মিরিকের মায়াবী মেঘের পানে

মেঘ তো অনেক দেখেছি। বান্দরবানের মেঘ, সাজেকের মেঘ, দার্জিলিংয়ের মেঘ, রিশপের মেঘ। কিন্তু মিরিকে যেমন করে মেঘ দেখেছি, তেমন মেঘ আর কোথাও কখনো দেখিনি। মিরিকের মেঘ যেন শুধু দূর আকাশে ভেসে বেড়ানো আর সুখে ছড়িয়ে যাওয়া মেঘ নয়। মিরিকের মেঘ যেন নিজের বাড়ির আঙিনার কেউ, যেন খুব আপন কেউ। যে আপনাকে পেয়ে সারাক্ষণ খুশিতে আত্মহারা হয়ে, নাওয়া-খাওয়া ভুলে আপনাকে ঘিরেই থাকবে। কোথাও যাবে না একটু সময়ের জন্যও! হ্যাঁ তাই-ই। মিরিকের মেঘ ঠিক এমনই।

মায়াবী মেঘেদের দল। ছবিঃ tour.com.bd

একমাত্র মিরিকেই দেখা যায় মেঘেদের ইচ্ছামতো ঘোরাফেরা আর খেলাধুলা। মিরিকের মেঘগুলো ছোট্ট শিশুদের দলের মতো, যারা এক জায়গায়, একসাথে কোথাও থাকতে পারে না। ছোট্ট শিশুরা যেমন খোলা মাঠ পেলে যত্রতত্র ছুটে বেড়ায়, মিরিকের মেঘগুলোও খোলা আকাশে যে যার ইচ্ছামতো যেখানে সেখানে উড়ে বেড়ায় আর ঘুরে ঘুরে আপন মনে খেলা করে। কোথাও এক মুহূর্তের জন্যও থেমে থাকে না। সেই সময় বা ইচ্ছেই যেন নেই ওদের।
আপনি যখন শিলিগুড়ি থেকে জীপে করে মিরিকের দিকে যাবেন, শিলিগুড়ির চা বাগান, শুকনার শাল গাছের অরণ্য, বিমান বা সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণের বিস্তীর্ণ সবুজের বনভূমি,খরস্রোতা পাহাড়ি নদীর উপরে লোহার ব্রিজ, পাথুরে পথের দু’পাশে চোখ জুড়ানো সবুজের সমারোহ উপভোগ করতে করতে হুট করেই জীপ নানা রকম বাকে এঁকেবেঁকে চলতে শুরু করবে। সেই সাথে শুরু হবে সমতল থেকে ধীরে ধীরে পাহাড়ের উঁচুনিচু ঢেউ খেলানো পথের আকর্ষণ।
মিরিকের মায়াবী পথে। ছবিঃ sangbadpratidin.in

শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং যেতে যে পথে যেতে হয়, প্রায় একই পথে বেশ কিছুটা যেতে হয় শিলিগুড়ি থেকে মিরিক যেতেও। তবে প্রায় ৩০ মিনিট পথ চলার পরে যে জায়গা থেকে পাহাড়, চা বাগান আর অরণ্য শুরু হয়, সেখান থেকেই দুটি পথে দুটি দিকে যেতে শুরু করে। একদিকে ডানে মোড় নিয়ে দার্জিলিং আর অন্যদিকে সোজা গভীর অরণ্য আর খরস্রোতা নদী পেরিয়ে যেতে হয় মিরিক।
তবে শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং আর মিরিক যেতে একটি জায়গায় দুটি পথ যেমন আলাদা হয়ে গেছে, ঠিক তেমনি দুটি পথের রঙ, রূপ, বৈচিত্র আর আকর্ষণও যেন আলাদা আলাদা পথ ধরেছে নিজেদের মতো করে। যেন এক জনের সাথে আর একজনের কিছু মিল থাকলেও, যারা এখানে যাবে তারা যেন আলাদা করে ফেলতে পারে অনায়াসেই।
দার্জিলিং যাবার পথের মতোই মিরিকের পথও পাহাড়ি, আঁকাবাঁকা আর উঁচুনিচু। তবে মিরিকের পথ অনেক বেশি রোমাঞ্চকর, অনেক বেশি আঁকাবাঁকা আর ঢেউ খেলানো। মিরিকের পথে পথে যে মেঘেদের দেখা যায়, মেঘেদের আহ্বান, আকর্ষণ আর মায়া দেখা যায়, সেটা আর কোথাও দেখা যায় না। এখানে মেঘেরা এক জায়গায় থমকে থাকে না, এখানে মেঘেরা একসাথে দলবদ্ধ থাকে না, এখানে মেঘেরা কালো হয়ে মন খারাপ করায় না।
মেঘেদের ছোটাছুটি। ছবিঃ ringcloud.allcolo.com:8080

