ভারতের শীতল মরুভূমির শহর কাজা

স্পিতি ভ্যালির পাহাড়ি সকাল নেমে আসতেই কাজা এসে নামলাম। সামনে যতদূর চোখ যায় পার্বতী ভ্যালির পাহাড়গুলো সারি দিয়ে আছে। স্পিতি রিভারের পাশে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়গুলোর উপর গড়ে ওঠা স্পিতির গ্রামগুলোর চেয়ে কাজা একটু বড়৷ স্পিতি ভ্যালির রাজধানী হিসেবেও ধরা হয় এই কাজাকে।

গাড়ি থেকে নেমে ঢুকলাম কাজার ছোট্ট লোকাল বাজারটাতে। শীত পোশাক, পাহাড়ে ট্র‍েকিং সামগ্রী, খাবার দোকান আর তিব্বতীয় গয়নার দোকানগুলোই মাতিয়ে রাখে এই শহরকে।কাজা ঢুকে চোখে পড়ল পুরো স্পিতির মতোই চারদিকের ধূসর পাহাড়গুলো, যাতে চিক চিক করছে পড়ন্ত সূর্যের আলো আর স্বচ্ছ নীল আকাশে তুলোর মতো কিছু মেঘ ভেসে আছে ইতস্তত।

কাজা যাত্রার পথে। কাজা, হিমাচল প্রদেশ। ছবিঃ মহিউদ্দিন মাহি 

শহর কাজার মূলত দুইটি অংশ। মাউন্ট শিলার গ্লেসিয়ার গলে আসা পানি থেকে উৎপন্ন নদী এই শহরকে দু’ভাগে ভাগ করে মিশেছে স্পিতি রিভারে৷ শহরের অপর দিকটাতে রয়েছে হাসপাতাল, সরকারি কিছু দপ্তর, খেলার মাঠ, স্কুল আর অন্য দিকটা মূলত লোকাল মার্কেট, হোটেল আর ক্যাম্প সাইট। টুরিস্টদের জন্য এই দিকটাই উপযোগী।

অপরদিকের পাহাড়ে সাদা রঙে আকা বিশাল বুদ্ধর ছবি সবার আগেই দৃষ্টি কাড়ল। পাহাড়ের এক তৃতীয়াংশ জুড়ে আঁকা বিশাল এক বুদ্ধের ছবি স্থানীয়দের কাছে পবিত্র। অপরূপ সুন্দর কাজায় ঢুকে দেখার দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে এখানকার মানুষগুলো। অধিকাংশ মানুষই তিব্বতীয়। স্থানীয় এই মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩,২০০।

কাজার রাস্তায়। কাজা, হিমাচল প্রদেশ। ছবিঃ রিফাত রাব্বি

ভারতের উচ্চতম শহরগুলোর মধ্যে কাজা একটি শহর৷ ১২,৫০০ ফিট অর্থাৎ ৩,৮০০ মিটার উচ্চতার এই শহটি রঙবেরঙের উৎসবগুলোর জন্য বেশ বিখ্যাত। উৎসবগুলোতে অনেক রঙের লাইট, কাপড় দিয়ে সাজানো হয়৷ তিব্বতীয়ান অনেক রঙের পোশাকে স্থানীয়রা মেতে ওঠেন এসব উৎসবে। এই শহরে এসেই  মুগ্ধ হলাম দোকানপাট আর হরেক রঙের অলিগলি দেখে৷

প্রত্যেকটি দোকানে রয়েছে রঙের উৎসব। এত উচ্চতায় ক্লান্তির জার্নি করে একটা হোটেল রুম নিয়ে নিলাম। হোটেলের রুম থেকেই দেখা যাচ্ছে বিশাল উঁচু পাহাড়ের সারি। সেগুলো যেন পিলারের মতো ধরে রেখেছে আকাশকে। জ্বলজ্বলে রোদে আরো ঝলসে যাচ্ছে বাদাম রঙের পাহাড়গুলো।

হোটেল রুমের বাদামি আভা।কাজা, হিমাচল প্রদেশ। ছবিঃ রিফাত রাব্বি

বাইরে বেশ রোদ থাকলেও ঠাণ্ডাটা ঠিকই শুষে নিচ্ছিলো দলের সবাইকে। হোটেল থেকে ফ্রেশ হয়ে তিব্বতী খাবার খাওয়ার লোভে খিদে যেন পেটমোড়া দিয়ে আসছিলো। নিচে নামতেই দেখলাম ছোট দুই একটা গলির পরই শহর শেষ৷ দুটো গলি খুঁজে বাস স্টপের দিকে এগোতেই তিব্বতী মোমো আর স্যুপের দোকান পেলাম৷ কী অসাধারণ সেই স্বাদ!

সিঙ্গাড়া পেলাম, যা রীতিমতো চটপটি করে দেয়া হলো আমাদের সামনে। খাবার খেয়েই পুরো শহরটা ঘুরে দেখার জন্য বের হলাম। ছোট্ট একটা শহর এই কাজা। অল্প কিছু দোকান, হোটেল, বাসস্ট্যান্ড নিয়েই শহরটি দাঁড়িয়ে আছে স্পিতির বুকে। বাদ বাকি যা আছে সব স্থানীদের বসতি। বছরে প্রায় ছয় মাস স্পিতির সাথে সব ধরনের পরিবহন যোগাযোগ বন্ধ থাকে বাইরের পৃথিবীর।

