ট্রেক টু চন্দ্রখনি পাস ও প্রথম হিমালয় যাত্রা

ভোরে ঘুম ভাঙল প্রচণ্ড শীতে। মানালীতে তখন বর্ষাকাল। সবে মাত্র ভোর হতে শুরু করেছে, কিন্তু লম্বা জার্নির পর ঘুমটা এত গাঢ় ছিল যে শীত বুঝতে পারিনি। দলের বাকি ক’জনকে টেনে তোলা ছিল সব থেকে ভয়াবহ কাজ। তবুও উচ্চতা ছোঁয়ার একটা তীব্র প্রয়াস ছিল সবার মধ্যে। হাতে সময় ছিল তাই উঠে ফ্রেশ হতে বেলা নয়টা বাজল। হোটেল থেকে বেরিয়ে চলে এলাম মানালি গার্ডেনের সামনে।

এখানে কলকাতার এক লোক মুরগি কেটে, ফ্রাই করে বিক্রি করে শুনেছিলাম। এসে দেখলাম তেমন কেউ নেই। তাই ডাল আর সবজি ভাত দিয়েই সকালের খাওয়া শেষ করে ব্যাকপ্যাক ঝুলিয়ে নিলাম। কুল্লুর বাস এত বেলা করে পাওয়া কষ্টকর তবুও ভাগ্য ভালো, কোথা থেকে একটা বাস এলো যেটা কুল্লু পর্যন্তই যাচ্ছিল। চেপে বসলাম দেরী না করে।

নগর এর ছোট্ট শহর। ছবিঃ আতিকুর রহমান 

আমাদের উদ্দেশ্য ছিল ছোট শহর ”নগর”। কুল্লুর আগে নেমে নদী পার হয়েই নগরে পৌঁছাতে বেলা তখন ১১টা বেজে গিয়েছে। দেরি যে করে ফেলেছি তা সবাই বুঝতে পারছিলাম ওদিকে তখন প্রায় ৫ ঘণ্টার ট্রেকিং করে উপরে উঠে যেতে হবে। পরের উদ্দেশ্য ছিল নগর থেকে রামসু হয়ে গানাসলানি ক্যাম্প সাইট। ট্রেকিংয়ের ট্রেইল খুঁজে নিয়ে উঠতে শুরু করলাম।

হঠাৎ করেই উচ্চতা পরিবর্তন হচ্ছিল। ছোট্ট শহর নগর ছেড়ে যখন ঘন সবুজ পাইন বনের পাথুরে রাস্তা দিয়ে উঠতে শুরু করেছি, চোখের সামনে স্বপ্নের মতো ট্রেইল, পাহাড়ের গভীর খাদ আর বোল্ডারের ফাঁকে ফাঁকে চোখ জুড়ানো সব সবুজ বুগিয়াল চোখে পড়া শুরু হয়েছে।

সবুজ অকৃত্রিম বুগিয়াল। ছবিঃ আতিকুর রহমান

তখনো হাঁটতে দারুণ লাগছিল। সাধারণত সবাই এই ট্রেকিংটা খুব ভোরে শুরু করে। আমরা সকাল এগারোটার দিকে শুরু করায় ট্রেইলে খুব বেশী লোক চোখে পড়ছিল না। পিঠে বিশাল রসদের বোঝা নিয়ে উপরে উঠছি। মাঝে মাঝে বসে বিশ্রাম নিচ্ছি ট্রেইলের পাশে কোনো বড় বোল্ডারে বসে। ট্রেইলে খুব বেশী পানির সোর্স না থাকায় খাবার পানিটাও টেনে নিয়ে উঠতে হচ্ছে। তাই দুই একজন নতুন ট্রেকারের বেশ সমস্যা হচ্ছিল।

