যশোরের চাঁচড়া শিব মন্দিরের উপাখ্যান

যশোর-খুলনা মহাসড়কে মাঝে মাঝেই যাওয়া হয়। বাসের জানালা দিয়ে একদিন খুলনা যাবার পথে চোখে পড়ল রাস্তার ডান দিকে সুন্দর একটি স্থাপনা। দেখে বেশ পুরনো মনে হচ্ছিল। যাত্রা পথে ঘুরে দেখার সুযোগ নাহলেও আফসোস হলো। বছর তিনেক যশোর থাকার পরও প্রাচীন সভ্যতার এই নিদর্শন কীভাবে আমার দেখার বাইরে থেকে গেল তা নিয়ে ভাবছিলাম।

দুদিন পর খুলনা থেকে ফিরেই চাঁচড়ার দিকে রওনা দিলাম। বাসা থেকে মাত্র ২০ মিনিটের রাস্তা। চাঁচড়া চেকপোস্ট বাজারে নেমে খুলনার দিকে মিনিট পাঁচেক হাঁটলেই হাতের ডান দিকে চোখে পড়ল ৩০০ বছরের বেশী পুরনো এই শিব মন্দিরটি। বর্তমানে চারদিকে প্রাচীর দেয়া হলেও তখন এর চারপাশটা ঘাসের কার্পেটে মোড়ানো সুন্দর একটা জায়গা ছিল।

ঘাসের চাদরে ঘেরা মন্দিরে ভ্রমনার্থী। ছবিঃ লেখক 

ভেতরে ঢুকে দেখলাম একজন পুরোহিত সাহেব পুজোর বন্দোবস্ত করছেন। আমাদের দেখে ভেতরে ডাকলেন। ওনার মুখ থেকেই গল্প শুনলাম এই মন্দিরের। ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দের আগে বা পরে তৎকালীন নামধারী রাজা শ্রী মনোহর রায় তার রাজ প্রাসাদের পাশেই তৈরি করেছিলেন এই মন্দিরটি। মন্দিরের পাশে ছিল বিশাল আকারের পদ্ম দিঘী। যা এখন একটু ছোট আকারের হয়ে গিয়েছে জমি দখলের প্রভাবে।

তখনকার প্রাসাদটি এখন আর নেই। তবে আমি যখন গিয়েছিলাম রাস্তার অন্যদিকে ঝুপড়ির মতো একটা জায়গায় প্রায় ৪০ ইঞ্চি পুরুত্বের দেয়াল চোখে পড়েছিল।
পুরোহিতের ভাষ্যমতে ওখানেই ছিল মাঝারি আকৃতির রাজবাড়ী। রাজার পরিবারের লোকদের সাথে শিবের পুজো করতে আসত গ্রামের সবাই। পাশের দিঘীতে গোসল করে পবিত্র হতেন সবাই।

চাঁচড়া শিব মন্দির। ছবিঃ লেখক 

বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতায় আনার পর বছর দশেক আগে এই মন্দিরকে পুঃনির্মাণ করা হয়। বাইরের টেরাকোটার কাজগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সেখানে পুরনো টেরাকোটার প্রতিকৃতিতে নতুন করে পোড়ামাটির ফলক স্থাপন করা হয়। অানুমানিক ৩২২ বছর আগে রাজা মনোহর রায় তার প্রাসাদের অভিষেক অনুষ্ঠানের সময় এই মন্দির তৈরি করেন।

তখন পাথুরে শিবের মূর্তি থাকলেও কালের বিবর্তনে সেই মূর্তিটি এখন আর নেই। পুরোহিতের গল্প মতে, রাজা মনোহর রায় প্রতিদিন ভোরে পেয়াদা নিয়ে আসতেন এই মন্দিরে। দীঘির পাড়ে হাওয়া খেয়ে ফিরতেন রাজ্যের কাজ সেরে। তাই মন্দিরটি সাজানো থাকত সব সময়। এই মন্দিরের ভোরের আরতিতেই জেগে উঠতেন রাজ পরিবারের সকলে।

চালা। চাঁচড়া শিব মন্দির। ছবিঃ লেখক

গঠন অনুয়ায়ী এই মন্দিরটি আট চালা, অর্থাৎ আটটি চাল। প্রথম ধাপে ফানেল আকৃতির চারটি চালা এবং তারপরে ছোট আর চারটি চালা, এভাবে দুইটি স্তরে এর ছাদটি নির্মিত হয়েছিল। তবে প্রথম দিকে চুন, ইট ও সুরকি দিয়ে চালা তৈরি করা হলেও পুঃনির্মাণের সময় সেখানে দীর্ঘমেয়াদী সিমেন্ট সহকারে কংক্রিট ব্যবহার করা হয়েছে।

এছাড়া চারটি খিলান যুক্ত দরজার তিনটি রয়েছে এর সম্মুখভাগে। বাকি একটি দরজা রয়েছে এর বাম পাশে। দরজাগুলোতে প্রথমদিকে কী ছিল জানা না গেলেও ভেতরে মূর্তি সংরক্ষণের জন্য লোহার গ্রিল দেয়া হয়েছে পুনঃনির্মাণের সময়। মন্দিরের ভেতরে রয়েছে বিশালাকারের দুইটি পিলার, যা মন্দিরের উপরের গম্বুজাকৃতিতে চালাকে ধরে রাখতে সাহায্য করে।

