সুড়ঙ্গ পথে চন্দ্রমহল ভ্রমণ

বাগেরহাট জেলা ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের মর্যাদা প্রাপ্ত, এই কথা কম-বেশি সবারই হয়তো জানা। বাগেরহাটকে ঐতিহাসিক মসজিদের শহরও বলা হয়। হ্যাঁ, আমি সেই বাগেরহাটের কথা বলছি, যেখানে ষাট গম্বুজ মসজিদ অবস্থিত। আজ আপনাদের জানাবো সেই জেলায় ভ্রমণের অভিজ্ঞতা। আগেই বলে রাখি, আমার গন্তব্য কোনো ঐতিহাসিক মসজিদ নয়। আমি রওনা হয়েছি চন্দ্রমহলের উদ্দেশ্যে।
চন্দ্রমহল বাগেরহাট জেলার রঞ্জিতপুরে অবস্থিত একটি দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা। এই মহলকে ঘিরে রয়েছে একটি ইকোপার্ক, যার নাম চন্দ্রমহল ইকো পার্ক। এই মহল নির্মাণ করেন সৈয়দ আমিনুল হুদা সেলিম। তিনি তার স্ত্রী চন্দ্রার নামে এটির নামকরণ করেন। একথা জানার পর আমার মনে একটু কৌতূহল জেগেছিল, এটিও কি আবার বাংলার তাজমহল নাকি? যেখানে সম্রাট শাহজাহান আর আমিনুল হুদা দুজনেরই স্ত্রীর প্রসঙ্গ জড়িত সেখানে এমন প্রশ্ন উদয় হওয়াটাই স্বাভাবিক নয় কি?
হাইওয়ের পাশে বড় করে লেখা স্বাগতম চন্দ্রমহল ইকো পার্ক, দেখেই গাড়ি থেকে নেমে পড়লাম। আমার সাথে আছে অমিতাভ অরণ্য। দুজনে বেশ আনন্দের সাথে সামনে এগিয়ে গেলাম, কিন্তু সামনে এগিয়ে ইকো পার্কের কোনো পরিবেশই চোখে পড়ল না। স্থানীয় একজনের কাছে জানতে পারলাম, চন্দ্রমহল ইকো পার্ক এখান থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
‘কী করি আর ভেবে না পাই’ অবস্থা। দুপুরবেলা হওয়ায় আশেপাশে কোনো রিক্সা-ভ্যানও দেখতে পাচ্ছিলাম না। অমিতাভ তার ভুঁড়িতে হাত ডলতে ডলতে বলল, ‘চল তবে হাঁটতে থাকি’। কী আর করার! হাঁটতে থাকলাম, কিছুক্ষণ হাঁটার পর পৌঁছে গেলাম চন্দ্রমহল ইকো পার্কের গেটে। হ্যাঁ, কিছুক্ষণই বটে। আমরা দুজনে যেখানে দিনে ৩৫ কি.মি. হেঁটেছি সেখানে এই দেড় কি.মি. কী এমন দূরত্ব! যা হোক সেই গল্প না হয় পরে একদিন বলব।
সাধারণ একটা গেট, দেখে বোঝার উপায় নেই যে ভেতরটা এত সুন্দর। ভিতরে ঢুকে আমরা কোন দিকে যাব বুঝতে পারছিলাম না, তাই সোজা হাঁটতে থাকলাম। হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়ে বাংলার হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের পরিচয় স্বরূপ নির্মিত বিভিন্ন ভাস্কর্য। এগুলো দ্বারা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে মধ্যযুগের বাঙালির জীবন যাত্রার ধরন। এগুলোর মধ্যে রয়েছে জেলে, মুটে, গ্রামীণ নারীর জীবনযাত্রার চিত্র, পালকি ইত্যাদি, যা এক নিমেষেই বাংলা এবং বাঙালির সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে পারে যে কাউকে।

ভাস্কর্য; Source: অচিন্ত্য আসিফ

এছাড়াও রয়েছে, অনেক প্রজাতির পশু-পাখি। এদের মধ্যে বানর, বনবিড়াল, হরিণ, তিতপাখি, তুর্কী মুরগী, সাদা ময়ূর, বক, বিভিন্ন প্রজাতির কুকুর, ঈগল, মদন টাক, সাদা ঘুঘু, পেঁচা, বেজী, কবুতর, কোয়েল, কুমির ইত্যাদির নাম উল্লেখযোগ্য। পেছনেই রয়েছে একটি দৃষ্টিনন্দন জলাধার। এখানে পানির উপরে রয়েছে ইট-সিমেন্টের তৈরি কাঁকড়া, ঝিনুক ও পানসী নৌকা। এই জলাধারের অপর প্রান্তে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে চন্দ্রমহল। মহলটির গায়ে সূর্যের আলো যেন নতুন রূপে জ্বলছে।
মহলটি নির্মিত হয়েছে প্রাচীন মহলের আদলে। উপরে একটি বিরাট গম্বুজ আর তার গায়ে রয়েছে সোনালী রঙের ডিজাইন, যার উপর সূর্যের আলো পড়ায় দামী কোনো রত্নের ন্যায় দেখাচ্ছে। পাশে রয়েছে একটি উঁচু মিনার। আর সমস্ত মহলটি পানিতে ঘেরা। এখান থেকে সামনে এগিয়ে গেলে আরো কিছু জলাধার চোখে পড়ে, যেখানে পানির উপরে নির্মিত হয়েছে বাঁশের তৈরি কুটির ও রেস্তোরাঁ।
পানির উপরে রেস্তরা; Source: অচিন্ত্য আসিফ

