পুণ্যস্থান বেনারস কাব্য: দ্বিতীয় দিনে নগর ভ্রমণ

বাবা-মাকে তীর্থ করাতে এবং নিজেও খানিকটা ঘুরে নিতে পুরো পরিবারকে নিয়ে ভারত ভ্রমণে বের হয়েছি চারদিন হলো। ঘুরছি গয়া এবং বেনারস। ইতোমধ্যে গত তিন দিনে গয়ার নগর ভ্রমণ, রাজগির ভ্রমণ আর বেনারসের দশাশ্বমেধ ঘাটের আরতী দেখা আর গঙ্গায় নৌকা ভ্রমণ সম্পন্ন করেছি। বেনারসে উঠেছি “হরে কৃষ্ণ হরে রাম” হোটেলে, প্রতিরুম ৬০০ রুপি করে দুটো রুম নিয়েছি। ঘাটের আরতী দেখা শেষে রাতের খাবার খেয়ে নিলাম সবাই মিলে।

দুপুরে নন-ভেজ খেয়েছি বলে রাতে ভেজ থালি খেলাম আমরা। খাওয়া-দাওয়া শেষে আবার একটা মাসালা দোসাও খেলাম ২৫ রুপি দিয়ে। সারাদিন বিছানায় শুইনি, ভারী খাবার-দাবারও খেয়েছি দুপুরের দিকে, নৌকা ভ্রমণ করেছি, আরতী দেখেছি। সব মিলিয়ে শরীর খুব ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিল সেদিন। তাই সকাল সকাল ঘুমিয়ে গেলাম। পরের দিন সকাল সকাল বেনারসের বিখ্যাত জায়গাগুলো দেখে নিতে হবে।

বেনারসি নগর ভ্রমণ, ছবিঃ লেখক

ভোর পাঁচটায় বাবা ডাক দিলেন গঙ্গা স্নান করতে হবে। প্রথমে ঘুমের কারণে রাজি না হলেও পরে মনে করলাম গঙ্গা স্নানটা করেই যাই। তাই দেরী না করে সকাল ৬টার দিকে কেদার ঘাটে চলে গেলাম। গঙ্গার পানি বেশ বেড়েছে, সাথে স্রোতও বেশ। ঘুমের কারণে আশি ঘাটের আরতী হাতছাড়া করে ফেললাম, সাথে গঙ্গার সূর্যাস্তটাও। এখানকার সূর্যোদয় দেখতে হলে ঘাটে উপস্থিত থাকতে হবে ঠিক ভোর সাড়ে চারটায়।

আমরা যখন ঘাটে পৌঁছাই সূর্য আলো ছড়াতে শুরু করেছে। সাথে করে মোবাইল নিয়ে যাইনি তাই সকালের গঙ্গার ছবি তুলতে পারিনি। যাই হোক, স্নান শেষে ফেরার পথে নগর ভ্রমণের জন্য অটো ঠিক করে নিলাম ৭০০ রুপিতে, ঘুরাবে রামনগর, সারনাথ, বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় আর এখানকার চারটি মন্দির।

সারনাথ, ছবিঃ লেখক

হোটেলে গিয়ে কাপড়-চোপড় পাল্টিয়ে ভেজা কাপড়গুলো হোটেলের ছাদে শুকাতে দিয়ে হোটেল থেকে চেক-আউট করে নিলাম সকাল ৭টায়। সাড়ে ৭টায় অটোতে উঠে বসি আমরা। প্রথমেই সারনাথের দিকে যাত্রা শুরু করলো অটোওয়ালা। বেনারস মূল শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরের জায়গা সারনাথ। মূলত একটি বৌদ্ধমন্দির এটি।

