সুলতানি স্থাপত্যের রত্ন 'ছোট সোনা মসজিদ'

তাহাখানা, দাফিউল বালা আর তিন গম্বুজ মসজিদ দেখে ৫০০ মিটার পিছিয়ে যেতেই ছোট সোনা মসজিদে এলাম। ছোট সোনা মসজিদের কাছে যখন এলাম, তখন মসজিদে জুম্মাবারের খুতবা পড়ছেন খতিব। তাই আমরা ভাবলাম, খাওয়া দাওয়াটা এই ফাঁকে সেরে নিই।

মসজিদের ধারে কাছে ভালো কোনো খাবারের হোটেল নেই। ২-৩ টা ছাপড়া ধরনের দোকান আছে। কী আর করা? ওখানেই বসে পড়লাম। খিদে তো নিবারণ করতে হবে! ভাত, মাছ, সবজি, গরুর মাংস, মুরগির মাংস, ডাল দিয়ে ভরপেট খাওয়া হলো। খাবারটাও নেহায়েত মন্দ নয়।

ছোট সোনা মসজিদ। Source : তাসমি

খাওয়া দাওয়া করে বেরিয়ে দেখলাম, তখনো নামাজ শেষ হয়নি। আমাদের হায়েস মসজিদের কাছে যে শিশু পার্কটি আছে, ওখানে রাখা হয়েছে। গরমে অতিষ্ঠ আমরা সেদিকেই পা বাড়ালাম। বোঝাই যাচ্ছে, বিখ্যাত ছোট সোনা মসজিদ ও পার্কটির জন্য এই এলাকায় বেশ লোকসমাগম থাকে। তারই প্রেক্ষিতে খাবারের পসরা সাজিয়ে বসেছে ভ্রাম্যমাণ দোকানগুলো।

বাদাম, হরেক রকমের কুড়কুড়ে, তিলের খাজা, নারকেলের নাড়ু, কদমা, চানাচুর, বুট, শুকনো বরই ইত্যাদি দিয়ে ভ্যান সাজিয়েছে দোকানি। গলা ভেজানোর জন্য আছে ডাব, লেবুর সরবত। আমি একটা ডাব কিনে নিলাম গলা ভেজানোর জন্য। কিন্তু প্রচণ্ড গরমে ডাবের ভেতরের পানিও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। তাই লেবু পানির শরণাপন্ন হতে হলো।

ততক্ষণে শুক্রবারের জুম্মার সালাত আদায় করতে আসা মুসল্লিরা বেরিয়ে গেছেন মসজিদ থেকে আমরাও তাই পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম বিখ্যাত এই মসজিদটির দিকে। অন্যান্য মসজিদের মতো এটি লালচে ইটের তৈরি নয়। বরং কালচে ধূসর রঙের পাথরে বানানো হয়েছে মসজিদটি। মসজিদের অলংকরণের ক্ষেত্রে ইটের বিন্যাস, পোড়ামাটির ফলকের গিল্টি ও চকচকে টালি ব্যবহৃত হলেও এগুলোর ভেতর প্রাধান্য পেয়েছে খোদাইকৃত পাথর। ভেতরে ঢুকে দেখলাম, ছাতে গম্বুজের খাঁজ। ভেতরেও এত সুন্দর নকশা। মসজিদের কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিরা তখন একপাশে খাবার খেতে বসেছেন।

Source : তাসমি

প্রাচীন বাংলার রাজধানী ছিল গৌড় নগরী। যা বর্তমানে চাঁপাইনবাবগঞ্জ নামে পরিচিত। এই জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার পিরোজপুর মৌজায় ছোট সোনা মসজিদটি অবস্থিত। জেলা শহর থেকে এর দূরত্ব ৩৮ কিলোমিটার। মসজিদের পাশ ঘেঁষে চলে গেছে প্রাচীন গৌড়-লখনৌতির সংযোগ সড়ক। গৌড় এখন আমাদের হলেও লখনৌতি চলে গেছে ভারতের কবজায়। গৌড়-লখনৌতি এখন আর একসাথে উচ্চারিত হবার উপায় নেই। খানিক আগেই আমরা এই রাস্তা ধরে গিয়ে কোতোয়ালী দরওয়াজা ঘুরে এসেছি, যেটা এখন বাংলাদেশ-ভারতের বর্ডার। কত উত্থানপতন হয়েছে, কত জল গড়িয়েছে তবুও কয়েক শ’ বছরেও মসজিদটির বিশেষত্ব পুরনো হয়নি।

‘সুলতানি স্থাপত্যের রত্ন’ বলে আখ্যায়িত করা হয় ছোট সোনা মসজিদটিকে। এর পাশেই বিশাল এক দিঘি। প্রধান প্রবেশ পথের উপরিভাগে স্থাপিত আছে একটি শিলালিপি। তা থেকে জানা যায়, জনৈক মজলিস-ই-মাজালিস মজলিস মনসুর ওয়ালী মুহম্মদ বিন আলী মসজিদটি নির্মাণ করেন। নির্মানের সঠিক তারিখ সম্বলিত অক্ষরগুলো মুছে গেলেও এতে সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের নামের উল্লেখ আছে। তাই ধারণা করা যায়, মসজিদটি তার রাজত্বকালে (১৪৯৪-১৫১৯) নির্মিত।