স্পিতির আকাশে নীলে মিশে যাওয়া।কাজা, হিমাচল প্রদেশ। ছবিঃ মহিউদ্দিন মাহি

সেপ্টেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত সব ধরনের লোকাল সার্ভিস প্রায় বন্ধ থাকে বরফে রাস্তা ব্লক হয়ে থাকার জন্য৷ মাইনাস কুড়ি পর্যন্ত এই তাপমাত্রায় সর্বত্র থাকে বরফের ছড়াছড়ি। তাই বাকি ছয় মাস এই শহর থাকে প্রানবন্ত৷ কৃষকদের ব্যস্ততা বাড়ে শীতের জন্য খাবার সংরক্ষণের। এখানকার স্থানীয় লোকেদের প্রতিদিনকার খাবার মূলত রুটি, ডাল, সবজি।

কাজার লোকাল মার্কেটে এগুলো স্পিতির অন্যান্য গ্রামগুলো থেকে এসে বিক্রি হয়৷ সব থেকে মজার ব্যাপার হচ্ছে এখানে খুব কম দামে ভাত, ডাল, সবজি এগুলো পাওয়া যায়। রাজমার সাথে স্থানীয়ভাবে ফলানো গমের রুটি খেয়ে লোকাল বাজারেই ঘুরলাম বেশ কিছুক্ষণ। পরদিন মানালি ফিরে আসার ট্যাক্সি টিকেট কেটে আবার হোটেল রুমে ফিরে এলাম বিশ্রামের জন্য।

পৃথিবীর উচ্চতম ফিলিং স্টেশন। কাজা, হিমাচল প্রদেশ। ছবিঃ মারুফা হক

ঘড়ির কাঁটায় ছয়টা বাজতেই আবার বের হলাম স্বপ্নের এই শহরে। বেশ কিছু শিব মন্দির আর বৌদ্ধ মন্দির ঘোরাঘুরি করে রাস্তায় এসে দেখলাম এখানেই রয়েছে পৃথিবীর উচ্চতম ফিলিং স্টেশন। প্রায় ১৪,৬০০ ফিট উচ্চতার এই ফিলিং স্টেশনের জন্যেই স্পিতি ভ্যালির যোগাযোগ ব্যবস্থা টিকে আছে। তিব্বতীয় রেসিপির এক প্রকার স্যুপ খেলাম লোকাল এক রেস্টরেন্ট থেকে। দেখতে হুবহু পানির মতো স্বচ্ছ এই স্যুপের স্বাদ অতুলনীয়।

এরপর কাজা থেকে একটু উপরে উঠতেই চোখে পড়ল পুরো ভ্যালিটি। আর যাই হোক সুউচ্চ পর্বতসারি আর স্বচ্ছ নীল আকাশের পাশাপাশি এই রূপ দেখে যে কেউ মোহগ্রস্থ হতে বাধ্য। এই রাস্তা চলে গেছে পৃথিবীর আরেক উচ্চতম গ্রাম হিকিমে। উচ্চতার নেশায় এসব গ্রাম শহরে যারাই একবার আসবে তারা বার বার আসতে বাধ্য।

স্পিতি ফেস্টিভ্যাল। ছবিঃ Hirip Tribal Cultural Society

সন্ধ্যায় হোটেলে ফিরে জানতে পারলাম আজ কাজাতে একটা উৎসব হবে। দেরি না করে জায়গার খবর নিয়ে চলে গেলাম উৎসবে৷ ছোট একটা বাড়িতে চলছে নাচ গানের আসর। স্পিতির নিজস্ব ভাষার গানে চলছে নাচ আর রঙের মেলা। নৃত্যশিল্পীরা পরেছেন মুগ্ধ করা হরেক রঙে সাজানো নাচের পোশাক।

বাংলাদেশি জেনে অনেকেই আমাদের জায়গা করে দিলো বসে দেখার জন্য। অনেক রাত পর্যন্ত আমরা উপভোগ করলাম পুরো উৎসব। পর দিন খুব ভোরে ফিরতে হবে দেশের পথে। শীতল স্পিতি ভ্যালির কোটি কোটি তারায় ভরা শেষ রাতটি কেটে যেতে থাকল।

কীভাবে যাবেন ও খরচের খসড়া:

কাজা যেতে হলে আপনার দরকার হবে একটি ভারতীয় ভিসা। যে কোনো পোর্ট দিয়ে প্রবেশ করে কলকাতা থেকে ট্রেন, বাস বা বিমানে যেতে হবে দিল্লি অথবা চণ্ডীগড়। ট্রেনে শ্রেণীভেদে দিল্লি বা চণ্ডীগড়ের ভাড়া পড়বে ৬৭৫ থেকে ৩,৫০০ রুপি। বিমানে পড়বে ২,৪০০ থেকে ১২,০০০ রুপি। এই জায়গাগুলো থেকে বাস পাওয়া যাবে মানালির। বাস ভাড়া পড়বে ৪৯০ রুপি থেকে ১,৪০০ রুপি।

মানালি থেকে কাজাগামী একটি HRTC এর লোকাল বাস চলাচল করে বছরে ছয় মাস ভোর পাঁচটায়, এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। বাস ভাড়া ৩০০ রুপি। অথবা ট্যাক্সি ভাড়া করে সরাসরি চলে যেতে পারেন কাজায়। ভাড়া পড়বে ৮০০ রুপি শেয়ারে গেলে আর পুরো ট্যক্সি ভাড়া করলে পড়বে ট্যক্সির ধরন অনুয়ায়ী ৬,০০০-১০,০০০ রুপি। HRTC এর বাসের টিকেট যাবার ন্যূনতম দুই দিন আগে ও ট্যক্সি ভাড়া করতে হবে যাত্রার আগের দিন।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

পাহাড়ের কোলে অনন্য রিসোর্ট “মিলনছড়ি হিলসাইড রিসোর্ট”

বিদেশের মাটিতে বাজেট ট্রিপ: পাহাড়ি কন্যা শিমলা ভ্রমণ