ঐতিহ্যবাহী চেরাগী পাহাড়: যেখান থেকে আলোকিত হয় চট্টগ্রাম

বলা হয়, প্রায় কয়েক’শ বছর আগে সুফি সাধক বদর আউলিয়া (রা:) সমুদ্রে ভাসমান একটি পাথর খণ্ডে আরোহণ করে চট্টগ্রামে আগমন করেন। তিনি মূলত ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে এখানে এসেছিলেন। কিন্তু তখন চট্টগ্রাম ছিল গভীর পাহাড়-পর্বতে ঘেরা এবং জন-মানবহীন। এখানে ছিল জ্বীন-পরিদের আবাসস্থল।
হজরত বদর আউলিয়া একটি অলৌকিক চেরাগ সাথে নিয়ে এসেছিলেন। সেটি হাতে নিয়ে তিনি যখন একটি পাহাড়ের চূড়ায় আরোহণ করেন তখন জ্বীন-পরিরা তাকে বাঁধা দেয়। তারা বলে, এখানে মানুষের কোনো স্থান নেই।
রাতের অন্ধকার নেমে এলে বদর আউলিয়া অতি সুকৌশলে তার চেরাগটি বা প্রদীপটি রাখার জন্য জ্বীন-পরিদের কাছে অনুমতি প্রার্থনা করেন। জ্বীন-পরিরা তাতে সম্মতি জ্ঞাপন করার পর বদর আউলিয়া তার অলৌকিক চেরাগটি জ্বেলে দেন। আর তখন তার তীব্র তেজ সহ্য করতে না পেরে জ্বীন-পরিরা চট্টগ্রাম ছাড়তে বাধ্য হয়। এর পর থেকেই এখানে মানুষের বসবাস শুরু হয়। আর পাহাড়টির নাম হয় চেরাগী পাহাড়। বেরিয়ে পড়লাম চেরাগী পাহাড়ের খোঁজে, লোককথা মতে যেখান থেকে বাণিজ্যিক নগরী চট্টগ্রামের শুরু। যদিও আমার ঘোরাঘুরির শুরুটা এখান থেকে না। এর আগে চট্টগ্রামের বেশ কয়েকটি জায়গা ঘুরে ফেলেছি।
আমি যখন চেরাগীর মোড়ে পৌঁছায়, তখন রাস্তার পাশে উঁচু উঁচু বিল্ডিংয়ের মধ্যে ছোট একটি টিলা চোখে পড়ে। কিন্তু আমার কাছে তাকে চেরাগী পাহাড় বলে মনে হলো না। কী জানি! চেরাগি পাহাড় আর চেরাগীর মোড়, জায়গা দুটির মধ্যে হয়তো শুধু নামেরই মিল; এছাড়া দুটির অবস্থান এক নয়! তাই এদিক-ওদিক ঘুরে-ঘুরে পাহাড়টি খুঁজতে লাগলাম। এভাবে হাঁটতে হাঁটতে এক পর্যায়ে পৌঁছে গেলাম পাহাড়টির পেছনের দিকে। এখানকার পরিবেশ দেখে মনে হচ্ছিল, এটিই সঠিক জায়গা। পাহাড়ের উপরে ওঠার জন্য রাস্তা করা আছে। সেই সাথে পাহাড়ের পাদদেশে রয়েছে একটি মঞ্চ। দেখেই বোঝা যাচ্ছে এখানে হয়তো মাঝে মধ্যে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

ডিসি হিল; Source; commons.wikimedia.org

আগেই শুনেছিলাম, চেরাগীর মোড় চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক কর্মী, সাংবাদিক, রাজনৈতিক নেতা-কর্মী সহ বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের আড্ডাস্থল। তাই মনে আর সন্দেহের অবকাশ রইল না যে এটা চেরাগী পাহাড় নয়।
রাস্তা ধরে উপরে উঠতে লাগলাম। কিছুদূর যেতেই একজন পুলিশ সদস্য আমাকে থামিয়ে দিল। জানাল, আর উপরে যাওয়ার অনুমতি নেই, ওদিকে ডিসির বাস ভবন। আমি রীতিমত থ হয়ে গেলাম। এখানে আবার ডিসির বাস ভবন এলো কোথা থেকে? চেরাগী পাহাড়ে ডিসির বাস ভবন! এমনতো কোথাও শুনিনি। তবে একটা কথা ঠিকই শুনেছিলাম যে চেরাগী পাহাড়ের পাশেই ডিসি হিল। আমি ভেবেছিলাম ওটা হয়তো পাহাড়টির নাম কিন্তু এখন দেখছি এখানে ডিসি সাহেব থাকার কারণেই এটি ডিসি হিল। যা হোক, ফিরে গেলাম চেরাগীর মোড়ে। এখানে সারি সারি কিছু ফুলের দোকান চোখে পড়ল।
চেরাগীর মোড়ে ফুলের দোকান; somoynews.tv