এখানকার রীতিনীতি হলো সারনাথ সোসাইটির লোক পুরো এলাকাটি ঘুরিয়ে দেখাবে, তাকে খুশি হয়ে যা দেবেন তাই নেবে। তবে সারনাথ ঘুরতে কোনো গাইডের দরকার হয় না যা বুঝলাম। এই বৌদ্ধমন্দিরটি থাইল্যান্ড সরকারের তৈরী। মোট ৮০.৫ ফুটের বিশাল এই বৌদ্ধমূর্তি সারনাথকে দিয়েছে আলাদা মর্যাদা। গৌতম বুদ্ধের প্রতিকৃতির পাশাপাশি এখানে মন্দিরও রয়েছে একটি যা উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে তৈরী বলে জানান সোসাইটির গাইড।

সারনাথের ভেতর বৌদ্ধ মন্দির, ছবিঃ লেখক

সারনাথে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র সিং মোদী প্রায় ৩৫,০০০ পরিবারকে বেনারসি শাড়ি তৈরির হ্যান্ডলুম দিয়েছেন, যা কাজে লাগিয়ে এখানে গড়ে উঠেছে বেনারসি শাড়ির বিশাল বিশাল সব কারখানা। কারখানাগুলোর সামনেই রয়েছে শাড়ি দেখানোর এবং বিক্রি করার দোকান। অনেক প্রকার বেনারসি শাড়ি আছে বেনারসে। তবে দেখেশুনে বুঝেই কেনা ভালো বেনারসি শাড়ি।

ভালো বেনারসি শাড়ি কিনতে হলে বাজেট অন্ততপক্ষে ৩,৫০০ রুপি করতে হবে আপনার। অনেককেই জিজ্ঞেস করলাম আসল বেনারসি শাড়ি চেনার উপায় কী, কেউই ঠিকঠাক উত্তর দিতে পারল না। তবে শাড়ির কাপড়ের উজ্জ্বলতা, রঙ আর পাতলা শাড়ি দেখে কেনা ভালো। বেনারসি দুটো শাড়ি ডিজাইন বা কাপড়ের দিক থেকে এক রকম হবে না কখনো।

সারনাথে ৮০.৫ ফুটের পবিত্র বৌদ্ধ প্রতিকৃতি, ছবিঃ লেখক

সারনাথ দেখা শেষে আমরা আবার অটোতে চড়ে বসলাম। গন্তব্য রামনগর রাজকিলা। শহর থেকে যতদূরে সারনাথ, ঠিক তেমনই দূরত্বে রামনগর রাজকিলা। এটি মূলত রামনগরের রাজার বাসভবন ছিল। পরে এটি একটি জাদুঘরে পরিণত হয়েছে। প্রচন্ড গরম পড়েছিল সেদিন বেনারসে।

রাজকিলা জাদুঘরে ঢুকতে ৫০ রুপি দিয়ে টিকেট কাটতে হয়। এদিকে আবার মন্দিরগুলো সাড়ে বারোটায় বন্ধ হয়ে যাবে। তাই জাদুঘরের ভেতর আর ঢুকতে ইচ্ছে করলো না। বাইরে থেকেই দেখে চলে এলাম। অটোওয়ালা বললো রামনগরে এ বাদে আর কিছু দেখার নাই, কে জানে সত্যি বলছে কী মিথ্যা!

রাজকিলা, ছবিঃ লেখক

রামনগর থেকে সোজা চলে গেলাম বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে। অটোওয়ালা জানালো, এই বিশ্ববিদ্যালয় এতই বিশাল যে এর ভেতরে ২০ কিলোমিটারের রাস্তা আছে। ওয়ার্ল্ড র‍্যাংকিংয়ে পুরো বিশ্বে ৬২৫তম আর পুরো এশিয়ায় ১২৩তম বিশ্ববিদ্যালয় এটি।

একই সাথে প্রকৌশল, জীববিদ্যা, কৃষিবিদ্যা, আইন আর ডাক্তারি বিদ্যা শেখানো হয় এখানে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরেই আছে বিশাল এক বিশ্বনাথ মন্দির। প্রচুর মানুষের সমাগম হয় প্রতিদিন এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে, বিশ্বনাথ মন্দিরে।

বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরকার বিশ্বনাথ মন্দির, ছবিঃ লেখক

বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হয়ে চলে গেলাম সংকট মোচন মন্দিরে। এই মন্দিরে মোবাইল ফোন অথবা ক্যামেরা জাতীয় যেকোনো জিনিস নিয়ে ঢোকা নিষেধ। এগুলো রাখার লকার আছে এখানে। লকারে সব কয়টি মোবাইল ফোন রেখে ঢুকে পড়লাম সংকট মোচন মন্দিরে। হনুমান এবং রামজীর মন্দির এটি। ঘড়িতে তখন বারোটা পনেরো বাজছে। অটো নিয়ে তড়িঘড়ি করে চলে গেলাম তুলসী মন্দিরে।

আমরা মন্দিরে ঢোকার পর পরই বন্ধ করে দেয়া হয় মন্দিরটি। তুলসী মন্দির থেকে বের হওয়ার পর বুঝলাম শেষ মন্দির দূর্গা মন্দির মনে হয় আর দেখা হবে না। তবুও অটোওয়ালাকে বললাম, “চলুন গিয়ে দেখি”। তুলসী মন্দির থেকে খুব কাছেই দূর্গা মন্দির। তবে আমরা যেতে যেতে প্রায় বন্ধ হয়ে যাচ্ছিলো মন্দিরটি। তাই বাইরে থেকেই দেখে ফিরলাম দূর্গা মন্দির।

তুলসী মন্দির, ছবিঃ লেখক

অটোওয়ালাকে বললাম আশি ঘাটের কালিকা ধাবায় নিয়ে যেতে। এখানকার বিখ্যাত খাবার হোটেল এটি। অনেক শখ করে এখানকার স্পেশাল মাটন অর্ডার করলাম। তবে ভাতের দাম দেখে চক্ষু চড়কগাছ হওয়ার অবস্থা, এক প্লেট ভাত ৭৫ রুপি। তবুও খেয়ে আসলাম কালিকায়।

খাসি আর মুরগী দুটোর স্বাদই অসাধারণ। খাওয়ার পর বেনারসি পানও খেয়ে নিলাম শিবালা চৌরাহে থেকে। মিষ্টি পান ১৫ রুপি আর রেগুলার পান ৫ রুপি। বলা হয় শুধু পান খাওয়ার জন্য বেনারস আসা যায়।

দূর্গা মন্দির, ছবিঃ লেখক

খেয়ে-দেয়ে হোটেলে গিয়ে ব্যাগপত্র গুছিয়ে বের হয়ে গেলাম স্টেশনের উদ্দেশ্যে। স্টেশনে গিয়ে শুনি হাওড়া যাওয়ার বিভুতি এক্সপ্রেস ট্রেন ৫ ঘণ্টা বিলম্বে চলছে। এমনিতে এলাহাবাদ থেকে ছেড়ে আসা এই বিভুতি এক্সপ্রেস ভারানসি আসে সন্ধ্যা ৬টায়। পরে এই ৫ ঘণ্টার বিলম্ব বেড়ে সাড়ে ৭ ঘণ্টার বিলম্বে গিয়ে ঠেকল।

শেষমেষ সন্ধ্যা ৬টার ট্রেনখানা রাত ৩:১০ এ বেনারসে আসে। এখনো সাড়ে ১২ ঘণ্টার বিলম্বে চলছে ট্রেনটি আর সেই ট্রেনেরই স্লিপার ক্লাসের কোনো এক বগিতে বসে লেখাটি লিখছি আমি আর চিন্তা করছি হাওড়া পৌঁছাবো কখন।

ফিচার ইমেজ- লেখক

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এক নজরে একটি জেলা: পাবনার ধর্মশালা

তুক'অ দামতুয়া এবং ব্যাঙ ঝিরিতে টিজিবি বাহিনী