এখানে মেঘেরা দলছুট হয়ে উড়ে বেড়ায়, এখানে মেঘেরা নানা রঙের সাজে সেজে প্রজাপতি হয়ে এখানে সেখানে উড়ে উড়ে যায়, এখানে মেঘেরা অবাধ্য বালক বালিকার পাড়ায় পাড়ায় বেড়াবার মতো করে এ পাহাড়ে, ও পাহাড়ে উঁকিঝুঁকি দেয়, এখানে মেঘেরা কোনো এক পাহাড়ের গায়ে, বারান্দায় আর বেলকনিতে নিজেদের মতো খেলায় মেতে ওঠে। আবার ইচ্ছে হলো তো গাল ভরা অভিমান নিয়ে উড়ে গিয়ে অন্য পাহাড়ের পিঠে গিয়ে বসে পড়ে। এখানের মেঘগুলো অস্থির, অবাধ্য আর অভিমানি।
গাড়িতে যেতে যেতে, পাহাড়ের গায়ে গায়ে, পিঠে পিঠে আর কোলে কোলে এমন হাজারো আদুরে আর অভিমানি মেঘ দেখতে দেখতেই হুট করে দেখবেন কোনো কোনো মেঘ আপনাকে দেখে ভীষণ আনন্দে আর শিশুর মতো খুশিতে আপনাকে আঁকড়ে ধরতে পাহাড় থেকে ছুটে এসে গাড়ির জানালায় ভিড় করেছে। শুধু আপনার গাড়ির কাছের জানালা খোলার অপেক্ষায় আছে। খুলে দিলেই ছুঁয়ে দেবে আপনাকে, ভিজিয়ে দেবে আলতো আদরে, জড়িয়ে ধরে মায়ায় বাঁধনে বেঁধে ফেলবে আপনাকে!
মেঘেদের বেলকোনি! ছবিঃ deshebideshe.com

দূরে তাকিয়ে দেখবেন, ওদের দেখাদেখি কোনো কোনো ছোট ছোট মেঘেদের দল আপনাকে স্বাগত জানাতে উড়ে এসেছে রাস্তার উপরে, গাড়ির ছাদে, সামনের বনেটে এসে ঠাঁয় বসে পড়েছে। গাড়ির গতির সাথে তাল মিলিয়ে যেন উড়ে উড়ে যেতে চাইছে আপনার সাথে। আপনি অবাক হয়ে, মুগ্ধ চোখে, আকুল হয়ে তাকিয়ে থাকবেন সেদিকে। ইচ্ছে হলেই ওদের ছুঁয়ে দিতে পারবেন হাত দিয়ে, এক মুঠো পুরে নিতে পারেন বুক পকেটে বা রেখে দিতে পারেন ওর কয়েক ফোঁটা হাতের তালুতে।
এভাবে মেঘেদের আহ্বান, আকর্ষণ আর আদরের স্পর্শ পেতে পেতে যখন মিরিকে পৌঁছে, ঘুরে ঘুরে শেষ বিকেলে কোনো পাহাড়ের চূড়ায় বসে তাকিয়ে থাকবেন দূরের উঁচুনিচু পাহাড় আর টুকরো মেঘেদের দিকে। দেখবেন ভীষণ আনন্দে মেঘেরা হেসে উঠবে, সেজে উঠবে নানান রঙে। মেঘেদের দল বর্ণিল সজে সেজে আপনাকে সাঁঝের বেলার আমন্ত্রণ জানাবে মিরিকের পাহাড়ে পাহাড়ে, পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে, ভাঁজে ভাঁজে আর দুই পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে। কোথাও দুধ সাদা কোমল মেঘ, কোথাও একটু রোদের রঙ মেখে লাল বা হলুদ মেঘ, কোথাও একখণ্ড গোলাপি বা পাহাড়ের শেষ আলোয় নীল মেঘ!
পাগল করা মেঘেদের দল! ছবিঃ http://tour.com.bd

মেঘেদের যে এত এত রঙ হয়ে থাকে সেটা মিরিক না গেলে জানতে পারতাম না। এমন নরম, কোমল আর বর্ণিল মেঘেদের নানা রকম সাজ আর স্বাগতসুখে হারিয়ে গিয়ে ঠাঁয় বসে ছিলাম অনন্ত সময়। মিরিকের পাহাড় চূড়ায়, অপার বিস্ময়ে আর আপ্লুত দৃষ্টিতে, ভাষা হারিয়ে, বোধ লুপ্ত করে। যখন সন্ধ্যা নামি নামি করছে, চারদিকের মেঘেরা উড়ে চলে গেছে যার যার বাড়ির আঙিনায়, নিজেদেরকে ঢেকে নিয়েছিল কুয়াশার চাদরে বা ঘন মেঘে, ঝরতে শুরু করেছিল টিপটিপ বৃষ্টি, তখন উঠতে হয়েছিল, আসলে উঠতে বাধ্য হয়েছিলাম মিরিকের মায়াবী মেঘেদের কাছ থেকে।

মিরিকের মায়াবী মেঘেদের কাছে যাবার সহজ উপায়:

মাত্র একদিনেই, হ্যাঁ শুধুমাত্র একদিনেই মিরিক গিয়ে ঘুরে আসতে পারেন খুবই অল্প খরচে। ঢাকা থেকে বাংলাবান্ধা হয়ে শিলিগুড়ি। শিলিগুড়ি থেকে ১ থেকে ১:৩০ ঘণ্টার দূরত্বে মিরিক। সারাদিন মিরিক ঘুরে, শেষ বিকেলের জীপে বা সন্ধ্যায় নিজেদের ভাড়া করা জীপে ফিরে আসতে পারেন শিলিগুড়ি। এমনকি চাইলে একদিনেই ঘুরে আবার চলে আসতে পারেন নিজ দেশে। এতটাই কাছে আর এতটাই সহজ মিরিক যাওয়া, আসা আর মিরিকের মায়াবী মেঘেদের প্রেমে পড়া!
ফিচার ইমেজ- adarbepari.com

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

মাত্র ৩৫০০ টাকায় সাজেকে পূর্ণিমা বিলাস!

পেয়ারা বাজারের ভাসমান সবুজ স্বর্গরাজ্যে