প্রবাল দ্বীপে ক্যাম্পিং ও স্নোরকেলিং

প্রতি বছরই ভাবি ডিসেম্বরের শেষ দিকে সেন্টমার্টিন যাব। কারণ বছরের এ সময়টায় সমুদ্রের পানি সবচেয়ে স্বচ্ছ থাকে। আবার ভিড়ও বেশি থাকে এ সময়, টিকেট/শিপ/হোটেল সব কিছুই পাওয়া দুস্কর। এভাবে শেষ পর্যন্ত মার্চ চলে আসে, যখন পানি মোটামুটি ঘোলা হয়ে যায়। ২০১৭ সালে  রোহিংগা ও সিগন্যাল জনিত সমস্যার কারণে মানুষ অনেক কম যাচ্ছিল।
সুযোগ বুঝে ১৭ ডিসেম্বর সেন্ট মার্টিনে চলে গেলাম। সঙ্গে ট্রাভেলার্স অব বাংলাদেশের আরেকজন মডারেটর তালাশ শাহনেওয়াজ। আমার সাথে স্নোরকেলিং সেট ছিল। গতবছর আনিয়েছিলাম আমেরিকা থেকে। বাংলাদেশও পাওয়া যায় এখন। সেন্ট মার্টিনের পশ্চিম সৈকতে নিরিবিলি “ড্রিম নাইট রিসোর্ট” এ উঠলাম আমরা।

দ্বীপে আমাদের তাঁবু- ছবি তালাশ শাহনেওয়াজ

আমরা ৪ জন, জেটি থেকে রিক্সা নিয়ে ড্রিম নাইট রিসোর্টে পৌঁছানোর পর প্রথম কাজ ছিল দুপুরে খাওয়া। জাহাজে থাকতেই রিসোর্টে ফোন করে বলে দিয়েছিলাম আমাদের জন্য রুপচাঁদা মাছ আর ভাতের আয়োজন করতে। সুতারাং রিসোর্টে আমাদের খাবার প্রস্তুত ছিল। খেয়ে দেয়ে হ্যামকে শুয়ে দুলতে শুরু করলাম। সেন্টমার্টিনের পশ্চিম বীচ অদ্ভুত সুন্দর। এখানে এসে বসলে আমার মনে হয় সারাজীবন এখানেই কাটিয়ে দিতে পারবো। অথবা বুড়ো বয়সে অবসর নেবার পর এখানে এসে থাকবো।

বাজারে পাওয়া যায় এ ধরণের সামুদ্রিক মাছ-ছবি লেখক

যাই হোক, সন্ধ্যায় আমি আর তালাশ বের হলাম স্কুবা ডাইভিংয়ের বুক দিতে, গিয়ে খবর পেলাম এ বছর এখনও শুরুই হয়নি, তাই সঙ্গে থাকা স্নোরকেলিং সেটই ভরসা। রিসোর্টে ফিরে এসে আমাদের জন্য রাখা কোরাল মাছের বার বি কিউ খেয়ে নেমে পড়লাম তাঁবু স্থাপনের কাজে।
তখন জোয়ার চলে এসেছে। রিসোর্টের ঠিক নিচেই পানি। সারারাত সমুদ্রের পানির শব্দ শুনবো ভাবতেই ভালো লাগছিল। রিসোর্টে আমাদের এক রুম নেয়া ছিল। বাকি দুজন সে রুমে ঘুমিয়ে পড়লো। আমি আর তালাশ তাঁবু খাটালাম একেবারে সমুদ্রের পাশেই।

