‘প্রাচ্যের মুক্তা’ খ্যাত গোয়ার কোলভা বীচ ভ্রমণ

সদ্য ঘুরে এলাম গোয়া-কেরালা-মুন্নার আর কোচিন। মূল কথা ভারতের দক্ষিণ অঞ্চলের বেশ কিছু জায়গা। মোট ১৩ দিনের এই ভ্রমণে পাড়ি দিয়েছি প্রায় ৮,০০০ কিলোমিটার পথ, ঢাকা থেকে শুরু করে ঢাকায় ফেরা পর্যন্ত। নেমেছি, থেমেছি, ঘুরেছি আর একটু আধটু স্পর্শ করেছি ভারতের ৭টি রাজ্য। পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা, অন্ধ্রপ্রদেশ, কর্ণাটক, গোয়া, কেরালা ও তামিলনাড়ু। আজকে গোয়া ভ্রমণের প্রথম পর্ব নিয়ে থাকছে গল্প।
ট্রেন থেকে নেমেই চোখে পড়লো গোয়া শহরে নানা রকম দূরত্বের বীচ ও শহরের আনাচে কানাচে যাবার জন্য কোথায় আর কোন ধরনের কত ভাড়া সেটার সরকারী চার্ট করে টাঙানো আছে। চাইলেই কেউ আপনাকে বোকা বানিয়ে বা বিদেশী ভেবে নিজের ইচ্ছামতো টাকা খসাতে পারবে না। সেই সুযোগ নেই, ওরা রাখেনি।

ম্যাডগাঁও। গোয়ার রেল স্টেশন। ছবিঃ লেখক

অটোতে করে সোজা হোটেল খুঁজতে গিয়েছিলাম। যেহেতু আমাদের ট্রেন প্রায় ৪ ঘণ্টা দেরিতে পৌঁছেছে প্রায় সন্ধ্যায়। তাই দূরের কোনো বীচে আর যেতে ইচ্ছা করেনি। গোয়া ম্যাডগাও স্টেশনের সবচেয়ে কাছের বীচ ৪/৫ কিলোমিটার দূরত্বের কোলভা বীচের কাছের হোটেল বীচ রিসোর্টে গিয়েছিলাম। একটি এসি, ডাবল স্ট্যান্ডার্ড রুমে উঠলাম ১,৫০০ রুপী করে, সাথে বিশাল সুইমিং পুল ফ্রি!
বাহ, আমার জন্য না হোক, আমার ছেলের জন্য তো এই সুইমিং পুল দারুণ আনন্দের একটা ব্যাপার হয়ে উঠলো, পরবর্তী চার দিনের জন্য। দারুণ রুম, বিশাল বাথরুম, চমৎকার লন, সবুজের মিহি ঘাসের গালিচা, নানা রকম গাছের সমারোহ। নীল জলের সুইমিং পুল, সারি সারি নারিকেল গাছের ছায়া, সব কিছু মিলে এতই ভালো লেগেছিল যে অন্য কোনো হোটেল খুঁজে আর নতুন করে মানিয়ে নিতে ইচ্ছা হয়নি। ওখানেই থেকে গিয়েছিলাম আমাদের চারদিনের গোয়া অবস্থানের জন্য।
নীল জলের সুইমিং পুল। ছবিঃ লেখক

