মেঘপাহাড়ের দেশ সাজেক ভ্রমণের ইতিবৃত্তান্ত

সময়টা ছিল ২০১৭ সালের রোজার সময়। রোজার ছুটিতে বাসায় যাইনি, ক্যাম্পাসেই রয়ে গেলাম। ধুমিয়ে টিউশনি করছিলাম, ১৭ রোজা পর্যন্ত থাকব ক্যাম্পাসে। মাস শেষে হাতে বেশ কয়েকটা টাকা আসবে, তাই মাথার ভেতর ঘুরতে যাওয়ার পোকা কিলবিলিয়ে উঠল। কিন্তু রোজায় কোথায় পাবো এমন কাউকে যে আমার সাথে ঘুরতে যাবে, সবাই তো বাসায়। খুঁজতে খুঁজতে খুব কাছের একজন বন্ধুকে পেয়ে গেলাম, ঢাকা থেকে যোগ দেবে সে। তাই পরিকল্পনা করতে লাগলাম কোথায় যাওয়া যায়। প্রথমে চিন্তা করলাম নাফাখুমের দিকে যাওয়া যায়। পরে শুনলাম বন্ধু নাকি ট্রেকে কাঁচা, তাই নাফাখুম বাদ। সাজেকের পরিকল্পনা তখনই আসলো যখন খাগড়াছড়ির কথা উঠল। রোজার সময় চলে তাই ভিড় কম হবে আর এমন শান্ত-নিরব পরিবেশে মেঘের কোলে দোল খাওয়ার দৃশ্য চোখে ভাসতেই চোখ চকচক করে উঠল।
যেমনটি কথা ছিল, ১৭ রোজায় সকল টিউশনি শেষ করে ঈদের ছুটি দিয়ে দিলাম স্টুডেন্টদের। যারা আগে আমার লেখা পড়েছেন এতক্ষণে নিশচয়ই জেনে গেছেন আমি থাকি খুলনায়। তাই খুলনা থেকে উঠে পড়লাম ঢাকার বাসে, মাওয়া হয়ে টুঙ্গীপাড়া এক্সপ্রেসের লঞ্চ পারাপারে ঢাকা পৌঁছে গেলাম ৪০০ টাকা দিয়ে। ঢাকার সায়েদাবাদ থেকে শান্তি পরিবহন (01191213438) বাস ছাড়ে খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে। ভাড়া ৫৮০ টাকা করে। রাত সাড়ে দশটার দিকে ছাড়ে সম্ভবত। একদম ভোরে পৌঁছে গেলাম খাগড়াছড়ি বাস স্ট্যান্ডে।

গন্তব্য সাজেক, ছবিঃ লেখক

খাগড়াছড়ি বাসস্ট্যান্ড থেকে অটো নিয়ে চলে যেতে হবে শাপলা চত্বরে। শাপলা চত্বর থেকে সাজেকের উদ্দেশ্যে চান্দের গাড়ি ছাড়ে। চান্দের গাড়ির ধারণ ক্ষমতা ১২ জন। ১২ জনের টিম না হলে সেখানে অপেক্ষা করলে বাকি টিম মেম্বার পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আমরা যেহেতু দুইজন যাবো তাই প্রথমে ঠিক করেছিলাম মোটরসাইকেলে যাবো, প্রতি মোটরসাইকেল ১,০০০ টাকা। কিন্তু কোনো মোটরসাইকেল পেলাম না আর মোটরসাইকেল দিয়ে যাওয়াও নাকি যথেষ্ট বিপদজনক। শাপলা চত্বর থেকে সাজেক যাওয়ার সিএনজিও পাওয়া যায়। সাজেক নিয়ে যাবে, এক রাত সেখানে থাকবে আবার পরদিন নিয়ে আসবে এই চুক্তিতে ভাড়া ঠিক হলো ৩,৫০০ টাকায়। আর যদি দিনে গিয়ে দিনে ফেরত আসতে চান তবে আরো কম টাকা লাগবে।
খাগড়াছড়ি থেকে সাজেক যাওয়ার রাস্তা, ছবিঃ লেখক

