মোংলায় ক্যাম্পিং ও সুন্দরবনে ডে ট্রিপ

পরিকল্পনার শুরুটা করেন মৃদুল ভাই। একদিন ইনবক্সে নক করে জানালেন খুলনা আসতে চান। আমি যেন ক্যাম্পিংয়ের একটা জায়গা ঠিক করি। উনাদের পরিকল্পনা জাহাজে খুলনা আসা, ক্যাম্পিং করা, চুই ঝাল খাওয়া আর আশেপাশে ঘুরে ট্রেনে ঢাকা ফিরে যাওয়া। আমি থাকি খুলনায়, তাই এখান থেকেই যোগ দেব আমি। ক্যাম্পিংয়ের জন্য যে জায়গাটা খুঁজে বের করলাম আমি, সেটা মোংলা উপজেলার দক্ষিণ চিলা গ্রামে। সুন্দরবনের একেবারে কাছেই গড়ে উঠেছে বাদাবন ইকো কটেজ। ভাবলাম ভাগ ভাগ হয়ে কেউ কটেজে আর কেউ তাঁবুতে থাকলেই হবে।

মায়াবী বাদাবন ইকো কটেজ

এদিকে জাহাজ বিশেষজ্ঞ জুয়েল জানিয়েছে হুলার হাট নেমে পরে বাই রোডে মোংলা আসলে অনেক সময় বাঁচবে। সেটাই শেষ পর্যন্ত ধার্য্য হলো। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টায় এমভি মধুমতিতে চড়ে রওনা দিল মৃদুল ভাইয়ের নেতৃত্বে ১২ সদস্যের দল, আমি আর শাওন সড়কপথে মোংলায় পৌঁছে গেলাম। নদী পার হয়ে কটেজ থেকে পাঠানো অটোতে উঠে সন্ধ্যার পর পর পৌঁছালাম বৈদ্যমারি বাজারের কাছেই বাদাবন কটেজে। মাস ছয়েক আগে যখন নির্মাণ কাজ চলছিল তখন আমি একবার এসেছিলাম। তখন অবশ্য উপদেশ দেবার জন্য এসেছিলাম, এবার থাকার জন্য এসেছি।
কটেজে ব্যাগ রেখে সবার আগে প্রথম কাজ পুকুরে ঝাপ দিয়ে পড়া। আমি ঝাপ দেবার সাথে সাথে আরও অনেকগুলো ঝাপ দেবার শব্দ শুনলাম। ওগুলো বাটা প্রজাতির মাছ, এ এলাকায় বলে খরসুনা। পানির একেবারে উপরের অংশে চোখ তুলে ঘুরে বেড়ায় এরা। অনেক দ্রুত গতি সম্পন্ন এ মাছগুলো পুকুরের উপরিভাগে ঘোরাঘুরি করে অক্সিজেন উৎপাদনে সাহায্য করে। কাছাকাছিই ছিল মাছগুলো, আমাকে ঝাপ দিতে দেখে দ্রুত ছিটকে পালিয়ে গেল। বিকেলে দলের বাকি সদস্যরা নাকি গোসল করতে নেমে এগুলোকেই সাপ ভেবে আঁতকে উঠেছিল।
লাফ-ঝাপ শেষ হবার পর কটেজের সামনে পুকুর পাড়ে গিয়ে বসলাম। জায়গাটা আড্ডা দেবার জন্য অসাধারণ। বাদাবন কটেজটা কাঠ, গোলপাতা আর বাঁশের বেড়া দিয়ে তৈরী খুব চমৎকার একটি কটেজ। কটেজের মালিক লিটন তরুণ একজন গাইড। আমি ব্যক্তিগতভাবে এ ধরনের কমিউনিটি বেইজড ট্যুরিজমের একজন শুভাকাঙ্ক্ষী। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সাথে মিশে গিয়ে তাদের বাড়ির কাছে থেকে ঘোরাঘুরি করাটা আমার খুব প্রিয়। লিটনের মুখে শুনলাম আমাদের আগে মাত্র তিনটি গ্রুপ এসেছিল। ওকে স্বান্তনা দিয়ে বললাম, ধৈর্য ধরো, শীতে তোমার অবস্থার অনেক উন্নতি হবে। মোংলায় বেশ গরম পড়ে, এই মৌসুমে আমাদের মতো বেয়াড়া পর্যটক ছাড়া অন্য কারো আসারও কথা নয়।
দুটো ডাবল রুম কটেজে। মাঝে ডাইনিং রুম আর একটু ফাঁকা জায়গা। কটেজের বাইরে পুকুরের মাঝে একটি মাচার মতো একটি ঘর করা, এছাড়া পুকুর পাড়ে পাতা হয়েছে দুটো আরাম কেদারা। দুই বেড রুমে মোট চারটি বিছানা পাতা, সহজেই দলের আট সদস্যের জায়গা হয়ে গেল। প্রতি রুমের সাথে অ্যাটাচ বাথরুম রয়েছে যার একটি হাই কমোড আর একটি লো কমোড। রাতে বাগদা চিংড়ি, মুরগী, সব্জি আর ডাল দিয়ে চমৎকার খাবার খেলাম আমরা। রান্না ভাল হওয়াতে বা আমরা বেশি ক্ষুধার্ত থাকায় অন্যদিনের তুলনায় বেশিই খেলাম।
বাগদা চিংড়ি, মুরগি, সব্জি, ডাল সব মিলে বেশ ভালো খাবার ছবি লেখক