রাতের বারবিকিউ-ছবি লেখক

তাঁবুর বাইরে চেয়ারে বসে অনেক্ষণ আমরা তারা গুনলাম। তারপর শোয়ার সময় মনে হলো সমুদ্রে গর্জন কমে যাচ্ছে, অর্থাৎ ভাটা শুরু হচ্ছে। ভালোই ঠাণ্ডা পড়েছে। তাই স্লিপিং ব্যাগের মধ্যে আরাম করেই শোয়া যাচ্ছে। বাতাসের সাথে সাথে সমুদ্রের গর্জনে একটু পরেই ঘুমিয়ে পড়লাম। শেষ রাতের দিকে ঘুম ভাঙতেই অবাক হয়ে গেলাম, সমুদ্রের গর্জন অনেক দূরে চলে গেছে। উল্টো রিসোর্টের দিক থেকে গর্জন ভেসে আসছে। ভালোমতো ঘুম ভাঙার পরে বুঝলাম আমাদের দলের অন্য দুজন ভয়ংকর নাক ডাকছে, তাদের নাসিকার গর্জন সমুদ্রে গর্জনকে হার মানাচ্ছে!
যাই হোক, কিছুক্ষণ পর আবার ঘুমিয়ে পড়লাম। খুব ভোরে আবার ঘুম ভেঙে গেল অতি উৎসাহী দর্শকদের কথাবার্তার কারণে। তাদের প্রশ্ন ও আমার উত্তর:
ভাই হোটেল ভাড়া বাচাইলেন তাঁবুতে থেকে?
-নারে ভাই, তাঁবুর জন্য আরও বেশি ভাড়া নিয়েছে।
তাঁবুর দাম কত? ৫০০ না ১,০০০?
-ফ্রি দিচ্ছে, টেকনাফে দৌড় দেন।

সামুদ্রিক চিংড়ি (লবস্টার)-ছবি লেখক

প্রথমদিন রিসোর্টে পৌঁছে খাওয়াদাওয়া সেরে রওনা দিলাম ছেঁড়া দ্বীপের উদ্দেশ্যে। স্নোরকেলিং করতে হয় ভাটার সময়। তখন ভাটা ছিল ঠিক, তবে দুপুরের পর রওনা দেয়াতে আলো খুব কমে যাচ্ছিল। অনেক জীবিত কোরাল দেখলাম, কিছু মাছও দেখলাম।
জোয়ারের পানি সরে গেলে যে কোরালগুলো শুকনো জায়গায় থাকে সেগুলো মরে যায়। এ কারণেই জীবিত কোরাল দেখতে ভাটার সময় নামতে হয়, এছাড়া জোয়ারের ধাক্কায় স্নোরকেলিং করার সময় মারাত্মক আহত হবার সম্ভাবনা থাকে। সেদিনের মতো আমরা ফিরে গেলাম রিসোর্টে।

স্নোরকেলিংয়ের সরঞ্জাম-ছবি লেখক

পরের দিন সকালে নাস্তা করে বের হবার সময় দেখলাম জোয়ার তখনো আছে। এদিকে তিনটায় আমাদের ফিরতি টিকেট। কিছু করার নেই, ভাটার অপেক্ষা না করেই এই কমে আসা জোয়ারে নামার সিদ্ধান্ত নিলাম। আগের দিন যেখানে নেমেছিলাম, সেখানে না নেমে অন্যদিকে নামলাম।
স্নোরকেলিং মাস্ক, ফিন পরে সবকিছু ঠিক মতো আছে কিনা দেখার জন্য ক্যামেরা ছাড়াই ডুব দিলাম, সাথে সাথে প্রায় ২০০ মাছের একটা ঝাঁকের মধ্যে পড়লাম। দেখতে কাচকি মাছের মতও, কিন্তু গায়ে তীব্র নীল ডোরা দাগ দেয়া এই মাছের পুরো ঝাঁক আমাকে দেখে থমকে গেল। দু:খে মাথার চুল ছেঁড়ার অবস্থা আমার, কেন অ্যাকশন ক্যামটা সাথে নিয়ে নামলাম না।