দেরী হলেও আমাদের হাতে তাড়া ছিল না। লম্বা সময়ের জন্য রসদ, জরুরী মেডিসিন, থাকার জন্য টেন্ট ছিল বলে কটেজ বুকের চিন্তা ছিল না। ঘণ্টা আড়াই হাঁটার পর আমরা রামসুতে পৌঁছালাম। পরিপাটি গ্রাম, ট্যুরিস্ট আর বসতি মিলিয়ে ৫০ জনের মতো মানুষ হবে টেনেটুনে। গ্রামের অধিকাংশ লোকই তখন কাজের জন্যে বেরিয়ে গিয়েছে।

রামসু গ্রামে ঢোকার মুখে। ছবিঃ আতিকুর রহমান

রামসুতে একটা দোকানে বসে স্যুপ নুডুলসের অর্ডার করলাম। পাশেই বিশাল পাহাড় উঠে গিয়েছে উপরের দিকে। অন্যদিকে লম্বা গাছের সারি পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে গিয়েছে নিচের দিকে। আর দূরে কোথাও মেঘ এগিয়ে আসছে গ্রামের দিকে। ভয় হচ্ছিল বৃষ্টির জন্য। হিমাচল প্রদেশে হুট হাট করেই আবহাওয়া পাল্টায়। আবার এভাবে অপরূপ চারপাশ ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করে না কোথাও।

দুপুর পড়ে আসছিল। তাই দ্রুত বেরিয়ে পড়লাম আমরা। হাঁটতে হাঁটতেই মনে হলো মেঘ আমাদের ঘিরে ধরেছে। এর আগে হোয়াইট আউটের অভিজ্ঞতা না থাকায় বেশ ঘাবড়ে গিয়েছিলাম, কিন্তু দলের সবাই দেখলাম বেশ সতর্ক আর নির্ভয়েই এগোচ্ছে, তাই আমিও সাহস নিয়েই এগুতে শুরু করলাম।

পাইন বন আর পাথুরে ট্রেইল। ছবিঃ আতিকুর রহমান 

দুই পাশে সবুজ বন, ফুলের গাছের সারি আর মাঝে মাঝে বিশাল পাইনের বনের মধ্যে দিয়ে সবুজ রঙের ছোট ছোট বুগিয়াল দেখে মনে হয় এখানেই যেন থেকে যাই সারাজীবন। বুগিয়াল মানে পাহাড়ের উপর সবুজ রঙের মাঠগুলো। আরো ঘণ্টা আড়াই ট্রেকিংয়ের পর আমরা গানাসলানি পৌঁছালাম। ততক্ষণ মেঘ কেটে গিয়েছে কিন্তু শেষ বিকেলের আলোটাও পড়ে আসছে। খুব ক্লান্ত লাগছিল নিজেকে।

হাঁটু কাঁপতে কাঁপতে কোনোমতে বসে পড়লাম। দলের বাকিরা ততক্ষণে তাবু পিচ করে ফেলেছে। চারপাশের ক্যাম্প সাইটে তখন প্রচুর ট্রেকাররা বসে আড্ডা দিচ্ছে। অনেকে এসে গল্প করা শুরু করল। আমি একটু রেস্ট নিয়ে তাবুর বাইরে আসলাম। ক্যাম্প সাইটে সবাই তখন আগুন জ্বালিয়ে আড্ডা গল্পে মেতে উঠেছে।

ক্যাম্প ফায়ার। ছবিঃ Yash Chowhan 

দলের সবাই বেশ অনেক রাত পর্যন্ত বাকি অচেনা ট্রেকারদের সাথে গল্প গুজব আর রান্না বান্না করে কাটালাম। সব থেকে মজার ব্যাপার ছিল সবাই মিলে ক্যাম্প সাইটে কনকনে ঠাণ্ডায় খাবার খাওয়া। খাওয়া শেষ করে সবাই সকাল সকাল ঘুমাতে গেলাম। স্লিপিং ব্যাগের ভেতরে ঢুকে বুঝলাম বৃষ্টি শুরু কয়েছে।