প্রবেশদ্বার। Source : তাসমি

মসজিদের ৫০টি গম্বুজ মূল্যবান ধাতু দিয়ে খচিত থাকায় এটিকে ছোট সোনা মসজিদও বলা হতো। যে মূল্যবান ধাতুগুলোর কারণে মসজিদটির এই নামকরন করা হয় সেসব আজ আর অবশিষ্ট নেই। মসজিদটির আঙ্গিনার আয়তন হল পূর্ব থেকে পশ্চিমে ৪২ মিটার এবং উত্তর থেকে দক্ষিনে ৪৩.৫ মিটার।

ইতিহাসের বিভিন্ন প্রামাণিক দলিল ঘেঁটে এও জানা যায় যে, মসজিদ প্রাঙ্গণের চতুর্দিকে গোড়াতে একটি বহিপ্রাচীর ছিল। এখন তা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলেও তার চিহ্ন রয়েছে। মসজিদটি উত্তর-দক্ষিণে ৮২ ফুট লম্বা ও পূর্ব-পশ্চিমে ৫২.৫ ফুট চওড়া এবং উচ্চতা ২০ ফুট। এর দেয়ালগুলো প্রায় ৬ ফুট পুরু। ১৮৯৭ সালে ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর পশ্চিম দেয়ালের বাইরের অংশ চারটি বুরুজের সাহায্যে কোণগুলোকে মজবুত করা হয়েছে। ব্রিটিশ আমলে ইংরেজরা গম্বুজ ও দেয়ালটি সংস্কার করেছিল।

মোট ১৫টি বুরুজের মধ্যে চার কোণে চারটি বুরুজ রয়েছে। ৯টি বুরুজ বাইরে থেকেই দেখা যায়। তবে মজার ব্যাপার হলো, গম্বুজগুলোর ঠিক মাঝখানে কেন্দ্রীয় যে গম্বুজটি আছে, ওটা ঠিক গম্বুজের মতো গোলাকার নয়। বরং চৌচালা ঘরের মতো। গম্বুজগুলোর তলদেশে বিচিত্র সব নকশা দিয়ে অলঙ্কৃত হয়েছে। বহু কারুকার্য খচিত ১৫টি গম্বুজেই একসময় সোনালী রঙের গিল্টি করা ছিল।

প্রধান ফটক। Source : তাসমি

মসজিদের পূর্বদিকে পাঁচটি ও উত্তর-দক্ষিণ দেয়ালে তিনটি করে প্রবেশদ্বার রয়েছে। দরজাসংলগ্ন ইমারতগুলোতেও রয়েছে নানা ধরনের কারুকাজ। প্রতিটি দরজাতেই রয়েছে খোদাইকৃত কারুকাজ। পাথর দিয়ে বানানো এসব দরজা আর দেয়ালে যে কী করে কারুকাজ করলো, ভেবেই পাচ্ছি না। মূল ঢোকার গেটে রয়েছে ২৪ মিটার চওড়া একটি বিশাল তোরণ। এর উচ্চতা সাড়ে সাত মিটার। এই ফটকের পূর্ব দিকে বিস্তীর্ণ অংশ জুড়ে দু’টি বাঁধানো কবরের দিকে চোখ চলে গেল আপনাআপনি।

বাঁধাই করা এই টাইপের কবর দেখে এসেছি খানিক আগেই, তাহাখানায়। পার্থক্য হলো, ওই কবরগুলো ছিলো লালচে, আর এই দুটো সম্পূর্ণ কালো পাথরের প্লাটফরমের ওপর নির্মিত। সমাধিগুলোতে পবিত্র কুরআন মজিদের আয়াত ও আল্লাহর নাম অঙ্কিত রয়েছে। ইতিহাসবিদ ক্যানিংহাম সমাধি দু’টিকে মসজিদের নির্মাতা ওয়ালী মুহাম্মদ ও তার পিতা আলীর বলে উল্লেখ করেছেন। এ ছাড়াও তোরণের সামনেই আরো কিছু অজ্ঞাত পরিচয়ের সারি সারি কবর রয়েছে। সবই কালো পাথরের সমাধি। মুসলিমদের এমন সমাধি আমি আর দেখিনি।

পশ্চিম দেয়ালে ছিল পাঁচটি অর্ধবৃত্তাকার মেহরাব। এখন অধিকাংশ মেহরাবের পাথর সরিয়ে ফেলা হয়েছে। অথচ এগুলোই নাকি এক সময়ের দেখার মতো বিষয় ছিলো। ভিতরের উত্তর-পশ্চিমে দোতলার কায়দায় একটি বিশেষ ধরনের গ্যালারি রয়েছে। যাকে রাজকীয় সৃষ্টি বলে ধারণা করা হয়। এটি ভূমিকম্পে ধ্বংসই হয়ে গেছে প্রায়। বিশেষ সিঁড়ির মাধ্যমে এটি সংযুক্ত। বলা হয়, এটি মেয়েদের নামাজ আদায়ের স্বতন্ত্র স্থান। আবার কেউ কেউ গ্যালারিটিকে সুলতানদের ব্যক্তিগত ব্যবহার্য মহল হিসেবে ধারণা করেন। এখানকার একটি প্রস্তর খণ্ড পাশের হজরত শাহ নেয়ামতুল্লার (র:) সমাধিতে স্থানান্তরিত হয়েছে।