খিলান দরজা। ছবিঃ লেখক

মন্দিরটি আকারে খুব একটা বড় না। পূর্ব দিকে মন্দিরের দৈর্ঘ্য ৯.৫ মিটার এবং প্রস্থ ৮.১৩ মিটার। এছাড়া মন্দিরের চারপাশের দেয়াল জুড়ে রয়েছে অজস্র টেরাকোটার কাজ। প্রাচীন টেরাকোটাগুলোতে বেশ কিছু ছবি ও মন্ত্র সম্বলিত থাকলেও এখনকার টেরাকোটাগুলোতে ফুলের আদল বেশী চোখে পড়ে।

এছাড়া মন্দিরের প্রতিটি কোণা ও জোড়া জুড়ে রয়েছে ছোট ছোট পোড়ামাটির কাজ। যেসব কাজ মুগ্ধ করবে সবাইকে। বর্তমানে একটি প্রধান ফটক ব্যবহার করা হয়। যেটি প্রায় ৯ ফুট উঁচু এবং এর চারদিকে আলাদাভাবে টেরাকোটার কাজ চোখে পড়ে। মন্দিরের উপরের চালার দেয়ালে কিছু আলোকুঠুরি রাখা হয়েছে। যাতে করে অন্ধকার মন্দিরের ভেতরে দিনের আলো প্রবেশ করতে পারে।

 প্রাচীন মন্দির।  ছবিঃ  লেখক

মন্দিরের বারান্দা পাকা করে দেয়া হয়েছে ইটের স্লিং দিয়ে। তাছাড়া পাতাবাহারের গাছগুলো বারান্দার চারদিকে সুন্দরভাবে ছেটে রাখা হয় মন্দিরের সৌন্দর্য রক্ষার জন্য। মন্দিরের আনাচে কানাচে রয়েছে বেশ কিছু নারকেল গাছ, সুপারি গাছ ও অন্যান্য কিছু গাছ। যা মন্দিরের প্রাঙ্গণে ছায়া দিয়ে থাকে। মন্দির থেকে এর প্রাচীর পর্যন্ত রয়েছে সবুজ ঘাসের আস্তরণ। তাই খালি পায়ে হেঁটে চারপাশটা দেখতে ভালো লাগবে যে কারো।

পুরোহিতের গল্প শেষ হতে হতে বেশ কয়েকজনকে দেখলাম পুজোর জন্য এসেছে। আমরা জায়গা ছেড়ে দিয়ে মন্দিরের চারপাশটা ঘুরে দেখতে লাগলাম। মনে হচ্ছিল, যদি ৩০০ বছর আগের এমন একটা দিনে এখানে দাঁড়িয়ে দেখে আসতে পারতাম কেমন চলছিল তখন এই মন্দিরের আশেপাশের জীবন।

মন্দিরের গায়ে টেরাকোটা। ছবিঃ লেখক 

রুট ও খরচের খসড়া:

ঢাকা থেকে যে কোনো বাসে বা ট্রেনে করে চলে আসবেন যশোর। নিউমার্কেট নেমে ৫ টাকা ভাড়া দিয়ে চলে আসবেন দড়াটানা মোড়। দড়াটানা নেমে আশেপাশেই বেশ কিছু ভালো খাবার হোটেল পাবেন। খেয়ে নিতে পারেন গরুর কালো ভুনা, চুই ঝালের মাংস দিয়ে ভাত। খাবার পর ফ্রেশ হয়ে রিকশা বা অটোতে উঠে চলে যান চাঁচড়া বাজার। ভাড়া নেবে ১০ টাকা।

রিকশা নিলে ভাড়া নেবে ২৫ টাকা। রিকশা নিয়ে সরাসরি শিব মন্দিরে চলে যেতে পারেন। ভাড়া পড়বে নিউমার্কেট থেকে ৪০-৫০ টাকা এবং দড়াটানা থেকে ২৫-৩০ টাকার মতো। যশোরে থাকার জন্য শহরের মধ্যেই বেশ কিছু ভালো মানের আবাসিক হোটেল পাবেন ।

কিছু কথা:

যেহেতু এই নিদর্শনগুলো আমাদের দেশের প্রাচীন সম্পদ, তাই এমন কিছু করবেন না যাতে করে এগুলোর কোনো ক্ষতিসাধন হয়। যদিও সতর্ক থাকা উচিৎ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতায় থাকা কোনো নিদর্শনের ক্ষতিসাধন করলে আপনার জেল বা জরিমানা হতে পারে। যেখানে যাবেন পরিবেশের প্রতি খেয়াল রাখবেন যেন নোংরা না হয়।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কেনিয়ার বিশ্ববিখ্যাত মাসাই মারা সাফারি

আমস্টারডাম ভ্রমণ: জলে কিংবা জাদুঘরে