ওদের এই স্বল্প দাম, ভালো মান, উন্নত সুযোগ সুবিধা আর সবার জন্য, সব সময় সমান সেবা দেবার মানসিকতার জন্য, ওদের কখনো মাছি মারতে হয় না। আমার চার দিনের ওই হোটেলে অবস্থানের অভিজ্ঞতা এমনই। সব সময় দেশী-বিদেশী পর্যটক গিজগিজ করছে। রিসেপশনের কাউকে অযথা বসে আছে দেখিনি কখনো। ভেবে পাই না আমাদের পর্যটন ব্যবস্থাপক, ব্যবসায়ী বা নীতিনির্ধারকরা কেন বোঝেন না, অল্প দাম, বেশি বিক্রি, সব সময়ের জন্য অপারেশন চালু রাখলেই মুনাফা বরং বেশি হবে।
এরপর খাওয়া নিয়ে আবারো অবাক হবার পালা। হোটেলে একটু সামান্য খোঁজ নিচ্ছিলাম যে খাবার দামটা না জানি কেমন হবে? বাইরে তো যেতেই হবে কম দামে খেতে। খুব যদি দরকার হয়, তাহলে এক বেলা যেন অন্তত ওদের সবচেয়ে কম দামী খাবারটা খেয়ে দেখবো এই ভাবনা নিয়ে খাবারের দাম দেখছিলাম।
দেখলাম একটি ভাত, ফ্রাই ফিশ, ফিশ কারী দাম ১,০০০ রুপী! দেখেই আমি বাদ দিয়ে দিয়েছি এখানে খাব না। ছেলের মায়ের জিজ্ঞাসা কেন? পাগল নাকি তুমি ১,০০০ টাকায় একজনের খাবার খেলে দুই দিন পরে তো চলে যেতে হবে, কেরালা না গিয়েই।
১০০ রুপীর ফিশ-রাইস মিল। ছবিঃ লেখক

ছেলের মায়ের উত্তর, পাগল আমি না তুমি।
আমি? কেন আর কীভাবে?
আরে ফিশ কারী, ফিশ ফ্রাই আর ভাতের মিলের দাম ১০০ রুপী! ১,০০০ নয়।
ধুর কী বল তুমি, চোখের মাথা খেয়েছ তোমার, আমাদের কক্সবাজারেই ৪০০/৫০০ টাকার নিচে মাছ ভাজা পাওয়া যায় না আর তুমি গোয়াতে দেখছ ১০০ টাকা, না! পাগলামি রাখো, ভালো করে দেখ।
আবার ভালো করে দেখলাম। এ আল্লাহ বলে কী, মাছের তরকারী, একটা আস্ত মাছ ভাজা আর ভাত মিলে মাত্র ১০০ রুপী! এও কী সম্ভব আর সাথে যত খুশি ফ্রিজের ঠাণ্ডা পানি। এমনকি চাইলে বোতল ভরে রুমেও নিয়ে যাওয়া যাবে! আর কী বলবো, আমি হতবাক হয়ে ভাত খেলাম সামুদ্রিক মাছের ঝোল, একটা মাঝারি রূপচাঁদা মাছের ভাজি, আর এক বোল সাদা ভাত মাত্র ১০০ রুপী দিয়ে!
শুধু আমি নই, ওই হোটেলের আর কেউ অন্য কোথাও দিনে অন্তত যায়নি খেতে, সবাই ওই হোটেলেই খেয়েছে সব সময়। তাতে কী হয়েছে জানেন, ওরা হয়তো দাম কম রেখেছে, কিন্তু ওদের বিক্রি হয়েছে অনেক অনেক বেশি, যেটা ওদের প্রফিটে তেমন একটা প্রভাব ফেলেনি। মুনাফা ওদের ঠিক আছে, কারণ দারুণ বিক্রি হয়।
ঝলমলে বীচের সজ্জা। ছবিঃ লেখক

