চাঁদপুর-বেলগাঁও চা বাগানের গল্প

আমাদের এই চট্টগ্রামের আশেপাশেই এত সুন্দর সুন্দর চা বাগান আছে আগে জানা ছিল না, চা বাগানের কথা বললেই মনে পড়ে যায় সিলেটের কথা।

এবার আমরা দেখতে গিয়েছিলাম চট্টগ্রামের বাঁশখালীর চাঁদপুর-বেলগাঁও চা বাগানে। প্রকৃতির সাথে একাকার হয়ে মিশে যাওয়ার সুযোগটি আর কেউ মিস করলাম না। শহরের কুয়াশা ভেজা সকালকে ভেদ করে নতুন দিনের শুরুতেই আমরা চলে এলাম আসল গন্তব্যে।

মন ছুয়ে যাওয়া ছবি। ছবিসুত্র : লেখক

বাগানের কাছাকাছি কাঁচা রাস্তা দিয়ে পৌঁছাতে পৌঁছাতে দেখছিলাম একেবারে আদর্শ গ্রাম যাকে বলে এমন একটি গ্রাম। যাতে লাগেনি শহুরে কোনো আভাস। কৃষক কাটছে পাকা ধান আর কৃষাণী এক সাইডে ধান মাড়াই করছে। ছোট ছোট টিলাগুলো থেকে ভেসে আসছে পাহাড়ি নানা পাখির ডাক। এই পাখির ডাক শুনে ফিরে গেলাম একেবারে ছেলেবেলায়।

তখনই শুনতাম শীতকালে এমন পাখির ডাক। যা এই শহুরে জীবনে শোনা দুষ্প্রাপ্য বটে।আবার বিলের ধারে আইলে রোদ পোহাচ্ছে কয়েকটা সাপ। একেবারেই নিজেদের মতো। কেউ তাদের দিকে তাকাচ্ছেও না। গ্রামের বাচ্চারা পিছু নিয়েছে আমাদের গাড়ির। যেটা একসময় আমরাও করতাম। হরহামেশা কোনো গাড়ি আসলে সেটাতে অল্প একটু চড়ার আশায় পিছু ছুটতাম।

ছবিসুত্র : শাম্মা

বাগানে প্রবেশের পর আমরা সোজা ইটের যে রাস্তাটি দেখেছি সেই রাস্তা দিয়ে হাটঁতে শুরু করলাম সামনের দিকে। একটু গিয়েই রাস্তা চলে গেল একটি টিলার দিকে। আমরাও আছি রাস্তার দেখানো পথে। তখনও জানতাম না টিলার উপরে আমাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে। শুধু প্রবেশের সময় গার্ড থেকে শুনেছি, “বেশিদূর যাবেন না, হাতি আছে”

টিলা শেষ করেই বাগান। ছবিসুত্র : লেখক

টিলাতে উঠেই প্রথমে আপনার চোখে পড়বে চা প্রক্রিয়াজাতের মেশিন। যেখানে বাগান থেকে চা পাতা তুলেই প্রক্রিয়াকরণ করা হয়। এসবকে পেছনে ফেলে আমরা হাঁটতে শুরু করলাম আবারো। অল্প গিয়েই বিস্তৃত সমতল জায়গা জুড়ে দেখা গেল চা গাছের সমারোহ। যারা সকাল থেকে অপেক্ষা করছিল আমাদের জন্য। আমাদের স্বাগত জানালো বেলঁগাও চা বাগানের কর্মরত শ্রমিকরা।

চা গাছের চারা। ছবিসুত্র :লেখক

ক্ষণিকের মধ্যেই আমরা হারিয়ে গেলাম সবুজের মাঝে। পায়ে হেঁটে এদিক ওদিকে ছুটে বেড়াচ্ছে সকলে। পুরো বাগানে পর্যটক বলতে ছিলাম শুধু আমরা, যে যার মতো কাজ করছে। পাহাড়ের ওপরে সমতল জায়গা জুড়ে বিস্তৃত সবুজের সমারোহ রেখে চোখ জুড়িয়ে যাবে যে কারো। বন্ধুদের সাথে গান, আড্ডা, খুনসুটিতে কিছু সময় মেতে থাকার জন্য একেবারে উপযোগী জায়গা এই চাঁদপুর বেলগাঁও চা বাগান। আমরাও তাই করেছি, বন্ধু অভিষেক আর মাসুদের কন্ঠে যখন শুনছিলাম, “চলো না ঘুরে আসি অজানাতে” গানটি, তখন আমরা হারিয়ে গিয়েছিলাম কল্পনার রাজ্যে।

মন ছুয়ে যাওয়া রাস্তা। ছবিসুত্র :শাম্মা

হঠাৎ করে খেয়াল করলাম, আমরা অনেক চা বাগান দেখেছি। কিন্তু কখনো চা গাছ কীভাবে উৎপাদন করে তা দেখা হয়নি। হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়লো বাগানের একপাশে বিশাল জায়গাজুড়ে বাঁশের পাটি দিয়ে ঢাকা। আর তার নিচে দেখা গেল মাটিতে চা পাতা গজানো। এসব পাতা থেকেই উৎপাদন করা হবে চা গাছ। ক্লোন চা উৎপাদনে বেশ সুনাম রয়েছে এই চাঁদপুর বেলগাঁও চা বাগানের।

