ভারতের পাহাড়ে ঘেরা অপরূপ শহর ক্যাসোল আর সালাল ভিলেজ

কী রে, মন খারাপ নাকি তোর? জিজ্ঞেস করল দিব্যদা। আমি তাচ্ছিল্যে না জবাব দিয়েই ফোনের দিকে তাকিয়ে রইলাম। সবে ফোনে একটু করে নেটওয়ার্ক ফিরতে শুরু করেছে। ক্যাসোল সম্পর্কে খোঁজ খবর নিচ্ছিলাম ইন্টারনেটে। আঁকা বাঁকা পথ বেয়ে গাড়ী নেমে যাচ্ছে পাহাড়ের পর পাহাড় ডিঙিয়ে। তখনো আকাশে একটু আলো নিয়েই পৌঁছালাম  ক্যাসোলে। যেন ছোট একটা শহরের চারদিকে আকাশ ছোঁয়া পাহাড়ের প্রাচীর দেয়া।

পাহাড়ের প্রাচীরে ঘেরা অপরূপ ক্যাসোল। ক্যাসোল, কুল্লু, হিমাচল প্রদেশ। ছবিঃ রিফাত রাব্বি 

কাসোলে ঢুকতেই চোখে পড়ল উত্তাল ক্যাসোল নদী। অনেকগুলো জলধারা এখানে এসে মিলেছে বলে অন্য নদীগুলো থেকে এটা বেশী বড় আর উত্তাল। সন্ধ্যে নেমে এসেছিল, আমরাও ক্লান্ত ছিলাম। একটা হোটেলে রুম নিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। হোটেলের বারান্দা থেকে একটু দূরে পার্বতী রিভারের গুম গুম শব্দে মুখরিত পুরো এলাকা।

পাহাড়ী দেয়ালে ঘেরা ছোট্ট ক্যাসোল। ছবিঃ রিফাত রাব্বি

একটু আরাম করতে শুয়েছি সবে। পিনাকদা ডেকে বললেন, যাবি নাকি রাতের ক্যাসোল দেখতে? তিড়িং করে উঠেই বের হয়ে গেলাম দাদার সাথে। রাতের ক্যাসোল অন্য রকম সুন্দর। ছোট্ট শহরে হলুদ বাতির দোকানগুলো ভিড়, বিভিন্ন দেশ থেকে আসা ভ্রমণকারীরা গল্প করছে এখানে ওখানে বসে। লোকাল মার্কেটে বিক্রি হচ্ছে স্থানীয়দের হাতে বোনা উলের পোষাক, তিব্বতীয়ান গয়না আর ট্রেকিং, ক্লাইম্বিংয়ের সরঞ্জাম।

রাস্তায় মোমো দেখে খিদে যেন উপচে উঠল। একটু বায়না ধরতেই পিনাকদাও রাজি হয়ে গেলান। মোমো খাবার জন্য বসালেন নদীর পাশে একটা ক্যাম্পসাইটে। আবছা চাঁদের আলোয় চারপাশের পাহাড়ি দেয়াল আর পাহাড়ের ওপর থেকে নেমে আসা নদীর শব্দ, পাইন বনের শুনশান শব্দ। আমি বিমোহিত হয়ে ছিলাম ক্যাসোলের পুরো সময়টুকুতে।উঠতে মন চাচ্ছিল না মোমো শেষ করার পর। ইচ্ছে যেন আজীবন চোখ বন্ধ করে এই শব্দ, এই পাহাড়ি কোলাহল শুনে যাই।

পাইন বনে, ভিড় করে আকাশ। ক্যাসোল, কুল্লু, হিমাচল প্রদেশ। ছবিঃ রিফাত রাব্বি 

দূর থেকে পিনাকদা ডেকে উঠলেন। আর বসে থাকলে নিশ্চিত ধরে হাসপাতালে নিয়ে যাবে অসুস্থ ভেবে। এবার শহরের মধ্যে এসে পুরো ক্যাসোল চক্কর দিতে কুড়ি মিনিটের বেশী সময় লাগল না। ঘুরতে আসা মানুষের সংখ্যা বেশী মনে হলো। ঘুরতে ঘুরতে যখন হোটেলে ফিরেছি, ঘড়ির কাঁটায় ঠিক দশটা। ফিরে দেখি খাবার চলে এসেছে। ডাল, রুটি, মোমো আর চাটনি। সবাই একসাথে খাওয়া শেষ করে ঠিক হলো, আগামীকালের গন্তব্য সালাল। জমাট আড্ডা শেষ করে মধ্যরাতে গাঁ এলিয়ে দিলাম বিছানায়।