খাওয়া দাওয়া শেষ করে রুমে ফিরে একটু বিশ্রাম নিয়ে, কিছুটা ক্লান্তি কমিয়ে বেড়িয়ে পরলাম বীচের উদ্দেশ্যে। আমাদের হোটেল থেকে মাত্র ৫-৬ মিনিটের হাঁটা পথ কোলভা বীচ। হেঁটে হেঁটে শুকনো বালুর পথ, নারিকেল গাছের সারি, ছোট্ট একটা ব্রিজ পেরিয়ে একদম বীচের ঢেউয়ের কাছে। কিন্তু ততক্ষণে সন্ধ্যা বেশ আগেই পেরিয়ে গিয়ে রাত নেমেছে। অথচ বীচে গিয়ে সেটা বোঝার কোনো উপায় রইলো না। কারণ নানা রকম পর্যটকে মুখরিত পুরো কোলভা বীচের আশপাশ। হুহু বাতাসে উড়িয়ে নিয়ে যেতে চাইছিল যেন।
কেমন যেন একটা শিহরণ বয়ে গিয়েছিল অনেক অনেক দিনের অপেক্ষার পরে সত্যি সত্যি গোয়ার সমুদ্র তীরে দাঁড়িয়ে আছি বুঝতে পেরে। রাতের আঁধারে, ক্ষীণ চাঁদের আলোয় যতদূর চোখ যায় নিয়ন আলো ঝিলিক দিয়ে যাচ্ছিল, দূরের নানা রকম বীচে নানা রকম বর্ণীল আলোর ঝলকানিতে। এক একবার ইচ্ছে হচ্ছিল ঢেউয়ের তালে তালে ভেসে ভেসে যদি এক বীচ থেকে আর এক বীচে ভেসে যাওয়া যেত তবে বেশ হতো।
তিনজনে মিলে হাতে হাত ধরে জনাকীর্ণ বীচ থেকে হেঁটে চলে গিয়েছিলাম নির্জনে একাকী পড়ে থাকা বীচের এক প্রান্তে। যেখানে ঢেউগুলো শুধু আমাদের ছুঁয়ে যাচ্ছিল, যেখানে আকাশের চাঁদ যেন শুধু আমাদের জন্য আলো জ্বেলেছিল, যেখানে উত্তাল সমুদ্রের মাতাল বাতাস শুধু আমাদেরকে পাগল করে তুলছিল!
কোলভা বীচ গোয়া। ছবিঃ লেখক

অনেক অনেকক্ষণ নির্জন, কিন্তু শতভাগ নিরাপদ বীচে বসে ছিলাম বালুর উপরে আর ঢেউয়ের মাঝে পা ভিজিয়ে, যতক্ষণ না ঘুমে তিন জনের ছয় চোখ জড়িয়ে না আসে ততক্ষণ। যখন শরীর একদম অবসন্ন লাগছিল ঠিক তখনই রুমে ফেরার পথ ধরেছিলাম। রাত ১১টা পেরিয়ে গেছে ততক্ষণে। কিন্তু আমরা যখন বীচ থেকে রাস্তার পথ ধরেছি, তখনও অনেকে দলবেঁধে বীচের পানে ছুটে চলেছে।
অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলাম ওদের সমুদ্র উপভোগের অদম্য উচ্ছ্বাস দেখে। কারণ গোয়ার কোনো বীচেই কোনো রকম নিরাপত্তাহীনতা নেই, কোনো বাধা বা বিধিনিষেধ নেই, কোনো রাখঢাক বা অযথা ভয়, শঙ্কা নেই। যে যেখানে আর যতক্ষণ খুশি, যেভাবে খুশি উপভোগ করতে পারবে। সেই আশ্বাস আর বিশ্বাসেই দারুণভাবে উপভোগ করা যায় গোয়ার যে কোনো বীচে, যে কোনো সময় আর যেভাবে খুশি।
কোলভা হলো গোয়া স্টেশন থেকে সবচেয়ে কাছের বীচ, দূরত্ব ৪-৫ কিলোমিটার। কলকাতা থেকে গোয়া যাওয়ার একমাত্র ট্রেন অমরাবতী এক্সপ্রেস বা প্লেন।
ফিচার ইমেজ- remotetraveler.com

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

প্রবাল দ্বীপে ক্যাম্পিং ও স্নোরকেলিং

তিন নেতা শেরে বাংলা, সোহরাওয়ার্দী, নাজিমুদ্দিনের সফেদ মাজার