ঘের থেকে বাগদা চিংড়ি ধরা দেখা

খুলনার জেলা প্রশাসকের অফিসে একদিন যেতে হয়েছিল বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটা দলের সাথে। জেলা প্রশাসক মহোদয় আমাদের সবাইকে একটি করে ক্যাপ উপহার দিয়েছিলেন। ক্যাপের মধ্যে দুটো জিনিস দেখা যাচ্ছিল, সুন্দরবন ও চিংড়ি। জেলা ব্র্যান্ডিংয়ের অংশ হিসেবে এ দুটোকেই বেছে নেয়া হয়েছে। কর্মসূত্রে আমি খুলনায় বসবাস করছি পাঁচ মাস হলো। এর আগে অনেক আসা হলেও স্থায়ীভাবে থাকা এই প্রথম।
পরিস্কার পরিচ্ছন্ন শহরটি বেশ ভালোই লাগে আমার। খুলনার আরেকটা জিনিস আমার খুব পছন্দ, তা হচ্ছে মাছ। বেশ কয়েক ধরনের প্রতিবেশ থাকার কারণে অনেক ধরনের মাছ পাওয়া যায় খুলনায়। ঘের, হাওর, বাওড়, সুন্দরবনের নদীগুলোর সাথে সাথে সমুদ্র থেকে মাছ আসে অনেক। আমার মতো মৎস্যপ্রেমীর দিন তাই ভালোই কাটছে।

খুলনার বাজারগুলোতে দেখা মেলে হরেক রকম মাছের ছবি লেখক

চিংড়ির জন্য খুলনা অঞ্চলের খ্যাতি আছে। তবে এ অঞ্চলের মানুষ ছাড়া অনেকেই জানে না এখানে মূলত দুটি প্রজাতির চিংড়ি চাষ হয়। যার মধ্যে একটি হচ্ছে স্বাদুপানির চিংড়ি, যেটাকে আমরা গলদা বলি। আর অন্য প্রজাতিটি নোনা পানির চিংড়ি, বাগদা নামে পরিচিত। অনেকেই গলদা -বাগদার পার্থক্য ধরতে পারেন না। সহজ করে বললে গলদার পাগুলো বেশ লম্বা হয় আর বাগদার পা একেবারেই ছোট, প্রায় গায়ের সাথে লাগানো থাকে। সচরাচর গলদাটাই আমরা বেশি দেখি, বাগদা খুলনা অঞ্চল ছাড়া অন্য অঞ্চলে বেশি পরিমাণে দেখা যায় না।
চিংড়ির ঘের ছবি লেখক

আমি গলদার ঘের এবং গলদা চিংড়ি ধরা অনেক দেখেছি, তবে বাগদা কখনো ধরতে দেখিনি। এর কারণ হচ্ছে গলদা জাল মেরে ধরা হয়। অপরদিকে বিশাল ঘেরে বিপুল পরিমাণ শ্যাওলার মধ্য থেকে বাগদা ধরা প্রায় অসম্ভব। সেজন্যই চাষীরা এক ধরনের ফাঁদ পেতে বাগদা ধরে। তবে সেটারও একটা নির্ধারিত সময় আছে, যাকে স্থানীয়রা গোন বলে। প্রতি গোনে পাতা হয় এ ফাঁদ, চিংড়ি সে ফাঁদের মধ্যে ঢুকে পড়লে আর বের হতে পারে না। অপ্রত্যাশিতভাবে সুযোগটা চলে আসলো আমার সামনে।
রাতটা কেটেছিল এই ঘেরের পাড়ের এই তাঁবুতে ছবি লেখক

ক্যাম্পিং করতে আমরা গিয়েছিলাম মোংলায়। রাতে বাদাবন ইকো কটেজে তাঁবু পেতে আড্ডা দিচ্ছিলাম সবাই। এর মধ্যে বস্তা হাতে এক লোককে সামনে দিয়ে যেতে দেখে জিজ্ঞাসা করলাম বাগদা চিংড়ি ধরতে যাচ্ছে কিনা। হ্যাঁ বোধক উত্তর শুনেই আমি লাফ দিয়ে উঠলাম তার সাথে যাবার জন্য। মিল্টন আমাকে নিতে রাজি না, কারণ পথে অনেক কাদা, হাঁটতেও হবে অনেকক্ষণ। আবার ঘেরে নামলে অন্তত কোমর পর্যন্ত ভিজে যাবে, সেটাও একটা কারণ। আমি তাকে আশ্বস্ত করলাম, আমার অতিরিক্ত কাপড় আছে সাথে।
ঘেরে চিংড়ি ধরার ভিডিও:

রওনা দিলাম ঘেরের উদ্দেশ্যে, একটু গিয়ে আমি আমার স্যান্ডেল খুলে রেখে গেলাম। আসলেই অনেক কাদা। তার মধ্য দিয়ে বেশিদূর অবশ্য যাওয়া লাগলো না, একটু পরেই ঘাসে ঢাকা পাড়ে চলে আসলাম, এখানে আর কাদা নেই। ঘেরের অনেক জায়গায় পানি বেশ স্বচ্ছ, বোঝাই যাচ্ছে এখানে গভীরতা এক ফিটও নেই। তবে মিল্টন জানাল যেখানে ”আটল” নামক এই ফাঁদ পাতা আছে সেখানে পানির গভীরতা মোটামুটি ৪ ফিটের মতো। লুঙ্গিতে কাছা মেরে আমিও নেমে পড়লাম পানিতে। এত রাতে পানিতে নামতে একটু একটু ভয় লাগছিল অবশ্য।

