চট্টগ্রাম শহরে আলোর উদ্যান জাম্বুরী পার্ক

জাম্বুরী পার্ক; Source: Arif Khan

শহর হিসেবে চট্টগ্রাম শহর দেশের আর দশটা শহর থেকে একদম আলাদা। সিআরবি পাহাড়, পতেঙ্গা সী বীচ, ফয়েজ লেক এই শহরের মূল আকর্ষণ। দেশের সর্ববৃহৎ সমুদ্রবন্দর এখানেই অবস্থিত, তাই এই শহরটিকে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানীও বলা হয়। আর এই শহরের প্রাণকেন্দ্র বলা যায় আগ্রাবাদ কমার্শিয়াল এরিয়াকে।

কিছুদিন আগেই এখানকার জাম্বুরী মাঠে গড়ে তোলা হয়েছে আলো আর ঝলকানির পার্ক ‘জাম্বুরী পার্ক’। রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে যাওয়া এই পার্কটি শহরের মূল আকর্ষণগুলোর একটিতে পরিণত হতে বেশি সময় নেয়নি। আজ লিখবো এই জাম্বুরী মাঠ তথা জাম্বুরী পার্ক নিয়ে।

জাম্বুরী পার্কের ছয়টি ফটকের মধ্যে একটি; Source: লেখক

জাম্বুরী মাঠ

চট্টগ্রাম শহরের সবচেয়ে বড় খেলার মাঠ হিসেবে পরিচিত জাম্বুরী মাঠ। অবহেলা আর রক্ষণাবেক্ষণবিহীন ভাবে পড়ে থাকা মাঠটি ছিল আশেপাশের কিশোর-কিশোরীদের জন্য একমাত্র খেলার মাঠ। বিকেল বেলাতে এ মাঠ হাজার মানুষের পদচারণায় মুখর থাকত। তবে বিকেলের ঠিক পরপরই আলো নেভার সাথে সাথে মাঠটি পরিণত হতো ছিনতাইকারী আর মাদকাসক্তদের স্বর্গরাজ্যে। এমনকি সন্ধ্যার পর এই মাঠের সামনে দিয়ে যেতেই অনেকে ভয় পেতো।

পূর্বের জাম্বুরী মাঠ; Source: wikimapia.org

জাম্বুরী মাঠ থেকে জাম্বুরী পার্ক

সেই জরাজীর্ণ জাম্বুরী মাঠ এখন শহরের অন্যতম সুন্দর পার্ক। ছিনতাই ও মাদকাসক্তদের আড্ডা কমাতে গণপূর্ত বিভাগের উদ্যোগে জাম্বুরী মাঠকে পরিণত করা হয় জাম্বুরী পার্কে। উঁচু কোনো ভবন থেকে পার্কটিকে দেখলে মনে হবে যেন এটি বাংলাদেশ না। মাত্র ১৮ কোটি টাকায় জাম্বুরি মাঠকে চট্টগ্রামের সেরা পার্কে পরিণত করেছে গণপূর্ত বিভাগ। সেই জাম্বুরী মাঠ জাম্বুরী উদ্যানে রুপান্তরিত হওয়ায় চট্টগ্রামবাসীর জন্য সুখবর।

তবে মাঠ থেকে পার্ক বানানোর উদ্যোগ নেয়ায় প্রথমদিকে এলাকাবাসীসহ পুরো শহরবাসী এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। মাঠ থেকে পার্ক করলে আশপাশের এলাকার একমাত্র খেলার মাঠটি বিলুপ্ত হয়ে যাবে, বিকেলে খেলাধুলা করার মতো শিশু কিশোরদের আর কোনো জায়গা অবশিষ্ট থাকবে না। তবে সব জল্পনা কল্পনা ফেলে ২০১৮ সালের ৮ সেপ্টেম্বর, শনিবার বিকেল সাড়ে চারটায় গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন পার্কটির উদ্বোধন করেন।

রাতের জাম্বুরী পার্ক; Source: লেখক

যেভাবে যাবেন

চট্টগ্রাম শহরের যেকোনো প্রান্ত থেকে আগ্রাবাদ বাদামতলী মোড়ে আসতে হবে। এখান থেকে লাকী প্লাজা মার্কেটের পার্শ্ববর্তী রাস্তাটি ধরে ৫-৬ মিনিট হাঁটলেই পৌঁছে যাবেন জাম্বুরী পার্কে। এটি আগ্রাবাদের এস এম মোরশেদ সড়কে অবস্থিত। জনসাধারণের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত এ পার্কটিতে কোনো টিকেট কাটার প্রয়োজন নেই। ৮ দশমিক ৫৫ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা উদ্যানটি উদ্বোধন হলেও সৌন্দর্য বর্ধনের কাজ এখনো চলমান।