পশ্চিম বীচে চলছে সাইক্লিং-ছবি লেখক

ক্যামেরা নিয়ে অনেকক্ষণ ধরে সেই ঝাঁক খুঁজে বেড়ালাম, কোনো লাভ হলো না। সেখান থেকে উঠে আরেকটু সামনে আরেক জায়গায় নামলাম। এবার দুজন একই সাথে নেমেছি। একটু পরে তালাশকে দেখলাম এক জায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক কোমর পানিতে, যে জায়গাটায় বালি। আমি তাকাতেই বলল এখানে একটা বেশ বড় মাছের ঝাঁক আছে। সাথে সাথে ডাইভ দিলাম আমি। পানির নিচে হাত দিয়ে তালাশ নির্দেশনা দিচ্ছিল কোথায় যেতে হবে। ওকে অতিক্রম করতেই দেখা পেলাম পুরো দলটার।
এ যেন পানির নিচের বিশাল একুরিয়াম। মূলত হলুদ ও কালো ডোরাকাটা এঞ্জেল ফিসের ঝাঁক এটা। বেশ বড়সড় কয়েকটাকেও দেখলাম দলের সাথে। এছাড়া আছে কয়েক প্রকারের সামুদ্রিক কৈ। কালো রংয়ের এই কৈগুলোর ভালোই সাহস আছে। অনেকক্ষণ ধরে তাকিয়ে থাকে, কাছে গেলেই ঝট করে ঢুকে পড়ে কোনো কোরালের ফাঁকে। পিছু নিয়ে আর কোনো লাভ হয় না, কোরালগুলোর কোনো না কোনো খাঁজ দিয়ে আবার বেরিয়ে অন্য পাশে চলে যায়।
অনেকক্ষণ ধরেই ওদের তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিলাম। এর মধ্যে তালাশও যোগ দিয়েছে আমার সাথে। দুজন মিলে আরও কিছুক্ষণ মাছ দেখে উঠে পড়লাম। উপরে উঠতেই তালাশের প্রথম প্রশ্ন, আপনি এরকম বাইন মাছের মতো মোচড়ামোচড়ি করছিলেন কেন? উত্তর দিলাম, মাছ যেদিকে যাচ্ছিলো আমিও ফিনের সাহায্য নিয়ে দ্রুত তাদের পেছনে যাচ্ছিলাম।
এ জায়গা থেকে উঠে আরেক জায়গায় চেষ্টা করেছিলাম কিছুক্ষণ, কিন্তু তেমন কোনো মাছ পাচ্ছিলাম না। একটু পরে আবিস্কার করলাম জাল পাতা আছে ওখানে। এদিকে দুপুর ১২টার বেশি বাজে, পরিপূর্ণ ভাটা এখন। কিন্তু হায়, আমাদের হাতে আর সময় নেই, দ্রুত ফিরে চললাম রুমের দিকে। ৩টায় শিপ ছেড়ে যাবে, তার আগেই আমাদেরকে গোসল করে ভাত খেয়ে ফিরতে হলো জেটিতে।

ঢাকা থেকে টেকনাফ বাস ভাড়া ৯০০ টাকা, সৌদিয়া এক্স, সেন্টমার্টিন পরিবহন ভালো, জাহাজ: জনপ্রতি ৫৫০ টাকা
রিসোর্ট: ড্রিম নাইট রিসোর্ট, ৪ জনের রুম ১,৫০০ টাকা (https://www.facebook.com/DreamNightResorts/)
খাওয়া প্রতি বেলা ৩০০ টাকা জনপ্রতি
ছেঁড়া দ্বীপ ভ্রমণ: স্পীড বোটে জনপ্রতি ৩০০ টাকা
সেন্টমার্টিন একটি সংরক্ষিত এলাকা। দয়া করে এতে কোনো প্লাস্টিকের আবর্জনা ফেলবেন না, আর কোরালের ক্ষতি হয় এমন কিছু করবেন না।
ফিচার ছবি: লেখক

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

নোয়াখালী-সোনাইমুড়ী-সেনবাগ-দাগনভূঁইয়ায় একদিনের ঘোরাঘুরি

‘প্রাচ্যের মুক্তা’ খ্যাত গোয়ার কোলভা বীচ ভ্রমণ