জোছনার আলোয় ঝাউ বনে ঘেরা সোনাদিয়া দ্বীপে ক্যাম্পিং

ভরা পূর্ণিমায় ঝর্ণার রিনঝিন জল পতনের শব্দে বা হিম হিম হাওয়ায় পাহাড়ের চূড়ায় তো অনেক বার তাঁবু বাস করা হলো। এবার পূর্ণিমার আলোয় গভীর রাতে সমুদ্রের পাশে ক্যাম্পিং করে সাগরের গর্জন শোনার ইচ্ছে প্রবল থেকে প্রবলতর হতে থাকে। তা ইচ্ছে যখন হয়েছে তখন সাধ্যের মধ্যে একটা পরিকল্পনা করে ফেলি।

কোথায় যাওয়া যায় চিন্তা করতে করতে বের হলো সোনাদিয়া দ্বীপ। ভিড়ভাট্টা এড়িয়ে নিরিবিলি সময় যাপন করা যাবে এখানে। পপুলার ট্যুরিস্ট স্পট হিসেবে সোনাদিয়া দ্বীপ তখনও এত পরিচিত হয়নি। তাই সমুদ্রের কাছে ক্যাম্প করে থাকার জন্য সোনাদিয়া দ্বীপ ঠিক হলো।

সোনাদিয়া দ্বীপ; ছবি- লেখক

দিনক্ষণ স্থির করে ১০ জন মিলে রাতের বাসে ঢাকা থেকে কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে ফকিরাপুল থেকে রওনা হই। যাত্রা বিরতিতে কুমিল্লায় রাতের খাবার সেরে নেই। সকাল ৭টায় কক্সবাজার পৌঁছাই। বাস কলাতলি মোড়ে নামিয়ে দিলে পাশেই কলাতলি নামে এক রেস্টুরেন্টে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে সকালের নাস্তা করে নেই। আমার এর আগে কখনো কক্সবাজার যাওয়া হয়নি। সে কারণে দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত দেখার তর সইছে না আর। তাই নাস্তা শেষ করেই সোজা চলে যাই সমুদ্র তটে।

বিশাল বিশাল ঢেউ গর্জে এসে পড়ছে সমুদ্র তীরে। আকাশের নীল আর সমুদ্রের নীলেরা মিলে মিশে একাকার। দূর সীমানায় আকাশ আর সাগর এক হয়ে গিয়েছে। সমুদ্রের বিশালতায় নিজেকে সমর্পণ করে বসে রই অনেকক্ষণ। বাকিরা সমুদ্রের কাছে এসে যেন দুরন্ত শৈশব ফিরে পেয়েছে। এরই মধ্যে চট্টগ্রাম থেকে যে দুইজনের আসার কথা ছিল তারও ইতোমধ্যে কক্সবাজারে চলে এসেছে।

ঝিনুক বাঁধানো তটে; ছবি- রাসেল আহমেদ জয়

ক্যাম্পিংয়ের সরঞ্জাম আর টুকটাক কেনাকাটা করে অটো নিয়ে সোজা চলে যাই কক্সবাজারের কস্তূরী জেটি ঘাট বা ৬নং জেটি ঘাটে। ঘাটে ছোট বড় বিভিন্ন সাইজের মাছ ধরার ট্রলার আছে। প্রত্যেকটি ট্রলারে বাংলাদেশের পতাকা লাগানো। সমুদ্র সীমানায় ট্রলার চিহ্নিত করার জন্য মূলত এই ব্যবস্থা। ঘাটে আগে থেকে রিজার্ভ করা ছিল ট্রলার। সেই ট্রলারে করে রওনা হই সোনাদিয়া দ্বীপের দিকে।