সাজেক যাওয়ার রাস্তাটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ভালোই উচ্চতায় অবস্থিত। সরু সে রাস্তায় পাশাপাশি দুই গাড়ি যেতে পারবে বলে মনে হচ্ছিল না। যাওয়ার পথে বাঘাইঘাট আর্মি ক্যাম্প পড়বে রাস্তায়। আপনার নাম পরিচয়, কোথা থেকে এসেছেন, কয়দিন থাকবেন এসব খাতায় টুকে নিয়েই ছেড়ে দেবে, বেশি সময় নষ্ট করে না আর্মিরা। বাঘাইঘাট আর্মি ক্যাম্পের আগে চান্দের গাড়ি একবার থামবে, না কোনো কাজে না। গাড়ি থামবে হাজাছড়া ঝর্ণার আগে। তবে যেখানে গাড়ি থামবে সেখানেই ঝর্ণা না, সেখান থেকে ১৫ মিনিট হেঁটে ভেতরে যেতে হবে। বেশ সুন্দর একটি ঝর্ণা, চাইলে গোসলও করে আসতে পারবেন। তবে আমরা গোসল করে আর দেরী করতে চাইনি। বাঘাইঘাট আর্মি ক্যাম্প থেকে আর্মি এস্কোর্ট দেয়ার কথা থাকলেও সেটা দেয়নি, তবে আসার সময় দেবে এবং তা কেবল সকাল দশটায় পাওয়া যাবে।
হাজাছড়া ঝর্ণা, ছবিঃ লেখক

খাগড়াছড়ি থেকে সাজেক যেতে তিন ঘণ্টার মতো লাগে। আমরা সাজেক পৌঁছে গেলাম ঠিক দেড়টায়। চারদিকের বিশালতা আর মেঘপ্রান্তর মাতাল করে দিচ্ছিল ক্ষণে ক্ষণে। আগে থেকেই মেঘপুঞ্জির কটেজ বুক করা ছিল, যার কটেজ তার নামটা ঠিক মনে নেই। তবে সাজেকে উনার একজন লোক থাকে যে মেঘপুঞ্জির সকল কটেজের দেখাশোনা করে। উনার নাম ইয়াসিন (01849887972)। উনার সাথে কথা বলেই আমি কটেজ বুক করি। হাস্যকর হলেও সাজেকের কটেজ ভাড়া হিসেব করা হয় টয়লেটের হিসেবে। প্রতি রাত হাই কমোডের রুম ভাড়া ৩,৫০০ টাকা আর সাধারণ টয়লেটের রুম ২,৫০০ টাকা। রোজার সময় পুরো সাজেকে আমরা ছাড়া আর কোনো পর্যটক ছিল না। তাই আমরা ২,০০০ টাকায় হাই কমোড আছে এমন রুমই নিলাম মেঘপুঞ্জিতে। তবে এই মূল্য শুধু মাত্র অফ সিজনের জন্য।
মেঘপুঞ্জি কটেজ, ছবিঃ লেখক

