসারও ব্যবস্থা করেন। ১৮৯৩ সালে কুমিল্লা শহরে প্রতিষ্ঠা করেন ‘ফয়জুন্নেসা জানানা হাসপাতাল’। ১৮৯৩ সালে নওয়াব বাড়ির কাছেই তিনি মেয়েদের জন্য একটি স্বতন্ত্র হাসপাতাল নির্মাণ করেছিলেন। এছাড়াও অনেকগুলো দাতব্য প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, এতিমখানা এবং সড়ক নির্মাণ করেছিলেন নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানী।

নওয়াব ফয়জুন্নেসা সরকারি কলেজ। সোর্স: লেখিকা

এখানেই শেষ নয়। ১৮৯৪ সালে পবিত্র হজ্ব পালন করার সময় তিনি মক্কায় হাজীদের জন্য একটি মুসাফিরখানাও প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি পবিত্র মক্কা শরিফে মাদ্রাসা-ই-সওলাতিয়া ও ফোরকানিয়া সহ বিভিন্ন শিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠানে প্রচুর পরিমাণে সহায়তা করেন।

নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী আর দশটা জমিদারের মতো ছিলেন না। প্রজাদের প্রতি তাঁর ভালোবাসা আর দায়িত্ব পরায়ণতা এই কাজগুলোর মাধ্যমেই প্রকাশিত হয়। নিজের জীবদ্দশাতেই তিনি তার স্থাবর-অস্থাবর সকল সম্পত্তি জনকল্যাণে সরকারের হাতে তুলে দেন।

ডাকাতিয়া নদী। সোর্স: লেখিকা

জমিদারীর সময়কার কাহিনী নিয়ে নবাব ফয়জুন্নেসা রূপক কাব্যগ্রন্থ রূপজালাল বইটি লিখেছেন। এছাড়াও বিভিন্ন লেখক ও গবেষক প্রায় ২০টির মতো বই লিখেছেন বাংলার প্রথম রানী নবাব ফয়জুন্নেছার জীবনী নিয়ে। তারমানে তিনি ছিলেন একাধারে নবাব, সাহিত্যিক এবং জনকল্যাণমুখী কাজের মানুষ। এমন একজন মানুষের জন্য মন থেকে শ্রদ্ধা জন্মায়।

কীভাবে যাবেন

দেশের যেকোনো জায়গা থেকে আগে লাকসাম বাসস্টেশন যেতে হবে। সেখান থেকে রিকশায় পশ্চিমগাঁও। রিকশাওয়ালাকে পশ্চিমগাঁও কলেজের কথা বললেই হবে। ভাড়া নেবে ৪০-৫০ টাকা। এই রাস্তাতেই ডাকাতিয়া নদীর পাশে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে কালের সাক্ষী নবাব ফয়জুন্নেসা নবাববাড়ি, জামে মসজিদ, স্কুল এবং কলেজসমূহ।

তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া

ফিচার ইমেজ: মাদিহা মৌ

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভারতের পাহাড়ে ঘেরা অপরূপ শহর ক্যাসোল আর সালাল ভিলেজ

আশুরার ছুটিতে সাজেক ভ্রমণে টিজিবি