যখন ঘুম ভাংলা, দেখি সকাল সাড়ে নয়টা। দেরি না করে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। আজ একটু আগেই উঠেছি তাই ঘুমিয়ে থাকা বাকীদের জাগিয়ে খাবারের জন্য নিচে আসতে  বললাম। খাবার সেরে হোটেল থেকে বের হতে হতে বাজল এগারোটা। সালাল যেতে সময় লাগবে ৪০ মিনিট। হেঁটেই যেতে হয় পার্বতী নদীর ধার দিয়ে। পাশ দিয়ে যাবার সময় পাথরে বাড়ি লেগে পানি ছিটে আসে গায়ে, এতই উত্তাল এই পার্বতী নদী।

উত্তাল পার্বতীর ডানদিক ধরেই সালালের রাস্তা। ক্যাসোল, কুল্লু, হিমাচল প্রদেশ। ছবিঃ রিফাত রাব্বি 

নদীর পাশ দিয়ে পাইন বনের ভেতর দিয়ে পাথুরে রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে যখন গ্রামের কাছাকাছি চলে এলাম, তখন ইমিগ্রেশনের মতোই পার করতে হলো পাহাড়ি কুকুরের ব্যারিকেড। আদর করে গায়ে হাত বুলালেই ভিসা লাগে না। প্রথমে দেখে ভয় পেলেও এরাই আমাদের গ্রামের পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল। ঢালু পাহাড়ের গায়ে সূর্যমুখী, অর্কিড, রড়োডেন্ড্রোন, আপেল বাগান, নাশপাতি বাগানে ভরা ছোট আর মায়াময় এই সালাল। যে দিকেই তাকাচ্ছি মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছি এই গ্রামের সৌন্দর্যে।

পরিপাটি করে সাজানো গ্রামটি আস্তে আস্তে পাহাড়ের উপরে উঠে গেছে। নিচে থেকে পুরো গ্রামটি দেখে মনে হবে এখানেই থেকে যাই বাকি জীবন। হোটেল ভাড়া খুব-ই কম, কিন্তু খাবারের দাম একটু বেশী। এখানকার হোটেলগুলোর পরিবেশ বেশ সুন্দর। বিশাল রুমের মধ্যে অনেকগুলো বিছানা ফেলে রাখা। অনায়াসে ৮-১০ জন শান্তিতে ঘুমানো যায়। পাশেই আছে আড্ডা দেবার মতো কোলবালিশে ভরা একটা জায়গা। আর বারান্দায় দাঁড়ালে সামনে খোলা ক্যাসোল ভ্যালি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে শুনশান নীরবতা উপভোগ করা যায় এই সালালে।

এক প্রস্থ আপেলের বাগান। ছালাল, কুল্লু, হিমাচল প্রদেশ। ছবিঃ রিফাত রাব্বি

বিকেলের দিকে পুরো গ্রাম ঘুরে আসতে সময় লাগল দুই ঘণ্টা। চারদিকে ফুল আর ফলের বাগানে ভরা এই গ্রাম। পাকা পাকা ফলগুলোর দিকে যেন কারো ভ্রুক্ষেপ-ই নেই। সব মিলিয়ে অসাধারণ রূপবতী গ্রামটি। গ্রামের নিচে রয়েছে পার্বতী রিভার ক্যাম্পসাইট।

ইচ্ছে করলে কম খরচে এই ক্যাম্পসাইটের কোনো একটা তাঁবুতেও থাকতে পারবে যে কেউ। হিমশীতল নদীর পাড়ে এই ক্যাম্পসাইটটিও অপরূপ সুন্দর। পাথরে ভরা নদীতে ইচ্ছে করলে গোসল সেরে নেয়া যায় যদি শীত সহ্য করার ক্ষমতা থাকে কারো।

পার্বতী রিভার ক্যাম্পসাইটের পাশে দলবলে আমরা। ছালাল, কুল্লু, হিমাচল প্রদেশ। ছবিঃ রিফাত রাব্বি