আমরা ১৪ জনের মধ্যে ৪ জন ঠিক করলাম ক্যাম্পিং করবো। লিটনের এখানেই তাঁবু ভাড়া পাওয়া যায়, তবে আমি নিজের তাঁবু ব্যবহার করতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। কটেজের একটা দিক ঘেরের পাড়ে তাঁবু ফেলার জন্য আদর্শ। সামনে কয়েক কিলোমিটার শুধুই চিংড়ির ঘের। সেখানে ইতোমধ্যে গাছে হ্যামক বেঁধে মৃদুল ভাই শুয়ে পড়েছেন। মশা যাতে কামড় দিতে না পারে সেজন্য উনি গায়ের খোলা অংশে অডোমোস মেখে রেখেছেন।
ভোরের আলোয় ক্যাম্পসাইট ছবি লেখক

প্রদীপ আর নয়নের সহযোগিতায় আমি আবার তাঁবু খাটিয়ে ফেললাম, তবে ইচ্ছে করেই তাঁবুর ফ্লায়ার (পানি নিরোধক আবরণ) লাগালাম না। গরম অবশ্য কমে এসেছে, ঘেরের পাড়ে বয়ে চলেছে মৃদুমন্দ বাতাস। নয়ন আর প্রদীপও তাঁবু স্থাপন করে ফেলেছে, ওরাও ফ্লায়ার লাগায়নি। লিটন এসে আমাদের সাবধান করে দিয়ে গেল, রাতে জোয়ার আসলেই বৃষ্টি হবে। আনুমানিক সময়ও বলে গেল রাত তিনটা থেকে ভোর পাঁচটা। আকাশের তারা দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়লাম আমি। হঠাৎ করেই ঘুমটা ভাঙল আমার, প্রায় সাথে সাথেই বুঝলাম বৃষ্টি পড়ছে। লাফ দিয়ে উঠে টেন্ট লাইট নিয়ে ফ্লায়ার বের করে তাঁবুর উপর স্থাপন করলাম। আর এর মধ্যে চিৎকার করে বাকিদের উঠালাম।
মৃদুল ভাই হ্যামক ছেড়ে আমার তাঁবুতে আশ্রয় নিল। এবার তুমুল বৃষ্টি শুরু হলো, মোবাইলে সময় দেখে অবাক না হয়ে পারলাম না, রাত তিনটে বাজে। লিটন ভালোই অনুমান করতে পেরেছে। টিনের চালে যেমন বৃষ্টির ছাট অসাধারণ লাগে, তাঁবুর ফ্লায়ারেও বৃষ্টির শব্দ মনের মধ্যে অন্যরকম অনুভূতির জন্ম দেয়। মাটিতে বৃষ্টি পড়ার কারণে সৃষ্ট গন্ধও বেঁচে থাকার গুরুত্ব অনুধাবন করতে শেখায়। সকালে ঘুম ভেঙে উঠে দেখলাম এখনও সূর্য ওঠেনি। লাল রংয়ের আভা ঘেরের উপর অসাধারণ এক পরিবেশ তৈরী করছে। যে কয়জন আমরা সকালে উঠেছি তারা বসে বসে উপভোগ করছি এই নির্মল পরিবেশের সূর্যোদয়।
কটেজে স্নিগ্ধ সকাল ছবি লেখক