রুমে ঢুকেই ব্যালকনির দিকে নজর গেল, আহা এখানকার ছবিই তো দেখে এসেছি এত দিন! এই বারান্দায় দাঁড়িয়ে কত শত মানুষের ছবি দেখেছি। নিচে মেঘ, উপরে চেয়ারে বসে থাকা মানুষ আর একাকীত্বের হাহাকার শুনতে ইচ্ছে করছিল খুব। এদিকে আবার খিদেও পেয়েছে। মেঘপুঞ্জির পাশেই আছে মারুতি হোটেল, সেখানে সৌজেন দা নামে এক লোক কাজ করে বা মারুতী দিদির স্বামী হবে হয়তো। সৌজেন দাকে বলে দিলাম, “আধ ঘণ্টার ভেতর খাবারটা একটু রেডি করুন, আমরা ফ্রেশ হয়ে আসছি”। একে একে গোসল সেরে নিলাম, একদম ফ্রেশ হয়ে হেঁটে চলে গেলাম মারুতী হোটেলে। বান্দরবানের মতো এখানেও আলু ভর্তা, ডাল, মুরগীর ডিম আর অফুরন্ত ভাত দিয়ে আপ্যায়ন করা হলো আমাদের, প্রতি বেলার খাবার খরচ ১০০ টাকা।
সাজেক পাড়া, ছবিঃ লেখক

খাওয়া দাওয়া শেষে আমরা খানিকক্ষণ হোটেলে বসেই বিশ্রাম নিলাম। বিকেল সাড়ে চারটার দিকে ঘুরতে বেরুলাম সাজেক পাড়ায়। সাজেক পাড়া অনেক উপরে হওয়ায় খাগড়াছড়ির এপাশটার বিশাল ল্যান্ডস্কেপ চোখে পড়ে। বসার সুন্দর জায়গা করা আছে রাস্তার পাশে। আমরা হাঁটতে হাঁটতে চলে গেলাম হেলিপ্যাডের পাশে। সেখানে চিরায়ত সাজেকের যে দৃশ্য আমরা দেখি, একটা লাল ছাউনিসহ ঘর সেটা আছে। সেই ঘরটি মূলত কফি হাউজ হতে পারে। অন্দরমহলের সাজসজ্জা চোখে পড়ার মতো। বিশাল এই ঘরের বাইরের দিকে সুন্দর ছোট একখানা পার্ক বিশেষ আছে নাম দেয়া হয়েছে “দ্যা হ্যাংগিং গার্ডেন”।
দ্যা হ্যাংগিং গার্ডেন, ছবিঃ লেখক

আমরা পার্কটি ঘুরে হেলিপ্যাডে গিয়ে অনেকক্ষণ সময় কাটালাম। বিস্তর সবুজের সমারোহে পুরো এলাকাটাতেই আগুন লেগে আছে ভয়ংকর সুন্দরের। উপর থেকে লাল ছাউনিওয়ালা কটেজের দেখা মেলে সেখান থেকে। উচ্চতার কারণে বাতাসের কোনো কমতি নেই। তাই বসে পড়লে বসে থাকতেই ইচ্ছে করে। অনেকক্ষণ বসে ছিলাম সেখানে। সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে-যাবে এমন একটা সময়ে উঠে গেলাম সেখান থেকে আর পা বাড়ালাম বাজারের দিকে। ইয়াসিনকে ডাক দিয়ে এদিকটায় আনালাম, ওরা কয়েকজন এলো। সবাই আমার থেকে বয়সে তিন-চার বছর ছোট। সবাই মিলে চা খেলাম আমরা। কথা বলে বুঝলাম সবাই অনেক ভালো এখানকার। আর বাঙালিদের সাথে স্থানীয়দের কোনো ঝুট-ঝামেলা নেই সাজেকে। সৌজেন দাকেও সাথে সাথে রাখলাম।
জুমঘর থেকে দেখা দৃশ্য, ছবিঃ লেখক