কক্সবাজারে কলাতলি সৈকতে আমরা কয়েকজন; ছবি- রাসেল আহমেদ জয়

শীতকালে সমুদ্র শান্ত থাকে। অন্যদিকে, সমুদ্রের কাছে যাওয়ার উপযুক্ত সময় শীতকাল। সমুদ্রের নীলাভ জলের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে যেতে থাকে ট্রলার। কিছুক্ষণ পর জিয়ন ভাই ডাক দিয়ে বলল ঐ দেখ মহেশখালী দ্বীপ। বাতিঘরের জন্য মহেশখালী সুপরিচিত। এই দ্বীপকে আড়াল করে এগিয়ে যাচ্ছি সোনাদিয়া দ্বীপের দিকে।

সোনাদিয়ার পথে; ছবি- রাসেল আহমেদ জয়

ঘণ্টা দেড়-দুই পর পৌঁছে যাই অনিন্দ্য সুন্দর দ্বীপ সোনাদিয়ায়। দ্বীপের সীমানায় পা রাখতে গিয়ে দেখি তখন সূর্য মামা মাথার উপর চলে এসেছে। খালের পানি কম থাকায় ট্রলার নোঙর ফেলেছে তীর থেকে বেশ কিছুটা দূরে। হাঁটু সমান জলে ডিঙিয়ে পাড়ে আসতে হয়। সেখান থেকে হেঁটে সোনাদিয়া দ্বীপের পূর্ব পাড়ে আসি। এখানেই আমরা আমাদের ঘাঁটি গাড়ি একরাতের জন্য। পেছনে আকাশমুখী ঝাউ গাছের বন আর সামনে দিগন্ত বিস্তৃত আকাশ সমুদ্রের সীমানায় মিশে আছে।

তাঁবু খাটানো হচ্ছে; ছবি- রাসেল আহমেদ জয়

কক্সবাজার জেলার মহেশখালী উপজেলার একটি সবুজ মায়াবী দ্বীপ সোনাদিয়া। এর আয়তন প্রায় ৯ কিলোমিটার। কক্সবাজার জেলা থেকে ১৫কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে এই দ্বীপের অবস্থান। মহেশখালী দ্বীপ থেকে এই দ্বীপকে আলাদা করেছে একটি খাল। দ্বীপটি দুই পাড়ায় বিভক্ত। পূর্ব পাড়া আর পশ্চিম পাড়া। আমরা পূর্ব পাড়ার দিকে ঘাঁটি করি। তবে খুব সকালে উঠতে পারলে পশ্চিম পাড়ায় সমুদ্র তট থেকে লাল কাঁকড়ার ঝাঁকে ঝাঁকে দেখা পাওয়া যায়।

দুপুরের ভোজন চলছে; ছবি- লেখক

দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা আনসার ভাইয়ের বাসায় করা হয়েছে। সাথে করে বয়ে আনা বাজার সদাই আনসার ভাইয়ের হাত দিয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। আমরা তাঁবুগুলো খাটাতে থাকি। পুরো দ্বীপে আমরা কয়েকজন ছাড়া আর কেউ নেই। তাঁবু সেট করা শেষ হলে কয়েকজন চলে যায় পানিতে ঝাপাঝাপি করতে। মনের সাধ মিটিয়ে নোনাজলে গোসল করে নেয় কিছুক্ষণ। এরই মধ্যে আনসার ভাই খবর পাঠায় দুপুরের খাবার প্রস্তুত। সবাই মিলে তাড়াতাড়ি খেতে যাই। ঝাউ গাছের বন পেরিয়ে যাই আনসার ভাইয়ের বাড়িতে।

ঝাউ বন পেরিয়ে আনসার ভাইয়ের বাড়ির পথে; ছবি- রাসেল আহমেদ জয়

খাওয়া শেষ করে আনসার ভাইয়ের পরিবারের সাথে গল্পগুজব করে যখন ফিরছি তখন পড়ন্ত বিকেল। সূর্য তখন তীর্যকভাবে তার উত্তাপ ছড়াচ্ছে। সূর্যের তীর্যক আলোয় সমুদ্রের নীলাভ পানি চিকচিক করছে। একপাল মহিষ সারাদিনের বিচরণ শেষে পূর্ব পাড়ার সমুদ্র তট ধরে পশ্চিম পাড়ার দিকে এগিয়ে যায়।