কিছু সময় পরে আমরা আবার পানিতে নামার পাঁয়তারা করছিলাম এসময় দেখলাম রংধনু উঠেছে। মনে হলো বহুদিন পরে পূর্ণাঙ্গভাবে রংধনুর দেখা পেলাম। ঘেরের পানিতে সেই রংধনুর প্রতিচ্ছবিও দেখার মতো। এর মধ্যে লিটন এসে জানাল সকালের নাস্তা প্রস্তুত। খিচুড়ি, ডিম ভাজা, চা আর বাগানের পেয়ারা দিয়ে নাস্তা সেরে আমরা আমাদের এই অভিযানের পরের অংশের জন্য প্রস্তুত হয়ে বের হলাম। বলা হয়নি, পুরো কটেজের ভাড়া, ১৪ জনের রাতের আর সকালের খাওয়া সহ সব মিলে দিতে হয়েছে ৬,৫০০ টাকা, অর্থ্যাৎ প্রতি জনের ভাগে মাত্র ৫০০ টাকারও কম পড়েছে।
জয়মনি ছবি লেখক

বাদাবন থেকে বের হয়ে আমরা একটা নসিমনে উঠে আধা ঘণ্টা পরে পৌঁছালাম জয়মনিতে, সেখানে আমাদের জন্য আমাদের নৌকা অপেক্ষা করছে। নৌকার ছাদে চমৎকার ছাউনি দিয়ে বসার জায়গা করা আছে। আমাদের সুন্দরবন ডে ট্রিপের প্রথম গন্তব্য হাড়বাড়িয়া। জয়মনি থেকে হাড়াবাড়িয়া যেতে এক ঘণ্টার মতো লাগলো। হাড়বাড়িয়া ঘাটে নামার পরে বুঝলাম আমরা ছাড়া বন বিভাগের লোকজনই শুধু আছে। বিট কর্মকর্তা আমাদের থেকে সরকার নির্ধারিত রাজস্ব নিয়ে সুন্দরবনের একদিন ভ্রমণের অনুমতিপত্র দিয়ে দিলেন। সঙ্গে একজন সশস্ত্র গার্ডও দিলেন। হাড়বাড়িয়াতে বাঘ আসার ঘটনা খুবই সাধারণ, তাই সবাইকে দলবদ্ধভাবে চলতে বলা হয় ও গার্ড দেয়া হয়।
হাড়াবাড়িয়ার ট্রেইল-ছবি লেখক

বনের মধ্যে কাঠের একটি ৩০ মিনিটের ট্রেইল করা হয়েছে। অমাবশ্যার জোয়ারে ভালোই পানি উঠেছে, তাই বনের এই অংশ মোটামুটি প্লাবিত, তবে কাঠের ট্রেইল বেশ উপরে থাকায় আমাদের কোনো সমস্যা হয়নি। সুন্দরী, গড়ান, বাইন, কেওড়া সহ অনেক ধরনের গাছ দেখলাম। তবে পানি ওঠার কারণে কয়েকটি হরিণ, সাপ, কাঁকড়া ছাড়া তেমন কিছুর দেখা মেলেনি। আমরাও দেরি না করে রওনা দিলাম করমজলের উদ্দেশ্যে।
হাড়বাড়িয়া-করমজল পুরোটাই পশুর নদী ধরে যেতে হয়, সুন্দরবন প্রায় সব সময় পাশেই থাকে। ২ ঘণ্টার বেশি সময় নদীতে চলার পর আমরা এসে পৌঁছালাম করমজলে। ঘাটেই অপেক্ষা করছিল বানরের দল, ট্যুরিস্টদের দেখেই এগিয়ে আসলো, উদ্দেশ্য যদি কিছু ছিনতাই করা যায়। তাদেরকে সে সুযোগ না দিয়ে একরকম দৌড়ে গেলাম বিভিন্ন বন্য প্রাণীর প্রজনন কেন্দ্রে।
করমজলে দেখা গেল অনেকগুলো বানর ছবি লেখক