আর একটু সামনে এগিয়ে গেলেই রয়েছে পিকনিক স্পট। এখানে কাঠের তৈরি একটি দুই তলা ভবন রয়েছে যেখানে দর্শনার্থীরা নিজের মতো করে অবকাশ যাপন করতে পারে।
রাস্তার পাশে রয়েছে সারি সারি নারিকেল গাছ, তাই রাস্তাটি বেশ ছায়াঘন। এই পরিবেশে বসে সময় কাটানোর জন্যে রয়েছে বসার স্থান। আমরা কিছুক্ষণ পুকুর পাড়ে বসে বিশ্রাম নিলাম।
পিকনিক স্পট; Source: অচিন্ত্য আসিফ

বিকাল গড়িয়ে এসেছে আমাদের ফিরতে হবে, তাই আর দেরি না করে চন্দ্রমহলের দিকে এগিয়ে গেলাম। দেখা যাক, কী আছে ভেতরে। কোনো সমাধি আছে নাকি সেটা দেখাই মূল লক্ষ। পানির নীচে তৈরি একটা সুড়ঙ্গের এক প্রান্ত দিয়ে প্রবেশ করে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলাম অপর প্রান্তে অবস্থিত মহলের দরজার সামনে।
মহলের ভেতরে ঢুকে প্রথমে চোখে পড়ল এর প্রতিষ্ঠাতার ছবি। তারপর ক্রমান্বয়ে দেখতে লাগলাম নির্মাতার সারা জীবনের সংগ্রহ। তিনি সারা জীবন বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করে যা কিছু সংগ্রহ করেছেন তারই সংগ্রহশালা এটি।
এখানে কোনো সমাধি নেই। আছে দেশী-বিদেশী পুরনো মুদ্রা, ডাক টিকিট, যুদ্ধের অস্ত্র, বহুকাল আগের তৈরি ঘড়ি, প্রার্থনার অলংকার, ধর্মীয় পুরাকীর্তি, সিঁদুর দানী, পাথরের আসবাবপত্র, বিভিন্ন রঙের পাথর, শত বছরের পুরনো কলের গান, সবচেয়ে ছোট গ্রামোফোন, বিরল পাণ্ডুলিপি, বাঁশ পোকা, বিভিন্ন প্রজাতির মৃৎ শিল্প, বিভিন্ন প্রকার ক্ষুদ্র পতঙ্গ, পাতা পোকা, ১৭০০-১৮০০ সালের পিতলের চুলের কাঁটা, রুপার চায়ের পাত্র, পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম কোরআন শরীফ, আড় বাঁশি ইত্যাদির নাম উল্লেখযোগ্য।
মহলের ভিতরে রয়েছে এই বাঘের মুখটি; Source: অচিন্ত্য আসিফ

ফেরার পথে স্থানীয় সূত্র থেকে জানতে পারলাম, এই মহলের নির্মাতা বাংলাদেশে থাকেন না। তিনি তার পরিবারের সাথে অন্য কোনো এক দেশে পাড়ি জমিয়েছেন।
মহল থেকে বেরনোর রাস্তা; Source: অমিতাভ অরণ্য

এখানে ঘুরতে আসেন সাধারণত দূর-দূরান্তের লোকজন। সুন্দরবনের কাছাকাছি হওয়ায় পর্যটকেরা সুন্দরবনে ঘুরতে এসে সময় থাকলে এখানেও একবার ঘুরে যান, তাই এখানে পর্যটকের ভিড় থাকে প্রায় সারা বছর।

কীভাবে যাবেন:

এখানে যেতে হলে প্রথমে আপনাকে ঢাকা থেকে খুলনায় আসতে হবে অথবা ঢাকা থেকে মংলাগামী গাড়িতেও সরাসরি চন্দ্রমহল যেতে পারবেন। এক্ষেত্রে আপনি সহজে পৌঁছাতে পারবেন। কিন্তু আপনি যদি খুলনা থেকে যেতে চান তবে আপনাকে সোনাডাঙ্গা বাসস্টান্ড থেকে মংলার গাড়ি ধরতে হবে। চন্দ্রমহলের আশে-পাশে ভালো মানের হোটেল না থাকায় অধিকাংশ মানুষ খুলনা থেকেই এখানে আসেন।
ফিচার ইমেজ- অচিন্ত্য আসিফ

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ট্রেনবিহীন দেশগুলোর ইতিবৃত্ত

ঐতিহ্যবাহী চেরাগী পাহাড়: যেখান থেকে আলোকিত হয় চট্টগ্রাম