কনকনে ঠাণ্ডার ভেতর বৃষ্টি আর বাতাসের শব্দ পাইন পাতার ভেতর দিয়ে যাওয়ার ভয়াবহ শব্দের মধ্যেও ঘুমিয়ে পড়েছি কখন বুঝতে পারিনি। বিপাকে পড়লাম মাঝরাতে।টয়লেটের জন্য ততক্ষণে চূড়ান্ত পর্যায়ে চলে গিয়েছি, ঠাণ্ডা বা বৃষ্টি কোনোটাই কমে না। অগত্যা পঞ্চোর উপর ভরসা করেই ছুটলাম হিমশীতল বৃষ্টির রাতে।

ভোর সকালে ঘুম থেকে উঠে একটু মাথা ব্যথা করছিল। ৮,৮৫৬ ফুট পরে এসেই যে এরকম হবে সেটা বুঝতে পারিনি। একটা নাপা এক্সট্রা আর এক কাপ কফি খাবার পর একটু ভালো লাগতে শুরু করল। সকালে দ্রুত স্টোভ জ্বালিয়ে নুডুলস রান্না করে নিয়ে তাবু গোটানো হলো। এবার অনেকেই এক সাথে ট্রেকিং শুরু করলাম। ট্রেকিংয়ের দ্বিতীয় দিনে গন্তব্য ছিল চাকলানী। প্রায় পাঁচ ঘণ্টার হাই অলটিটিউড ট্রেকিং ছিল এই দিনে।

চন্দ্রখনি পাস, বেইস ক্যাম্প। ছবিঃ আতিকুর রহমান

তাই সতর্ক হয়ে আস্তে আস্তে হাঁটতে শুরু করলাম। পাইন বনের গভীর দিয়ে রাস্তা উপরের দিকে উঠছে। বৃষ্টির জন্য পিচ্ছিল পাথুরে রাস্তা কিছু কিছু জায়গায় বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। সতর্কতার সাথেই আমরা প্রায় ছয় ঘণ্টা ট্রেকিং করে চাকলানী নামক একটা জায়গায়। উচ্চতা ১১,৪৮০ ফিট। এখানেই চন্দ্রখনি পাসের বেইস ক্যাম্প।

চারদিকে বিশাল বিশাল পর্বতের সারি দেখে সারাদিনের ক্লান্তি ঘুচে যাচ্ছিল। স্বপ্ন ভরা চোখে আমি দেখতে থাকলাম চারদিকের বিশাল বিশাল সব পাহাড় পর্বতের সারিগুলো।চোখ জুড়িয়ে আসছিল সেই সাথে দিনের আলো কমে আসছিল। বেশ কিছু দূরে বসে দেখলাম ক্যাম্পের ভেতর জোনাকির মতো বাতি জ্বলে উঠছে একে একে। সন্ধ্যার মুহূর্তে জীবনে প্রথমবার হিমালয়ের এত উচ্চতায় নিজেকে খুব সুখী মনে হচ্ছিলো। ভাবছিলাম এখানেই যদি থেকে যেতাম আজীবন। 

রুট ও খরচের খসড়া:

কলকাতা থেকে দিল্লি বা চণ্ডীগড় পর্যন্ত ট্রেনে আসা যাবে। খরচ পড়বে ৬৮০-৩,২০০ রুপি পর্যন্ত। এখান থেকে বাসে করে কুল্লু অথবা মানালি চলে আসতে হবে। ভাড়া পড়বে ৬৫০ থেকে ১,২০০ রুপি। মানালি বা কুল্লুতে এসে হোটেলে থাকতে হবে। খরচ পড়বে ৩০০ – ২,০০০ রুপি পর্যন্ত। কুল্লু বা মানালি থেকে নগর এসে ট্রেকিং শুরু করতে হবে। টোটাল ৫ দিন ট্রেকিংয়ের জন্য খরচ হবে ৬ হাজার থেকে ৮ হাজার রুপির মতো।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কাপ্তাই লেকের বুকে গিটারের সুরে সুরে জ্যোৎস্না বিলাস

আমেরিকার যত ভ্রমণস্থানের গল্প: শিকাগো সিটি