ইয়াসিন জানাল রাতে মেঘপুঞ্জিতে বিদ্যুত থাকবে না, তাই একই মালিকের আরেকটি কটেজে নিয়ে আসল আমাদের। এই কটেজের নাম জুমঘর। আগের কটেজ থেকে হাজার গুণে ভাল, সামনের অংশ পুরোটাই কাঁচে ঘেরা কটেজ জুমঘর। দেখে বেশ ভাল লেগে গেল। সাথে সিঁড়ি দিয়ে নামতে হয় এমন একটা আলাদা ব্যালকনিও আছে যেখানে অতি যত্নে দুটো চেয়ার পেতে দেয়া হয়েছে আমাদের জন্য। সন্ধ্যাটা সাজেকের পাহাড়ি নিস্তব্ধতা ভেদ করে গান গেয়ে কাটালাম আমরা।
আমাদের ঠিক উপরেই ছিল ইয়াসিনদের কটেজ, তারাও গলা মেলাল আমাদের সাথে। আমার খুব ভাল লাগছিল এই ভেবে এভাবেই হয়তো ঘুরতে এসে অপরিচিত মানুষগুলোর সাথে আত্মার সম্পর্ক তৈরী হয়ে যায়। আমাদের জন্য ইয়াসিন রাতের খাবারটা রুমে নিয়ে চলে এলো। ওরা তিনজন আর আমরা দুইজন মিলে রাতের খাবারটা আমরা কটেজেই সারলাম, এদিকে সিএনজি ড্রাইভারকে বলে দিলাম রাতের খাবারটা আমি খাওয়াবো। খাওয়া-দাওয়া করে একটু আড্ডা দিয়ে ঘুমিয়ে গেলাম বেশি রাত না করে। পরদিন সকালে কংলাক পাড়া নিয়ে যাবে ড্রাইভার।
চিরায়ত সাজেক, ছবিঃ লেখক

পরদিন সকালে খুব করে বৃষ্টি নামল সাজেকের বুকে। ঘুম থেকে উঠে দেখি বৃষ্টির পানি চুইয়ে পড়ছে কটেজের বারান্দায়। বড় ভাই আগে থেকেই সাবধান করে দিয়েছিলেন বৃষ্টি হলে কংলাক পাড়া না যেতে কারণ যাওয়ার পথটি নাকি ভালোই পিচ্ছিল হয়। অবশেষে উপায়ন্তর না দেখে কটেজে বসেই মেঘের সাথে কথা বলে নিলাম, বললাম চলে যাচ্ছি আজকে।
হেলিপ্যাড থেকে দেখা, ছবিঃ লেখক

সকালের নাস্তাটা সৌজেন দা’র সাথে করলাম। মানুষ হিসেবে একদম স্বচ্ছ মনের অধিকারী এই সৌজেন দা। উনার বাচ্চাকাচ্চা, তাদের পড়াশোনা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে এই দুই দিনে প্রচুর কথা হয়েছে আমার। বলতে খুব গর্ববোধ করছি যে আমার একজন ভক্ত বেড়ে গেল সাজেক গিয়ে। মাঝে মাঝে এখনো ফোন দিয়ে আধো বাংলায় খোঁজ-খবর নেন তিনি।
বারান্দা থকে দেখা সবুজ আর সবুজ, ছবিঃ লেখক

সাজেক থেকে ফিরতে হলে রওনা দিতে হবে ঠিক দশটায়, নাহলে আর্মি এসকোর্ট পাওয়া যায় না। আর্মি এসকোর্টের ব্যাপারটা হলো আপনার সাথে একজন আর্মি পারসন দিয়ে দেয়া হবে যাতে রাস্তায় কোনো সমস্যা না হয়। সকাল দশটায় রওনা দিয়ে দিলাম আমরা, সিএনজিতে একজন উঠে বসলেন আর্মিদের। খাগড়াছড়ি পৌঁছে যাই দেড়টার দিকে। সেখান থেকে আড়াইটার বাস ধরে ঢাকা পৌঁছে যাই রাত সাড়ে নয়টায়। আর এভাবেই শেষ হয় খুবই ছোট কিন্তু স্বপ্নময় এক ভ্রমণের। ঘুরতে দুজনের মোট খরচ হয়েছে ১০,৫০০ টাকা।
ফিচার ইমেজ- লেখক

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

মুগ্ধতায় মোড়ানো সেন্ট মার্টিনস দ্বীপ

চকলেট-চা-কফি ও মশলার শহর মুন্নারে