বেলা শেষে ঘরে ফেরার পালা; ছবি- রাসেল আহমেদ জয়

ঝিনুক বাঁধানো তটে নীল জলের ঢেউ আছড়ে পড়ছে। সবুজ ঝাউ বনে ঘেরা সমুদ্র তটে লাল টুকটুকে সূর্য সমুদ্রের জল রাশির মধ্যে টুপ করে হারিয়ে যায়।

সূর্য ডুবিডুবি করছে; ছবি- রাসেল আহমেদ জয়

রাতেও আনসার ভাইয়ের বাড়িতে খাবারের ব্যবস্থা হয়। সেখান থেকে খেয়ে বারবিকিউয়ের রসদ নিয়ে ক্যাম্পে ফিরি। চাঁদের আলো গায়ে মেখে সমুদ্রের পাশেই বারবিকিউয়ের আয়োজন করি। ঝাউ বনের ফাঁক দিয়ে নেমে আসে অপরূপ জোছনা। এ যেন এক অন্যরকম সোনাদিয়া। মুগ্ধ নয়নে চেয়ে থাকি ঘোর লাগা এই চাঁদের আলোয়। জোছনার আলো, ঝাউ বন আর নীল জলের সমুদ্রর ঢেউয়ের গর্জনে বিমোহিত হয়ে থাকি।

বারবিকিউ চলছে; ছবি- লেখক

রাতের গভীরতার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে সমুদ্রের গর্জন। এবার ঘুমাতে যাওয়ার পালা। একঘেয়েমি আর যান্ত্রিকতার শহরে আবার ফিরতে হবে সকালে। তাঁবুতে গিয়ে স্লিপিং ব্যাগের মধ্যে ঢুকতেই চোখে রাজ্যের ঘুম নেমে এলো। সমুদ্রের গর্জন আছড়ে পড়ার সাথে সাথে আমিও হারিয়ে যাই ঘুমের অতল গহ্বরে।

যান্ত্রিক শহরে ফেরার পালা; ছবি- লেখক

যেভাবে যাবেন

দেশের যেকোনো জায়গা থেকে প্রথমে আপনাকে কক্সবাজারে আসতে হবে। কলাতলির মোড় থেকে অটো করে কস্তূরীর ঘাট বা ৬নং জেটি ঘাটে যাবেন। সেখান থেকে ট্রলারে করে সোনাদিয়া দ্বীপ। লোক বেশি থাকলে ট্রলার রিজার্ভ করে নিয়ে যেতে পারেন। মহেশখালী হয়েও সোনাদিয়া যাওয়া যায়।

সোনাদিয়া দ্বীপে প্রাণী বৈচিত্র্য; ছবি- রাসেল আহমেদ জয়

থাকা খাওয়া

মূলত সোনাদিয়া দ্বীপে যারা যায় তার বেশির ভাগ তাঁবু করেই থাকে। খাওয়ার ব্যবস্থা চাইলে নিজেরাও করতে পারেন অথবা স্থানীয় লোকদের সাথে কথা বলে ব্যবস্থা করতে পারেন।

ঘরে ফেরার তাড়া; ছবি- রাসেল আহমেদ জয়

অবশ্যই মনে রাখবেন
*ভালো মানের টর্চ লাইট সাথে নিতে ভুলবেন না।
*যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলা থেকে দূরে থাকবেন।
*খেয়াল রাখবেন আপনার অতি উচ্ছ্বাসে প্রকৃতির যেন কোনো ক্ষতি না হয়।
*সঙ্গে নেওয়া পলি প্যাকেটগুলো সঙ্গে নিয়ে ফিরুন।
*সমুদ্ররে নামার সময় অবশ্যই লাইফ জ্যাকেট পরতে হবে।

*** ফিচার ইমেজ- রাসেল আহমেদ জয়

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ইংল্যান্ডের রোমাঞ্চকর পাঁচটি রোডট্রিপ

সুন্দরবন ভ্রমণের শেষদিনে হিরণ পয়েন্ট ও করমজলে