কারুকাজ। Source : তাসমি

পুরো মসজিদটি ইট দিয়ে নির্মাণ করা হলেও, ভেতর-বাইরের দেয়ালের বহির্ভাগ পাথর দিয়ে আবৃত। প্যানেলের কিনারগুলোতে লতাপাতার নকশা এবং হিন্দু আমলের শিকল ও ঘণ্টার ছবি খোদাই করা। বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ও জাদুঘর বিভাগ মসজিদটির রক্ষনাবেক্ষন করছে।

কীভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে রাজশাহী হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের দূরত্ব ৩১৯.৪ কিলোমিটার। চাঁপাইনবাবগঞ্জ যাওয়ার দুটো পথ আছে। সড়কপথ আর রেলপথ। সড়কপথে যেতে হলে ঢাকার যেকোনো স্থান থেকে আপনাকে প্রথমে যেতে হবে- সায়দাবাদ, গাবতলি কিংবা উত্তরা। এসব জায়গা থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ যেতে পারবেন এসি বা ননএসি বাসে। নন এসি বাসগুলো হলো- হানিফ, শ্যামলী, দেশ ট্রাভেলস, একতা, গ্রামীণ ট্রাভেলস, সৌদিয়া, ন্যাশনাল, তুহিন, আকিব ইত্যাদি। ভাড়া পড়বে ৫৮০ টাকা। বাসে অন্তত সাড়ে সাত ঘণ্টা লাগবে। জ্যামে পড়লে, আরোও বেশি।

মসজিদের অভ্যন্তরীণ কারুকাজ। Source : তাসমি

ট্রেনে যেতে হলে আগে থেকেই টিকিট কেটে রাখতে হবে। কমলাপুর কিংবা এয়ারপোর্ট থেকে ট্রেনে উঠতে পারবেন। ভাড়া ৩৮০ টাকা। ট্রেনের নাম পদ্মা। বেশ ভালো ট্রেন। কমবেশি সাত ঘণ্টায় পৌঁছে যাবেন।

তারপর চাঁপাইনবাবগঞ্জ টার্মিনাল থেকে চলে যেতে পারবেন লোকাল বাসে চলে যেতে পারবেন ছোট সোনা মসজিদে। আবার আমাদের মতো গৌড় নগরীর সবগুলো পুরাকীর্তি দেখার জন্য গাড়িও রিজার্ভ করে নিতে পারেন। ৭-৮ জনের জন্য সারা দিনের এসি হায়েসের ভাড়া পড়বে ২,৫০০ টাকা।

কোথায় থাকবেন

যদি একদিনের ট্যুর প্ল্যান করেন, তাহলে রাতের ট্রেন বাসে গিয়ে সারাদিন ঘুরে রাতেই ফিরতে পারবেন। তখন ওখানে থাকার চিন্তা না করলেও হবে। এরপরও যদি আপনি চাঁপাইনবাবগঞ্জে রাত্রিযাপন করতে চান সেক্ষেত্রে আপনার জন্য রয়েছে খুব ভালো একটা অপশন। বড় ইন্দারা মোড়ে পাবেন একটা তিন তারা আবাসিক হোটেল। নাম, স্কাই ভিউ ইন। এছাড়াও আছে আল নাহিদ হোটেল, আল হেরা হোটেল, সোনামসজিদ হোটেল, থ্রি স্টার হোটেল, লাল বোর্ডিং। তাছাড়া সরকারি ডাকবাংলো আর রেস্ট হাউস রয়েছে থাকার জন্য। সরকারি ডাকবাংলো শহরের সদর হাসপাতালের কাছেই। অন্যান্য হোটেলগুলো সব শহরের মধ্যেই।

কেবল সোনামসজিদ হোটেলটি সোনামসজিদের কাছে।

এসব হোটেলের ভাড়ার রেঞ্জ এসি ১,০০০ থেকে শুরু এবং নন এসি ৬০০ টাকা থেকে শুরু।

সমাধিস্থল।  Source : তাসমি

সতর্কতা

পুরাকীর্তি আমাদের সম্পদ। সেসব দেখতে গিয়ে আশেপাশে ময়লা ফেলে আসবেন না। দালানে নিজের নাম লিখে আসবেন না। নিজের দেশকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখুন। নিজে না শুধরালে, অন্যজনের কাছে তা আশা করা বোকামি। আপনি নিজেই যদি দর্শনীয় জায়গাগুলো পরিষ্কার না রাখেন, অন্যজন রাখবে তা কী করে প্রত্যাশা করেন?

Feature image – ইভা

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শীতের অরণ্য ডুয়ার্সে…

ভ্রমণ, কলকাতা ও কেনাকাটার পাগলামির প্রভাব