পাহাড় বেয়ে ওপরে উঠে পুরো ভ্যালিটির দিকে তাকালে চোখ জুড়িয়ে যায়। দু পাশে উঁচু পাহাড়গুলো দুদিকে কাত হয়ে ওপরে উঠে গেছে। তার মাঝ বরাবর দিয়ে পার্বতী রিভার, দম্ভভরে এঁকেবেঁকে চলে গেছে বহুদূরে, ভ্যালির শেষ মাথায়। আলো পড়ে আসতেই  আমরা লোকালয়ের দিকে ফিরে এলাম। অনেক রকম আলোয় গ্রামের ক্যাম্পসাইটগুলো মুখরিত হয়ে আছে ততক্ষণে।

সালাল ভিলেজে ক্যাম্প সাইটের বিমুর্ত আলো। ছালাল, কুল্লু, হিমাচল প্রদেশ। ছবিঃ রিফাত রাব্বি

হোটেলের খোলা বারান্দায় বসে চাঁদের আলোয় পার্বতী রিভারের চিকচিকে জলরাশি দেখতে দেখতে কেটে যাচ্ছিলো সময়। নিজেকে মুক্ত পাখির মত লাগছিল। পাইনবনের ঝির ঝির শব্দ আর টুকটাক গল্পে কেটে গেল অনেক সময়। কারোরই ঘুমানোর মতো মন ছিল না। কিন্তু পরদিন পুরো ক্যাসোল চরিয়ে আমরা ক্যাম্প করে মানিকারান চলে যাব। তাই ঘুমটা দরকার ছিল। বিছানায় শুয়ে কখন ঘুমিয়ে গেছি মনে নেই।

পরদিন খুব ভোরে উঠে ক্যাসোলের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম সদলবলে। সালাল ছাড়ার পর এক ঘন্টা হাঁটার পর ক্যাসোল পৌঁছে আর ভাত ছাড়া এই কদিন কাটিয়ে উন্মাদ হয়ে গিয়েছিলাম ভাতের জন্য। সবাই মিলে ফ্রাইড রাইসই খেলাম। খাওয়া শেষে ক্যাসোলের জঙ্গলে চলে গেলাম সবাই। বিশাল পাহাড়ের ঢালে পাইনবনের ভেতর দিয়ে এগোলাম বেশ কিছুক্ষণ।

পাইন বনের শুনশান নীরবতা ভেঙ্গে আসছে। ক্যাসোল, কুল্লু, হিমাচল প্রদেশ। ছবিঃ রিফাত রাব্বি  

ঠান্ডায় হাত জমে যাবার মতো অবস্থায় ভেজা ডালপালার মধ্যে একটু শুকনো কিছু পাইনের গাছের ছাল খুঁজে আগুন জ্বালানো হলো। আগুনের চারপাশে বসেই বনের শুন শুন শব্দে ধ্যান করার মতো পরিবেশ চলে এলো। গল্প গুজব আর পাথরের পাহাড়গুলোর মধ্যে যখন সময় কেটে যাচ্ছিলো মনের মধ্যে ফিরে না যাবার মোহটাও কুরে কুরে খাচ্ছিল। আগুন নিভিয়ে যখন মানিকারানের বাস ধরার জন্য ক্যাসোলে ফিরে এলাম, ঘড়ির কাঁটা তখন বারোটা ছুঁই ছুঁই করছে।

রুট আর খরচের খসড়া:

কলকাতা থেকে ট্রেনে যেতে হবে পাঞ্জাবের জালান্দার অথবা চন্ডিগড়। খরচ পড়বে শ্রেণী ভেদে ৬৭৫ থেকে ৩,২০০ রূপি। এই জায়গাগুলো থেকেই পেয়ে যাবেন ক্যাসোলগামী বাস বা ট্যাক্সি। বাস ভাড়া ৪৫০-১,০০০ রূপি, ট্যাক্সি ভাড়া ৮,০০০ রূপি।

ক্যাসোল থেকে যে কারো কাছে শুনলেই সালাল যাবার ট্রেইল দেখিয়ে দেবে। একমাত্র হেঁটেই সালাল পৌঁছানো যায়। অথবা কোনো লোকাল গাইড নিতে হবে ক্যাসোল থেকে। খাবার খরচ বাজেট ট্রাভেলারদের জন্য লাগবে ৪০০ রূপি প্রতিদিন। হোটেলের ভাড়া গড়ে ৬০০ – ১,০০০ রূপি।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বাংলাদেশ ঘুরুন বাজেট ট্রিপে: ৩,৫০০ টাকায় কুয়াকাটা ভ্রমণ

নবাব ফয়জুন্নেসা জামে মসজিদ ও বিভিন্ন শিক্ষালয়ের ইতিবৃত্ত