চিত্রা হরিণের খাঁচার পাশ কাটিয়ে আমরা গেলাম বিভিন্ন বয়সী কুমিরের বাচ্চা দেখতে। প্রথমটাতে উঁকি দিয়ে বুড়োটার দেখা পেলাম। পরে বাকি খাঁচায় মাঝারি ছোট সব বয়সী কুমিরের বাচ্চা দেখলাম। ট্রেইলে ঢোকার আগে অনেকক্ষণ ধরে পুকুরের দিকে তাকিয়ে দেখছিলাম বড় কুমিরটাকে দেখা যায় কিনা, কিন্তু সে মনে হয় আজ অভিমান করে আছে, কোথাও তার কোনো চিহ্নও নেই। ট্রেইলে সবাইকে ঢুকিয়ে শেষ ব্যক্তি হিসেবে ঢুকতে যাচ্ছিলাম আমি, তখন তাকে পানির উপরে ভেসে উঠতে দেখলাম। এত কাছ থেকে এই ভয়ংকর প্রাণীটাকে দেখতে একটু হলেও ভয় ভয় লাগছিল। যদিও ভালো করেই জানি সীমানাপ্রাচীরের উপর দিয়ে লাফ দিয়ে আসা সম্ভব না। কয়েক মুহূর্ত ভেসে থাকার পর আবার ডুব দিল, আমিও ট্রেইলে ঢুকে পড়লাম।

 
নাম না জানা হাজারো পাখির ডাক, ম্যানগ্রোভের মধ্য দিয়ে চলে দেখা পেলাম টাওয়ারের। সেই সময় শুরু হলো তুমুল বৃষ্টি, টাওয়ারের আশ্রয়ে কিছুক্ষণ উপর থেকে বনভূমির দৃশ্য উপভোগ করে ফিরে চললাম। আমাদের সময় প্রায় শেষ, তাই তাড়াহুড়ো করেই ফিরতে হলো। করমজল থেকে বোট আমাদেরকে নামিয়ে দিয়ে গেল মোংলা। জয়মনি-হাড়াবাড়িয়া-করমজল-মোংলা এর ডে ট্রিপের জন্য বোটকে দেয়া হলো ৩,৫০০ টাকা। এছাড়া সরকারি রাজস্ব হিসেবে দেয়া লেগেছে আরও ২,০০০ টাকা। মোংলা থেকে ফিরে এসে কোনোমতে সবাইকে ট্রেনে তুলে দিতে পারলাম। চুইঝাল খাওয়ার সময় আর হলো না। কী আর করা, আরেকবার আসতে বলে বিদায় জানালাম সবাইকে।

ম্যানগ্রোভ-ছবি লেখক

বাদাবন ইকো কটেজের ফেইসবুক পেইজ: https://www.facebook.com/Badaban-Eco-Cottage-197766730993826/
মালিক লিটন জমাদ্দারের নাম্বার: 01736-331515
মোংলা নদী পার হয়ে বৈদ্যমারি বাজার অটোতে আসতে খরচ হবে ২০০ টাকা। কটেজে প্রতি রুমের ভাড়া ১,২০০ টাকা। আর খাবার খরচ ২০০-৩০০ টাকা প্রতিবেলা, কী খাবেন সেটার উপর নির্ভর করে। আমাদের খরচ পড়েছিল ২৫০ টাকা, খাবার ছিল বাগদা চিংড়ি, মুরগী, ডাল ও সব্জি। সকালের নাস্তা ১০০ টাকা করে।
ফিচার ইমেজ- লেখক

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সপ্তদশ শতকের ঢাকার কেন্দ্রীয় মসজিদ চকবাজার শাহী মসজিদ

রিশপ পাহাড়ের স্বর্গ উদ্যানে