আরেকটু সামনে গিয়ে দেখতে পেলাম প্রায় ৩০-৪০ জন শ্রমিক এসব পাতা থেকে উৎপাদিত চা গাছের প্যাকেটজাত করছে। সবুজ পলিথিন দিয়ে এসব কাজ করার জন্যও ঘিরে রাখা হয়েছে একটি সাইড। আমাদের বেশ অভিভূত করছে এই চা উৎপাদন করা দেখাটা। অভিজ্ঞতার খাতায় যুক্ত হলো নতুন কিছু।

সবুজের সমারোহ। ছবিসুত্র : শাম্মা

আড্ডা, গল্প, খুনসুটিতে মেতে থেকে থেকে আমাদের যতটুকু সম্ভব ঘুরে দেখেছি। পুরোটা আর দেখতে পারলাম না। অবশ্য দূর থেকে আমরা পুরোটাই দেখেছি।

ছবিসুত্র : শাম্মা

যেহেতু পুরো দিনের পরিকল্পনা করেই আমরা চট্টগ্রাম শহর থেকে এসেছি তাই সময়কেও সেভাবে ভাগ করে নিয়েছি। দিনের প্রথমভাগ আমরা কাটিয়ে দিয়েছি এই বেলগাঁও চাঁদপুর চা বাগানে। পেটে তখন প্রচণ্ড ক্ষুধা। পরিবেশ নষ্ট হবে বলে আনা হয়নি বাইরের কোনো খাবার। আবার সবার হাঁটার শক্তিও প্রায় শেষ। কোন রকমে বাগানের গেইটে এসে দেখি কোনো গাড়ি নেই। গাড়ি বলতে থাকে সিএনজি।

বাশখালী বীচ। ছবিসুত্র : লেখক

কিন্তু যেতে হবে বহুদূর। অগত্যা আবার শুরু হলো আমাদের হাঁটা। গন্তব্য চৌমোহনী বাজার। কোনো বিরতি ছাড়াই বিশ মিনিটে চলে আসলাম। পেটে তখন ক্ষুধার জ্বালা, অবশেষে পেয়ে গেলাম একটি হোটেল। গোগ্রাসে যে যত পারে খেয়েছে।

আমাদের এবারের গন্তব্য বাঁশখালী সী বীচ। কিন্তু সবাই খুবই ক্লান্ত। এসেছি যেহেতু যেতেই তো হবে। সিএনজি নিয়ে নিলাম সরাসরি বীচ। শুরু হলো গাড়িতেই ঘুম পর্ব।

লালকাঁকড়া। ছবিসুত্র :লেখক

গ্রামের কাঁচা-পাকা রাস্তা পেরিয়ে আমরা যাচ্ছিলাম বাঁশখালী বীচে। আমার মধ্যেও কাজ করছে এক চাপা উত্তেজনা। এসব গ্রাম পেরিয়ে এখানে কেমন বীচ! অবশেষে চলে আসলাম আমাদের সেই বাঁশখালী বীচে।

পুরো টীম

তবে অবাক করা ব্যাপার হলো বীচে আমরা পৌঁছেছি। কিন্তু গাড়ি থেকে নেমেও আমরা বীচ দেখিনি। সামনে এক বিশাল বাঁধ। সে বাঁধ পেরিয়েই বীচ। প্রথম দেখাতেই মনটা ভরে গেল। খুবই ভালো লেগে গিয়েছে। প্রথম দর্শনে প্রেম যাকে বলে আরকি।

সাগরের পাড় দিয়ে আমরা খালি পায়ে হাটঁছিলাম, পানিতে জোয়ারের জন্য অপেক্ষা করছে সাম্পানগুলো আর ঢেউগুলো খেলে যাচ্ছে আপন মনে। আরও আকর্ষণীয় ব্যাপার হলো কাঁকড়াগুলো নিজ থেকে আমাদের তাদের লুকোচুরি খেলার সঙ্গী বানিয়ে নিয়েছে। ব্যাপারটা আমরা জানিও না। পরে খেয়াল করলাম।

চারদিকে নিরবতা। ছবিসুত্র :লেখক

পুরো বীচে পর্যটক বলতে ছিলাম আমরা পাঁচজনই। তাই ইচ্ছেমতো দাপিয়ে বেড়িয়েছি। চারদিকে সুনসান নীরবতা। দল একটু ভারী করে সময় নিয়ে আসলে বেশ উপভোগ করা যাবে জায়গাটা।

ফিচার ইমেজ : মোশাররাত ফারহানা শাম্মা

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

দিল্লীর মেট্রোর মারপ্যাঁচে…

সুনাখারি রিসোর্ট থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দর্শন