বর্ণিল ফোয়ারা; Source: লেখক

দীর্ঘ চক্রাকার হাঁটার পথ আর ৮ হাজার রানিং ফুটের উদ্যানটিতে র‍য়েছে প্রায় ৫০ হাজার বর্গফুটের জলাধার, যার কিনারায় র‍য়েছে বসবার জন্য তিনটি বড় গ্যালারি। জলাধারের পাশে রয়েছে দুইটি পাম্প হাউস। এছাড়াও র‍য়েছে সাড়ে পাঁচশো আলোক বাতির পাশাপাশি দুইটি বর্ণিল ফোয়ারা।

উদ্যানের চারপাশে চারটি স্থাপনার মধ্যে রয়েছে দুইটি টয়লেট ব্লক, একটি গণপূর্ত রক্ষণাবেক্ষণ অফিস ও একটি বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্র। প্রবেশের জন্য রয়েছে ৬টি ফটক, তবে চারটি ফটক খোলা থাকে সাধারণত। স্থাপত্য অধিদপ্তরের নকশায় উদ্যানটিতে রোপণ করা হয়েছে সোনালু, নাগেশ্বর, চাঁপা, রাঁধাচূড়া, বকুল, শিউলি, সাইকাস, টগর, জারুলসহ ৬৫ প্রজাতির ১০ হাজার গাছের চারা।

বর্ণালি ফোয়ারা; Source: লেখক

সারাদিনই জনসাধারণের জন্য উদ্যানটি উন্মুক্ত থাকলেও পার্কটিতে সবচেয়ে বেশি ভিড় হয় সন্ধ্যা থেকে রাত অবধি। কারণ তখন পার্কের ভেতরে সারি সারি লাগানো এলইডি লাইটের আলোতে বেশ মনোরম পরিবেশের সৃষ্টি হয়।

আর একটু পর পর রঙিন আলোর ফোয়ারায় চারদিক হয়ে ওঠে বর্ণালি। মূলত এই আলো আধারির খেলার জন্যই পার্কটি স্বল্প সময়ে এত জনপ্রিয়তা পেয়েছে। আশেপাশের সুউচ্চ কোনো বিল্ডিং থেকে পার্কটিকে দেখলে এক মুহূর্তে একে ইউরোপ আমেরিকার কোনো বিলাসবহুল রিসোর্ট মনে হবে।

জাম্বুরী পার্ক; Source: লেখক

অন্যান্য পার্ক থেকে সম্পূর্ণ ভিন্নধারার এ পার্কটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এই পার্কে কোনো স্ট্রিট ফুড যেমনঃ ফুচকা, চটপটি, বাদাম, ঝালমুড়ি ইত্যাদি পাওয়া যায় না। এমনকি পার্কটিতে খাবার দাবার নিয়ে ঢোকা এবং পার্কের ভেতরের কৃত্রিমভাবে বানানো লেকটিতে গোসল করা ও সাঁতার কাটা সম্পূর্ণ নিষেধ। ধুমপান নিষিদ্ধ এ পার্কটির পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার প্রশ্নে এমনটাই কঠোর কর্তৃপক্ষ।

তবে দুঃখের ব্যাপার এত নিয়মের পরেও আমাদের সচেতনতার অভাবে এসব নিয়ম মেনে কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতা করছি না। অনেকে ব্যাগে করে লুকিয়ে চিপ্স, বিস্কুট, কোল্ড ড্রিঙ্কস নিয়ে ঢুকে যেখানে সেখানে ময়লা আবর্জনা ফেলছে। ইতোমধ্যেই লেকটিতে ভাসছে দর্শনার্থীদের ফেলা প্লাস্টিকের বোতল আর চিপ্সের প্যাকেট। এ ব্যাপারে পার্কের নিরাপত্তাকর্মীকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন প্রতিদিনই পরিষ্কার করা হয় পার্কটি। তবে মানুষের অসহযোগীতাপূর্ণ আচরণে তারা হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে পার্কটিকে পরিষ্কার রাখতে।

মূল ফটক, জাম্বুরী পার্ক; Source: লেখক

এখানে বলে রাখি অন্যান্য পার্কের চেয়ে এখানকার পরিবেশ অনেকটা স্বাভাবিক ও সুন্দর। সর্বদা নিরাপত্তা কর্মীদের নজরে থাকা এ পার্কটি সম্পূর্ণ সিসিটিভির আওতাধীন। তাই পরিবার-পরিজন নিয়ে পার্কটিতে ভ্রমণকালে আপনাকে কোনো ধরনের অশোভনীয় পরিস্থিতির শিকার হতে হবে না। এরকম সুস্থ পরিবেশ চট্টগ্রামের আর কোনো পার্কে আছে নাকি আমার জানা নেই।

পরিশেষে বলতে চাই, আপনি আমি আমরা চাইলেই এই পার্কটির আয়ুষ্কাল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর করতে পারি। যেখানে সেখানে ময়লা আবর্জনা না ফেলে আমাদের নাগরিক দায়িত্বটুকু যথাযথ পালন করলেই এর সৌন্দর্য বজায় থাকবে অনেকটা সময়।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ছোটদের জন্য কলকাতার সাইন্স সিটি

ভরা জ্যোৎস্নায় সাজেক ভ্রমণ (২৭ সেপ্টেম্বর)