ফুল সবারই ভালো লাগে সেই সাথে আমারও কিন্তু সব থেকে বেশি ভালো লাগে তা যখন গাছে থাকে। ফুলের দোকানে ঘুরতে ঘুরতে একজন দোকানির কাছে চেরাগী পাহাড়ের অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলাম। তিনি আমার দিকে এমনভাবে তাকালেন যেন কোনো ভিন গ্রহের প্রাণী দেখছেন। তার উত্তর শোনার পর অবশ্য আমারও নিজেকে কেমন যেন বোকা বোকা মনে হচ্ছিল। কারণ, দোকানটি ছিল একেবারে চেরাগী পাহাড়ের গা ঘেঁষা। সেই পাহাড় যাকে আমি চেরাগী পাহাড় বলে মানতে পারছিলাম না। তাই খানিকটা নাক সিঁটকালাম। তবে যখনি এই পাহাড়ের ঐতিহাসিক গুরুত্ব স্মরণে এলো তখন আর এই পাহাড়টিকে ক্ষুদ্র মনে হচ্ছিল না।
চেরাগী পাহাড়ের পাশে তিন রাস্তার মিলন স্থল যা চেরাগীর মোড় নামে পরিচিত। এখানকার ইতিহাসের স্মারক হিসেবে রাস্তার মাঝখানে রয়েছে একটি চেরাগ আকৃতির মনুমেন্ট।
চেরাগীর মোড়ে স্থাপিত মনুমেন্ট; Source: অচিন্ত্য আসিফ

আসলে এই মনুমেন্টটিই চেরাগী পাহাড়। চেরাগী পাহাড় নামে আলাদা কোনো পাহাড়ের অস্তিত্ত্ব আজ আর নেই। হয়তো এক সময় ছিল, যা আজ কালের গর্ভে বিলিন। যারা এই সত্যটিকে মেনে নিতে পারেন না তারা এর পাশের ছোট পাহাড়টিকেই চেরাগী পাহাড় বলেন। ঠিক যেমন আমাকে বলা হয়েছিল।
জায়গাটি পত্রিকা পাড়া নামেও পরিচিত। কারণ এখানে রয়েছে বিভিন্ন দৈনিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক, মাসিক পত্রিকা ও বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের কার্যালয়। এছাড়াও রয়েছে হকার সমিতির কার্যালয়, প্রকাশনা সংস্থা, মুদ্রণ ও বিভিন্ন সমাজসেবা প্রতিষ্ঠান। সর্বোপরি এখানে বাণিজ্যিক, সমাজকল্যাণমূলক ও শিল্প সাহিত্য বিষয়ক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
সকাল সন্ধ্যা এখানে বিভিন্ন সংবাদকর্মী, রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, সাংস্কৃতিক কর্মী, শিল্পী, স্কুল কলেজের ছাত্র-ছাত্রী সহ সকল শ্রেণীর নাগরিকের আনাগোনায় মুখর হয়ে থাকে। সৃষ্টি সুখের উল্লাস চলে রাত-দিন। রাতের আঁধারও যেন এখানকার কার্যক্রমকে থামিয়ে রাখতে পারে না। কারণ আঁধার দূর করা তো সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য। পুরো চট্টগ্রামে সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের চর্চা কেন্দ্র এই চেরাগীর মোড় স্বগর্বে সামনে এগিয়ে চলেছে দিন দিন। এখানকার সৃজনশীল এই আড্ডাকে স্থায়ীভাবে রূপ দিতে আত্মপ্রকাশ ঘটেছে ‘ইউনিটি ইন চেরাগি আড্ডা’। এ সংগঠন বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো আয়োজন করে চট্টগ্রাম আড্ডারু সম্মেলন। এছাড়াও এই সংগঠন চেরাগি মোড়ের সৃজনশীল সব কর্মকাণ্ডকে আরও এগিয়ে নিতে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
চারিদিকে ঘোরাফেরা শেষে ফেরার পথে চেরাগীর মোড়ে দাঁড়িয়ে কিচ্ছুক্ষণ চেরাগ আকৃতির মনুমেন্টটি পর্যবেক্ষণ করছিলাম আর মনে মনে ভাবছিলাম, সুফি সাধক বদর আউলিয়া এই পাহাড়ে আসলেই কোনো প্রদীপ জ্বালিয়েছিলেন কিনা জানি না। তবে এটা অবশ্যই সত্য যে, এখানে একটা প্রদীপ এখনও জ্বলছে এবং ক্রমে তা দীপ্তিমান হয়ে উঠছে।
রাতের চেরাগী; chattagrampratidin.com

কীভাবে যাবেন:

চেরাগী পাহাড়ে যেতে হলে আপনাকে প্রথমে চট্টগ্রামে যেতে হবে। চট্টগ্রাম শহর থেকে বাসে বা সিএনজিতে যেতে পারবেন চেরাগীর মোড়ে।

কোথায় থাকবেন:

চট্টগ্রাম শহরে বেশ কয়েকটি থাকার হোটেল রয়েছে। আপনার সাধ্যমতো সেখান থেকে বেছে নিতে পারেন আপনার পছন্দেরটি।
ফিচার ইমেজ: Facebook

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সুড়ঙ্গ পথে চন্দ্রমহল ভ্রমণ

ফয়'স লেকের জানা ও অজানা গল্পকথা