রাতের খাবারে ছিল চিংড়ি মাছ ছবি লেখক

অমবস্যার রাত, কোথাও কোনো আলো নেই। আমার আর মিল্টনের হাতে টর্চলাইট আছে। মিল্টনকে যেখানে দেখলাম আমি সেদিকে এগিয়ে চললাম, কাছাকাছি গিয়ে আলো ফেলে দেখলাম একটা চারকোনা বাক্স সে উঠিয়ে আনছে পানি থেকে, এটাকেই আটল বলে। উপরেই একটি বাগদা চিংড়ি দেখা যাচ্ছে, টর্চের আলোতে বাগদা চিংড়িটাকে লাফালাফি করতে দেখলাম। মিল্টন খুব সাবধানে আটলটা পানির উপরে উঠিয়ে এক কোনার মাটি সরিয়ে নিয়ে সেখানে একটা ছোট গর্তের মতো করলো। সে গর্তের মুখে বস্তা ধরে ঝাকিয়ে ঝাকিয়ে সব চিংড়ি বস্তার মধ্যে ঢুকিয়ে ফেলল দক্ষতার সাথে। তারপর বস্তার মুখ বন্ধ করে আবার জায়গমাতো রেখে দিলো চারো।
এর মধ্যে আমি কয়েকটা কাইক্কা মাছকে অনুসরণ করছিলাম, তাদের মধ্যে একটি মাছ হঠাৎ করে আক্রমণ করে বসলো বস্তার উপর। মিল্টন বললো আলো দেখলে এ মাছগুলো ঝাপিয়ে পড়ে। এর মধ্যেই একটা মাছ আমাকে আক্রমণ করলো, মনে হলো  কে যে পানির মধ্যে আমার রানে সুঁই ফুটিয়ে দিতে চাইলো! চমকে উঠেই বুঝতে পারলাম এটা কাইক্কা মাছের কাজ। দেখতেও পেলাম দুষ্ট মাছটাকে, এখনও লাইটের আশেপাশে ঘোরঘুরি করছে।
রপ্তানির জন্য প্যাকেট করা চিংড়ি, প্রসেসিং প্ল্যান্ট থেকে নেয়া হয়েছিল অন্য একদিন ছবি লেখক

ঘের থেকে উঠে আমরা ফিরে চললাম, মিল্টন আগে আগে চলছিল, এর মধ্যে একবার থেমে আমাকে একটা বেশ বড়সড় কাঁকড়া দেখালো। আরেকটু এগুতেই আবার থামালো, এবার বাগদা চিংড়িই দেখা যাচ্ছে। মিল্টন আমাকে বললো, “ধরতে পারেন কিনা দেখেন তো?” খুব আস্তে আস্তে লাইট তাক করে রেখে ধরার চেষ্টা করলাম আমি। পুরোপুরি ব্যর্থ, এমনকি চিংড়ির গায়েও হাত লাগাতে পারলাম না। অথচ প্রতিবারই খুব কাছাকাছি আরেকটা জায়গায় গিয়ে অবস্থান নিচ্ছে চিংড়িটা।
ধরার পরিকল্পনা বাদ দিয়ে ফিরে চললাম আমরা। এবার মিল্টন ঘেরের শেষ প্রান্তে এসে বস্তায় শুধু বড় বড় চিংড়িগুলো রেখে ছোটগুলো ছেড়ে দিল ঘেরে। দুই প্রজাতির চিংড়ি দেখলাম, হরিণা ও বাগদা। তার মধ্যে হরিণার দৈর্ঘ্য এক আঙুলের চেয়ে বেশি না, বাগদাগুলো বড়ই, ২০-৩০টায় এক কেজি হবে।
কুকারে ভাজা চিংড়ি-ছবি লেখক

মনে পড়ল কয়েকদিন আগেই একটি প্রসেসিং প্ল্যান্ট দেখতে গিয়েছিলাম, সেখানে বাগদা চিংড়ি আন্তর্জাতিক মান সম্পন্ন কুকারে রান্না করে খাইয়েছিল, সেটার স্বাদ ভোলার মতো না। রপ্তানির জন্য রাখা চিংড়ি মাছও দেখেছিলাম সেখানে। খুলনা অঞ্চলের লোকের কাছে এই চিংড়ি ধরা দেখাটা কিছুই না, আমার জন্য অনেক বড় কিছু। চিংড়ি ধরা শেষে কটেজে ফিরে দেখি আমাদের খাবার আয়োজনেও আছে বাগদা চিংড়ি। সুস্বাদু সেই চিংড়ি, মুরগি, ডাল আর সবজী দিয়ে শেষ করলাম রাতের খাবার।
ফিচার ছবি: লেখক

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কলকাতা কালীঘাট: প্রাচীন এক ধর্মীয় তীর্থক্ষেত্রের ইতিকথা

E T B এর ইভেন্ট: প্রবাল দ্বীপে বৃষ্টি বিলাস এবং আরামের ট্যুর